গান্ধারী

ঝড় আসছে । গান্ধার রাজ্য চারিদিক ঘেরা পাহাড়ে। কদিন ধরে আকাশ থমথম। আসন্ন পূর্বাভাস। অবশেষে আজ সোঁ সোঁ শব্দে ,চারিদিক অন্ধকার করে ঝড় এসে হানা দিল গান্ধার রাজ্য।
একটু আগেই দুপুরের রোদ্দুরে ঝকঝক ছিল চারিধার। এখন ঘন কালো মেঘে সূর্য গেছে ঢেকে। পৃথিবীতে যেন প্রলয় আসন্ন!
গান্ধাররাজের সন্তান দুটি। কন্যা গান্ধারী ,রূপে গুণে তার তুলনা ভার। পুত্র শকুনি। সে আবার লেখাপড়া করতে চায়না। রাজকার্যেও মন নেই। যত মনোযোগ পাশা খেলার প্রতি। সারাদিন বন্ধুদের সঙ্গে বাজি রেখে পাশা খেলবে, আর জিতের উল্লাসে মোচ্ছব করবে! এই কি রাজপুত্রের কাজ? এমনিতেই এখন, ভারত রাজনীতিতে গান্ধার দেশ ক্রমশ পিছিয়ে পড়ছে। রাজা সুবল সেজন্যে বেশ চিন্তিত। ভারতবর্ষের রাজধানী হস্তিনাপুরের সম্রাট ধৃতরাষ্ট্র। তরুণ এই রাজার বকলমে রাজ্য চালান মহামতি ভীষ্ম। কোনকারণেই হোক, গান্ধাররাজ্যের বিশেষ সমাদর ওখানে নেই। এমন ভাবে বেশিদিন চললে, রাজ্যের অর্থকরী দিকে টান পড়তে পারে, সে ভয় আছে রাজা সুবলের। কন্যাটি তার ভারি সুন্দর। যেমন সুন্দরী, তেমনি বুদ্ধিমতী, তেমনি ধার্মিক। লেখাপড়াতেও খুব ভালো। তবে , রাজ্যের ভবিষ্যতে কন্যা কতটুকু সহায় হতে পারে? সে তো পুত্রের কাজ! অথচ , পুত্র শকুনি তেমন যোগ্য কই! শ্বাস ফেলে ভাবেন রাজা।
‌ ঝড় আছড়ে পড়ার আগেই, দ্রুতগামী তিনটি রথ ধেয়ে আসতে লাগল গান্ধার রাজ্যের দিকে। মাথার উপর উড়ছে কৌরবরাজবংশের পতাকা। রাজকীয় সেই রথ যেন গর্ব অহংকার আর ঐশ্বর্যের প্রতীক। জানা গেল, হস্তিনাপুরের দূত এসেছে, বিশেষ জরুরী বার্তা নিয়ে । রাজ্য জুড়ে সাজ সাজ। প্রচুর উপঢৌকন নিয়ে রাজসভায় এসে দাঁড়াল তারা। মুখের রেখায় উদ্ধত ভাব। এটাই স্বাভাবিক। অধস্তন রাজ্যের প্রতি এমন ব্যাবহার করেই থাকে শাসক রাজ্যের কর্মচারী।
‌ বিগলিত মুখে বার্তাবাহকের আপ্যায়নের ব্যবস্থা করা হলে, তারা গম্ভীর মুখে , গড়গড় করে বলে যেতে লাগল , হস্তিনাপুরের সর্বসেবা মহামতি ভীষ্মের বক্তব্য।
চিৎকার করে ছিটকে উঠল শকুনি। হতে পারে তেমন উপযুক্ত রাজপুত্র সে নয়, কিন্তু ভগিনী গান্ধারী তার প্রানের টুকরো। ভয়ঙ্কর ভালোবাসে নিজের অসীম গুণবতী বোনটিকে। তার সম্বন্ধে কি বলে ওই অর্বাচীন দূত? যত বড় সম্রাটের দূত হোক না কেন , শকুনি ভয় পায় না। এত বড় সাহস! বলে কি না অন্ধ ধৃতরাষ্ট্রের সঙ্গে বিবাহ হোক কুমারী গান্ধারীর!
