লকডাউন ও মানসিক বিপর্যয়

করুণা দেবী বাড়িতে একাই থাকেন। সঙ্গী বলতে একটি কাজের মেয়ে। স্বামী গত হয়েছেন, সন্তানেরা কর্মসূত্রে অন্যত্র, আজকাল যেমন দেখা যায় হামেশাই। বিকেলে পার্কে গিয়ে বসা, দুচারজন সমবয়সী মানুষের সাথে গল্পগাছা – সারাদিনে তাঁদের বিনোদন বলতে এইটুকুই। লকডাউনের জন্য বাড়ির সদর দরজার বাইরে পা রাখতে পারেননি গত একমাস, পার্কে যাওয়া তো দূরের কথা। প্রথম দিকে রাস্তার দিকের বারান্দায় বসে থাকতেন, যদি কারোর দেখা পাওয়া যায়, যদি দুটো কথা বলা যায়, সেই আশায়। কিন্তু রাস্তাও শুনশান। আজকাল দেখা যায়না ওঁকে বারান্দায়। বাড়ির জানলা দরজাও খোলেন না নিয়মিত।
পাশের বাড়ির দত্তবাবু দিনে চার থেকে পাঁচবার গাড়ির চাবি, মোবাইল ফোন, সদর দরজার হাতল ইত্যাদি ডেটল দিয়ে পরিষ্কার করেন। জিজ্ঞাসা করলে বলেন ‘করোনাভাইরাস ছাড়া আর কিছু ভাবতে পারছি না মশাই, সব সময় আতঙ্কে থাকি কিছু বাকি রয়ে গেল না তো!’
দমদম অঞ্চলে একটি ফ্ল্যাটে একা থাকে বনশ্রী। ছোট একটি সংস্থায় চাকরি করে। বছর দুই আগে ব্যাক্তিগত কিছু কারণে ডিপ্রেশনে চলে গিয়েছিল। বার দুই আত্মহত্যার বিফল চেষ্টা ও তারপর বিস্তর চিকিৎসার পরে তার জীবন স্বাভাবিক ছন্দে ফিরতে শুরু করেছিল। ছোট একটি সংস্থায় কাজ করত। ডাক্তারের নির্দেশ মত অবসর সময়ে বা ছুটিছাটার দিনগুলিতে নিয়মিত পার্কে বা কফি শপে অথবা মুভি দেখতে যেত। এখন সব সন্ধ। অফিসও। ওর বাবা মা অন্য শহরে থাকেন। দিনে একাধিকবার তারা ফোনে অথবা ভিডিও কলে মেয়ের সাথে যোগাযোগ রাখেন। বনশ্রী হেসে কথা বলে, বুঝতে দেয়না কিছু, কিন্তু ফোন শেষ হলেই সিনথেটিক দোপাট্টা হতে নিয়ে বসে থাকে। কখনও উঠে টুল টেনে এনে খাটের ওপর তুলে সিলিং ফ্যানের আংটার দূরত্ব মাপে। আজ অনেকদিন হয়ে গেল সে অভুক্ত রয়েছে। বাড়িতে খাবার আছে পর্যাপ্ত, শুধু খাবার ইচ্ছেটাই সম্পূর্ণ চলে গেছে। তীব্র অবসাদে ডুবে থাকে সারাদিন।
উল্টো দিকের ফ্ল্যাটের অল্পবয়সী সুখী কবুতরের মত যে দম্পতিটি, আজ তাদের চিৎকারে পাড়ায় কান পাতা দায়। সাজানো সুখী আবরণ ভেদ করে বেরিয়ে পড়ছে কদর্য মুখগুলি। দামি গাড়ি, সুন্দর সাজপোশাক, সাজানো সংসার – কোন কিছুতেই ঢাকা পড়ছে না সম্পর্কের অন্তঃসারশূন্যতা।
