জন্ম- ১৯৬৭, বরানগর। বর্তমানে দার্জিলিং জেলার মিরিক মহকুমার উপশাসক ও উপসমাহর্তা পদে আসীন। চাকরীসূত্রে ও দৈনন্দিন কাজের অভিজ্ঞতায় মধ্যবিত্ত ও নিম্ন মধ্যবিত্ত মানুষের সমস্যা সমাধানে তাঁর লেখনী সোচ্চার।

গানের ভিতর দিয়ে যখন

সে ছিল আমাদের হাজার বছরের পুরোনো গান। কি যাদু বাংলা গানে। গান গেয়ে দাঁড় মাঝি টানে। আমাদের সেই হাজার বছরের পুরোনো গানে নৌকা বাইবার কত কথা। খুঁজে পেতে তুলে ধরলেন মহামহোপাধ‍্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রী।
ওই যে চর্যাপদের ভাষাটা নিতান্তই বাংলা, এটা সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় মশায়কে রীতিমত প্রমাণ করে দেখাতে হল। তার আগে হরপ্রসাদ শাস্ত্রী মশায় ওটি নেপালের রাজ দরবারের লাইব্রেরি ঘেঁটে আবিষ্কার করলেন। । তার মানে সেটা চালু ছিল না। মুনিদত্তের একটা টীকা খুঁজে পাওয়া গেল। তাও সংস্কৃত ভাষায়। তাতে অর্থ কিছু কিছু স্পষ্ট হল। এ যেন সেই হারানো রাজপুত্রের গল্প। তাকে যারা চিনত, জানত, তারা কেউ কোথাও বেঁচে নেই। কেমন নাক, কেমন চোখ, গলার স্বর কেমন কেউ জানে না। অয়েল পেন্টিং দূরস্থান, রাজবাড়ীর কোনো গ্ৰুপ ছবিতে পর্যন্ত তাকে খুঁজে পাওয়া যায় না। কারো স্মরণে নেই। এবার কি তাহলে ডি এন এ টেস্ট হবে? উপস্থিত বুদ্ধি তো সেটাই বলে।
সেই আমাদের হাজার বছরের পুরোন গান। কেউ বলে চর্যাগীতি, কেউ বলে চর্যাগাথা। কেউ বলে উঁহু, না না , নাম তার চর্যাচর্যবিনিশ্চয়।
ভাষাও বোঝা সাধারণের কর্ম নয়, লিপিরও সেই দশা। তবু বাংলা। আর সেটাই ঠিক। বিজ্ঞানঘটিত প্রমাণ।
আমাদের অস্তিত্বের ভেতরে ভেতরে বিজ্ঞান এমন কাজ করে।
 গল্পটা তাহলে কেমন দাঁড়িয়ে গেল? সেই যেন মা হারা ছেলে জঙ্গলে নেকড়ে বাঘের দুধ খেয়ে বড় হয়েছিল। বলছ বাংলা, কিন্তু খুঁজে পেলে বাপু নেপালের লাইব্রেরি ঘেঁটে। হয় কথায় নয় কথায় যাঁদের লাইব্রেরি পোড়াতে হাত নিশপিশ করে, তাঁরা মনে রাখুন। আর মানেটা বোঝার সুবিধে হল মুনিদত্তের সংস্কৃত টীকা থেকে। ওর নাম “নির্মলগিরা”। ভাল করে বলতে গেলে নির্মলগিরার তিব্বতি অনুবাদ। চর্যাটীকার খাঁটি পাঠ পাওয়া গেল ওই তিব্বতি অনুবাদে। বাংলাভাষার এই প্রত্নসম্পদ  কি করে বৌদ্ধগানের মধ্যে খুঁজে পাওয়া গেল, তার শিকড় সন্ধান করতে গেলে ব্রায়ান এইচ হজসনের নামটা এসে যায়। তিনিই নেপাল থেকে বৌদ্ধপুঁথি সংগ্রহ করে প্রাচ্যবিদ্যাচর্চায় আগ্রহী মানুষদের কাছে পাঠাতেন।
নাম এসে যায় ইউজিন বার্ণউফ এরও।  ড্যানিয়েল রাইট আর সিসিল বেনডালকেও ভোলা চলে না।
তাহলে কি মনে হচ্ছে? নেপালের লাইব্রেরি, সংস্কৃত টীকা, তার আবার তিব্বতি অনুবাদ, বিদেশী পণ্ডিতের অকুণ্ঠ আগ্রহ, সবার পরশে পবিত্র করা তীর্থনীরে আমার বাংলার জন্ম? আমরা শুরু থেকেই “বিশ্ববাংলা” ? আমাদের মনে মেজাজে আন্তর্জাতিকতা স্থান পেতে দেরি কিসের?
উঁচু উঁচু পর্বত। সেখানে থাকে শবর তরুণী। পরনে তার ময়ূর পুচ্ছ, আর গলায় তার বনফুলের মালা। তার মুখটি কি পান পাতার মতো? তার হৃদয়টা কি পানের মতো করেই আঁকি না এখানে ওখানে! আহা কর্পূর দিয়ে মিঠে পান খাই আর সহজ সুন্দরীর মুখটি মনে ভাসে।
কি চমৎকার করেই না আমার মনের কথা আগে ভাগে জেনে লিখে গিয়েছেন শবরপাদ। গান ধরেছেন বলাড্ডি  রাগে। চর্যাগাথার আঠাশ নং কবিতায়।
তার পর জানা গেল শবর তরুণীটি আসলে কবির ঘরণী। সে ছল করে অমন সেজেছে। আমাদের চেনা জানা চণ্ডীও শিবের সাথে অমন ছল করতেন। খাটো পোশাক পরে মাছ ধরতেন। আর তাকে পরস্ত্রী মনে করে শিবের সে কি কাম পিপাসা!