‌ মুখ শুকিয়ে গেছিল রাজা সুবলেরও। তবু মাথা ঠান্ডা রেখে তিনি শকুনিকে শান্ত হতে বললেন। বিবাহ প্রস্তাব ফিরিয়ে দেওয়া মানে, যুদ্ধ অনিবার্য। অতীতে বহুবার ভীষ্ম , পছন্দমত কন্যা তুলে নিয়ে চলে এসেছেন। এখানেও তাই ই হবে। মাঝখান থেকে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে গান্ধার রাজ্য। তার চেয়ে মনের দুঃখ মনে চেপে, বিখ্যাত ভরত কুরুবংশের গৌরবের কথা মাথায় রেখে , বিবাহে রাজি হয়ে যাওয়াই ভালো। মনের রাগ দুঃখ মনে চেপে তিনি হই হই করে বলে উঠলেন—আরে, এত আমাদের পরম সৌভাগ্য। গান্ধারী হবে ভারতমহিষী। আপনারা বসুন। ওরে সকলে অন্তঃপুরে খবর দে। উৎসবের আয়োজন হোক।”
‌ হতবাক শকুনি, এক ছুটে অন্দরমহলে স্তব্ধবাক গান্ধারীর সামনে হাজির হল—
‌ ভগিনী, এ অন্যায়। তুমি রাজি হবে না।
‌পিতার ইচ্ছাই শেষ কথা , ভ্রাতা। বিবাহের মত সামান্য একটি ব্যাপারের জন্য, রাজ্য আর পিতার ক্ষতি আমি হতে দিতে পারি না।
‌জীবনের প্রতি কোনো দায় নেই? ভগিনী? –কাতর কণ্ঠে বলল শকুনি।
‌ কক্ষটি অতি সুন্দর। গান্ধারীর রুচিবোধ সূক্ষ্ম। গুটিকয়েক সখী তার ঘনিষ্ঠ। তারাও শিক্ষিতা। রুচিশীলা।
‌ অন্যদিন সিন্ধুনদের ওপার থেকে ঝড় ভেসে এলে, সখীসহ গান গেয়ে ওঠে গান্ধারী। আজ সকলেই চুপ। জীবনের সব আনন্দ শুষে নিয়ে মেয়েটিকে গম্ভীর পরিণত বানিয়ে দিয়েছে ওই একটি ঘোষণা। কদিন পরেই চলে যেতে হবে এক অন্ধ রাজপুরুষের রানী হয়ে। অভিমান , রাগ, দুঃখ নিয়ে একমাত্র ভাইয়ের হাত ধরে গান্ধারী বললেন—ভ্রাতা শকুনি! পিতা অসহায়। ভীষ্ম কাউকে ছেড়ে কথা কন না। যেতে আমাকে হবেই। তবে, দৃষ্টিহীনের পত্নীর কোনো অধিকার নেই পৃথিবী দেখার। সাতপুরু কাপড় এনে আজ থেকেই নিজেকে অন্ধ বানাব আমি!”
‌—-ভগিনী! আর্তনাদ করে ওঠে শকুনি। দাঁত ঘষতে ঘষতে বলে—এর শোধ আমি তুলবই। ধ্বংস করব কুরু বংশ। আমি তোমার সঙ্গে যাবো।” শেষবারের মত সস্নেহে প্রিয় ভাইটির মুখটি দেখল গান্ধারী। কক্ষে সযতনে সাজান ছোট ছোট প্রিয় বস্তু —সুন্দর দুটি চোখ মেলে তাকাল সখীদের দিকে—তারপর — সাতপুরু মসলিন কাপড় বাঁধতে শুরু করল চোখের উপর দিয়ে, মলিন মুখে সাহায্য করতে লাগল সখীরা, বিবাহের উৎসব নয়, যেন কোনো বিষাদ সভার আয়োজন হতে লাগল রাজ অন্তঃপুর জুড়ে। অভিমানে থরথর গান্ধারী , আর একবারও ফিরে তাকাল না, নিজ রাজ্য গান্ধারের দিকে। আরোপিত অন্ধত্ব স্বীকার করে নিয়ে সে চলল কুরু বংশের রাজ মহিষীর পদ অলংকৃত করতে।

‌ কারো একটি ইন্দ্রিয় কমজোর হলে, অন্য ইন্দ্রিয়ের ক্ষমতা বেড়ে যায়, জানা ছিল গান্ধারীর। তবু, এতখানি শক্তিশালী ধৃতরাষ্ট্র, কল্পনা করেনি । সে শান্ত ধীর বুদ্ধিমতী। স্বামীর সমস্ত আবেগ, যৌনতা শরীরে ধারণ করতে লাগল রোজ। গান্ধারীর চোখ কাপড় দিয়ে বাঁধা, এই কথা ধৃতরাষ্ট্রের পুরুষ অহং তৃপ্ত করল। অতন্ত্য তীব্র তার যৌন আকাঙ্খা–গান্ধারীর শরীর দলিত মথিত হতে লাগল । রাজ্য চালায় ভীষ্মদেব। ছোট ভাই পাণ্ডু ,বেশির ভাগ সময় যুদ্ধ বিগ্রহে ব্যস্ত। ইতিমধ্যে তার দুটি বিবাহ হয়েছে। কুন্তী ও মাদ্রী নামে সুন্দরী দুই পত্নী নিয়েও সে রাজ্যে থাকার চেয়ে অরণ্যবাস পছন্দ করে। এতেও ধৃতরাষ্ট্র বেশ আনন্দ পায়। পাণ্ডু রাজ্যে থাকলে, তাঁকে হীনমন্যতা গ্রাস করে। তার চেয়ে বরং সে অরন্যেই থাক। প্রয়োজনে অর্থ পাঠিয়ে দিলেই হল। এমন নিশ্চিন্ত জীবনে এতদিনকার কামনার উৎসমুখ খুলে গেল গান্ধারীকে পেয়ে।
