নীলাঞ্জনা

(২য় পর্ব)

“কিরে এত দেরী করলি কেন? কখন থেকে ওয়েট করেই যাচ্ছি।” – নীলাঞ্জনা ঈষৎ খেঁকিয়ে উঠলো।
কিংশুক স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললো। না মানে যার যেটা কাজ, সেটা না করলে কেমন পেটের ভিতর গুরগুর করে না? তার উপর কিংশুক ছোটবেলা থেকেই খেলেধুলে বাড়ি ফিরলে, মাঝরাতে ঘুম ভাঙলে, স্কুল থেকে ফিরে মায়ের ভারী বর্ষার মেঘ ছেয়ে থাকা মুখখানা দেখে বুঝে যেত আজ ঘরের ইশান বা নৈঋৎ – কোন কোনে বজ্রবিদ্যুৎসহ বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। সে দিনগুলোতে কিংশুক মার খেতনা, মা কিংশুক-কে কোলে করে বাথরুমে নিয়ে যেত না, এমনকি রান্না ঘর থেকে দুধ গরম করে এনে বলতও না খরখরে গলার আওয়াজে “দুধটা চুপচাপ খেয়ে নে!” হিসাবমত এই দিনগুলো কিংশুকের জীবনে আনন্দময় দিন হওয়া উচিৎ, কিন্তু হয়নি। বরং এই দিনগুলোতে কখনও কখনও পাশের ঘর থেকে বা ঘুমের ভান করে পড়ে থাকার সময়ে ও শুনেছে, মেঘের ভিতর জমে থাকা জল মায়ের চোখ বেয়ে গড়াচ্ছে।
বরাবরই কিংশুকের মনে হয়েছে এরকম মার না খাওয়া আনন্দের দিনগুলোয় সব থাকে কিন্তু কি যেন একটা থাকেনা! অনেকটা ওই নুন ছাড়া তরকারির মত! কিংশুকের মনে হয় দু একটা অযৌক্তিক চড় চাপর, গালমন্দ, এক গ্লাস দুধের বিটকেল গন্ধের বিনিময়ে সবটা স্বাভাবিক থাকুক। নীলের ক্ষেত্রেও তাই! নীল সেই যবে থেকে নীলাঞ্জনা দি, তবে থেকে কিংশুকের ভুলে ওকে চোখ পাকিয়ে, তেড়েফুঁড়ে মুখ ঝামটা দেবে, এমনটাতেই সে অভ্যস্ত। এর অন্যথা হলে কিংশুকের মনটা কেমন কাগজ ফেলে দেওয়ার আগে যেমন ভাবে দলা পাকায়, তেমন হতে থাকে।
“আরে কিরে বাবা! চল ভিতরে… দেরী হয়েছে কেন জিজ্ঞেস করায় মাঝরাস্তায় দাঁড়িয়ে কি মহাজাগতিক গননা শুরু করলি! মরবি তো একটু সম্মান রেখে মর! সাইকেল চাপা পড়ে মরবি শেষ অব্দি!”
“না মানে ওই বেরনোর আগে একবার দেখে নিচ্ছিলাম যা যা প্ল্যান ছিল, সবগুলো জড়ো করা হয়েছে কিনা!”
“সব ঠিক ঠাক?”
“হ্যাঁ !একদম ! অল সেট! আমি তো আমার কান খুঁচানোর ইয়েটাও এক জায়গায় জড়ো করে রেখেছি!”
“আরে গাধাআআআ… দরকারি জিনিসগুলো দেখ… কান খুঁচানোর ইয়ে নিয়ে ব্যাস্ত হয়ে পড়েছে নাকি!” – কফিহাউসের সিঁড়ি দিয়ে উঠতে উঠতে হাসতে থাকে নীল।
কিংশুক এই হাসিটা দেখে আশ্বস্ত হয়! যে মানুষের অলঙ্কার ছিল এক মুখ হাসি, যার সান্নিধ্যে আসলে মন খারাপ উধাও হয়ে যেত নিমেষে, যে বহু মানুষের অন্যতম মোটিভেশন ফ্যাক্টর ছিল একসময়ে, সেই নীলাঞ্জনা দি’কে ও দেখেছে এক মুখ আষাঢ়ে মেঘ নিয়ে ঘুরতে, ও দেখেছে ঠকতে ঠকতে ক্লান্ত হয়ে সেই মানুষটা একসময়ে বোবা হয়ে গিয়েছিল কেমন! কোথায় যেন ও নিজের হাসিরাশি গুলোকে দাফন করে এসেছিলো চুপচাপ সবার চোখের আড়ালে। নিজেকে বড় ভাগ্যবান মনে করে কিংশুক…না না নীলাঞ্জনা ওর প্রেমিকা বলে নয়। কিংশুক শিউরে ওঠে ভাবতে ভাবতে যদি বছর দুই আগে হায়দ্রাবাদের মোটা অঙ্কের টাকার চাকরি ও প্রত্যাখান করে কলকাতায় ফিরে আসার সিদ্ধান্ত না নিত! তাহলে তো ওর জানাই হত না ওর নীলাঞ্জনা দি ওর দুই গালের টোলের আড়ালে কি গভীর দুঃখ ডুবিয়ে রেখেছে!