কাম নিয়ে নানারকম মজা চর্যাগাথায়।
আবার পড়ব আঠাশ নং চর্যা গান।
গান ছিল শ্রীকৃষ্ণকীর্তন ব‌ইটিতেও। গীতি আলেখ‍্যের মতো। এক একটি গান এক এক রাগে। এর ভিতরে রাধাকৃষ্ণ প্রেমকথার প্রাকৃত রুচির বুনোট। বসন্তরঞ্জন রায় বিদ্বদ্বল্লভ মহাশয় সেই প্রাচীন পুঁথিখানি খুঁজে পেলেন গোয়ালঘরের চাল থেকে। হাতে নিয়ে বেশ টের পাওয়া গেল, এ খুবই পুরোনো দিনের লেখা। বাসলীদেবীর উপাসক বড়ু চণ্ডীদাস লিখেছেন এই সন্দর্ভ। দানখণ্ড ভারখণ্ড এই রকম সব নামে এক একটি অধ‍্যায়। শেষটুকুর নাম রাধাবিরহ।
পরবর্তীকালে তো আরো চণ্ডীদাস দেখা দিলেন। সে কালে লোকেরা নিজের নামটুকু চিরস্থায়ী হোক, সেভাবে চাইত না। চিরস্থায়ী নাম রাখবার মতো এলেমদার কলম তো শস্তা নয়। তাই কারো লেখা কালের রথের পদতলে পড়েও টিঁকে যাবে মনে হলে স্বল্প ক্ষমতার লেখকদের ইচ্ছে হত, মহাজনের কলমের আড়ালে গা ঢাকা দিয়ে চুপিসাড়ে টিঁকে থাকার চেষ্টা করা। এই ভুলভাল মানুষী দুর্বলতা থেকে চণ্ডীদাস সমস‍্যা। তবে পরিশ্রমী গবেষকদের চোখকে ফাঁকি দেওয়া শক্ত। শব্দচয়নে, ভাষার অলঙ্করণে এমন কিছু থেকে যায়, যা দুই পৃথক ব‍্যক্তির অস্তিত্ব চিনিয়ে দেয়। পদাবলী রচনা করতে গিয়ে পরবর্তীকালের বৈষ্ণব কবিকে প্রতিষ্ঠানের মান রাখার কথা ভাবতে হয়েছে। প্রতিষ্ঠানের বেঁধে দেওয়া রুচি, দর্শন চিত্রকল্প ঠিক ঠাক রাখতে গিয়ে কবিত্ব নীরক্ত হয়েছে। শ্রীচৈতন্য দেবের পাবনী প্রভাব বহন করতে গিয়েও পদাবলী হয়ে উঠেছে শুদ্ধ রুচির জিনিস। শ্রীকৃষ্ণ কীর্তনকারের সে দায় ছিল না। তিনি শিল্পীর স্বাধীনতা প্রাণভরে ব‍্যবহার করেছেন।
বাংলাভাষা গড়ে তুলতে উইলিয়াম কেরী আর তাঁর শ্রীরামপুর মিশনের কথা আসেই। বাংলা পুঁথি খুঁজে বের করে তা ছাপার অক্ষরে সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেবার ভিতরে যে চেষ্টাই থাকুক না কেন, আখেরে তা বাঙালির বিপুল উপকার করেছে, এই কথাটা কিছুতেই এড়িয়ে যেতে পারব না।
বিস্তর পুঁথি ঘাঁটাঘাঁটি করে বাংলা লিপির সর্বজনগ্রাহ্য মান‍্য চেহারা টা ঠিক কী হবে তা বেশ বুঝতে পেরেছিলেন চার্লস উইলকিনস। ভদ্রলোক ছিলেন পুঁথিবিশারদ। পুঁথির লিপি বিশ্লেষণ করতে দক্ষ। পঞ্চানন কর্মকার আর তাঁর জামাতা মনোহর কর্মকার ছিলেন লৌহ শিল্পী। বাংলা অক্ষরের ছাঁদ তাঁদের শিখিয়ে নিলেন চার্লস সাহেব। এরপর ছাপাখানার মেশিন চলে এল কেরী সাহেবের উদ‍্যোগে।
মানোএল দা আসসুম্পসাঁও রোমান হরফে বাংলা ভাষার ব‍্যাকরণ লিখেছিলেন। নাথানিএল ব্রাসি হালেদ বাংলা ভাষায় ব‍্যাকরণ লিখলেন। ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের তরফে উইলিয়াম কেরী কিছু বাঙালি পণ্ডিতকে ডেকে বাংলা ভাষায় ব‌ই লিখতে বললেন। মৃত‍্যুঞ্জয় বিদ‍্যালঙ্কার, রামরাম বসু প্রমুখ পণ্ডিত সাহেব পড়ানোর দায়ে বাংলা ভাষায় লেখা লেখি শুরু করলেন। তবে সে ফরমায়েশি কেজো গদ‍্য। শিল্পবস্তুর সন্ধান দেওয়া মাইনে করা পণ্ডিতের ক্ষমতার বাইরে।
