উত্তরণ – এক স্বপ্নের নাম

উত্তরণ,বাঁকুড়া শহরে কলেজে পড়তে আসা কয়েকজন ছাত্র-ছাত্রী, যাদের কোনো মাসকাবারি বেতন নেই বা মাস গেলেই বাবা-মা ভারি প্যাকেট পাঠায় না। কেউ স্টাইপেন্ড পায়,কেউ পায় স্কলারশিপ, কেউ করে টিউশন,কেউ আবার সামান্য টিফিনের পয়সা জমিয়ে স্বপ্ন দেখে, এই সমাজের জন্য কিছু করার। শুধু স্বার্থপরের মত বাঁচা নয়,কেরিয়ার তৈরি করা নয়, মানুষের পাশে দাঁড়ানোর এক একাগ্রতায় এই সমাজের জন্য  ওরা কিছু করার কথা ভাবতে শুরু করে। এভাবেই ২০১২ তে বাঁকুড়ার কিছু কলেজ পড়ুয়া ঠিক করলো তারা তাদের দরিদ্র বন্ধু-বান্ধবীদের সাহায্য করবে। পরিকল্পনা মত নিজেদের হাত খরচ বাঁচিয়ে প্রতি মাসে ৩০ টাকা করে জমা করা শুরু করল। এই জমানো টাকা দিয়েই কয়েক জন ভাই ও বন্ধুকে কিনে দিল তাদের প্রয়োজনীয় পাঠ্য পুস্তক। প্রাথমিক ভাবে ৮-১০ জন পড়ুয়া এই উদ্যোগে সামিল হলেও, ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে সংখ্যাটি। উদ্যোগটি পরিচিতি পেল “উত্তরণ” নামে, রুপ নিল একটি সংগঠনের।

উদ্যোক্তাদের বেশীর ভাগেই বাঁকুড়া জেলার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে এসেছিল বাঁকুড়া শহরে, কলেজে পড়তে। সপ্তাহান্তে জমায়েত হত পাঁচবাগার মাঠে, হ্যাঁ খোলা আকাশের নিচেই। কখনো বৃষ্টিতে ভিজে কখনো বা রোদে ঘেমে। বিকল্পের খোঁজে ওরা একদিন পৌঁছায় বাঁকুড়া স্টেডিয়ামে। কর্তৃপক্ষের অনুমতি না থাকায় কিছু দিনের মধ্যেই বন্ধ করতে হল ওখানকার জমায়েত। এর মাঝেই নতুন সমস্যা এলো, উদ্যোক্তাদের কয়েক জনকে শহর ছাড়তে হল। কলেজের পড়া শেষ করে উচ্চশিক্ষার উদ্দেশ্যে পাড়ি দিল অন্য শহরে। কিন্তু  “উত্তরণ” নামক প্রয়াসটি এখানেই শেষ হয়ে যায়নি। বাঁকুড়া শহরে পড়তে আশা আরও কিছু নতুন পড়ুয়া হাত ধরল এই  শিশু উত্তরণের। অন্য শহরে পড়তে যাওয়া পুরানো সদস্যদের মাধ্যমে বাড়ল সংস্থার পরিধি। বাঁকুড়ার প্রয়াস পৌঁছাল বর্ধমান, কলকাতা, খড়্গপুর, হায়দ্রাবাদ শহরের বড় বড় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে। দ্রুত গতিতে বাড়তে থাকল সংস্থার কাজ কর্ম। পাঠ্য পুস্তক দেওয়ার সাথে সাথে তারা চালু করল মাসিক বৃত্তি প্রকল্প “উত্তরণ মেধাবৃত্তি” প্রদান। প্রাথমিক ভাবে সেইসংখ্যাটি মাত্র দুই (২) জন হলেও, বর্তমান আর্থিক বর্ষে মোট সাত (৭০) জন দুস্থ অথচ মেধাবী ছাত্র-ছাত্রী এই বৃত্তির সুবিধা পাচ্ছে।