কলকাতায় ফিরেই দুদিনের মাথায় ও নীলাঞ্জনা দি’কে ফোন করে বলেছিল, “এসেছি কলকাতায়!আসছি তোমার বাড়ি সামনের রবিবার। অরিন্দম থাকবে তো? রান্না করো ভালমন্দ।।দেখি কেমন রান্না শিখেছ।”
নীলাঞ্জনা দিও ততোধিক আহ্লাদী গলাটা কড়া করে বলে উঠেছিলো, “পারব না অত খাটতে…যা বানিয়েছি, চুপচাপ খেয়ে নিবি।”
ততদিনে নীলাঞ্জনা দি’র বিয়ে হয়ে গেছে অরিন্দমের সাথে। আমাদের সাথে ভালো আলাপ ছিল অরিন্দমের। বেশ ভালো মানুষ। বিয়ের আগেও রাত জেগে অনেক আড্ডা মেরেছি আমি, অরিন্দম, প্রনব দা, নীলাঞ্জনা দি। বিয়ের পর সেই প্রথম ওর বাড়ি যাবো। তার আগে শেষ দেখা ওদের বিয়েতে। লাল টুকটুকে বেনারসি পরে নীলাঞ্জনা দি’কে ঠিক ততটাই সুন্দর লাগছিলো যতটা সুন্দর আর কোনোদিন কাউকে লাগেনি। মন ভরে দেখছিলাম, বিয়ের দিনও একরকম কথার তোড়ে ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে আশেপাশের মানুষদের। নীলাঞ্জনা দি’র চোখের দিকে তাকালে আমার মনে হত ঠিক ওই চোখগুলো কোন এক পাহাড়ি রাস্তার বাঁক। ওই বাঁক পেরলে “ভ্যালি অফ ফ্লাওয়ার” দেখবো নাকি দেখবো সর্বনাশী খাদ – কিচ্ছু বোঝা যাবে না যতক্ষণ না ওই বাঁক পেরোনো সম্ভব হচ্ছে। মানুষটি আদ্যপান্ত আয়নার মত স্বচ্ছ হলেও চোখদুটোর গভীরতায় এতটাই ক্ষমতা ছিল যা কোন আগন্তুকের সম্পূর্ণ মনোযোগ গিলে নিতে পারে।
কিন্তু সেবার কলকাতায় ফিরে যখন দেখা হল নীলাঞ্জনা দি’র সাথে… সেই চোখগুলোই যেন খাদের গভীরে থাকা প্রাণহীন পাথর হয়ে গেছে! কিন্তু উচ্ছ্বাসে কোন কমতি ছিলনা। যে নীলাঞ্জনা দি’কে এক চূড়ান্ত ভাবলেশহীন, অগোছালো, উদাসীন, বেহিসেবি দেখেছিলাম আজীবন, তাকে দেখলাম রান্না করে পাঁচ পদে সাজিয়ে গুছিয়ে খেতে দিয়েছে আমায়। খেয়াল করেছিলাম আমি যখন খাচ্ছিলাম, স্নেহভরে আমায় নিরীক্ষণ করছিলো ওই এক জোড়া চোখ। কি যেন একটা যত্ন করতে চাওয়ার তৃষ্ণা ছিল ওই দৃষ্টিতে। খাওয়া হলে পর আমি ওদের নতুন বাড়ি ঘুরে ঘুরে দেখলাম। ভালই সাজিয়েছে। নীলাঞ্জনা দি আমায় নিয়ে খুব ব্যস্ত হয়ে পড়লো যথারীতি। কত গল্প করল। বিয়ের ছবি দেখাল। আমি এসব কিছু দেখছিলাম ঠিকই। কিন্তু তার চাইতেও বেশী আমি খুঁজছিলাম সেই পুরনো নীলাঞ্জনা দি’কে। কিছুতেই খুঁজে পাচ্ছিলাম না। মনে হল, বিয়ের পর হয়তো এমনটিই হয় মেয়েদের। সেদিনটা আড্ডা মেরেই কেটে গেলো। এরপর বেশ ঘনঘন যাতায়াত ছিল ওদের বাড়িতে। কর্তা গিন্নি দুজনেরই শনি রবিবার করে ছুটি থাকতো। অরিন্দম প্রায়ই আমায় ডেকে নিত। আমিও তখন হায়দ্রাবাদের চাকরি ছেড়ে এসে নতুন চাকরির খোঁজ করছি। বিশেষ কাজকর্ম থাকতো না। আমিও জুটতাম ওদের বাড়ি। আড্ডা হাসি মজা… কাটতো ভালই।
যদিও প্রথম প্রথম একটু অবাক লাগতো ভেবে যে নতুন বিয়ে ওদের… নিজেরা সময় কাটায় না?একদিন জিজ্ঞেস করেছিলাম কথায় কথায় নীলাঞ্জনা দি’কে। “কি গো… তোমার বরটা এত্ত বেরসিক কেন? আমার  যদি একটা বৌ থাকতো, আমি তো বিয়ের পর এক বছর ছুটিই নিয়ে নিতাম অফিস কাছারি থেকে!”
