গাজন

রিয়াধের হাতে সুতলিটা বেঁধে দিলো মোড়ল, এবছর গাজনে রিয়াধের ভক্তা হওয়া পাকা। অনেকদিনের ইচ্ছে ভক্তা হওয়ার, ঘরের লোকগুলোর বাধাতে হয়ে ওঠে নি। ভক্তা হওয়ার জন্য যে কৃচ্ছ্রসাধন  তা নাকি রিয়াধের সইবে না, কাহিল হয়ে পড়বে। কি যে বলে এরা! মোষের মতো কালো হিলহিলে শরীরটা কি শুধু দেখতেই নাকি! পিঠের চামড়ায় কাঁটা বিঁধে সেও তক্তা  টানতে পারবে, কাঁটা বিঁধে চড়ককাঠে ঘুরতেও পারবে সে। সুখী দেখুক। এতোদিন ইঙ্গিতে অনেক বোঝাবার চেষ্টা করেছে যে সে সুখীকে ভালোবাসে। সুখী ডাগর চোখে তার শরীরটা দেখে ফিকফিক হেসেছে শুধু। রিয়াধের মনে হয়েছে সে হাসি তাচ্ছিল্যের। সুখী তাকে যোগ্য মনে করেইনি। খুব রাগ হয় রিয়াধের। ইচ্ছে করে সুখীর ক্লিপ লাগানো চুলের পোঁটলাটা খুলে লম্বা চুল ধরে হিড়হিড় করে টেনে নিয়ে গিয়ে মহাদেবের থানে সিঁদুর ঘষে দেয় মাথায়, জ্বালা জুড়াবে।
মন্দিরের ভক্তার জন্য নির্দিষ্ট বেতের লাঠিটা আনতে গিয়ে সে শুনলো গাজন পরব হবে না। করোনা রোগের জন্য দেশজুড়ে নানা বিধি-কানুন। ধর্মস্থান বন্ধ। ছৌ নাচও বন্ধ। রিয়াধের চোখে বিষাদ। নতুন ধুতি গামছা সব কিনে রেখেছে সে। মনকে প্রস্তুত করেছে গাজনটা পেরোলেই সুখীকে প্রেম নিবেদন করবে সোজাসুজি। তার আগে ভক্তা রিয়াধের সাহস ও কান্ডকারখানা দেখুক সে। এসব দেখে সুখী নিশ্চয়ই তার প্রতি আকৃষ্ট হবে। দূর, রিয়াধের ভাগ্যটাই খারাপ!
গাজনের দুপুর। সরকার দ্বারা জারি করা লক ডাউনে কেউ কোথাও নেই। শনশন্ তপ্ত বাতাস বইছে। শিবথানের চত্বর খাঁ খাঁ। সকালে শিবলিঙ্গের মাথায় কেউ একটা ধুতরা ফুল দিয়ে গেছে। একাকী শিবঠাকুর সেটিই মাথায় নিয়ে চুপচাপ দাঁড়িয়ে। আজ কত গমগমে পরব হবার কথা ছিলো তাকে ঘিরে! মন্দিরের কোণাটায় রাখা আছে লোহার কাঁটা দিয়ে তৈরী করা চাবুক, আজ ভক্তারা নিজেদের গায়ে সপাসপ্ বসাতো। রক্ত ফুটে উঠতো তাদের শরীরে। সে এক উন্মাদনা। মন্দিরের বাইরে বড় বেলগাছটির তলায় একাকী বসে রিয়াধ, ঝরে পড়া শীর্ণ পাতাগুলি দুহাতে পিষে গুঁড়ো গুঁড়ো করছে চাপা আক্রোশে। হঠাৎ কি মনে করে ঝড়ের বেগে মন্দিরে ঢুকে লোহার কাঁটাটি নিয়ে এসে নিজের পিঠে চাবুকের মতো মারতে লাগলো। যন্ত্রণা ফুটে উঠলো সারা মুখে। কালো পিঠে বিন্দু বিন্দু ফুটে উঠলো রক্তের দাগ। ক্রমশ গড়িয়ে নতুন সাদা ধুতিকে রঞ্জিত করলো।  চাপা গোঙানী বেরিয়ে এলো মুখ দিয়ে। শ্বাস নেবার জন্য একটু থামতে সামনে তাকিয়ে দেখলো সদ্যস্নাতা সুখীকে, হাতে আকন্দের মালা, শিবঠাকুরকে পরাবে। এখন করুণচোখে একদৃষ্টে তাকিয়ে রয়েছে রিয়াধের দিকে। রিয়াধের পাগলামী দেখে ভয় পেয়েছে, কষ্ট হচ্ছে তার।
কাঁটাটি যথাস্থানে রেখে সুখীকে পাশ কাটিয়ে রিয়াধ ধীরে ধীরে মন্দির থেকে বেরিয়ে গাঁয়ের রাস্তায় নামলো। কিছুদূর এসে পেছন ফিরে দেখে সুখী একই জায়গায় দাঁড়িয়ে রয়েছে, অপলকে দেখছে রিয়াধের চলে যাওয়া। আর যেতে পারলো না সে, ফিরতে হলো মন্দিরের দিকে — সুখীর সাথে পথের দূরত্ব কমতে লাগলো। কাঁটাবিদ্ধ পিঠের যন্ত্রণা অনেক আরামের এখন।