বাংলা গদ‍্যভাষায় মনের উচ্চ ভাবপ্রকাশ সর্বপ্রথম করলেন রাজা রামমোহন রায়। বাঙালির কলমে বাংলাভাষার ব‍্যাকরণ বই রচনার কৃতিত্বও এই রাজার। গণিতের ব‌ই ক্ষেত্রতত্ত্বসার রামমোহন রায়ের আর এক কীর্তি।
একদিকে আরবী ফারসি, অন‍্যদিকে সংস্কৃত ভাষায় গভীর জ্ঞান, তার সাথে ইংরেজি ভাষায় পাণ্ডিত্য রাজাকে বহুভাষাবিদ করে দিয়েছিল। বিভিন্ন সংস্কৃতির ধর্মগ্রন্থ তিনি গভীরভাবে পাঠ করে এক অন্তর্দৃষ্টি অর্জন করেন। এই পুঁজি নিয়ে রাজা তুলনামূলক ধর্মতত্ত্ব নিয়ে আলোচনায় মাতলেন। সংবাদপত্রে বিতর্ক মূলক লেখা ছাপিয়ে তিনি বাংলা ভাষায় বিতর্কের পরিসর গড়ে দেন। বিদ‍্যাসাগর মহাশয়‌ও সমাজ সংস্কার করার প্রয়োজনে রামমোহন রায়ের দেখানো পথে বিতর্ক মূলক রচনা চালিয়ে গিয়েছেন।
রাজা রামমোহন রায়ের ভাষায় বলিষ্ঠ ভাব ছিল, ছিল যুক্তি বিন‍্যস্ত চিন্তার প্রকাশ। কিন্তু ততটা মিষ্টতা ছিল না। সে জিনিস উপহার দিয়েছেন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ‍্যাসাগর। বাংলা ভাষার প্রথম শিল্পী তিনিই। হিন্দি, সংস্কৃত ও ইংরেজি ভাষার সাহিত্য পাঠ করে তিনি সাধারণ ছাত্রের স্বার্থে বেতাল পঞ্চবিংশতি, সীতার বনবাস, শকুন্তলা ও ভ্রান্তি বিলাস লিখে বাংলাভাষার সম্পদ তৈরি করলেন।
১৮২৪ সালের ২৫ জানুয়ারি জন্মেছিলেন আমাদের মধুকবি। মাইকেল মধুসূদন দত্ত। আমাদের বাংলা সাহিত্যে আধুনিক যুগে একমাত্র মহাকবি। ১৮৭৩ এ প্রয়াত হন। ১৮৬১ তে প্রকাশিত তাঁর মেঘনাদবধ কাব্য। ওই মেঘনাদবধ কবে থেকে পড়ছি । এখনো বিস্ময় আর আকুলতা কমে নি। ওজস্বিতায়, উপমার অসামান্য ব্যবহারে, রূপকে , অলঙ্কারে তো বটেই; কবিতার আসল যে প্রাণসত্ত্বা, সেই মন্ময় গভীরতায় মেঘনাদবধ আজো আমাকে নিবিড় তৃপ্তি দেয়। আমি মনে মনে বেশ কিছু পংক্তি অক্লেশে আউড়ে যেতে পারি।
বাংলাদেশের কপোতাক্ষ নদের তীরে সাগরদাঁড়ি গ্রামে সম্পন্ন শিক্ষিত ব‍্যবহারজীবী পরিবারের আদরের দুলাল হয়ে জন্মেছিলেন মাইকেল মধুসূদন দত্ত। নিরালা নিরুপদ্রব সুখী জীবনের হাতছানি এড়িয়ে নিজের হাতে গড়লেন নিজের কবিজীবন। ইংরেজি ভাষায় লিখবেন, ইংরেজিতে ভাববেন, ইংরেজিতে স্বপ্ন দেখবেন, এসব উলটে পাল্টে গেল। খুঁজে পেলেন নিজের কবিভাষা। লিখলেন মেঘনাদবধ কাব্য। রামায়ণ নিয়ে সাধারণের বিশ্বাসকে অন্য রকম করে দেখলেন। রামকে দেখালেন পরদেশে আক্রমণকারীর বেশে। রাবণ ও ইন্দ্রজিৎকে স্বদেশপ্রেমী বীর করে। এই যে নতুন করে দেখানোর চেষ্টা ওঁকে বাংলা ভাষার মহাকবি করে দিল।
বড়ো কবির মেধা মনন আর স্পর্ধা ছিল তাঁর। ছাপোষা কেরানীর মন নিয়ে তো আর তাঁকে বোঝা সম্ভব নয়। তাঁর পিতার অর্থ ছিল। ছিল চালু ওকালতি ব্যবসাও। কবি ছিলেন ব্যারিস্টার। বাবার মক্কেলদের যোগাযোগ যদি নাও পেতেন তবু কেজো বুদ্ধির লোকের পক্ষে ওই পেশায় রোজগারের অভাব তো হতো না।
কিন্তু তিনি কবিজীবনকে পেতে চেয়েছিলেন। অনিশ্চিতের পথে ঝাঁপাতে দ্বিধা তিনি করেন নি। যথার্থ কবি পা টিপে টিপে, শাসকের মন যুগিয়ে, সমকালের পদাঙ্ক অনুসরণ করে চলেন না।
তাঁরা যুগের জন্ম দেন।
তাঁদের আশ্রয় করে ইতিহাসের বাঁক বদল হয়।