‌গান্ধারীর ভালো লাগত না। তার একটি নিজস্ব ব্যক্তিত্ব আছে। সে শুধুমাত্র শয্যাসঙ্গিনী হতে চায়না। কাব্য, কলা, দর্শনের আলোচনা তার ভালো লাগে। সে স্বামীর সঙ্গে সুন্দর সময় কাটাতে চায়। যেতে চায় জলবিহারে। ঘুরে আসতে চায় সুন্দর অরণ্যে। আদর চায় স্বামীর। চায় নিবিড় সান্নিধ্য। কদিনেই বুঝে গেল গান্ধারী–ধৃতরাষ্ট্র অন্ধ শুধু বাইরে নয়, অন্তরেও। অতন্ত্য মোটা দাগের মানুষটি, কোনোদিন তাঁর মনের সূক্ষ্ম অনুভূতি স্পর্শ করতে পারবে না ! গান্ধারী গুটিয়ে নিল নিজেকে। ধীরে ধীরে ডুবে গেল পূজা অর্চনায়।
‌তার শীতল ব্যবহারে বিরক্ত ধৃতরাষ্ট্র তিরস্কার করে বসেন। জোর করে বিছানায় নিয়ে আসেন। প্রায় ধর্ষণ করেন রোজ। শুকনো মুখ, প্রাণহীন পুতুলের মত গান্ধারী–রাজ অন্তঃপুরে নিজেকে বিলীন করে দেন। সারা হস্তিনাপুরে তার দিকে নজর রাখে কেবল একজন। গান্ধারীর মুখের প্রতিটি রেখা বদলের খবর রাখে সে। শকুনি। সাপের মত আশ্রয় নিয়েছে কৌরব রাজপরিবারে। ফিরে যেতে হবে। কিন্তু আবার আসবে সে। ছোবল মারবেই সে। অপেক্ষা শুধু সময়ের।

দুই💐💐💐💐
‌💐💐💐💐💐💐💐💐
‌ আজকাল বড় ভয় করে গান্ধারীর। গর্ভবতী সে। উৎফুল্ল ধৃতরাষ্ট্র। সেদিন তার কটি বেষ্টন করে স্বামী বলেন—আমি খুব খুশি গান্ধারী। তোমার পুত্র হবে কুরুকূলের জ্যেষ্ঠ সন্তান। সিংহাসন প্রাপ্য তার।
‌ গান্ধারীর স্ফীত উদরে হাত রেখে ফিস ফিস কুটিল গলায় বলে রাজা—জানো তো! অরণ্যে না গেলে ওই পাণ্ডু হত সম্রাট। অন্ধ বলে আমি থাকতাম বাতিলের খাতায়। এ সহ্য হয়? আমি কি ইচ্ছে করে অন্ধ হয়েছি? ওই পাণ্ডু তো নপুংসক। সন্তান হবে কোথায়?
‌ বুঝলে মহিষী—-আমার সন্তান হবে ভারত সম্রাট!
‌—শান্ত হন মহারাজ। পাণ্ডু আপনার নিজের ভাই। এতখানি নির্দয় হবার কোনো কারণ নেই। ধর্ম যেটুকু দেয়…!
‌—-থামো! বিকৃত কণ্ঠে চিৎকার করেন ধৃতরাষ্ট্র —ধর্ম? কিসের ধর্ম? কুরুকূলের আমি জ্যেষ্ঠ পুত্র। সিংহাসন আমার প্রাপ্য। অথচ লোক করুণার চোখে তাকায়। পান্ডুকে সমীহ করে। একশ হাতির শক্তি আমার শরীরে। প্রমাণ করতে পারলাম না কিছুই। আজ আমার সন্তান তার প্রমাণ দেবে।
‌ ভাগ্যিস তার চোখ বাঁধা। আজ ভাবে গান্ধারী, ভাগ্যিস সে দেখতে পায়না কিছু। অনুমানেই এত খারাপ লাগছে, অসহ্য লাগছে–গর্ভাবস্থায় ও শরীরের যেখানে সেখানে পীড়ন সহ্য করতে হচ্ছে–এমন মানুষকে না দেখাই ভালো । স্থির শীতল গলায় গান্ধারী বলে—মহারাজ ! এমন অবস্থায় আমার বিশ্রামের বিশেষ প্রয়োজন। আপনার সেবার জন্য এক দাসী পাঠিয়ে দেব বরং।”
‌—দাসী? দাসী পাঠাবে? সে পারবে? —অসহিষ্ণু রাজা প্রশ্ন করলেন। শান্ত মুখে উত্তর দিল গান্ধারী–
‌ সন্তান নির্বিঘ্নে পৃথিবীতে আসুক–আপনি চান না?
উদ্যত কামুক হাত থেমে গেল ধৃতরাষ্ট্রের —
‌ ঠিক ই বলেছ রানী। যাও বিশ্রাম করো। দাসীকে পাঠিয়ে দিও।
নিশ্চিন্ত নিঃশ্বাস ফেলে নিজের ঘরে ঢুকে এলো গান্ধারী। সন্তান জন্ম পর্যন্ত একলা কাটাতে পারবে। স্বামী সহবাস নামক ওই অত্যাচার সহ্য করতে হবে না আর। আরাম করে শরীর এলিয়ে দিল সোনার পালঙ্কে। জানালা দিয়ে ঘরে এসে পড়েছে চাঁদের আলো। নিঃশব্দ রাজপুরী। স্ফীত উদরে হাত রেখে অস্ফুটে কথা কয়ে যায় সে। তেমন কোনো বন্ধু নেই তার এই কৌরব রাজবংশে। সন্তান কি আপন হবে তার? বন্ধু হবে? না কি ,হবে সাম্রাজ্য লোভী? অ ধর্মচারী?
