রবীন্দ্রনাথ ও শেলী – কল্পনা বিদ্রোহ ও বিষাদ

রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন,
“তাহার পরে বয়সে আরো কিছু বড়ো হইয়াছি; সে-সময়কার লেখকদলের মধ্যে সকলের কনিষ্ঠ বলিয়া একটা আসন পাইয়াছি— কিন্তু সে-আসনটা কিরূপ ও কোন্‌খানে পড়িবে তাহা ঠিকমত স্থির হইতেছিল না; ক্রমে ক্রমে যে একটু খ্যাতি পাইতেছিলাম তাহার মধ্যে যথেষ্ট দ্বিধা ও অনেকটা পরিমাণে অবজ্ঞা জড়িত হইয়া ছিল; তখনকার দিনে আমাদের লেখকদের একটা করিয়া বিলাতি ডাকনাম ছিল, কেহ ছিলেন বাংলার বায়রন, কেহ এমার্সন, কেহ আর-কিছু; আমাকে তখন কেহ কেহ শেলি বলিয়া ডাকিতে আরম্ভ করিয়াছিলেন”
রবীন্দ্রনাথ এবং শেলী এই দুই কবিকেই কল্পনার প্রথম প্রেমিক বলতে পারি। শেলী তাঁর একটি গদ্য কবিতায় বলেছিলেন যে মানুষ মূলত কল্পনাপ্রবণ “An Imaginative being”
ভাবলে অবাক লাগে প্রায় একই ভাবে একই সুরে কথা বলেছেন রবীন্দ্রনাথ,
“যা বস্তুগত জিনিস তা মানুষের মনের স্পর্শে তারই মনের জিনিস হয়ে ওঠে। সেই মনের বিশ্বের সম্মিলনে মানুষের মনের দুঃখ জুড়িয়ে যায়, তখন সেই সাহিত্য থেকে সাহিত্য জাগে। যে-শক্তির দ্বারা বিশ্বের সঙ্গে আমাদের মিলনটা কেবলমাত্র ইন্দ্রিয়ের মিলন না হয়ে মনের মিলন হয়ে ওঠে সে-শক্তি হচ্ছে কল্পনাশক্তি”
কল্পনাবিদ্ধ কবিজীবন কী রকম হতে পারে শেলী তার নমুনা দিয়েছেন “Prometheus Unbound” নামক কাব্যনাট্যে। কল্পনার অভিসারে সেই ভাসমান আত্মার অনন্ত বিস্তার পাচ্ছি এশিয়ার গীত-ঝংকারময় সংলাপ বাক্যে,
“My soul is an enchanted boat
Which like a sleeping swan, doth float”
আমার আত্মা এক বিমোহিত তরণী, রাজহংসের মত ভাসমান তোমার গানের রূপোর ঢেউয়ে। রবীন্দ্রনাথের কবিতার ছত্রে ছত্রে কল্পনার প্রতি উচ্ছ্বসিত আসক্তির অবিকল এক প্রতিরূপ পাচ্ছি।
“অনন্ত এ আকাশের কোলে
টলমল মেঘের মাঝার
এইখানে বাঁধিয়াছি ঘর
তোর তরে কবিতা আমার”
ওয়ার্ডসওয়ার্থ অথবা শেলীর মতো রবীন্দ্রনাথও বিশ্বাস করতেন মধ্যবর্তিনী কল্পনার ভিতর দিয়েই সৌন্দর্য তথা বিশ্ব রহস্যের উন্মোচন সম্ভব।
“চিরপ্রশ্নের বেদীসম্মুখে চিরনির্বাক রহে
বিরাট নিরুত্তর,
তাহারি পরশ পায় যবে মন নম্রললাটে বহে
আপন শ্রেষ্ঠ বর”।
একেই বলতে পারি কবির দিব্যদর্শন। কল্পনা এই শব্দটি ‘কবি কাহিনী’-তে একাধিকবার খুব সচেতন ভাবে ব্যাবহৃত। কাব্যের প্রথম চরণেই কল্পনাবালা এই শব্দটি পাচ্ছি।
