যশোবন্ত বসু, বাঁকুড়া শহরে বসবাস, সাহিত্যের ছাত্র, পেশা শিক্ষকতা। নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি সময় থেকে জেলা ও রাজ্যের কিছু পত্রপত্রিকায় লেখালিখি শুরু। ভালোবাসার বিষয় কবিতা ও রম্যরচনা। কবিতার পাশাপাশি স্যাটায়ারধর্মী লেখাতেও সমান আগ্রহ। কবিতা ও মননশীল প্রবন্ধের আগ্রহী পাঠক। ভণ্ডামি ও কপটতাহীন জীবনযাপনে বিশ্বাসী।

ভাষার প্রযত্নে

বছরের কেবলমাত্র একখানি দিন ” ধায় যেন মোর সকল ভালোবাসা…. তোমার পানে তোমার পানে ” গাইলে হবে না। ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা ফুটে ওঠে ব্যবহারে। এর সঙ্গে ওতপ্রোত জড়িয়ে থাকার কথা যে-বস্তুটির, সেইটি হচ্ছে শিক্ষা, প্রকৃত শিক্ষিত চর্চা।
শিক্ষার হার ও ভার যত বেড়েছে, ধার তত কমেছে। সরকারি বিজ্ঞাপনে, বিজ্ঞপ্তিতে, সরকারি দপ্তরে অজস্র নির্দেশনামার নীচে ইংরেজি By order শব্দের তর্জমা ‘ অনুমত্যানুসারে ‘ আকছার চোখে পড়ে। ‘ অনুমতি ‘ এবং ‘ অনুসারে ‘ শব্দদুটি সন্ধির নিয়মে জুড়ে গেলে শব্দটি দাঁড়ায় ‘ অনুমত্যনুসারে ‘। তার বদলে ‘ অনুমত্যানুসারে ‘ ! মাঝখানের ওই আ-কারটি আসে কী করে ? অদ্ভুত ব্যাপার ! এর বদলে ‘ আদেশানুসারে ‘ বা ‘ নির্দেশানুসারে ‘ লিখলে তো কোনও ক্ষতি হত না।
বিদ্যাসাগরের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত সেই ‘ দুরাবস্থা ‘ গল্পটির কথা মনে পড়ে।
এই প্রসঙ্গে আরও একটি অদ্ভুত ‘ সৃষ্টি ‘র প্রতি রসিকজনের দৃষ্টি আকর্ষণ করি। শব্দটি হল ‘ ফিল্মোৎসব ‘। ইংরেজি ‘ ফিল্ম ‘ শব্দটিকে কোন্ উর্বর মস্তিষ্ক বাংলা তৎসম শব্দ জ্ঞান করে তার সঙ্গে ‘ উৎসব ‘ শব্দটির সন্ধি করিয়ে, নাট্যোৎসব বা নৃত্যোৎসব -এর মতো তাকেও ‘ ফিল্মোৎসব ‘ বানিয়ে ছাড়লেন ?
কলকাতা শহরে নন্দন চত্বরের মতো সংস্কৃতির পীঠস্থানেই এমন ‘ ফিল্মোৎসব ‘ বছরের পর বছর চলছে , বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের মতো শিক্ষিত, সংস্কৃতিবান মানুষের সময় থেকেই। আশ্চর্য !
তবে আশ্চর্য হওয়ার মতো বিষয় ‘ শিক্ষিত বাঙালি ‘ বড় কম ছড়িয়ে রাখেনি ! সেখানে প্রকৃত শিক্ষার অভাব যত্নের অভাব, দুর্ভাগ্যজনকভাবে, বড় প্রকট।
ইংরেজি ব্যাকরণে যা syntax বা word-order, বাংলা ব্যাকরণে তা-ই অন্বয় বা বিন্যাস। এই অন্বয় ভাষাভেদে আলাদা। এটা আলাদা কথা কিছু নয়। কথাটা হচ্ছে, এক ভাষার অন্বয় অন্য ভাষায় অন্ধের মতো অনুকরণ করার বহুল প্রচলিত ‘ শিক্ষিত ‘ প্রবণতা নিয়ে।
এমনিতেই আমরা, পশ্চিমবঙ্গের বাঙালিরা, স্কুল-কলেজে ‘ শিক্ষিত ‘ বাঙালি প্রতিদিনের বাক্যব্যবহারে, মুখের ভাষায় ইংরেজি বা হিন্দির আধিপত্যের কাছে অবচেতনে মাথা ঝুঁকিয়েই রেখেছি। তা না-হলে ” এবার খাবার দিই / ভাত বাড়ি ” জাতীয় কথার বদলে ” খাবার লাগাই ” কথাটা রাস্তার ধারের হোটেল-ধাবা থেকে শুরু করে শিক্ষিত বাঙালির খাবার টেবিল অবধি পৌঁছে গেল কীকরে ?