বাংলায় সে সময় যে নাটক অভিনীত হচ্ছিল, তা দেখে তাঁর মোটেও ভাল লাগে নি। অবশ্য বড় মানুষদের মধ্যে একটা মহৎ অতৃপ্তি বোধ কাজ করে। তিনি বলেছিলেন “অলীক কুনাট্য রঙ্গে মজে লোক রাঢ় বঙ্গে, নিরখিয়া প্রাণে নাহি সয়। ” তিনি নিজেই নাটক লিখে দেখিয়ে দিলেন নাটক কেমন হতে পারে।
নাটকের সাথে প্রহসনও লিখেছিলেন। সমকালীন বাঙালি জমিদার বড়লোকের নারীঘটিত কুঅভ্যাসকে ব্যঙ্গ করে দুটি নাটিকা। একেই কি বলে সভ্যতা, আর বুড় সালিকের ঘাড়ে রোঁ ।
নারীমাংস ভোগের বেলা জমিদার মহাজনের জাতবিচার কোথায় থাকে দেখিয়ে দিয়েছেন তিনি। হিন্দু মুসলমান নির্বিশেষে জমিদার মহাজনেরা যে গরিবের ঘরের নারীর ইজ্জত লুটতে সমান দক্ষ ছিল, তিনি কলমের মুনশিয়ানায় সেটা দেখিয়েছেন। জাত নয়, এদের শ্রেণীচরিত্র উন্মুক্ত করেছেন কবি। শ্রেণীচরিত্র অনুধাবন করার ক্ষমতা তাঁর কলমের জাত চিনিয়ে দেয়।
ওই যে তিনি হিন্দুধর্ম ত্যাগ করে খ্রিস্টান হলেন, সেটা কেন? কেন না, ওঁর প্রবল ইচ্ছে ছিল গ্রীক রোমান ধ্রুপদী সাহিত্য সরাসরি পড়বেন। তাই সেই গ্রীক ল্যাটিন ভাষা শেখা প্রয়োজন ছিল। আর সেই সব সভ্যতার পুরাণকথা পড়তে, তাদের সংস্কৃতির ভিতর মহলের কথা জানতে পাদ্রীদের সঙ্গলাভ ছিল বাস্তব প্রয়োজন। ব্যক্তিগত স্তরে যোগাযোগ ও সম্পর্ক তৈরি না করে উঠতে পারলে দত্তকুলোদ্ভব কবির পক্ষে সেই যুগে ওই ভাষা সংস্কৃতির নিবিড় পাঠ সম্ভব হত না।
একে কবিধর্ম পালন ছাড়া আর কি বলব?
বাংলায় সে সময় যে নাটক অভিনীত হচ্ছিল, তা দেখে তাঁর মোটেও ভাল লাগে নি। অবশ্য বড় মানুষদের মধ্যে একটা মহৎ অতৃপ্তি বোধ কাজ করে। তিনি বলেছিলেন “অলীক কুনাট্য রঙ্গে মজে লোক রাঢ় বঙ্গে, নিরখিয়া প্রাণে নাহি সয়। ” তিনি নিজেই নাটক লিখে দেখিয়ে দিলেন নাটক কেমন হতে পারে।
নাটকের সাথে প্রহসনও লিখেছিলেন। সমকালীন বাঙালি জমিদার বড়লোকের নারীঘটিত কুঅভ্যাসকে ব্যঙ্গ করে দুটি নাটিকা। একেই কি বলে সভ্যতা, আর বুড় সালিকের ঘাড়ে রোঁ ।
নারীমাংস ভোগের বেলা জমিদার মহাজনের জাতবিচার কোথায় থাকে দেখিয়ে দিয়েছেন তিনি। হিন্দু মুসলমান নির্বিশেষে জমিদার মহাজনেরা যে গরিবের ঘরের নারীর ইজ্জত লুটতে সমান দক্ষ ছিল, তিনি কলমের মুনশিয়ানায় সেটা দেখিয়েছেন। জাত নয়, এদের শ্রেণীচরিত্র উন্মুক্ত করেছেন কবি। শ্রেণীচরিত্র অনুধাবন করার ক্ষমতা তাঁর কলমের জাত চিনিয়ে দেয়।
“বুড় সালিকের ঘাড়ে রোঁ” – হ্যাঁ , বানানটা ঠিক এই রকম ছিল । বইমেলায় গিয়ে অতি ছোটো সাইজের বইটি মাঠে ঢেলে বিক্রি হচ্ছিল । আমি ক্লাস সেভেন এইটের ছোটো ছেলে নিজের খুশিতে সেই মিনি বুক কিনেছিলাম গোটা একটাকা দিয়ে । তখনকার দিনে লোকে ছোটোদের ভালবেসে একটাকা দিতে পারত । ওই মিনি বইতে আরো একটি নাটক ছিল – “একেই কি বলে সভ্যতা” । দুটো নাটক এক নিঃশ্বাসে পড়ে ফেলেছিলাম। মাইকেলকে ভালোবাসার সেই শুরু ।
‘বুড় সালিকের ঘাড়ে রোঁ’ নাটকটিতে দেখেছি হিন্দু জমিদার মুসলিম মেয়ের শরীর ছুঁতে চেয়ে লোক লাগিয়েছেন। মুসলিম মেয়ের শরীর ছুঁতে চাইলে হিন্দু ধর্মধ্বজীর ধর্ম নষ্ট হয় না। আসলে ততদিনে জেনে গিয়েছি , দুটো মাত্র জাত আছে – গরিব আর বড়লোক । এই ধরুন রামা কৈবর্ত আর হাসিম শেখ – এদের কিন্তু গরিব বলে চিনতে শিখেছি – হ্যাঁ , শিখেছি বঙ্কিমের হাত ধরে । মাইকেলের নাটক পড়ে অসহায় মুসলিম মেয়ের জন্যে মন কাঁদল ।