“শুন কলপনা বালা, ছিল কোন কবি
বিজন কুটীর-তলে। ছেলেবেলা হোতে
তোমার অমৃত-পানে আছিল মজিয়া”।
রবীন্দ্রনাথের যেমন ছিল ‘কবি কাহিনী’ তেমনই শেলীর আছে “Alastor”। কবিতাটির পঙক্তিতে কবি কল্পনার দিব্য আলোকে বসুন্ধরার আত্মপ্রকাশের বিবরণী আছে।
“Thou hast unveiled thy inmost sanctuary,
Enough from incommunicable dream”,
পার্সি বিসশেলী ১৭৯২সালের ৪ই আগষ্ট সাসেক্সের হরসেমে জন্মগ্রহণ করেন। শেলি ইটন এবং অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষা গ্রহণ করেন। অক্সফোর্ডে এসে শেলি প্রগতিবাদী লেখক যেমন, টম পেইন এবং উইলিয়াম গডউইনের লেখাসমূহ পড়া শুরু করেন। তিনি সাসেক্সের ব্যারণবংশীয়, যৌবনেই পিতৃদ্রোহী। তার সংক্ষিপ্ত জীবনে ( ১৭৯২ – ১৮২২) তিনি যেন বহু জীবনের কাজ করে গেছেন। শেষ লেখা “Triumph of Life” তিনি সমাপ্ত করে যেতে পারেন নি।
“Swift as a spirit hastening to his task
Of glory & of good, the Sun sprang forth”
পাশাপাশি বিপরীত বিন্যাসে স্থাপন করি রবীন্দ্রনাথকে – কল্পনার দেবদূত এই কবি কলকাতার অভিজাত জমিদার বংশের সন্তান। শিলাইদহ, শান্তিনিকেতন, ইয়োরোপ, আমেরিকা – বিভিন্ন ভুবন জুড়ে তিনি নিরন্তর ভ্রাম্যমান। রবীন্দ্রনাথের প্রথম জীবনে শিলাইদহ যাত্রা এক সন্ধিকাল বলে গণ্য হতে পারে।
“বেলায় উঠে দেখলুম চমৎকার রোদ্দুর উঠেছে এবং শরতের পরিপুর্ণ নদীর জল তল-তল থৈ-থৈ করছে”।… “দুপুরবেলা খুব এক পশলা বৃষ্টি হয়ে গেল। তারপরে বিকেলে পদ্মার ধারে আমাদের নারকেল বনের মধ্যে সূর্যাস্ত হল। আমি নদীর ধারে উঠে আস্তে আস্তে বেড়াচ্ছিলুম”। এই পদ্মাপ্রেম রেশ রেখে গেছে চৈতালীর একটি কবিতায়,
“হে পদ্মা আমার,
তোমায় আমায় দেখা শত শত বার”।
প্রমথনাথ বিশী তাঁর ‘রবীন্দ্রকাব্য প্রবাহ’ গ্রন্থে শেলী ও রবীন্দ্রনাথের তুলনা করতে গিয়ে বলেছেন দুজন কবিই ধাবমান জলস্রোত খুব ভালোবাসতেন। শেলী নৌকা করে চলে যেতেন নদী থেকে সাগরে। আর রবীন্দ্রনাথ ভেসে যেতেন পদ্মার বুকে হাউসবোটে করে।
শেলীর কল্পনা নদীবুকে নৌকায় যাপিত জীবনকে যে পরম অর্ঘ্য দিয়েছিল তার প্রমাণ হিসাবে উপস্থিত করছি, “The boat on the serchio”
“OUR boat is asleep on Serchio’s stream,

Its sails are folded like thoughts in a dream”,

