দার্জিলিং জেলার নজরুল শতবার্ষিকী উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী প্রধান শিক্ষক। একক কাব্য সংকলন,সবুজের স্বরলিপি,নান্দী তিয়াষা, 'মনখারাপের দ্রাঘিমা পেরিয়ে', 'মনের সই' ও গদ্য সংকলন 'উত্তরের বন্ধুরা' পাঠক মহলে জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে। বিভিন্ন সংবাদ পত্রে [দৈনিক ] ফিচার লেখক । বাস শিলিগুড়ি ডাক শিলিগুড়ি ৭৩৪০০১

সকলেই শাক দিয়ে মাছ ঢাকে: প্রসঙ্গ ধর্ষণ

আবার সংবাদ শিরোনামে ধর্ষণ।আতঙ্কিত অভিভাবক, কলুষিত গোটা সমাজ।দেশে ধর্ষণের মতো সামাজিক ব্যাধি বেশ জাঁকিয়ে বসছে দুনিয়ায়।সম্প্রতি পশ্চিমবঙ্গের দক্ষিণ দিনাজপুর জেলার কুমাগঞ্জে স্কুল ছাত্রীকে ধর্ষণ করে খুন এবং পেট্রোল দিয়ে জ্বালিয়ে দেবার মতো মর্মান্তিক ঘটনা ঘটল।এগিয়ে বাংলার এই লজ্জা রাখবো কোথা?এমন ঘটনা আকছার ঘটেই চলেছে।এ ছাড়াও তেলেঙ্গানার তরুণী চিকিৎসকদের মর্মান্তিক হত্যালীলা চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিল ডিজিটাল ইন্ডিয়ার কঙ্কালসার চেহারাটা।বেটি পড়াও-বেটি বাঁচাও আর কন্যাশ্রী প্রকল্পগুলি শুধু মিথ্যার নির্লজ্জ বেসাতি ছাড়া কিছুই নয়।তবুও উলঙ্গ সত্যটা স্বীকার করে না কেউ।
সকলেই শাক দিয়ে মাছ ঢাকে যে।কে কাকে নিরাপত্তা দিবে?আর কে ফিরিয়ে দিবে নারী অধিকার।ধর্ষকদের চরম শাস্তির সংবাদ প্রায় মেলেই না।বিচারের বাণী নীরবে নিভৃতেই কাঁদে শুধু।এক যুগ অন্ধকারের দিকেই ঢেলে দেয় এমন ঘৃণ্য বর্বরোচিত ঘটনা।
কিন্তু তাতে কি?ধর্ষকদের সেফ্টিভালভ তো আছেই-দেশের অভিশাপ জাতপাত, ধর্ম আর ভোটের রাজনৈতিক সংস্কৃতি।যা সমাজকে কুরে কুরে খাচ্ছে অহরহ, আমি আপনিও তার অজান্তে শিকার।তাই মোমবাতি মিছিলের আনুষ্ঠানিকতায় এমন মারাত্মক সামাজিক ব্যাধি রোধ করা যায় না।সে দিল্লীর নির্ভয়া কাণ্ড,কাশ্মীরের আসিফা কিংবা ঘরের কাছে বছর দেড়েক আগে ঘটে যাওয়া শিলিগুড়ির আদিবাসী তরুণীকে ধর্ষণ করে খুন করবার ঘটনা যেমন রয়েছে তেমনি ধুপগুড়ি এলাকায় প্রতিবাদী ছাত্রীর বিবস্ত্র দেহ যা রেললাইনের ধারে পড়েছিল তেমন অজস্র উদাহরণ রয়েছে।দেশ দুনিয়ার মতোই উত্তরবঙ্গেও এমন ঘটনা আকছার ঘটছে।এই রাজ্যের ক্ষয়িষ্ণু রাজনৈতিক সংস্কৃতির প্রবল দাপটে ধর্ষণ চোখের নিমেষে আত্মহত্যা হয়ে গেলে আমরা আর অবাক হই না।দেখতে দেখতে আর শুনতে শুনতে অনেক কিছু সয়ে যায়।সংবাদে প্রকাশ গত শনিবার মালদাতে কাঁথা সেলাইয়ের নাম করে ধর্ষণের অভিযোগ উঠেছে।ঘরে বাইরে নারীদের প্রতি এমন শকুন দৃষ্টি আর এবং নির্মম একটার পর একটা ঘটনা আসল সত্য ঘটনাকে চেপে দেয়।স্মৃতির পাতায় এই ভাবেই হারিয়ে গেছে হয়তো বহু মর্মান্তিক ঘটনা।উত্তরবঙ্গ জুড়ে ধর্ষণ আর নারী নির্যাতনের ঘটনা বাড়ছে।স্বাভাবিক জীবন যাপনে বাধার সম্মুখীন হচ্ছে নারীরা।দেশের সমাজে মানুষের মতো বাঁচবার অধিকারটি আজ প্রশ্ন চিহ্নের মুখে সন্দেহ নেই।মন্ত্রী আমলাদের নিরাপত্তায় যখন কাড়ি কাড়ি টাকা খরচ হচ্ছে তখন এ যুগের প্রেরণাদাত্রী নারীরা নিরাপত্তাহীনতায় ডুকরে ডুকরে কাঁদছে।