তিন
বজ্রপাতের মত খবর আছড়ে পড়ল হস্তিনাপুরে। কুন্তী সন্তানসম্ভবা। ঔরস ধার করা হয়েছে ধর্ম দেবের কাছ হতে। ধৃতরাষ্ট্র স্তম্ভিত। এমন ধাক্কা যে আসতে পারে, একথা স্বপ্নেও ভাবেন নি তিনি। খুশির হিল্লোল বয়ে চলেছে রাজপ্রাসাদে। পান্ডুর পিতা হবার কোন আশাই ছিল না, সেখানে একেবারে দেবপুত্র? এ অসম্ভব সম্ভব হল কেবলমাত্র কুন্তীর জন্য। ধন্য ধন্য পড়ে গেল কুন্তীর নামে। পাগলের মত ধৃতরাষ্ট্র দৌড়ে গেলেন গান্ধারীর কাছে—-সন্তান জন্ম হবে কবে তোমার?
‌খুব শীঘ্র মহারাজ।
‌কুন্তীর আগে না পরে?
‌আগেই মহারাজ।
‌যাক। নিশ্চিন্ত —মুখে বললেও, মনে এক উদ্বেগ নিয়ে নিজ শয়ন কক্ষে প্রবেশ করলেন ধৃতরাষ্ট্র। সেবিকা দাসীটি এসে হাত বুলিয়ে দিতে লাগল সর্বাঙ্গে। আহ! নরম স্পর্শ। নারী শরীরের ঘ্রাণ! কোমল দুটি বক্ষ। জেগে উঠল শরীর। দুই হাতে সবলে চেপে ধরলেন তাকে। অসহায় কবুতরের মত ছটফট করে দাসী। নিমেষে তার বস্ত্র খুলে ফেলে শরীরে শরীর মিশিয়ে নেয় ধৃতরাষ্ট্র। পাণ্ডু পাণ্ডু ! দ্যাখ পৌরুষ কাকে বলে! চোখ আছে তোর। তবু ক্ষমতা নেই নারী শরীরে বীজ বপন করার। আমাকে দ্যাখ! ভাবতে ভাবতে সবলে পিষ্ট করেন দাসীকে, ফিস ফিস করে বলেন
‌ভয় পেওনা। পুত্র হলে সে রাজপুত্রের সমাদর পাবে। এখন তৃপ্ত করো আমাকে।
রাজপরিবারের বিশেষ চিকিৎসকরা মিলে একটি দল তৈরি হল। মহারানীর উপর সারাক্ষণ নজর রাখার জন্য ধাত্রী বিদ্যায় পারদর্শী দাসীদের নিয়োগ করা হল। প্রতিটা অনু মুহূর্ত পর্যন্ত হিসেব করে চলা হতে লাগল। গান্ধারীর চলা বলা খাদ্য সব কঠোর নিয়ন্ত্রণে রাখা হতে লাগল। প্রতিমুহূর্তের হিসেব অনুযায়ী, গান্ধারীর আর দশদিন বাকি প্রসবের। খবর পাওয়া গেছে, কুন্তী এখনো মাস দুই দূরে।
হিসেব করে মানুষ, নির্মাণ করে কাল। হিসেব মত যে দিন স্থির হয়েছিল প্রসবের , পার হয়ে গেল তা। কোনো লক্ষণ নেই। কোনো বেদনা নেই । গান্ধারীর শরীরে বিন্দুমাত্র আলোড়ন নেই। পাগল হয়ে উঠলেন ধৃতরাষ্ট্র —অন্ধ চোখ দুটি জ্বলতে লাগল ধক ধক। ভয়ে শুকিয়ে গেল গান্ধারীর মুখ। ওদিকে কুন্তীর প্রসব আসন্ন প্রায়। গান্ধারী হাত ধরলেন রাজ বৈদ্যের
কিছু একটা করুন।
‌—মহারানী। কালের নিয়মেই আপনার কিছু দেরি হবে। অতন্ত্য স্বাভাবিক ভাবেই প্রসব হবে। কেন চিন্তা করছেন?