“ছিনু মোরা সুলোচনে গোদাবরী তীরে …”। হ্যাঁ, ঠিক এভাবেই সীতা সরমার সাথে গল্প করছেন অশোকবনে। শব্দবিন্যাস যাই হোক না কেন, একটি বধূ যে আর একটি বধূর সাথে সুখদুঃখের গল্পটি করে , আমি তার আমেজ পূর্ণমাত্রায় পেয়েছিলাম ওই কটা শব্দে ।
‘দাস’ – কথাটা যে এভবে ব্যবহার করা যায় , ছোটবেলায় মাইকেল না পড়লে বুঝতাম না। মেঘনাদ ইন্দ্রজিৎ তার কাকা বিভীষণ এর সাথে বাক্যালাপ করার সময় নিজেকে দাস বলছেন। আবার কবিও আত্মবিলাপমূলক কবিতায় নিজেকে “দাস” বলছেন। ‘রেখো মা দাসেরে মনে’। ওই দাস শব্দটি আমার মর্মে লেগে আছে ।
কেন তিনি মহাকবি ? নিজের ভেতরের মানুষটির কাছে বারবার জানতে চেয়েছি। বাবার চালু আইন ব্যবসায় নিজেকে রপ্ত করে প্রতিষ্ঠা পাবার সব রকমের সুযোগ ওঁর ছিল । সে সব দিনে বিদেশি ভাষা শেখার আজকের মতো সোজা সরল বাঁধানো রাস্তা ছিল না। সে বিদেশি ভাষার নাড়ী নক্ষত্র মেজাজ মরজি আগাপাশতলা বুঝবেন, বিদেশের পুরাণ উপপুরাণ ভালো করে বুঝবেন বলে নিজের কৌলিক ধর্ম পরিত্যাগ করলেন । জাত ধর্ম সব কিছু ত্যাগ করে মাইকেল যেন সুস্থিতি আর নিরাপত্তার সাথে বিচ্ছেদ ঘটিয়ে দিলেন নিজের । ওই বিদেশি ভাষা আর তার সংস্কৃতির অন্দর মহলে না ঢুকলে মহাকাব্যিক মেজাজে নিজেকে দীক্ষিত করতে পারতেন না। এ যেন ঝড়ের মুখে পাল তুলে দেওয়া ।
অলীক কুনাট্য রঙ্গে — সম সময়ে বাঙালি যে জীবনটা যাপন করছিল তাতে বড়ো কিছু করার স্পর্ধা , বড়ো করে ভাবার চেষ্টা প্রায় লোকের ছিল না। গতানুগতিক থেকে বাংলা কবিতাকে ছিটকে বের করে আনলেন। বাংলা ভাষায় একটা বড়ো মাপের কাঁপন ধরিয়ে দিলেন । ওই ‘ইরম্মদময় বজ্র’ কথাটা বেশ মনে পড়ে। বজ্র শব্দের আগে ওই ‘ইরম্মদ’ কথাটার ব‍্যবহার কোথাও পাই নি । ‘কোকনদ’ আর ‘তামরস’ শব্দ দুটিও আমার ভেতর যেন একটি একটি করে কমল খুলতে থাকে , ইড়া পিঙ্গলা বেয়ে কোন সহস্রারের দিকে ধেয়ে চলি প্রিয় কবির হাত ধরে ।
বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় তাঁর প্রথম উপন্যাস রাজমোহনের স্ত্রী ইংরেজি ভাষায় লিখেছিলেন ।
মহাকবি মাইকেল তাঁর প্রথম কাব্য ক্যাপটিভ লেডি ইংরেজি ভাষায় লিখেছিলেন।
দীনবন্ধু মিত্রের নীল দর্পণ ইংরেজি অনুবাদে প্রকাশ হয়ে হইচই ফেলে দিয়েছিল । সেই অপরাধে বঙ্গপ্রমী পাদরি জেমস লঙ এর কারাদণ্ড হয় । অর্থ দণ্ডটি নিজের ট্যাঁক খসিয়ে মিটিয়ে দিয়েছিলেন কালীপ্রসন্ন সিংহ ওরফে হুতোম পেঁচা । জনশ্রুতি এই যে, অসামান্য নাটকটি নিজের পরিচয় প্রচ্ছন্ন রেখে অনুবাদ করেছিলেন মহাকবি মাইকেল । আর বিদ্যাসাগর উইলিয়ম সেক্সপীয়রের কমেডি অফ এররস কে নতুন আঙ্গিকে নতুন চেহারায় নির্মাণ করে পেশ করেছিলেন ” ভ্রান্তি বিলাস” করে। রবীন্দ্রনাথের যে পুস্তক নোবেল সম্মান পায়, তা আসলে ” সঙ অফারিংস ” । গীতাঞ্জলি, গীতালি, গীতিমাল্য, খেয়া আর নৈবেদ্য কাব্য গ্রন্থের কিছু কিছু কবিতাকে সেই ” সঙ অফারিংস” বইতে অসামান্য অনুবাদে পাই ।