২০১৩-১৪ সালে এদের কর্মসূচিতে সংযোজিত হল নতুন প্রকল্প “ শারদীয়া” ও “শীতকালীন বস্ত্র বিতরণ”। ঠিক করল দুর্গা পূজার প্রাক মুহূর্তে ওরা পৌঁছে যাবে সেই সব মানুষগুলোর কাছে, যাদের নতুন জামা কাপড় কেনার সামর্থ্য নেই। উদ্দেশ্য ম্লান মুখে হাসি ফোটানো, তাদেরকেও “শারদীয়া”-র খুশিতে সামিল করা। কিন্তু এত টাকা কোথায়? না, টাকার দরকার নেই তো, আমার আপনার বাড়িতে পড়ে থাকা সুন্দর জামা কাপড় গুলোই পৌঁছে দিচ্ছি ওদের কাছে। ওদের আনন্দটা কিন্তু নতুন জামা কাপড় পাওয়ার মতোই। এখনও পর্যন্ত মোট  পাঁচবার এই প্রকল্পটি রূপায়িত হয়েছে। ওরা পৌঁছাতে পেরেছে বাঁকুড়া জেলার আটটি (৮) টি প্রত্যন্ত গ্রামে। শুধু তাই নয়, বাঁকুড়া শহরের বিভিন্ন এলাকাতে খোলা আকাশের নীচে রাত কাটানো মানুষ গুলোর পাশে দাঁড়ানোরও চেষ্টা করেছে ওরা জন্ম লগ্ন থেকেই। দুরারোগ্য রোগে আক্রান্ত বন্ধু-বান্ধবী বা তাদের বাবা-মা দের পাশে দাঁড়ানোর  সামর্থ্য নেই ওদের,সামর্থ্য নেই  তাদের চিকিৎসার ভার বহন করার, সে তো অনেক টাকার ব্যাপার। কিন্তু ওরা চেষ্টা করে তাদেরও পাশে দাঁড়ানোর। স্কুল-কলেজ, দোকান-পাট এমনকি পথচারীর কাছ থেকেও কিছু টাকা চাঁদা তুলে তাদের হাতে দেওয়ার চেষ্টা করে। মানসিক ভাবে ঐসব পরিবারের পাশে থেকে কষ্ট ভাগ করে নেওয়ার একটা চেষ্টা করে।
বাঁকুড়া শহরে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে উদ্বৃত্ত খাবার ক্ষুধার্ত মানুষের মুখে দেওয়ার প্রয়াসে “সেভ ফুড সেভ লাইফ”  শুরু করে ২০১৬ সালের শেষের দিকে। ওরা পেরেছে কিছু খাবার বাঁচাতে। শুধু তাই নয় রেল স্টেশন ও নিকটবর্তী এলাকায় থাকা ভিখারি ও পথ শিশুদের সাথে জন্মদিন ও বিশেষ দিন গুলি পালন করা ও তাদের মুখে কিছু খাবার তুলে দেওয়ার উদ্যোগ বেশ সাফল্য পেয়েছে। বিগত বছরে ওরা তিনশো (৩০০) প্লেটের বেশী খাবার সংগ্রহ করতে সক্ষম হয়।
ওদের আরেকটি প্রয়াস “উত্তরণ বুক ব্যাঙ্ক”। বুক ব্যাঙ্কটি সম্পূর্ণ ভাবে পুরানো বই দিয়ে তৈরি।  জুলাই’২০১৭   থেকেই বিভিন্ন এলাকা থেকে ওদের সদস্যরা পুরানো পাঠ্য বই সংগ্রহ করা শুরু করে। সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষ এগিয়ে এসেছেন এই প্রয়াসে সামিল হতে, তুলে দিয়েছেন তাদের বাড়িতে থাকা অব্যবহৃত বই গুলি। বাঁকুড়া জেলার বিভিন্ন প্রান্ত ও কলকাতা থেকে চারশোর (৪০০) বেশী বই সংগৃহীত হয়েছে। প্রাথমিক ভাবে একাদশ, দ্বাদশ (বিজ্ঞান বিভাগ) ও জয়েন্ট এন্ট্রান্স এর ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য পাঠ্য পুস্তকের সুবিধা দেওয়া সম্ভব হয়েছে। আগামীদিনে এই বুক ব্যাঙ্কের মাধ্যমে অনান্য বিভাগ ও চাকুরী প্রার্থীদের জন্য বইয়ের সুবিধ দেওয়ার চেষ্টা করছে ওরা