এই নদীপ্রতীক নৌকাপ্রতীক এই জলচিত্রকল্প স্বপ্নচিত্রকল্প রবীন্দ্রকাব্যের প্রথম পর্বে বার বার দেখা দিয়েছে। একটা উদাহরণ দেওয়া যাক
“গান গেয়ে তরী বেয়ে কে আসে পারে,
দেখে যেন মনে হয় চিনি উহারে”।
“ What the imagination seizes the beauty must be truth” – শেলী “ A defence of poetry”- তে বলেছেন কল্পনাই পৃথিবীর অগোচর সৌন্দর্যকে আমাদের চোখের সামনে এনে দেখায়।
রবীন্দ্রনাথের ‘মানসসুন্দরী’ কবিতায় কল্পনাকে স্বম্বোধন করেই কবিতাটির শুরু,
“আজ কোনো কাজ নয়– সব ফেলে দিয়ে
ছন্দ বন্ধ গ্রন্থ গীত– এসো তুমি প্রিয়ে,
আজন্ম-সাধন-ধন সুন্দরী আমার
কবিতা, কল্পনালতা”।
রবীন্দ্রভক্ত ও একজন শেলী প্রেমিক হিসাবে এই কবিতাটির সঙ্গে শেলীর “Hymn to Intellectual Beauty” কবিতাটির তুলনা করছি। একটা অন্তরঙ্গ ভারসাম্য সহজেই চোখে পড়ে। শেলী যাকে উদ্দেশ্য করে বলেছেন,
“The awful shadow of some unseen Power
Floats though unseen among us; visiting”
রোমান্টিক কল্পনার একদিকে রয়েছে বিদ্রোহ অন্যদিকে রয়েছে বিষাদ। ইতালির ফ্লোরেন্সের কাছে আর্নোকে ঘিরে থাকা এক বনের ভিতর এই কবিতার আইডিয়াটা শেলীর মাথার ভিতর জেগে উঠেছিল। সে ছিল এক মৃদু উষ্ণ দিন, হঠাৎ ধেয়ে এলো ঝোড়ো বাতাস, সঙ্গে নিয়ে এল বৃষ্টির বাহিনী। শেলী অতএব ঝড়কে উদ্দেশ্য করে অনায়াসেই উচ্চারণ করতে পারেন এই অমর পঙক্তিগুলি,
“Oh, lift me as a wave, a leaf, a cloud!
I fall upon the thorns of life! I bleed”!
রবীন্দ্রনাথের কল্পনা কাব্যে বর্ষশেষ কবিতায়। বিদ্রোহের সঙ্গে কল্পনার প্রিয়যোগ ঝড়ের অভ্যুদয়ের একটি অনবদ্য বর্ণনা –
“ঈশানের পুঞ্জমেঘ অন্ধবেগে ধেয়ে চলে আসে
বাধাবন্ধহারা
গ্রামান্তরে বেণুকুঞ্জে নীলাঞ্জনছায়া সঞ্চারিয়া
হানি দীর্ঘধারা”।
তীব্রতম দুঃখের ভিতর থেকেই জন্মায় আমাদের মধুরতম সঙ্গীত। অশ্রুসিক্ত বেদনা এভাবে অনেক সময়েই শুধু হাসির চেয়ে প্রিয় হয়ে ওঠে।
“আমার প্রাণের ‘পরে চলে গেল কে
বসন্তের বাতাসটুকুর মতো”।
হৃদয়ানুভুতির বিচ্ছেদকাতর রূপ, মানসের অশ্রু থর থর সংবেদনা, অপ্রাপনীয় স্বপ্নের জন্য ব্যথা ও আর্তির এক ঘনীভূত রূপ পাই ‘কড়ি ও কোমল’ কাব্যের আকাঙ্খা কবিতায়,
“আজি কে যেন গো নাই, এ প্রভাতে তাই
জীবন বিফল হয় গো।
তাই চারি দিকে চায় মন কেঁদে গায়–
“এ নহে, এ নহে, নয় গো।”
রবীন্দ্রনাথের পাশাপাশি সমান্তরালে শেলীর জগৎকে স্থাপন করি। নষ্ট আত্মাকে বেঁধেছে এক শিকল