ইংরেজি ভাষার কাছে বাংলা ভাষার ঋণ শোধ করবার নয় ।
‘বন্দে মাতরম’ মানে হল মা, তোমাকে বন্দনা করি । মা একটি সংসারে কি দায়িত্ব পালন করেন, যে কোনও বিবেচক মানুষ জানেন । গর্ভধারিণী , স্তন্যদায়িনী ,  শিক্ষিকা , সেবিকা , সান্ত্বনাদায়িনী  – মা কতো ভুমিকা যে পালন করেন ! যে জাতি “বন্দে মাতরম” বলে স্বাধীন হয়েছে , মহিলাকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দেখেছে , রাষ্ট্রপতি হিসেবে পেয়েছে , প্রধান বিচারপতি হিসেবে দেখেছে – সেখানে একটিও মেয়ে কেন নির্যাতিত হবে ? কাজ শুরু হোক নিজের বাড়ি থেকে – গান  সোচ্চারে গাই আর না গাই নিজের মা বোনকে সম্মান করতে  যেন শিখি ।
বন্দেমাতরম গানটি যে খুব সোজা, – আর শব্দগুলো খুব পপুলার, তাতো নয় । বরং ভাষাটি ক্লাসিক্যাল । দীক্ষিত সঙ্গীতশিল্পী চাইলে নিশ্চয় রেওয়াজ করে এ মহৎ গানটি গাইতে পারেন । এ গানের ভেতর এক উচ্চ অনুপ্রেরণা আছে – আমি এটা অনুভব করেছি । মহৎ জিনিস সর্বদা পপুলার হয় না। পপুলারিটি দিয়ে মহত্ত্ব পরিমাপ করা যায় না। থিওরি অফ রিলেটিভিটি সকলে জলবৎ তরলম করে বুঝে নেবেন এমন শিশুসুলভ আকাঙ্ক্ষা আমার নেই ।
১৮৯৬ সালের ২৮শে ডিসেম্বর কলকাতায় ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের অধিবেশনে সর্বপ্রথম রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে গীত হয় বন্দে মাতরম।
গানটি পরিবেশন করেছিলেন স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।
নিজের লেখা কবিতার বাছাই করা কয়েকটির ইংরেজি অনুবাদ তিনি করেছিলেন নিজেই। এভাবেই রবীন্দ্রনাথ “song offerings” সৃষ্টি করেন । গীতাঞ্জলি, গীতিমাল‍্য, নৈবেদ্য, খেয়া, অচলায়তন, শিশু, স্মরণ, কল্পনা, চৈতালি, উৎসর্গ    এই দশটি কাব‍্য থেকে পছন্দ করে করে কবিতা খুঁজে নিয়ে । সেই ইংরেজি অনুবাদের সঙ্কলনের একটি মুখবন্ধ লিখে দেন  আইরিশ কবি ইয়েটস ( ১৮৬৫ – ১৯৩৯) । ইয়েটস এর জন্মদিন এই জুন মাসের ১৩ তারিখে , আর  জুন মাসের ৩০ তারিখে গোটা পৃথিবীর রবীন্দ্রপ্রেমীরা  আন্তর্জাতিক রবীন্দ্র কাব্যপাঠ দিবস পালন করেন। । এই রকম কোনো সময়েই লণ্ডনে রবীন্দ্রনাথ এই অনূদিত কবিতাগুলি পড়ে শুনিয়েছিলেন।
তেরোই এপ্রিল। এপ্রিলের তেরো তারিখ। ১৯১৯ সাল। জালিয়ানওয়ালা বাগে রাজনৈতিক বক্তব্য শুনছিল জনতা। বক্তা ডাঃ সত্যপাল আর সৈফুদ্দিন কিচলু। মাইকেল ও ডায়ারের নির্দেশে নিরস্ত্র জনতার উপর গুলি চালিয়েছিল পুলিশ। তার পরেও এলাকায় চলেছিল সরকারি সন্ত্রাস।
স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছিল রাষ্ট্র শক্তি তার সমস্ত ভালমানুষির মুখোশ ঝেড়ে ফেলে উলঙ্গ নখ দাঁত বের করেছে। রাজনৈতিক দলের নেতারা চুপ। রাজনৈতিক বিরোধ করতে তাঁদের শিক্ষা। রাষ্ট্রশক্তির দাঁত নখের মোকাবিলা আলাদা জিনিস। রাজনৈতিক দলের নেতারা সব চুপ। তো তখন একজন কবি কিভাবে পথে নামলেন, কিভাবে দাঁড়ালেন মানুষের পাশে?