ভজা রিক্সা চালাত। ষ্টেশনের পাশে স্ট্যান্ড। লকডাউনের পর হপ্তাখানেক বাড়িতে বসেছিল। শেষে পেটে টান পড়ায় পাড়ার দাদাকে ধরে বাজারে বসছে চট পেতে। এখন ও সব্জি বেচে। কিন্তু দাম পায়না। প্রায় কেনা দামেই বিক্রি করে দিতে হয় সব্জিগুলো রোজ। দিনের শেষে হাতে তেমন কিছু থাকে না। বাড়িতে বউ বাচ্চার ক্ষুধার্ত মুখগুলো মনে পড়লেই আর ফিরতে ইচ্ছে করে না। আজকাল ওর মনে হয় বাজারে চটে না বসে থেকে ঘুরে বেড়ালে আর হাতসাফাইটা জানলে এর থেকে বেশী আয় করতে পারত ও। হয়ত আর কিছুদিন বাদে সেটাই করবে।
টিভিতে দেখা যাচ্ছে প্রায় রোজই কেউ না কেউ পুলিশের ওপর চড়াও হচ্ছেন, পুলিশকেই মারধোর করছেন। কিছুদিন আগে দেখা গেল ম্যাঙ্গালোরের এক বয়স্ক ব্যক্তি লকডাউনের বন্দীদশা সহ্য করতে না পেরে বেরিয়ে পড়েছিলেন রাস্তায়। পুলিশের হাতে চরম হেনস্থার পরেও তিনি বাড়ি ফিরতে অস্বীকার করেন। শান্তশিষ্ট ভদ্রলোকটির এহেন অস্বাভাবিক আচরণে অবাক হয়েছেন এলাকার বাসিন্দারা সকলেই।
কী মনে হচ্ছে? বিক্ষিপ্ত ঘটনা? বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা কিন্তু বারবার এই সমস্যা সম্পর্কে মানুষকে সাবধান হতে বলছে। তাদের মতে ভবিষ্যতে এই সমস্যা মারাত্মক রূপ ধারন করতে পারে, যার শিকার হতে চলেছে ব্যাক্তি, সমাজ এমনকি অর্থনীতিও।
করোনা আচমকাই হানা দিয়েছে আমাদের নিশ্চিন্ত নিরাপদ পরিমন্ডলে। নিজের নিজের ঘরের দরজা বন্ধ করে তাকে ঠেকিয়ে রাখতে বদ্ধপরিকর আমরা সবাই। আশা রাখছি কোন দরজা খোলা না পেয়ে সে ফিরে যাবে ঠিক। আবার সব আগের মত হয়ে যাবে, আমরা আবারও নিশ্চিন্তে, নির্ভয়ে দিন কাটাবো। খানিকটা তেমন হলও বটে। এক অসম যুদ্ধে কিছুটা হয়ত এগিয়ে রইলাম আমরা। সেই সাফল্যে আনন্দিত হয়ে আমরা দাবও করলাম আরও কিছুদিন চলুক এই ঘরবন্দী অবস্থা। অর্থনীতি পরে, প্রাণ আগে। বাঁচলে, সামলে নেওয়া যাবে অর্থনীতিও। নিজে না বাঁচলে কোথায় অর্থনীতি, কোথায় কী? সবই শেষ। অতএব যে পদ্ধতিতে শত্রুকে একটু হলেও পর্যুদস্ত করা গেছে, চলতে থাকুক সেই পদ্ধতিই। আমরা ভাবিনি শত্রুর আরও একটি মুখ থাকতে পারে। প্রতিবার সে একই রকম ভাবে, একই দিক থেকে আঘাত হানবে এমনটা নাও হতে পারে – সেকথা আমরা বুঝিনি। এমনকি যখন বিশেষজ্ঞরা দাবি করছিলেন যে এই শত্রু নিজেকে ক্রমশ পরিবর্তিত করে আরও বেশি শক্তি সঞ্চয় করছে তখনও আমাদের হাতে ঘরের দরজা বন্ধ করে পরস্পরের থেকে বিচ্ছিন্ন থাকা ছাড়া আর কোন হাতিয়ার নেই। আলাদা থাকা, বিচ্ছিন্নতা, পরিচ্ছন্নতা, আক্রান্ত অথবা সদ্য বহিরাগত