সত্যিকারের জন্মটা পয়লা মে, ১৯৫৮। বয়স বাড়িয়ে ভর্তি বলে খাতায় কলমে আগেই জন্ম। বাণিজ্যের স্নাতকের দৌড় দৌড়ে ক্লান্ত হয়ে ভাগ্যান্বেষণ। অবসর। খড়্গপুর, দিল্লি, কলকাতায় অসংগঠিত কাজ করতে করতে ভালবাসার টানে সংবাদপত্র জগতে চলে আসা। সেই থেকেই এই পেশায়। এখন জনস্বার্থ বার্তা পত্রিকার সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য। এছাড়া আমেরিকার নিউ ইয়র্ক টাইমসের এনলিস্টেড ফ্রি-ল্যান্সার। কবিতা লিখি ছোটবেলা থেকেই সখে, থেকেই, কিন্তু প্রবন্ধ লিখি তাগিদে। কবিতার বই প্রথম প্রকাশ ২০০৭-এ, ‘ক্যানভাসে রক্তের দাগ’ (প্রকাশক - দর্পনে মুক্তমন)। তারপর পকেট কবিতার বই ‘চুমু’ (প্রকাশক - চতুরঙ্গ), ‘নদীর নাম কালো’ (কলকাতা প্রকাশন) এবং ‘প্রবৃত্তির অনিবৃত্ত টানে’ (শিখা প্রকাশন, ঢাকা)। প্রবন্ধের বই আছে চারটি। স্বাধীনতার পাঁচ অধ্যায় (নিঃশেষিত), স্বাধীনতার ছয় অধ্যায়, মুসলমানের দুর্গাপুজো (দ্বিতীয় সংস্করণ নিঃশেষের পথে), এবং বঙ্কিমচন্দ্রের দুর্গেশনন্দিনী উপন্যাসের আলোকে আঞ্চলিক ইতিহাসের খোঁজ বিষয়ে ‘দুর্গেশনন্দিনীর সন্ধানে’। সবগুলিই (জনস্বার্থ প্রকাশন থেকে প্রকাশিত। স্বীকৃতি বলতে কবিতার জন্য-- বাংলাদেশের ময়মনসিংহের উদয়দিগঙ্গন আবৃতি সংস্থার ‘কবিপ্রণামী’। প্রবন্ধের জন্য মুসলমানের দুর্গাপুজোর জন্য আব্দুল করিম সাহিত্য সম্মান, বোধিসত্ত্ব সম্মান ও লালন পুরস্কার। বিশেষ আগ্রহ আঞ্চলিক ইতিহাস, পৌরাণিক বিষয় ও লোকসংস্কৃতির আঙ্গিকে দুর্গা নিয়ে খোঁজ।

সরহুল থেকে ইস্টার হয়ে নববর্ষ

আজকের সময় থেকে চাই চম্পানগরে থাকতেন অস্ট্রিক গোষ্ঠীর সাঁওতাল, খেড়িয়া শবররা। খেড়িয়া মানে খেরওয়াল জাতির আদিবাসী। তাদের মৃত্যুদেবতার নাম হুদুলরাজ, রাজ্যের নাম ‘মরণ’, যা সাধারণভাবে পাতাল বা নরক বলে পরিচিত। তাঁদের বিশ্বাস, মৃত্যুর পর মানুষ প্রথমে যায় ‘হানাপুরী’ বা অন্যলোকে। সেখানে বিচারের পর ভালোমানুষরা যায় ‘সেরমাপুরী’ বা স্বর্গলোক; আর বাকীরা মরণে বা পাতাল নরকে। জীবিত কেউ মরণে যেতে পারে না।
হুদুলরাজ কঠোর হাতে রাজ্য সামলান। তাঁর নিয়ম বদলায় না। কিন্তু, একবার তাকেও নিয়ম বদলাতে হয়েছিল। সেই ঘটনার কারণেই সাঁওতাল সমাজে সহরুল থেকে স্যালসেই উৎসবের শুরু। সরহুল উৎসবের সমাপ্তিতেই স্যালসেই। আদিবাসী সাহিত্য-সংস্কৃতির বিশিষ্ট গবেষক ডঃ ধীরেন্দ্রনাথ বাস্কে সেই কাহিনীটি আমাদের জন্য রেখে গেছেন।
খেরওয়াল জাতির প্রাচীন প্রবাদ, বিশ্বের মাতার নাম ধরিত্রী। বিন্দি তাঁর মেয়ে। ধরিত্রীই সব প্রাণের উৎস, ফসলের জন্মদাত্রী ও রক্ষাকর্ত্রী। তাই তিনি প্রাণেরও দেবী। নয়ণমণি বিন্দিকে সবসময় চোখে চোখে রাখেন ধরিত্রী, কিছুক্ষণ চোখের আড়াল হলেই অস্থির হয়ে ওঠেন। বিন্দি খেলে ফুলের বনে, ফলের গাছে, নদীর ধারে। একদিন বিন্দি একাই নদীতে স্নানে গিয়ে আর ফিরছে না। বেলা গড়িয়ে সন্ধ্যে পারিয়ে রাত হল, বিন্দি ফিরল না। মা ধরিত্রী অস্থির হয়ে উঠলেন। সর্বত্র খুঁজেও বিন্দিকে পাওয়া গেল না। উতলা ধরিত্রী তখন বলতে থাকলেন, “বিন্দিকে না পাওয়া গেলে এই জীবনই আর রাখব না। কার জন্যে বাঁচব!” তিনি তাঁর স্বাভাবিক সব কাজ বন্ধ করলেন। ধরিত্রীদেবী স্থানু হয়ে অনশনে বসায় সব ফসল শুকিয়ে গেল। গাছের পাতারা হলুদ হয়ে ঝড়ে গেল। বাগানের ফুল, বনের ফল শুকিয়ে মরে গেল। মৃত্যুর কালো ছায়া নেমে এল, পৃথিবী বুঝি রসাতলে যায়!
