মা এক নির্ভীক সৈনিক

মরদ ‘পরিযায়ী শ্রমিক’। এ শব্দবন্ধ বাগদী বউয়ের কাছে অচেনা। সে শুধু জানে যে তার স্বামী ভিনরাজ্যে খনিতে কাজ করে। বছরে দুবার বাড়ি আসে। কোলে যে তার তিন মাসের খোকা, খোকার বাবা তার মুখ দেখেনি এখনো। জঙ্গল ঘেঁষা একচালার ঘরে খোকাকে নিয়ে বাগদী বউ একলা থাকে, জঙ্গল থেকে কাঠকুটো, ফলপাকুড় সংগ্রহ করে। জঙ্গলে রাতবিরেতে শুনতে পাওয়া যায় বাঘের গর্জন। একটু যে গা ছমছম করে না তা নয়, কিন্তু বাঘ এখনো পর্যন্ত কোনদিন বসতিতে আসেনি। দূরের গ্রামে তৈরি হচ্ছে বিরাট ইস্কুল। সেখানে ইঁট বালি বওয়ার কাজ করে সে। গত দু’মাস সে কাজও বন্ধ। ওই যে কি এক রোগ এসেছে, সবার কাজকর্ম গিয়েছে বন্ধ হয়ে। ঘরে খাবার নেই অনেকদিন। পেট ভরে না খেলে বুকে ভালো দুধ হয় না। খোকা শুধু বুকের দুধ খায় যে।
জঙ্গল ঘেঁষে ঘর। জঙ্গলের ভেতর কিছুদূরে একটা জলা মত আছে। জলায় প্রচুর শামুক গুগলি পাওয়া যায়। ঝাল ঝাল গুগলির ঝোল খেতে বড় ভালোবাসে বাগদি বউ। জলার পাড়ে পাওয়া যায় কলমি শাক। সেসব জোগাড় করতেই সকাল সকাল চুবড়ি হাতে, ছেলে কাঁখে বাগদী বউ জঙ্গলের পথে পা রাখল। সঙ্গে নিতে ভুলল না লোহার ফলা লাগানো সড়কিটা।
* * *
গরমটা এবার পড়েছে বেশ। বাচ্চাদুটির গা চেটে পরিস্কার করছিল বাঘিনী। আজ কিছু শিকার না করলেই নয়। দিন দুয়েক আগে একটা বুনো খরগোশ মেরেছিল সে। আজ যদি একটা হরিণ পাওয়া যেত! কিন্তু একটা ছোট হরিণ মারতেও অনেকটা সময় লেগে যায়। ছানা দুটিকে রেখে অত দূরে যেতে ইচ্ছে করে না। মাত্র সাত দিন বয়স ওদের। সামনের ছোট নদীটি শুকিয়ে গিয়েছে। জল খেতে হলে যেতে হবে জঙ্গলের কিনারায় যে জলা আছে , সেখানে। ভোর রাতে ওখানে জল খেতে আসে সব বন্যপ্রাণীরা। সারারাত খিদে সহ্য করার পর ভোর রাতে বাঘিনী বেরিয়ে পড়ল জলার উদ্দেশ্যে। ছানা দুটিকে রেখে গেল আপাত নিরাপদ ডেরায়।
বাঘিনীর ঘ্রানেন্দ্রিয় যেমন দূর থেকে টের পায় প্রাণীদের অস্তিত্ব, জঙ্গলের প্রাণীরাও তার উপস্থিতিমাত্র সজাগ হয়ে ওঠে। পাখিগুলি এডালে সেডালে মহা কোলাহল বাধিয়ে গোটা জঙ্গলকে সচকিত করে উড়ে পালাল। বানরগুলি কিচমিচ শব্দ করতে করতে দূরে কোথাও অদৃশ্য হয়ে গেল। চারিদিকে নেমে এলো এক অপার্থিব নীরবতা। সূর্য তখনও ওঠেনি। অস্পষ্ট আলোয় পলায়নরত হরিণ দলের শেষ হরিণটিকে লক্ষ্য করে লাফ দিল বাঘিনী।
* * *
ঝোপের আড়ালে বসে ধীরেসুস্থে পেট পুরে খেয়ে হরিণের দেহাবশেষ ফেলে রেখে জলের দিকে এগিয়ে গেল সে। অনেকক্ষণ বাচ্চাদের ছেড়ে আছে । তাড়াতাড়ি ফিরতে হবে। এখন চারিদিকে ঝলমল করছে রোদ।
জলে নেমে চুপড়ি ভরে গেঁড়ি গুগলি তুলছিল বাগদী বউ। প্রকৃতির অস্বাভাবিক নৈঃশব্দ্য সে খেয়াল করেনি। খোকাকে পিঠের সাথে কাপড় দিয়ে শক্ত করে বেঁধে নিয়েছে। হঠাৎ তার ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় তাকে কিছু জানান দিল। মুখ তুলতেই দেখে পঁচিশ গজ দূরে হলদে ডোরাকাটা স্থিরদৃষ্টিতে তার দিকে চেয়ে। শিরদাঁড়া দিয়ে হিমেল স্রোত নেমে গেল বাগদী বউয়ের। গায়ের রোমকূপ খাড়া হয়ে উঠল। জঙ্গলের এত কাছে থেকেও আজ সে প্রথম বাঘ দেখল।
বাঘিনীও দেখল, কষ্টি পাথরে খোদাই করা এক সবল মানুষীকে, পিঠ ও হাতের অনাবৃত পেশী থেকে চুঁইয়ে পড়ছে স্বাস্থ্য। চোখের দৃষ্টি বাঘিনীর মতই খর ও সচকিত। খোকার কাপড়ের বাঁধন দ্রুত আরো শক্ত করল সে, বাগিয়ে ধরল হাতের লোহার ফলা লাগানো সড়কি। বাঘিনীর তুলনায় এতটুকুও কম ক্ষিপ্র নয় সে। বাঘিনী লাফ দিলেই পেটে ঢুকিয়ে দেবে লোহার ফলা, মনে মনে তৈরী হল । মুহূর্তের পর মুহূর্ত কেটে গেল, নিঃশ্বাস চেপে রাখার ফলে দম বন্ধ হওয়ার উপক্রম হল তার।
ঠিক সেই মুহুর্তে খোকা নড়াচড়া শুরু করলো, সাথে উঁ উঁ করে কান্না। চোখের দৃষ্টি নরম হয়ে এলো বাগদিনীর। নিশ্বাস প্রশ্বাস স্বাভাবিক হল। মিলিয়ে গেল চোয়ালের শক্ত ভাব। খোকার খিদে পেয়েছে। সেই কোন ভোরবেলায় খাইয়েছিল।
বাঘিনী চমকিত হয়ে সবটুকু দেখল। দেখল মেয়েটির  বুকের কাপড় ভিজিয়ে স্তনবৃন্ত থেকে নিঃসারিত হচ্ছে অমৃত। দ্রুত জলে মুখ ডুবিয়ে জল পান করে পাড়ে উঠে গেল বাঘিনী। দূরে একটি গাছের তলায় কয়েক মিনিট অপেক্ষা করল মেয়েটিকে লক্ষ্য করার জন্য। তারপর জঙ্গলে মিশে গেল।
বাগদি বউ ততক্ষণে জলার পাড়ে বসে ছেলেকে পিঠ থেকে নামিয়ে কোলে নিয়েছে।