ব্যক্তিদের সম্পূর্ণ আলাদা করে রাখা ইত্যাদি হাজারো নিয়ম নীতি সতর্কতা, যা কিনা এমনকি বাড়ির ক্ষুদে সদস্যটিরও জানা হয়ে গেছে। অথচ এখন দেখা যাচ্ছে সে সবই বৃথা। কারণ সাম্প্রতিক রিপোর্ট অনুযায়ী আপাত দৃষ্টিতে সম্পূর্ণ সুস্থ মানুষও হতে পারে করোনার বাহক। তাকে আলাদা করে চিহ্নিত করার কোন উপায় নেই। অর্থাৎ প্রতিবেশী থেকে পাড়ার মোড়ের দোকানদার, অথবা হয়ত এক বিছানায় শোয়া পাশের মানুষটিই, – যে কেউ হতে পারে এই বাহক। অতএব আতঙ্ক। যা এতদিন ছিল ঘরের বাইরে, আজ তা সর্বত্র। সুরক্ষিত বলে কোন জায়গা রইলনা আমাদের কাছে।
যে কোন জীবাণু সংক্রমণ, প্রতিষেধক আবিস্কার হওয়ার পর থেকে সম্পূর্ণ নির্মূল হওয়া পর্যন্ত সময়টা নেহাত কম নয়। ম্যালেরিয়া হোক বা পোলিও – সে অভিজ্ঞতা আমাদের আছে। অনুমান, যে আরও বছর দুই তো এই জীবাণুকে সাথে নিয়েই মানুষকে বাঁচতে হবে। আর যেহেতু এখন আর সংক্রমিত বা বাহক কিছুই আপাত দৃষ্টিতে আলাদা করে বোঝার উপায় নেই, তাই তার সাথে লড়াইটা আর বাইরে থেকে করা যাবে না, করতে হবে শরীরের ভেতর থেকেই। একদল চিকিৎসক এবং বিশেষজ্ঞের মতে হার্ড ইমিউনিটি ছাড়া পথ নেই। হয়ত আবারও প্রমানিত হতে চলেছে ডারউইনের তত্ত্ব।
অতএব ততদিন পর্যন্ত মানুষ মানুষকে দেখলে ছিটকে যাবে। প্রেমিক প্রেমিকা হাত ধরার আগে ভাববে স্যানিটাইজারের বোতলটা যেন কোথায় রাখা ছিল! ঠোঁটে ঠোঁট ছোঁয়াতে ভয় পাবে, হারিয়ে যাওয়া বন্ধুকে দেখেও উচ্ছাসে জড়িয়ে ধরতে ভয় পাবে মানুষ, মনের মধ্যে ভয় কাজ করবে – অপরজন লক্ষণবিহীন বাহক নয় তো! এ এক অন্যরকম যাপন যার পরতে পরতে মিশে আছে অনিশ্চয়তা, আতঙ্ক, হতাশা, একাকীত্ব – সব মিলিয়ে সম্পূর্ণ অচেনা এবং অকল্পনীয় এক পরিস্থিতি।
অনেকগুলি ভয় একসাথে কাজ করছে। করোনার ভয়, মৃত্যু ভয়ের সাথে যোগ হয়েছে অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা। ছাত্রছাত্রীদের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত। যারা লেখাপড়া শেষ করে কাজের জগতে সদ্য পা রাখতে যাচ্ছিল তাদের কী হবে? যে সময় অর্থনীতিবিদরা বলছেন বিশ্বজুড়ে চাকরি হারাবেন কয়েক লক্ষ মানুষ সেই সময় দাঁড়িয়ে নতুন কর্মসংস্থানের আশা করা কষ্টকল্পনা ছাড়া আর কিছুই না। ইতিমধ্যেই পেটে টান পড়েছে এক শ্রেণীর মানুষের। অদূর ভবিষ্যতে বাকিদের ওপরেও প্রভাব ফেলতে চলেছে এই অর্থনৈতিক মন্দা। একটু আগে বা পরে, আঘাত নামবে সকলের ওপর।