প্রমাদ গুনলেন সকলে। প্রকৃতির দেবদেবী ও ধরিত্রীর অনুচরেরা বিন্দিকে খুঁজতে খুঁজতে এলেন হুদুলরাজের প্রাসাদে। জানতে পারলেন, বিন্দি রয়েছে সেখানেই। তারা হুদুলের কাছে গিয়ে বিন্দির মুক্তি চাইলেন। হুদুল বললেন, “অসম্ভব।মরণে একবার কেউ এলে তাঁর ফিরে যাওয়ার কোনও নিয়ম নেই। নিয়ম ভাঙারও কোনও উপায় নেই। বিন্দির ক্ষেত্রেও সেটাই মানতে হবে।”
অনুচরেরা সবিস্তারে জানালেন, বিন্দি-র শোকে মা ধরিত্রীদেবী পাথর হয়ে গেছেন। অনশনে বসায় মৃত্যু পৃথিবীকে গ্রাস করছে। তাই অনুরোধ, বিন্দিকে যেন তিনি ফিরে যেতে দেন। তাদের বারংবার অনুরোধেও চিড়ে ভিজছে না দেখে শেষে তাঁরা প্রয়োগ করলেন ব্রহ্মাস্ত্র। বললেন, “বিন্দির বিহনে ধরিত্রীমাতা নাওয়া-খাওয়া ছেড়ে দিয়েছেন। গাছের পাতা হলুদ হয়ে ঝড়ে যাচ্ছে, ফুল-ফল মরে যাচ্ছে। পৃথিবীর রং বদলে গেছে। ধরিত্রীমাতা আত্মহত্যা করলে সৃষ্টিই থাকবে না। যদি সৃষ্টিই না থাকে, হুদুলই বা কার উপর রাজত্ব করবেন!
চিন্তিত হুদুলরাজ এবার ঘাবড়ালেন। সৃষ্টিই না থাকলে যে সবার অস্তিত্বই শেষ! সে-ক্ষেত্রে সব দোষ আসবে তাঁরই ঘাড়ে। কিন্তু, বিন্দিকে তো ইতিমধ্যে সে মরণের রানি করা হয়েছে। তার কী হবে? সাত-পাঁচ ভেবে শর্ত দিলেন হুদুল, জীবিত অবস্থায় এসেছিল বলে বিন্দি এখন মায়ের কাছে ফিরে যাক। কিন্তু, যেহেতু সে এখানে এসেছিল, রানি হয়েছে, তাই বছরের একটা সময় তাকে এখানে এসেও কয়েক মাস থাকতে হবে। ধরিত্রীর অনুচরদের কাছে তখন বিন্দিকে ফিরিয়ে ধরিত্রীকে বাঁচানোই মূলকথা। তাঁরা রাজী হলেন। বিন্দিও নাচতে নাচতে ফিরে এলো মায়ের কোলে। আবার ফুলে ফুলে ভরে গেল পৃথিবী। গাছে গাছে সবুজ কচি পাতারা ছেয়ে গেল। শুরু হল কলকণ্ঠের কাকলি। ফুলের বর্ণে, গন্ধে মন ভরে গেল বিশ্ববাসীর। তারা উৎসবে মেতে উঠলেন।
এই উৎসবটাই আদিবাসীদের প্রিয় ফুলের উৎসব ‘বাহা’ বা বসন্তের ‘সহরুল’। এর শুরু হয় মাঘ মাসে,ফুলে ফুলেগাছপালা ভরে গেলে। আর এর শেষ হয় ফাল্গুনী পূর্ণিমার দিন। সেই দিনের উৎসবের নাম স্যালসেই। সেইদিন খেরওয়াল জাতির নববর্ষ। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর শ্রীকৃষ্ণের দোল উৎসবের বদলে বোলপুরের আদিবাসী সমাজের সেই নাচ-গানের উৎসবকেই শান্তিনিকেতনে ‘বসন্ত উৎসব’ বলে চালু করেছিলেন। যৌবনের নবীন বর্ষের সূচনা বুঝি করে গিয়েছিলেন।