কবিরা যেন কেমন ভাবে দেখতে পান। কবিরা, আমি স্পষ্টতই স্তাবকদের থেকে কবিকে আলাদা করছি, দেখতে পান অনেক দূর অবধি। ব্রিটিশ চলে যাবার পর, এই ভারত নামে দেশটার ঠিক কি হতে যাচ্ছে, তা নিয়ে কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের আশঙ্কা ও উদ্বেগের অবধি ছিল না। কবি বেশ দেখতে পেতেন একদিকে প্রাচীনপন্থী, গোঁড়া, রক্ষণশীল একটা রাজনৈতিক স্বার্থগোষ্ঠী, আরেক দিকে সর্বত্যাগী, কিন্তু হঠকারী, সৎ কিন্তু অদূরদর্শী একদল স্বাধীনতা সংগ্রামী, আর দু তরফের সুবিধাবাদী নেতৃত্ব, যাঁরা ক্যাডারদের সামনে ঠেলে দিয়ে সুবিধাভাগ করে নিতে লজ্জা পাবেন না। আর দেখতে পান দেশজোড়া সাম্প্রদায়িক সহিষ্ণুতা গুণের অভাব। দেশটা যে নির্দিষ্ট কোনো সম্প্রদায়ের সম্পত্তি নয়, এইটা বোঝার মতো উদারতাসম্পন্ন নেতৃত্ব তাঁর চোখে বিশেষ পড়ে নি। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বেশ টের পাচ্ছিলেন, একটা দেশভাগ অবশ্যম্ভাবী। আজ স্বাধীনতা অর্জনের এত বৎসর পরে সব দ্বিধাদ্বন্দ্ব ঝেড়ে ফেলে বলা দরকার, সাম্প্রদায়িক মনোভাবের বিরুদ্ধে পরিকল্পিত লড়াইয়ের অভাবেই দেশভাগের আগেই দুই সম্প্রদায়ে দাঙ্গা বেধেছে, আর দেশভাগের পর উদ্বাস্তু শিবিরে মেয়েরা ধর্ষিতা হয়েছে। মানুষের রক্তে, ধর্ষিতা মেয়ের কান্নায় স্বাধীনতা মলিন হয়ে গিয়েছে। অনেক সংবেদনশীল স্বাধীনতা কর্মী দুঃখে ক্ষোভে পাগল হয়ে গিয়েছিলেন। তাঁরা দেশসেবকের তাম্রপত্র নিতে যান নি।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বসন্ত নাটকটি উৎসর্গ করলেন কাজী নজরুল ইসলামকে আর তাসের দেশ উৎসর্গ করলেন সুভাষচন্দ্র বসুকে। যৌবন জলতরঙ্গের প্রতি তাঁর বরাবর তীব্র আকর্ষণ ছিল।
বাংলা গদ্য নিয়ে শখে হোক আর রুটি রুজির স্বার্থেই হোক, যাঁরা যত্ন নিয়ে কাজ করতে চাইবেন, তাঁদের সকলকেই  স্বামী বিবেকানন্দের গদ্য ভাষা নজর করতে হবে। এ ভাষার জোর সাংঘাতিক । চিন্তা বলিষ্ঠ হলে যে ভাষা বলিষ্ঠ হয়, বিবেকানন্দের বাংলা চিঠি পত্রে তার ভালো নজির আছে। অথচ সাহিত্যিক বলতে যা লোকে বোঝে, তা তো তিনি ছিলেন না। যাই হোক ছাত্র বয়সেই, মনে হয় সপ্তম শ্রেণীতেই আমি বিবেকানন্দের বাংলা গদ্য পড়ে টের পাই তাঁর প্রাণের স্পর্ধা ।
তিনি সুয়েজ খালের উপর জাহাজ যাত্রার কথা লিখেছিলেন। কি যে সহজ অন্তর ছোঁয়া গদ্য ছিল সেটি!
রাত্রির গভীর বৃন্ত থেকে ছিঁড়ে আনো ফুটন্ত সকাল
এমন  একটা কথা বলতে মনের জোর লাগে । তবু একজন সার্থক কবি যখন  মন্দ্র স্বরে বলেন ” রাত্রির গভীর বৃন্ত থেকে ছিঁড়ে আনো ফুটন্ত সকাল ” তখন সেই কবির গভীর সদর্থক আর ইতিবাচক মনটিকে চিনে নিতে পারি
সৌর পরিবারের দূরতম বলয়ে রয়েছে নানা ধূলিকণা , বরফ আর মিথেন এর মতো গ্যাস । ওই নিয়ে উরট ক্লাউড । আর কুইপার বেল্ট । ধূমকেতুর দল ওই গভীর গহন এলাকা থেকে উঁকি মারে আমাদের চেনা আকাশে । ধূলিকণা , বরফ আর মিথেন এর মতো গ্যাস  দিয়ে তৈরি ধূমকেতুর দেহ । চেনা জানা গ্রহ উপগ্রহদের  মতো নয় ধূমকেতুর চেহারা। নিজেকে সুগোল করে বানাতে যে বৃহৎ ভর প্রয়োজন , তা জুটিয়ে উঠতে পারে না একটি ধূমকেতু ।
কবিও সর্বদা পারে না সামাজিক সাংসারিক হিসেব মিলিয়ে চলতে ।
তাই কবি যেন কেমন একাকী
প্রকৃত কবি রাজার ধামাধরা সাজতে লজ্জা পায়
কিন্তু একজন যথার্থ কবিই পারেন রাজার উলঙ্গ চেহারাটা তুলে ধরতে।
কিংবা রাজার দেশজোড়া সৈন্য যে আসলে কিসের জন্যে তা মুখ ফুটে বলতে পারেন প্রকৃত কবি
তাঁরাই বলতে জানেন  ” রাত্রির গভীর বৃন্ত থেকে ছিঁড়ে আনো ফুটন্ত সকাল “
কবিরা যেন সেই ধূমকেতু
যারা আঁধারে অগ্নিসেতু বাঁধবেন।