একেবারে শুরুতে দেওয়া উদাহরণগুলি এবার মনে করুন। প্রতিটি মানুষ এই অনিশ্চিত পরিস্থিতির চাপে অসহায় এবং একলা হয়ে পরছেন, সেখান থেকে শুরু হয়েছে ভয়ঙ্কর সব উপসর্গ। মানুষ সামাজিক জীব। সে একাকী নয়, সকলকে নিয়ে থাকতে ভালবাসে। প্রিয় মানুষের সান্নিধ্যে থাকতে ভালবাসে। সেটাই তার স্বভাব। প্রকৃতি মানুষকে এভাবেই গড়েছেন। যখন সে একটানা অনেকদিন তার সহজাত প্রবৃত্তির বিপরীতে চলতে বাধ্য হয় তখনই বিপর্যয় ঘটে তার মনোজগতে। যুক্তি দিয়ে সাময়িকভাবে এই বন্দীদশা এবং আরোপিত একাকীত্ব মেনে নিলেও মনের গভীর জটিল আবর্তে শুরু হয় এক বিচিত্র টানাপোড়েন। বাইরে সে নিজেকে বোঝাবে, সময়ের দাবি মানবে। কিন্তু অবচেতনে তার স্বাভাবিক প্রবৃত্তি তাকে তার রোজকার অভ্যস্ত জীবনে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে চাইবে। এই যুদ্ধের কোন মীমাংসা হয়না। বরং ক্ষোভ এবং হতাশা বাড়তে থাকে। তার সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়তে থাকে অনিদ্রা, অস্বাভাবিক খাদ্যাভ্যাস, বেশি খাওয়া অথবা খিদে না পাওয়া বা একেবারেই খেতে না পারা। আচরণে দেখা দেয় অস্বাভাবিকতা – কখনও একেবারেই চুপ করে যাওয়া, আবার কখনও অতিরিক্ত আক্রমনাত্মক হয়ে ওঠা, জিনিষপত্র ভেঙ্গে ফেলা, অকারণে মানুষকে আঘাত করা, কান্নাকাটি, নিজেকে শারীরিকভাবে আঘাত করা। এগুলি কিন্তু সবই ডিপ্রেশন বা মানসিক অবসাদের লক্ষণ। আক্রান্ত ব্যাক্তির মানসিক যন্ত্রণা এমন পর্যায়ে পৌঁছোতে পারে যখন সে নিজেকে শারীরিকভাবে আহত করে তাৎক্ষনিক আরাম পায়। ফলে সে নিজেকে বারবার আঘাত করতে থাকে। কোন কোন ক্ষেত্রে তীব্র হতাশা থেকে এই সময় আত্মহত্যার প্রবণতা দেখা দেয় সহজেই। স্বাভাবিকভাবেই আমরা কখনই নিজেদের প্রিয়জনকে এই অবস্থায় দেখতে চাইব না।
সব অসুখের মত অবসাদেরও চিকিৎসা আছে। কিন্তু সমস্যা হল, এই উপসর্গগুলি থেকে বাঁচতে মনস্তাত্বিকেরা এতদিন যে পরামর্শ সকলকে দিয়ে এসেছেন এখন ঠিক তার উল্টো করতে বলা হচ্ছে মানুষকে। অবসাদ থেকে বাঁচতে মানুষকে বলা হত বেশী করে মানুষের সাথে মিশতে, এখন দুরত্ব রাখতে বলা হচ্ছে। যে ছোঁয়ায় সব অসুখ সেরে যায়, মা যখন মাথায় হাত বুলিয়ে দেন, প্রিয়জন যখন কপালে ঠোঁট ছোঁয়ান, বয়স্ক মানুষেরা নাতি নাতনিকে বুকে জড়িয়ে ধরেন, স্নেহ চুম্বনে ভরে দেন তাদের মুখ, ভেঙ্গে পড়ার মুহূর্তে বন্ধুর আলিঙ্গনে যখন নতুন করে বেঁচে নেওয়ার সাহসটুকু জুটে যায়, ছোট ছোট যে মুহূর্তগুলোতে মানুষ খুঁজে পায় তার বেঁচে থাকার মানে, আজ সেইসব ছোঁয়া, সেই মুহূর্তগুলোই হারিয়ে যেতে বসেছে মানুষের জীবন থেকে। নিরাশ্রয় হয়ে পড়ছে মানুষ, ভেতরে ও বাইরে।