“The chains that bind this ruined soul
Had cankered then—but crushed it not”
কবির মনে হয়ছিল তাঁর আশা নেই, স্বাস্থ নেই, শান্তি নেই, নেই তাঁর যশ ও শক্তি, প্রেম ও বিশ্রাম।
“কিন্তু নিরাশাও শান্ত হয়েছে এমন
যেমন বাতাস এই, সলিল যেমন
মনে হয় মাথা থুয়ে
এইখানে থাকি শুয়ে
অতিশয় শ্রান্তকায় শিশুটির মতো”।
এই যে রোমান্টিক কবিরা কল্পনাকে ধর্ম বলে মানলেন, বিষ্ময়বোধের পুনরুজ্জীবন ঘটালেন, তাঁরা একটি বিশেষ সমস্যার সন্মুখীন হয়েছিলেন। শেলীর ‘Skylark’ অথবা রবীন্দ্রনাথের পূরবী কাব্যের ‘বকুলবনের পাখি’ এই আদর্শপ্রতীক।
To a Skylark
“Hail to thee, blithe Spirit!
Bird thou never wert,
That from Heaven, or near it,
Pourest thy full heart
In profuse strains of unpremeditated art”
বকুল-বনের পাখি
“শোনো শোনো ওগো বকুল-বনের পাখি,
দেখো তো, আমায় চিনিতে পারিবে না কি।
নই আমি কবি, নই জ্ঞান-অভিমানী,
মান-অপমান কী পেয়েছি নাহি জানি”
অতএব রবীন্দ্রনাথকে মহাযুদ্ধবিধ্বস্ত পৃথিবীর মানুষকে শোনাতে হয়েছিল শান্তির ললিতবাণী, বলতে হয়েছিল “মানুষের প্রতি বিশ্বাস হারানো পাপ”। আর শেলী যাকে আমরা বলতে পারি আধুনিক প্রমিথিউস – মানুষকে ভালোবেসে ক্ষতবিক্ষতদের একজন – মানবের জন্য এক সব পেয়েছির দেশ এক মুক্ত ভুবন এক সমানাধিকারের স্বদেশ খুঁজে খুঁজে স্বল্পস্থায়ী জীবন কাটিয়ে দিলেন; ভোরের প্রথম আলোয় স্বৈরাচারী ও ক্রিতদাসগণ রাত্রির ছায়ার মতো মিলিয়ে যায়, –
“And tyrants and slaves are like shadows of night
In the van of the morning light”.
রোম্যাণ্টিক কল্পনার ভিতরে ভিতরে রয়েছে তীব্রআগ্রানুভূতি – বাইরে তার প্রকাশ শব্দ ছন্দের লিরিকের মায়াবী ধ্বনির উচ্ছ্বসিত ঝর্ণাধারা রয়েছে শেলীতে, মনে পড়ে যায় “The Indian Serenade” – এর কোনও কোনও পঙক্তি,
“Oh lift me from the grass!
I die! I faint! I fail”!
সেই লিরিকের ঝর্ণাধারা রয়েছে রবীন্দ্রনাথে –
“তাই মনে হয় আমি পরম সুন্দর,
আমি অমৃতনির্ঝর।
সুখসিক্ত নেত্র মম
শিশিরিত পুষ্পসম,
ওষ্ঠে হাসি নিরুপম
মাধুরীমন্থর”।
ঋণ: রবীন্দ্ররচাবলী। Shelly – Poetical Works/The Romantic Imagination – C.M.Bowra/রবীন্দ্রজীবনী – ১ম খন্ড প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়।