যাকে মহৎ সাহিত্য বলে, তাকে চিরকাল চিন্তাবিদেরা শ্রদ্ধা করে এসেছেন। কবিতা কি হবে, কেন হবে, তৃতীয় শ্রেণির রাজনীতি করে খাওয়া লোকেরা ঠিক করে দেন নি, দিতে পারেন নি। বাংলায় কাজী নজরুল, সুকান্ত, বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, দিনেশ দাস, মঙ্গলাচরণ চট্টোপাধ্যায়, সুভাষ মুখোপাধ্যায়, শঙ্খ ঘোষের মতো বড়ো কবির লেখা পড়ে অনেকেই ভাল কাজ করতে উৎসাহ পান। মহৎ সাহিত্য অনেক সময় রাজনৈতিক গোষ্ঠীর মার্কা মারা লেবেল সাঁটা বোতলে পোরা জিনিস হয় না। মহৎ সাহিত্য নিজের নিয়ম নিজে লেখে। রাজনৈতিক গুরু ঠাকুর পাণ্ডা পুরুতের কাছে তার টিকি বাঁধা নেই।
অন্তর থেকে বিশুদ্ধতম ভালবাসা দিয়ে যাঁরা বাংলা কবিতা লিখবেন, তাঁরা নিশ্চয় খেয়াল করবেন যে, আধুনিক বাংলাভাষার মহাকবি মধুসূদন দত্তের প্রথম কাব্যগ্রন্থের নাম “ক‍্যাপটিভ লেডি”। আধুনিক বাংলা গদ্য লিখেছেন বঙ্কিম, তাঁর প্রথম লেখা “রাজমোহন’স ওয়াইফ”। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের যে ব‌ই নোবেল পুরস্কার এনে দিল, তার নাম “সং অফারিংস”। এর কবিতাগুলি কবি নিজেই অনুবাদ করেছিলেন। এই কবিতাগুলি গীতাঞ্জলি, গীতালি, গীতিমাল‍্য, খেয়া, নৈবেদ্য প্রমুখ দশটি গ্রন্থ থেকে রীতিমতো বাছাই করা । কোনও বিশেষ একটি কাব্যগ্রন্থের অনুবাদ মাত্র নয়। আর জীবনানন্দ দাশ, বুদ্ধদেব বসু, বিষ্ণু দে, সমর সেন, অমিয় চক্রবর্তী, এঁরা সকলেই পেশায় ইংরেজিবিদ। হয় ইংরেজি ভাষা সাহিত্যের অধ্যাপক, নয় তো জার্নালিস্ট বা খুব বড়ো চাকুরে।
নিজের ভাষাকে ভালবাসতে গিয়ে অন‍্য ভাষার প্রতি কোনো ঘৃণা আর বিদ্বেষ যেন প্রকাশ না পায়।
কবি শামসুর রহমানের কথা বলতে ইচ্ছে করে। ওঁর বেশ কিছু কবিতা সাধারণ মানুষের কণ্ঠস্থ। ছাত্রছাত্রীরা আবৃত্তিকালে সুকান্ত ভট্টাচার্য, দিনেশ দাস, বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, মঙ্গলাচরণ চট্টোপাধ্যায়দের সাথে তাঁর কবিতাও বলতো। “ধন্য রাজা ধন্য, দেশ জোড়া তার সৈন্য” কবিতাটি বেশ নাড়া দিয়ে যায় আমাকে। হ্যাঁ, ‘মুখটি খোলার জন্য’ যাদের স্বদেশ সমাজে নিয়মিত নিগৃহীত হতে হয়, তারা জানেন, এই কবিতার পংক্তিগুলি অমোঘ হয়ে গিয়েছে। হ্যাঁ নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর “উলঙ্গ রাজা”র মতোই।
অর‌ওয়ালের গণহত্যার কথা আজ আর কার কার মনে আছে জানি না। স্বাধীন দেশের ভিতরে নিজস্ব সেনা পোষার এলেম ছিল ভূমিপ্রতিপত্তি সম্পন্ন বড়লোকেদের,  আর তা নিয়ে রাষ্ট্র কর্তৃপক্ষ সেভাবে উদ্বিগ্ন ছিলেন না। কেননা জমিদারের লেঠেল বাহিনী আগুন লাগাতো গরিবের ঘরে, ধর্ষণ করতো গরিবের মেয়ে ব‌উকে। গরিবের প্রাণ যে সমাজতান্ত্রিক ধাঁচের সমাজে আদৌ মূল্যবান নয়, তা বার বার দেখিয়েছেন রাষ্ট্র কর্তৃপক্ষ।
তখন কবি সাহিত্যিককে কলম ধরতে হয়। নিজের নিজের সময়ে রাষ্ট্রীয় ঔদ্ধত‍্যে গরিবের প্রাণ গেলে প্রতিবাদ করেছেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, নজরুল, সুকান্ত। দিনেশ দাস, মঙ্গলাচরণ চট্টোপাধ্যায়, বীরেন্দ্র চট্টোপাধ‍্যায়, রাম বসু, এঁরাও কালোবাজারি ও নানা অন‍্যায়ের বিরুদ্ধে কলম ধরতে ভয় পান নি। আমাদের শঙ্খ ঘোষও তাঁর সময়ে অন‍্যায়ের বিরুদ্ধে গলা তুলেছেন। মিছিলে পা মিলিয়েছেন। তো অর‌ওয়ালের গণহত্যার সময়ে আমি তাঁর কবিতা পাঠ করে অনুপ্রাণিত হয়ে নিজের কলমে দুবার না ভেবে ওঁর কবিতার দুচার পংক্তি ব‍্যবহার করি। তখন থেকেই জানি সময়ের প্রতি দায়বদ্ধতা আধুনিক কাব‍্যচেতনার অচ্ছেদ‍্য অঙ্গ।
আমার ভাষাচেতনা সর্বমানবের মুক্তি চেতনার সাথে সমন্বিত। আমার সময়ে ইতিবাচক গঠনমূলক ভূমিকা নিতে নিতে আমার ভাষাচেতনা বিকশিত হয়ে ওঠে।