শুধু তো এখানেই শেষ নয়। করোনা মোকাবিলায় একদিকে যেমন বিচ্ছিন্ন হতে বলা হচ্ছে, একইসাথে ঘরের ভেতরে থাকতেও বলা হচ্ছে। অর্থাৎ পরিবারের নিরবিচ্ছিন্ন সঙ্গ, যা কিনা সকলের জন্য সমান অনুভূতি নিয়ে আসে না। প্রতিটি পরিবার আলাদা। যদি ধরে নেওয়া হয় একই পরিবারে বাস করা মানেই সদস্যরা প্রত্যেকে সুন্দর পরিবেশে সুন্দর সম্পর্কের বাঁধনে রয়েছে, তাহলে সেটা হবে অন্ধের হস্তি দর্শন। অন্তঃসারশূন্য সম্পর্ক, অকেজো সংসার, যেখানে সদস্যদের মধ্যে সুস্থ এবং স্বাভাবিক সম্পর্ক নেই, যেখানে পরিবারের বন্ধন শুধুমাত্রই একটি সমাজের চোখে ধুলো দেওয়া সাজানো শান্তিপূর্ণ বন্দোবস্ত, সেখানে লকডাউন ভাঙ্গন ডেকে আনে। বিপর্যয় ঘনিয়ে আসে সেই সমস্ত পরিবারে। এই প্রসঙ্গে একেবারে শুরুতে উল্লেখ করা অল্পবয়সী দম্পতির উদাহরণটি আরেকবার স্মরণ করিয়ে দিই।
অন্যদিকে যে মানুষগুলি ডোমেস্টিক ভায়োলেন্সের শিকার, তাদের ক্ষেত্রে এই লকডাউন এক অন্য বিপদ ডেকে আনে। ডোমেস্টিক ভায়োলেন্সের ভয়াবহতা সম্পর্কে আমরা কমবেশি সকলেই অবগত। বর্তমান প্রতিকূল পরিস্থতির সাথে যুক্ত হয়ে সে আরও কতটা ভয়ঙ্কর রূপ ধারন করতে পারে সে কথাও সহজেই অনুমেয়।
এখন এমন মনে হতেই পারে যে মানসিক সমস্যা যার হচ্ছে, সেটা তার ব্যক্তিগত সমস্যা। সেটা সমাজকে প্রভাবিত করে না। বিশেষত আমাকে আর আমার পরিবারকে প্রভাবিত না করলে সে নিয়ে বিশেষ চিন্তা করার কিছু নেই। কিন্তু ভুলটা ঠিক এখানেই। আপনার প্রিয়জনদের মধ্যেই যে কেউ এমন বিপজ্জনক মানসিক অবস্থার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছেন না সে কথা কে বলতে পারে? বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে আগামী দিনে এক বিপুল জনসংখ্যা এই অবসাদের শিকার হতে চলেছে এবং সমাজের সকল স্তরে এর প্রভাব অবশ্যম্ভাবী। মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়লে তা সরাসরি প্রভাব ফেলবে তার কর্মক্ষেত্রে, ফলে উৎপাদনশীলতা কমবে। অধিকাংশ মানুষের কাজ করার অভ্যেস চলে যাবে। এর সরাসরি প্রভাব পড়বে অর্থনীতিতে। সমাজের সার্বিক মানসিক স্বাস্থ্য ঠিক না থাকলে সমাজ কোন জায়গায় গিয়ে দাঁড়াবে সে কথা বোঝার জন্য খুব বেশি কল্পনার আশ্রয় নিতে হবে না।