এই বছরেই(২০১৯) শুরু হয়েছে “মেঘের পালক” প্রকল্প। উদ্দেশ্য কিছু প্রতিবন্ধী ছাত্র-ছাত্রীকে হাতের কাজ শিখিয়ে তাদের স্বনির্ভরতার রাস্তা দেখানো। প্রাথমিক ভাবে ১০ জন ছাত্র-ছাত্রী এই প্রকল্পের আওতায় এসেছে। রাখি পূর্ণিমায় ওদের তৈরি রাখি এবার শোভা পেয়েছে দাদা ও ভাইয়েদের হাতে। এর লভ্যাংশ তুলে দেয় ওরা তাদের হাতে, তাদের পড়াশুনার কাজে লাগানোর জন্য।
সংস্থাটি সাতবছর পার করে আটবছরে পা রাখলো। অনেক ওঠা পড়ার মধ্য দিয়ে চলতে হয়েছে “উত্তরণ” কে। সমাজের বিভিন্ন স্তর ও শ্রেণির মানুষ এগিয়ে এসেছেন,ওদের হাতে হাত রেখছেন। কিন্তু এখনও ওদের সিংহ ভাগ সদস্য ও কর্মীই ছাত্র-ছাত্রী। এখনও সংস্থা চলে সদস্যদের দেওয়া মাসিক ৫০/- টাকা আনুদানে। কর্ম পরিধি বেড়েছে,কিন্তু ওদের চিন্তার বিষয় আর্থিক সচ্ছলতা। বড় কোন আর্থিক সাহায্য ওদের  জোটেনি, যদিও দেদার প্রতিশ্রুতি পেয়েছে।
“সাথে থেকো… সাথে রেখো” মন্ত্র নিয়ে এগিয়ে চলেছে এই ছাত্রদল।
ওদের আগামী পরিকল্পনাঃ
১. সেভ ফুড সেভ লাইফ প্রকল্প টির বিস্তার। অনেক সময়ই গভীর  রাত্রে খাবার সংগ্রহ করার ডাক পেলেও ভ্যান গাড়ী ও ফ্রিজ না থাকায় খাবার গুলি সংগ্রহ করতে পারে না। আর্থিক সাহায্য পেলে এই পরিকল্পনাটি ওরা বাস্তবায়িত করতে  পারবে।
২. দক্ষিন বাঁকুড়ার আদিবাসী এলাকা গুলিতে ছোট ছোট ছেলে মেয়েদের শিক্ষার  জন্য নার্সারি স্কুল তৈরি করার ওদের খুব ইচ্ছে আছে।
৩. গ্রামগঞ্জ থেকে আসা দুঃস্থ মেধাবী ছেলে মেয়েদের জন্য উচ্চমাধ্যমিক-এর পর বিভিন্ন প্রফেশনাল কোর্সে ভর্তি হবার প্রবেশিকা পরীক্ষার জন্য বিজ্ঞানের বিষয় গুলিতে কোচিং এর ব্যবস্থা করাও ওদের পরিকল্পনা আছে।
উত্তরণ সম্পর্কে বিশদ জানতে ও যোগাযোগ করতে

উত্তরণ

(UTTORAN-AN ENDEAVOUR)

(ছাত্র-ছাত্রীদের দ্বারা পরিচালিত একটি সমাজ সেবী সংস্থা)

রেজি নং- S/2L/34008 of 2014-15, বাঁকুড়া : পশ্চিমবঙ্গ

Mobile: 9002733771/ 9476318934

Email:  [email protected]
Website:  www.bankurauttoran.org

Facebook: https://www.facebook.com/UttoranAnEndeavour/

YouTube: https://www.youtube.com/channel/UC2DdJ7o0j9wIThngoa9dB6Q

তথ্য সহায়তাঃ রীতেশ মল্লিক