‌—-না না দেরি নয়। দেরি নয়। আপনি যা পারেন করুন। ব্যাকুল উৎকণ্ঠা আছড়ে পড়ল মহারানীর গলায়। পুরোনো পরিচিত ভিষগাচারয, বৃদ্ধ হয়েছেন, তাকালেন গান্ধারীর দিকে। আসন্ন প্রসবা নারী মানসিক ভাবে বিপর্যস্ত থাকে–কিন্তু , মহারানী যেন ভীত। সর্ব অবয়বে মাতৃত্বের আনন্দের পরিবর্তে জড়িয়ে রয়েছে ভয়। এমন হলে তো প্রসবে বিঘ্ন ঘটতে পারে! চিন্তিত বৃদ্ধ ভিষগ কিছু লতাপাতার ঔষধ প্রস্তুত করলেন। মুখে বললেন :
প্রসব নির্বিঘ্নে হবে। আপনি নিজেকে হালকা রাখুন। আপনার গর্ভে একাধিক ভ্রূণ রয়েছে। দেরি ঠিক সেই কারণেই।
এ কথার উত্তর দিল না গান্ধারী। নিজের স্ফীত উদর টানতে টানতে শয়নকক্ষে আছড়ে পড়ল। ধৃতরাষ্ট্র আজকাল নতুন দাসীকে নিয়ে মেতে রয়েছেন। বেচারী মেয়েটিও গর্ভবতী। তবু তার রেহাই নেই ওই কামুক রাজার হাত থেকে। শুনেছে, নিয়োগ প্রথায় ক্ষেত্রজ পুত্রের পিতা হতে চলেছে পাণ্ডু, অতন্ত্য যত্ন করছেন কুন্তীর। সম্মান দিচ্ছেন । কি হবে যদি কুন্তী আগে জন্ম দেয় সন্তানের? স্বামীর ভয়ঙ্কর কুটিল মুখটি মনে করে, বুকের রক্ত হিম হয়ে গেল গান্ধারীর।

‌চার 💐

কুন্তী সুন্দর করে প্রসব করলেন ধর্মরাজ যুধিষ্ঠিরকে। সেদিন পৃথিবী ভরে উঠল আনন্দে। সমস্ত সু লক্ষণ নিয়ে সন্তান পৃথিবীতে এল। কুরুবংশের জ্যেষ্ঠ সন্তান, প্রথম পাণ্ডব —দ্রুতগামী দূত হস্তিনাপুরে খবর নিয়ে এল। রাজ্যজুড়ে উৎসব শুরু হয়ে গেল। ভীষ্ম নিজে দাঁড়িয়ে থেকে দান যাগ যজ্ঞ শুরু করলেন। শুধু ভয়ঙ্কর হয়ে উঠলেন ধৃতরাষ্ট্র। অন্তঃপুরে এসে কোমরে হাত দিয়ে দাঁড়ালেন ,অসুস্থ গান্ধারীর সামনে। তীব্র ব্যঙ্গের সুরে বলে উঠলেন
‌ এক দাসীও তোমার চেয়ে বেশি যোগ্য মহারানী। তুমি নাকি শতপুত্রের জননী হবার বর পেয়েছিলে? সেই জন্য তোমাকে এত বড় বংশের পুত্রবধূ হবার মর্যাদা দেওয়া হল। আর আজ পান্ডুর পুত্র হল সিংহাসনের উত্তরাধিকারী? ধিক তোমাকে।
‌ শয্যায় আধশোয়া গান্ধারী, না দেখতে পেলেও ,অনুভব করছিল বিষাক্ত নিঃস্বাস। বিবাহের পর থেকেই সে এই পুরুষকে মেনে নিতে পারেনি। দৃষ্টিহীন পুরুষের কামুক হাত তাকে সারাক্ষণ পীড়ন করত। আজ তার শয্যার পাশে এসে দাঁড়িয়েছে এক স্বার্থপর ক্ষমতালোভী পুরুষ। অসুস্থ শরীরকে কোনোমতে টেনে , গান্ধারী বলে–
‌ আমার কি দোষ মহারাজ?
‌—তবে ? কার দোষ? শোনো রানী, নপুংসক পাণ্ডু, আমি নই। আমার ঔরসে দাসী পর্যন্ত পুত্রবতী হয়। আর তুমি? ধিক।
‌ বেগে বেরিয়ে গেল ধৃতরাষ্ট্র। অপমানে বিষ সর্বাঙ্গ। জ্বলে যায়। জ্বলে যায়। কি বুঝবে ওই নারী? প্রাপ্য থেকে বঞ্চিত হবার যন্ত্রণা! উফফফ!
‌ স্তব্ধ হয়ে বসে রইল গান্ধারী। কাপড় বাঁধা দুই চোখের কোন দিয়ে হুহু করে বেরিয়ে আসছে জল। আন্দাজে উঠে, নির্ভুল হাতে বন্ধ করল কক্ষের ভারী কপাট। আন্দাজেই টেনে বার করল কাঠের ছোট মুগুর। দুহাতের শক্তি একসঙ্গে করে, দশমাসের গর্ভে জোরে আঘাত করল। যত জোরে পারে। দুদিন ধরে ভালো করে খাওয়া হয়নি। মানসিক বিপর্যয়ের শেষ সীমায় এসে শরীর আর নিলনা। চেতনা হারাতে হারাতে বুঝতে পারল, তীব্র বেগে কিছু একটা বেরিয়ে আসছে শরীর থেকে। জ্বলন্ত লাভার মত, উল্কা পিণ্ডের মত এক মাংস পিণ্ড সজোরে বেরোতে লাগল গান্ধারীর যোনি পথ বেয়ে।
‌পাঁচ
ভুরু কুঁচকে রইলেন ব্যাসদেব অনেকক্ষন। ঘটনাটি জটিল। কপাট ভেঙে উদ্ধার হয়েছে অচৈতন্য রক্তাক্ত গান্ধারী। ব্যাসদেবকে খবর পাঠিয়ে আনা হয়েছে সত্বর। কুরুকূলের যে কোনো সমস্যায় ব্যাসদেব আসা জরুরী। আম্বা আম্বালিকা , দিদি শাশুড়ি সত্যবতী –প্রবীণ নবীন –ভীড় করেছে সবাই– আতঙ্ক ছায়া মেলে আছে মুখগুলিতে। এমন হঠকারী কাজ শোভা দেয় না কি গান্ধারীর মত শান্ত মেয়ের?