সমস্যা আরও আছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন যখনই এমন সময় আসে, মানুষের নিজের অস্তিত্ব বিপন্ন হয়ে পরে, তখনই তার নৈতিকতা কমে আসে, অপরাধ প্রবণতা বেড়ে যায়। তার মধ্যে দেখা দেয় সর্বগ্রাসী রাগ, ভাঙচুর, লুটমারের প্রবণতা, যার প্রভাব সবার আগে গিয়ে পরে জনসাধারনের সম্পত্তি এবং সমাজের ওপর তলায় থাকা মানুষদের ওপরে। মনে রাখতে হবে প্রান্তিক মানুষদের কাছে কিন্তু মধ্যবিত্ত শ্রেণিও সমাজের ওপরতলার মানুষ, যারা ফুটপাথের কলের জলে পেট ভরিয়ে ‘কাল কী খাবো’ এই চিন্তা মাথায় নিয়ে রাত্রে ঘুমোতে যায় না। এখন একবার শুরুতে রিক্সাওয়ালা ভজার উদাহরণের কথা মনে করাই। নিশ্চিন্ত থাকার কিন্তু কোন অবকাশ নেই। আজ যা ব্যাক্তিগত অচিরেই তা সমগ্র সমাজের সমস্যা হয়ে দাঁড়াবে।
তাহলে উপায়? হয়ত সেটা আছে আমাদের নিজেদের হাতেই। এর থেকে বাঁচতে হবে নিজেদেরই। নিজের মধ্যে এরকম কোন মানসিক পরিবর্তন দেখলেই উদ্বিগ্ন হবেন না। জানবেন আপনি সুস্থ এবং স্বাভাবিক মানুষ বলেই এই উপসর্গ আপনার মধ্যে দেখা দিয়েছে। বাইরের জগতের এই অস্বাভাবিক পরিস্থিতির সাথে আপনার সুস্থ স্বাভাবিক মস্তিস্ক মানিয়ে নিয়ে পারছে না বলেই আপনার এই অসুবিধে হচ্ছে। আর যদি অন্য কারো মধ্যে এই লক্ষণ দেখেন তাহলে, সে যেই হোক, তার পাশে দাঁড়ান। তাকে কথায় নয়, কাজেও ভালবাসুন। আপনার মতই সেও অনেক মানসিক চাপ এবং পরিবর্তনের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছেন সেটা মাথায় রাখুন। এমন কিছু করা থেকে নিজেকে বিরত রাখুন যাতে অন্য মানুষটি আঘাত পায়। সাথে থাকুন, মানসিকভাবে। মাথা ঠাণ্ডা রাখুন। অযথা তর্কে জড়াবেন না। আত্মকেন্দ্রিকতা সরিয়ে রাখা আশু প্রয়োজন। একজন মেজাজ হারালে অন্যজনকে শান্ত থাকতেই হবে। এখন ইগো নয়, সম্পর্ক সামনে থাকুক। স্বাস্থ্য দুরকমের – মন এবং শরীর। দুইই সমান জরুরি। করোনায় শুধু শারীরিক নয়, মানসিকভাবেও সুস্থ থাকুন। আগামী দিনে যাতে সকলে সুস্থভাবে কাজেকর্মে স্বাভাবিকতায় ফিরতে পারে, সে দায়িত্ব আপনার আমার প্রত্যেকের। ভয় নয়, সাবধানে থাকুন। আতঙ্কে দিশেহারা না হয়ে সচেতন থাকুন। ভালো থাকুন, ভালো রাখুন – শরীরে এবং মনে।
এগুলি আমাদের আশেপাশের ঘটনা