একটু পিছনে ফিরে গেলে দেখতে পাবো, আমাদের বছর গণনাও এই সময়ে ছিল না। এখনকার এক বছরে, মানে ৩৬৫ দিনে, তখন দুটি বছর হতো। অর্থাৎ, ছয় মাসে এক বছর। পণ্ডিত যোগেশ্চন্দ্র বিদ্যানিধি লিখেছেন, একটি বছর হিমবর্ষ, অপরটির শরৎ বর্ষ। ঋতুও ছিল দুটি – শরত আর হিম ঋতু। হিম ঋতুর শুরু অগ্রহায়ণে, শরৎ জৈষ্ঠ্য মাসে। মাসের নামগুলিও সে সাক্ষ্য দিচ্ছে – ‘অগ্র’ অর্থাৎ আগে শুরু আয়ন — উত্তরায়ণ, দক্ষিণায়নের মত। আর জেষ্ঠ্য অর্থাৎ প্রথমে অবস্থানবলেই সে জৈষ্ঠ্য। অগ্রহায়ণ হল নল রাজার পুণরায় রাজ্যাভিষেকের মাস। সেই হিম বর্ষের নববর্ষ উৎসব। আদিবাসীদের তখন বাঁধনা পরব।
আদিবাসীদের সরহুলের পর স্যালসেই শেষ হয় চৈত্রের পূর্ণিমায়। ফের শুরু আরেক উৎসবের প্রস্তুতির। ফসলের প্রতীক্ষার। ইউরোপে এই সময় শীত শেষ হয়ে বসন্ত আসে। ফসলের দেবীর পুজো শুরু হয়। তিনদিনের পুজো। সেই ধারা চালু হয়েছে যখন হিত্তানি থেকে যাযাবর জাতির মানুষ ইউরোপে গ্রিসের দিকে গেলেন, তখন থেকে। হিত্তানিদের ফসলের দেবীর নাম ইস্থার। আজ তারই ধারা চলছে ইস্টার পরব হিসাবে। তবে প্রায় ২০০০ বছর আগে যখন খ্রিস্ট ধর্ম প্রবর্তন হয়, তখন সেই ইস্টার পরবের সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হয় যিশু খ্রিস্টের পুনরাবির্ভাবের কাহিনী। ইস্টার হয়ে গেল খ্রিস্টানদের পরব। আসলে সেই নতুন ফসলের, শীত বা মরণের ঋতু পার হয়ে নতুন একটা বছরের আগমনী।
ইস্থার দেবী হলেন পেচক ও সিংহবাহিনী, দুই হাত, পিঠের পিছনে বিরাট পাখা, পায়ের গোড়ালি ও নখ দেখলে মনে হবে সিন্দবাদের রক পাখীর পা ধার করেছেন। পাথরের গায়ে প্রায় ৮০০০ বছর আগের আদিবাসীরা কাঁচা হাতে যে মূর্তি এঁকেছিলেন, সেটি দেখলে মনে হবে, দেবীর বুঝি ১০টি হাত। আমাদের দেশে ইস্থারের ভক্তদের আগমণ প্রায় ২০০০ বছর আগেই। তাদের সঙ্গেই আসেন সেই দেবী — যিনি সিংহবাহিনী এবং পেঁচাও যার বাহন। দুর্গা তাই সিংহবাহিনী হয়েও মহালক্ষ্মী। আর, তার পুজোও এই সময়েই হতো। পরে, উতসবের সংস্কার সাধনে দুর্গা পুজো সরে গেল শরতে, চৈত্রে রয়ে গেল বাসন্তী আর অন্নপূর্ণা। আদিবাসীদের দাঁশায়ের ভিক্ষা চেয়ে ঘরে ঘরে ফেরা হয়ে গেল চিরভিখারী শিবের গাজন।
খুঁটিয়ে দেখলে তাই দেখা যাবে, প্রতিমাসেই একটি করে এমন নববর্ষ গেঁথে আছে আমাদের প্রাচীন সংস্কৃতিতে। যেমন, প্রতিমাসের পূর্ণিমাতেই আদিবাসীদের বাহা, বিহু, সহরুল, স্যালসেই, পোঙ্গল, ওন্নাম, চৈতি, বিরহা, লোরি, করওয়া চৌথ — আনন্দের সব উৎসবই নববর্ষের উৎসব। আনন্দের নানা রঙের বর্ণালী সুতোয় গাঁথা নববর্ষ। নতুন একটা সুন্দর বছরের কামনা।