‌ব্যাসদেব ও অন্যান্য বিচক্ষণ চিকিৎসকরা ওই মাংসপিন্ডটিকে পরীক্ষা করে নিশ্চিন্ত হলেন প্রাণ আছে তার মধ্যে। ভ্রূণ সুরক্ষিতই আছে। তাড়াতাড়ি সেটিকে বরফ ঠান্ডা জলে স্নান করানো হল। সেই মাত্রেই ,ভ্রূণ বেরিয়ে এল একশ এক টুকরো হয়ে। একশটি ছোট ছোট কলসীর মধ্যে ওষুধ আর ঘি রেখে, তার মধ্যে আঙ্গুল সমান ভ্রূণ গুলো রেখে, রোজ যত্ন করার নির্দেশ দিলেন ব্যাসদেব। এক বছর সময় লাগবে এই নলজাত বা কলসীজাত প্রাণ গুলির মানব রূপ পেতে। সেই সময় কাল সতর্ক থাকা প্রয়োজন। সাতদিন থাকলেন ব্যাস। গান্ধারী পুরোপুরি সুস্থ হলে, মৃদু তিরস্কার করে বললেন
‌ —এমন ছোট ঈর্ষা তোমার থেকে আশা করিনি প্রাজ্ঞ নারী। আমি তোমাকে অন্যরকম ভাবতাম।
‌ উত্তরাধিকার এবং রাজ্যধিকারের কাল নীতি তোমাকে কবে গ্রাস করল ?”
‌ অসুস্থ ক্লান্ত গান্ধারী ম্লান হাসে –নারীর কেবল ধারণ করে ঋষিবর। অধিকার থাকে পিতার। শত পুত্রের জননী হয়েও একলাই থাকব, যেমন ছিলাম পিতৃগৃহে।
‌নির্বাক ব্যাসদেব। জ্বলন্ত সত্যের সামনে মূক হয়ে যায় জ্ঞান। রানী হোক বা ভিখারিণী–নারীর পরিচয় সে নারী। পুরুষের ব্যবহারের যন্ত্র মাত্র।

‌ছয়
ঈর্ষা ঈর্ষা ঈর্ষা—ঈর্ষার কালো ছায়া হস্তিনাপুর জুড়ে। ধৃতরাষ্ট্র চেয়েছিলেন, যেন যেন প্রকারেন যুধিষ্ঠিরের মৃত্য। তাহলে রাজ্য নীতি অনুযায়ী সম্রাট হবে দুর্যোধন। তাতো হলোই না, উপরন্ত অরণ্যে পাণ্ডু –মাদ্রীর অকাল মৃত্যুর পরে, পিতামহ ভীষ্ম কুন্তী সহ পঞ্চপাণ্ডব কে এনে তুললেন রাজগৃহে। সমান সমাদরে অস্ত্র শিক্ষা , বিদ্যা শিক্ষা চলতে লাগল এবং যথারীতি পাণ্ডুপুত্রেরা প্রাণপনে যতটুকু পারে শিখে নিয়ে এগিয়ে যেতে লাগল।
ধৃতরাষ্ট্রের অমিত প্রশয়ে, দুর্দম একশ পুত্র নানা অত্যাচারে জর্জরিত করতে লাগল পঞ্চপান্ডকে। এর মধ্যে এসে পড়ল শকুনি। কুমন্ত্রণা দিয়ে ভাগ্নে দুর্যোধনের মন বিষিয়ে তুলতে লাগল সে। তাঁর মনের গোপন ইচ্ছে হল, যেভাবেই হোক কুরু পাণ্ডবের যুদ্ধ হয়ে, ধ্বংস হয়ে যাক হস্তিনাপুর। প্রিয় ভগ্নীর জীবন নষ্টকারীদের কোনো ক্ষমা তার কাছে নেই।
‌কি করবে গান্ধারী? নিজের সব বঞ্চনা ভুলে নতুন করে বেঁচে উঠতে চাইলেন—পুত্রমুখ না দেখলেও, আঙ্গুল বুলিয়ে বুলিয়ে নবজাতকদের স্পর্শ করে অঝোরে কাঁদতেন তিনি। নিজের ধ্যান ধারণা দিয়ে তাদের গড়ে তুলবেন এমন ভাবনা ক্ষণে ক্ষণে পুলকিত করত। অথচ আজ কি দেখছেন তিনি? সারা হস্তিনাপুর দাপিয়ে বেড়ায় ছেলেরা। লেখা পড়া করে না, যা খুশি তাই করে, নারীদের অসম্মান, সাধারণ মানুষদের অত্যাচার, ব্রাহ্মণদের উপহাস—সব কানে আসে গান্ধারীর। কিছু করার নেই তার। অমিত প্রশ্রয় দেন ধৃতরাষ্ট্র। দুর্যোধন দুঃশাসন যেন চন্ডাল। বরং অদ্ভুত ভালো স্বভাবের হয়েছে , দাসী পুত্র যুযুৎসু। ধৃতরাষ্ট্রের ঔরসে জন্ম বলে, মহলে থাকার সুবিধা পায়। বড়মা বলে কাছে আসে। প্রাণ জুড়িয়ে যায়। নিজেকে ভুলে থাকার প্রাণপণ প্রয়াসে, গান্ধারী ডুবে যেতে থাকতেন ধর্ম কর্মে প্রায় ব্রহ্মচারী জীবন যাপন করতে থাকেন।
সাত
ধর্ম আর অধর্ম—এই দুইয়ের মধ্যেকার সূক্ষ্ম পার্থক্য মানুষকে বুঝতে হয়, জীবন দিয়ে। অন্যায় দেখলেও যদি চুপ করে যেতে হয়, তবে তার ফল হতে পারে, ভয়ানক।