আর একটি আগ্রাসন হয়েছে ‘ কেনকী ‘ শব্দের। ‘ কেননা ‘ না বলে হিন্দির ‘ কিউঁকি ‘-র প্রতি প্রেম ও সমর্থন গচ্ছিত করে দিয়ে ‘ কেনকী ‘-র ব্যবহারও ক্রমাগত বাড়ছে।
অন্বয় বিষয়ে লেখাটি শুরু করেছিলাম। সেই প্রসঙ্গে আসছি। চিঠিপত্র লেখার চল লুপ্তপ্রায়। কেজো, সরকারি বা দরকারি যে-কটি চিঠিচাপাটি এই বাংলায় চলাচল করে, তাদের ঠিকানার জায়গায় ইংরেজি ‘ care of ‘-এর অনুসরণে অক্লেশে বাংলায় ‘ প্রযত্নে ‘ লেখা হয়। ওপার বাংলার বাঙালিরা কিন্তু এমনটা লেখেন না। কারণ তাঁরা বাংলাভাষাটা ঠিকঠাক লিখতে জানেন। কবি শঙ্খ ঘোষ ( গ্রন্থ : বটপাকুড়ের ফেনা / প্রকাশক : একুশ শতক ) মনে করিয়ে দিচ্ছেন, ” বাংলাদেশ থেকে একটা চিঠি এসে পৌঁছল। আমার কাছে নয়, তবে আমারও নাম আছে খামের ওপর। নামের আগে লেখা আছে ‘ প্রযত্নক ‘… …। care of না লিখে ওঁরা লেখেন ‘ প্রযত্নক ‘। এ-বাংলায় লেখা হয় ‘ প্রযত্নে ‘।
” ওঁরা কেন ‘ প্রযত্নক ‘ লেখেন ? কেননা ওঁরা ঠিক-ঠিক লিখতে চান। অনুবাদ করার সময়েও বাংলা অন্বয়টাকে এভাবে খেয়াল রাখতে চান ওঁরা। ইংরেজি থেকে বাংলায় আনতে গেলে অন্বয় যে পালটে যায়, সেটা ওঁরা মনে রাখেন। ‘ Care of Anwar Pasha ‘ বলবার জন্য বাংলায় লেখা যায় ‘ আনোয়ার পাশার প্রযত্নে ‘। আমরা লিখি ইংরেজি বিন্যাসে : ‘ প্রযত্নে : আনোয়ার পাশা ‘। বাংলাদেশও আগেই দেয় শব্দটা, কিন্তু সেটা তারা দেয় পদপরিবর্তন করে, লেখা হয় ‘ প্রযত্নক : আনোয়ার পাশা ‘। বিশেষণ হিসেবে আসে বলে স্বাভাবিক লাগে ব্যাপারটা। “
এই আলোচনা পড়তে-পড়তে মনে পড়ল আকাশবাণী কলকাতা বেতারকেন্দ্রের বেতার-ঘোষণার কথা। একসময় ‘ প্রাত্যহিকী ‘ বিভাগে মাঝেমধ্যে চিঠি লিখতাম। আমার পরিচিতজনের মধ্যে কেউ-কেউ এখনও লেখেন। ‘ প্রাত্যহিকী ‘ বিভাগের ঠিকানা বলার সময় ঘোষক/ঘোষিকা অবলীলায় ঘোষণা করতেন ( হয়তো এখনও করেন ) ” প্রযত্নে কেন্দ্র অধিকর্তা, আকাশবাণী ভবন, ইডেন গার্ডেন… ” ইত্যাদি।
ঠিক ওইরকম আর একটি অন্বয়-বিভ্রাট ঘটে খামের ওপর উদ্দিষ্ট ব্যক্তির নামের আগে ইংরেজি ‘ To’ -এর অনুসরণে ‘ প্রতি ‘ শব্দটি লেখায়। বাংলায় লেখার সময় আমরা ‘ অমুকের প্রতি ‘ বা ‘ অমুকের জন্য ‘ লিখি না কেন ? কারণ ইংরেজিতে ‘ To ‘ যে নামের আগেই থাকে ! স্কুলে ইংরেজি ক্লাসে মাস্টারমশাই / দিদিমণিরা তেমনটাই লিখতে শিখিয়েছিলেন কিনা ! বড় হওয়ার পরেও আর দুই ভাষার অন্বয়-পার্থক্য নিয়ে মাথা ঘামাইনি।
বাংলাদেশের মানুষ কিন্তু মাথা ঘামান। নিজের মাতৃভাষাকে ভেতর থেকে ভালোবেসে, সুচার যত্নে ও শিক্ষিত বোধে ব্যবহার করেন।
ভাষার সম্মানের জন্য রক্তপাত ও মৃত্যুবরণও তো সেই ভালোবাসারই প্রকাশ।