দৈনিক সংবাদে প্রকাশিত সংবাদ অনুযায়ী অভিযোগ তেলেঙ্গানার তরুণী চিকিৎসকদের পরিবাকে এমন মারাত্মক অপরাধের ডাইরি করতে হন্যে হয়ে ছুটতে হয়েছে।লজ্জা-ঘৃণা-ভয়, তিন থাকতে নয়।অপরদিকে দিল্লির তরুণী অনুদেবীকে শারীরিক ভাবে নিগৃহীত হতে হয়েছে।অপরাধ তেলেঙ্গানার তরুণী পশু- চিকিৎসকের ধর্ষণ খুনের প্রতিবাদে লাল প্যাস্টেলে লেখা নীরব শ্লোগান –‘কেন ?আমি আমার নিজের ভারতে নিরাপদ নয়’?তেলেঙ্গানার চিকিৎসকের ধর্ষণ কাণ্ডের প্রতিবাদ করায় আর এক তরুণী স্বাধীন দেশের পুলিসের দ্বারাও লাঞ্ছিত ও নিগৃহীত হল।তাই সেকেন্দার সাহের সাথে গলা মিলিয়ে বলতে ইচ্ছে করে‘সত্যি সেলুকাস কি বিচিত্র এ দেশ’।আপরাধের সাজা কি হবে সেই বিচারের বাণী হয়তো আমরা জানি।মোমবাতি মিছিলের প্রজ্বলিত মোমগুলি বহু আগেই গলে গলে নিভে যাবে।আর আমাদের স্মৃতি থেকে সব মুছে যাবে একদিন নিশ্চিত।তাই ভেকের মোমবাতি মিছিল দিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ার দেওয়াল কাঁপবে ঠিকই কাজের কাজ কিছুই হবে না।এখন বরং রোগ নিরাময়ের থেকে রোগের প্রতিষেধকের অন্বেষণ বড় প্রয়োজন।তা না হলে সমাজটা মানুষরূপী শয়তানদের স্বর্গ রাজ্যে পরিণত হবে।প্রত্যক্ষ- পরোক্ষভাবে রাজনৈতিক, জাতপাত আর ধর্মের নামে অপরাধীরা ধর্ষণের মতো অপরাধ করেও রেহাই পেয়ে যায় অনায়সে।মনে হয় ধর্ষকরা রাজনৈতিক দাদাদের মদতের পেটেন্ট নিয়েছে।সমাজে তারা বহাল তবিয়তে বুক ফুলিয়ে ঘুরে বেড়ায় এ সত্য সবাই জানে।
নারী আজ নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে।সমাজের আজ ভীষণ অসুখ।এ যেন কবির ভাষায়,‘চারিদিকে আলো জ্বলে অন্ধকার ঘুচেনা তথাপি’।ঘরে বাইরে সর্বত্র আজ তারা ঝুঁকির মধ্যে।ধর্ষণ প্রবনতা একটি ছোঁয়াচে রোগে পরিনত হয়েছে।কোন মানুষ ধর্ষক হয়ে জন্মগ্রহণ করে না।অপসংস্কৃতি,মূল্যবোধের অভাব সামাজিক বৈষম্য, বেকার সমস্যা,সর্বোপরি পারিবারিক শিক্ষার ঘাটতি ধর্ষণের মতো ব্যাধির কারণ।স্বাভাবিকভাবেই একটি শিশু অন্য প্রাণির মতোই বেড়ে উঠে কিন্তু মনের বিকাশ ও বৃদ্ধি নির্ভর করে বহুলাংশে সমাজ ও পরিবারের উপর।বর্তমানে শিথিল হয়ে যাচ্ছে চিরাচরিত মূল্যবোধ ভেঙ্গে পড়ছে প্রতিদিন অনুশাসন।ভুবনায়ণের দাপটে শিকড়হীন সংস্কৃতি আমাদের চেটে খাচ্ছে।সামাজিক শৃঙ্খলাকে সেকেলে বলে উড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে।অস্থির পরিমণ্ডলে তৈরি হচ্ছে নানারকমের সামাজিক বিপত্তি।আর্থ-সামাজিক টানাপোড়নে তরুন সমাজ হতাশ ও বিভ্রান্তির শিকার।বর্ণাঢ্য প্রচার ও প্রলোভন জাগানো সম্প্রচার তরুন সমাজকে কক্ষচ্যুত করছে।জাগছে অসুস্থ কৌতূহল।সহজেই বিপথগামী হচ্ছে তারা।অপার কৌতূহল নিয়ে যৌন ব্যভিচারের দৃশ্যে বিবস হয়ে যাচ্ছে অপাপবিদ্ধ অমলিন শিশু।মূল্যবোধ অদৃশ্য সুতোর টানে বেঁধে রাখে পারিবারিক সামাজিক সুস্থতাকে।আজ যা ছিঁড়ে ফেলার সব রকম আয়োজন সম্পূর্ণ। আমাদের দ্যুতিময় দিনগুলি যারা সুচিভেদ্য অন্ধকারে ঠেলে দেয় যুদ্ধ হোক তাদের বিরুদ্ধে।