হস্তিনাপুরের রাজপরিবার স্পষ্টত দুটি শিবিরে ভাগ এখন। ছেলেরা কৈশোরের প্রান্ত সীমায় দাঁড়িয়ে। ক্ষত্রিয়ের সমস্ত ধর্মেই পাণ্ডুপুত্রেরা নিজেদের যোগ্যতা প্রমাণ করছে ক্রমশ। তত জটিলতা বাড়ছে। অসন্তোষে কিচকিচ করছে কুরু পরিবারের কিছু সদস্য। সবচেয়ে অশান্তি ধৃতরাষ্ট্রের। নানা দিক থেকে নিজের ক্ষমতার প্রয়োগ করে, পাণ্ডবদের ক্ষতি করতে চাইছেন। কড়া নির্দেশ জারি আছে অন্দরমহলে, কৌরব –পাণ্ডব –দু পক্ষের জন্য ভোজন যাবে আলাদা রকমের। কিছুতেই যেন এর অন্যথা না হয়।
গান্ধারীর সময় আজকাল খুব মন্থর হয়ে গেছে। তার যেন আর কিছু করবার নেই। মাকড়সা যেন জাল বুনছে ধীরে ধীরে। শরীর আগের চাইতে ভারি হয়ে যাচ্ছে। সংসারের কোনো কাজে মন লাগে না। বয়সের আগেই বৃদ্ধা হয়ে যাচ্ছেন ক্রমশ। একলা বসে থাকে প্রায়শই। একদিন
কুন্তী এল তার সঙ্গে দেখা করতে। কুন্ঠিত গলায় বলল:
” দিদি, আমি আর কার কাছেই বা যাব। একটা কথা না বললেই না। তুমি একটু দুর্যোধনকে বুঝিয়ে বলো। এমন করে আমার ছেলেদের কষ্ট না দেয়।”
গান্ধারী উঠে দাঁড়াতে গেল। শরীর কাঁপে। আন্দাজে মুখ ফেরাল কুন্তীর দিকে। শঙ্কিত গলায় বলল–
” কি হয়েছে ? কি করেছে ওরা?
‌–ভীমকে বিষ খাবার খাইয়ে জলে ঠেলে ফেলে দিল। দিদি, আমার তো ওই ছেলে ছাড়া আর কিছু নেই। সারা পরিবারে আর কে ওদের শাসন করবে? ওদের শাসন প্রয়োজন । ”
‌ অসহায় শামুকের মত গুটিয়ে যেতে লাগল গান্ধারী। মহারানী সে। ক্ষমতার অধিকারী। অঙ্গুলিহেলনে স্তব্ধ হয়ে যাবে চরাচর। অথচ সামনে দাঁড়ান কুন্তীকে ভয় করছে। কারণ সে অপরাধীর মা। কোণঠাসা হয়ে তীক্ষ্ণ গলায় বলে উঠল:
‌ শাসন যথেষ্ট করা হয়। ওরা রাজপুত্র। মর্যাদায় অনেক উপরে। রাজপুত্রের শাসন যখন তখন করা যায়? ওরা কি অরণ্যচারী?
‌ নিজের কানে কর্কশ শোনালো কণ্ঠ—তোমার ভীম এত পেটুক কেন? ওকে বলো জিহবা সংযত করতে। ” উত্তেজনায় ওঠানামা করছিল বুক। দাসীরা দুহাত দিয়ে ধরে রেখেছে তাকে। রাগে সর্বাঙ্গ জ্বলছিল কুন্তীর। গান্ধারী এমন করবে ভাবে নি সে! সন্তানস্নেহে অন্ধ তবে ধৃতরাষ্ট্র কেবল নয়, গান্ধারীও কম নয়! তাই তাদের উপর করা কোনো অন্যায়ের প্রতিবাদ করে না সে। দাঁত দিয়ে ঠোঁট কামড়ে শানিত গলায় বলল কুন্তী–
‌ চলে যাচ্ছি আমি। কিন্তু এর ফল ভুগতে হবে তোমাকে। গোটা হস্তিনাপুরকে।
‌ অপমানের চিতায় এক মাকে তুলে দিয়ে বেরিয়ে গেল অন্য দর্পিতা মা। কুন্তী চলে যেতেই, মহারানীর খোলস ছেড়ে বেরিয়ে এল, হেরে যাওয়া এক নারী। আকুল কান্নায় ভেঙ্গে পড়তে পড়তে গান্ধারীর মনে হল, কেন বাঁচাল গর্ভ সেদিন? কু সন্তানের চেয়ে অনেক ভালো নিঃসন্তান থাকা। ভাবা মাত্রই শিউরে উঠল শরীর। তাড়াতাড়ি আরাধ্য দেবতার সামনে হাতজোড় করে মঙ্গল কামনা করতে লাগলেন দুর্যোধনের।

আট
‌শকুনির অভিসন্ধি ছিল গোপন কুটিল সর্পিল। কেউ ঘুণাক্ষরেও বুঝতে পারত না, তোয়াজ করে চলা ওই লোকটি আসলে একজন কপট ছিদ্রান্বেষী। হস্তিনাপুর ধ্বংস করার উদ্দেশ্যে ঘুণপোকার মত বাসা বেঁধেছে সেখানে। গান্ধারীর কাছে মাঝে মাঝে বিকেলে যায় সে। সাতপুরু কাপড় বাঁধা চোখে, মুখের প্রতিটি রেখায় বিষাদের আঁচড়—বোনটির হাতে হাত রেখে বসে। ক্লান্ত স্বরে গান্ধারী বলে
‌ —নিজের রাজ্য ছেড়ে এভাবে এখানে পড়ে আছো , ভাই? আমার ভালো লাগে না।
‌—তুমিও চলো তবে। ফিরে চলো গান্ধার। চোখ মেলে দ্যাখো আবার সূর্যের আলো, ফুল, তোমার প্রিয় সখীদের!