নীলাঞ্জনা দি হেসেছিল যথারীতি হোহো করে!
“আরে কিরে ওদিকে চল…আমাদের পেটেন্ট সীটটা ফাঁকা হয়েছে।” তাকিয়ে দেখলাম কফিহাউসের দোতলায় দরজা দিয়ে ঢুকে বাঁ হাতে এক্কেবারে কোনার টেবিলের দুটো চেয়ার ফাঁকা হয়েছে। আমরা গিয়ে বসলাম।
এই জায়গায় গত দুটো বছরে এতবার এসেছি যে চেনা হয়ে গেছে এখানকার বেয়াড়া কাকুরাও। ওরা জানে আমরা দুটো কোল্ড কফি, একটা চিকেন কাটলেট আর একটা এগ স্যান্ডউইচ অর্ডার দেব। মাঝেসাঝে ওই হাক্কা চাউমিন। তাও অভ্যাস বশতঃ প্রোটোকল মেইনটেইন করার জন্য অর্ডার নিতে আসত। আজও ওরা একই অর্ডার দিলো। আজকের কফি হাউস আসাটা একটু অন্যরকম অন্যান্য বারের থেকে। কি জানি আবার কোনোদিন আসা হবে কিনা! আসা যদিও বা হয়, কি জানি এই বেয়াড়া কাকুরা এক থাকবে কিনা। নিজের লোককে ছেড়ে চলে যাওয়ার মত একটা কষ্ট হচ্ছিলো কিংশুকের। কিংশুক জানে নীল-এর ও হচ্ছে। বেশী বই কম না। কিন্তু ও যে কোন অনুভূতিগুলো কে প্রকাশ করবে আর কোনগুলোকে দক্ষ অভিনেত্রীর মত লুকিয়ে ফেলবে, সেটা কিংশুক আজ অব্দি বোঝেনি। ওর পাশে থাকতে থাকতে কিংশুক বুঝেছে ওর নীলাঞ্জনা দি নদীর মত। পাথরে ধাক্কা খাওয়ার আগের মুহূর্ত পর্যন্ত নদী যেমন জানেনা তার গতিপথ ঠিক কোনদিকে যাবে, নীলাঞ্জনা দিও তেমন। বা বলা ভালো, নীল তেমন। নীলাঞ্জনা দির বরং অনেক সুস্পষ্ট মানসিক আকৃতি ছিল। আর তাছাড়া নীল’কে মন খারাপের কোন কথা বলতে গেলে কিংশুক একটু ভেবে চিন্তে নেয় বৈকি! ও জানে সেই লড়াই-এর দিনগুলোর কথা, যখন নীল সুযোগ পেলেই শুধু দেওয়ালের দিকে তাকিয়ে থাকতো বোবা কিন্তু জ্বলন্ত দৃষ্টি নিয়ে।
“কিংশুক…এই যে কাল আমরা চলে যাবো, এর পর যদি ক্যচাল বাড়ে?”
“আর বাড়ার কি বাকি আছে?” একটু হেসেছিল দুজন দুজনের দিকে তাকিয়ে। এরকমই অল্পসল্প কথা চালাচালি করে দুজনই খানিক ঘোরাফেরা করলো কলেজস্ট্রিটের বই পাড়ার দোকানগুলো। নীলের দিকে কড়া নজর রেখেছিল কিংশুক। ডঃ সেন বলে দিয়েছিল লাস্ট সিটিং-এ নীল খুব সংবেদনশীল এক পর্বের  মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। একমাত্র আস্থা, ভরসা আর সঙ্গ ওকে বের করে আনতে পারে এই অন্ধকূপ থেকে। নীল স্বাভাবিক ছিল।
কিংশুক নীলকে ট্রেন-এ উঠিয়ে দেবার পর নীল ওকে আরও একবার বলেছিল ঠিক সময়ে এসে “তুই উল্টো দিকের চায়ের দোকানে অপেক্ষা করবি। আমি বাড়ি থেকে বেরবো ৪টে নাগাদ। অসুবিধা হবে না বুঝলি। কিংশুক মাথা নাড়িয়ে বলেছিল “ঠিকাছে।”
ফিরে আসার সময় নীলকে হাত নেড়ে টাটা বলে স্টেশন থেকে বেরিয়েই কিংশুক ফোন লাগাল হিরন্ময় চক্রবর্তী মানে নীলের বাবাকে।

ক্রমশ…