‌—-কেমন আছে সবাই ,ভাই? সে ই আমার ফুলের বাগান? এখনো কি সূর্যের আলো এসে আমার ঘরেই লুটোপুটি খায়?
‌—সব আছে ভগ্নী। কেবল তুমি নেই।
‌—ছেলেমানুষী করোনা শকুনি। বিবাহিতা নারীর ধর্ম কি তুমি জানো না?
‌—-বিবাহিত! হাঃ। —ক্রুদ্ধ ব্যঙ্গে বলে ওঠে শকুনি–
‌ বিবাহিত? না। একে বিবাহ বলে না। তুমি ছিলে সুলক্ষণ যুক্ত নারী। সে খবর জানত ওই ভীষ্ম। তাই অপদার্থ ধৃতরাষ্ট্র র জন্য তোমাকে জোর করে ধরে আনা হল। বিবাহ! একে বিবাহ বলে?
‌—- এখন সে কথা ভাবার কোনো মানে নেই ,তুমি আমার সন্তানদের কু পরামর্শ দিয়ে নষ্ট করছ। এ তোমার কেমন মন্দ বুদ্ধি?
‌—ভুল। ভগ্নী । ভুল। আমি নই। নষ্ট যদি কেউ করে থাকে, সে ওদের পিতা ধৃতরাষ্ট্র। ঈর্ষাকাতর, কামুক , অন্ধ সম্রাট। তিনিই অনিবার্য করে তুলছেন যুদ্ধকে। এমন স্বভাব ওই পিতা আর তার পুত্রদের, যে, তারা ক্ষমতায় থাকলে , পৃথিবীর অমঙ্গল অনিবার্য।
‌ গান্ধারী স্তম্ভিত হয়ে রইল। বন্ধ চোখের উপর থেকে সরে যেতে লাগল একটি করে পর্দা। যুদ্ধের কারণ সঙ্গে করেই ঘুরছে পিতা পুত্রের দল। তা হল ঈর্ষা। সামান্য প্রাপ্যটুকুও দেবেনা পাণ্ডবদের। যুদ্ধ যদি অনিবার্য ঘটেই, কার জন্য প্রার্থনা করবেন তিনি? কাকে দেবেন আশীর্বাদ? ধর্মের পক্ষে থাকবেন না অধর্মের? কে হবে বিজয়ী? কুন্তিপুত্র না গান্ধারীপুত্র?

নয়
যুদ্ধ শেষ। জয়ী হয়েছে পাণ্ডব। তারা মনে করে শাসকের জন্য ঘর শুধু নিজের দল নয়। শাসকের জন্য ঘর গোটা দেশ। দেশকে, দেশের সমাজকে বিষমুক্ত করার
জন্য, শাসনদন্ড হাতে নিতে হয় । এক অর্থে শাসক হল দাস মাত্র।
গান্ধারীর শতপুত্রের কেউ বেঁচে নেই। এমনই হবে জানা ছিল। প্রস্তুত ছিল। অথচ আজ বুকের ভিতর লক লক করে জ্বলছে শোক। কিছুতেই প্রবোধ মানছে না চোখের জল। বার বার মনে পড়ছে, যুদ্ধের আগে দুর্যোধন আশীর্বাদ নিতে এসেছিল। গান্ধারী মুখ ফিরিয়ে বসেছিল। তখনো ভিতরে দ্রৌপদীর উপর অন্যায় অত্যাচারের ক্রোধ যায় নি। তার ছেলে এত নীচ কাজ করবে? কেন করবে? তার ছেলে? তার সন্তান? কোথাও কোনো ভুল হচ্ছে না তো! মনের সংকট অবস্থার মধ্যে থেকে স্থির হতে পারেনি সে। মুখ ফিরিয়ে ছিল সন্তানের কাছ থেকে। বার বার ধৃতরাষ্ট্রকে অনুরোধ করেছিল, দুর্যোধনকে ত্যাগ করতে। ত্যাগ করলে বেঁচে যেত হয়ত!
শ্মশান প্রাসাদে একলা কি যেন খুঁজে বেড়ায় এক মা। তাঁর পুত্রদের শেষ কোনো স্মৃতি! কান পেতে শুনতে চায়
মাতৃ সম্বোধন! হাত বাড়িয়ে ধরতে চায় শেষ অবলম্বন। কিছুই নেই আর। গভীর অতলান্ত শূন্যতা ঘিরে ধরে চারিদিক। ধীরে ধীরে একটু একটু করে ডুবে যেতে যেতে অস্ফুটে বলে ওঠে গান্ধারী__দুর্যোধন । ফিরে আয়।

Facebook Comments