সমরজিৎ চক্রবর্তী, রেলে চাকরি করি, পাশাপাশি একটু-আধটু চেষ্টা করি গল্প প্রবন্ধ-নিবন্ধ লেখার। প্রকাশিত হয়েছে দুটি গল্প গ্রন্থ ১) অচেনা রোদ্দুর ২) অনুরঞ্জন। আমারই সম্পাদনায় ২০০৬ সাল থেকে দীর্ঘ চোদ্দ বছর ধরে আদান, জনাই, হুগলী থেকে প্রকাশিত হয়ে চলেছে 'শব্দকিরণ' নামে একটি ত্রৈমাসিক সাহিত্য পত্রিকা।

ইতিহাসের পাতায়

বাঁশবেড়িয়া

পূর্বরেলের হাওড়া-কাটোয়া লাইনে ব্যান্ডেলের পরের স্টেশনই বাঁশবেড়িয়া। প্রাচীন সপ্তগ্রামের অন্যতম এক জনপদ। হাওড়া থেকে দূরত্ব মাত্র ৪৪ কিলোমিটার। বংশবাটি অপভ্রংশে বাঁশবেড়িয়া। ঐতিহাসিকরা বলেন, প্রাচীনকালে ভাগীরথীর তীরে বিশাল এক বাঁশবন ছিল। এই বাঁশবন থেকেই অঞ্চলটির নামকরণ হয় বংশবাটি।
কবিরাম রচিত প্রাচীন সংস্কৃত গ্রন্থ ‘দিগ্বিজয় প্রকাশ’-য়ের ‘কিলকিলা বিবরণ’ অধ্যায়ে এই বংশবাটির কথা উল্লেখ আছে। হুগলীর কাছে বংশবাটী প্রভৃতি গ্রাম, এখানে খলাপি নদী দামোদর থেকে এসে গঙ্গায় মিলিত হয়েছে।
“বংশবাটী প্রভৃতয়ো হুগলীমাজ্য বর্ত্ততে।
খলাপি তটিনী নিত্যং বহতে বালুকাস্তরে।।”
‘নীলদর্পণ’ খ্যাত সুপ্রসিদ্ধ লেখক দীনবন্ধু মিত্রের ‘সুরধনী’ কাব্যতেও উল্লেখ পাওয়া যায় বংশবাটীর। লিখেছেনঃ
“পরিপাটী বংশবাটী স্থান মনোহর,
যে দিকে তাকাই দেখি সকলই সুন্দর!
বিদ্যাবিশারদ কত পন্ডিতের বাস,
সুগৌরবে শাস্ত্রালাপ করে বার মাস।”
বর্তমানে বাঁশবেড়িয়ার কৌলিণ্য মনোহারিত্ব মহাকালের কবলে পতিত হলেও এক সময়ে বাংলার এই স্থান সুপ্রসিদ্ধ জনপদ হিসেবে পরিচিত ছিল। যাঁদের দৌলতে এই স্থান মহিমান্বিত, সুপ্রসিদ্ধ সেই রাজবংশ বহু বছর অবধি রাজত্ব করেছিল বাংলার বিভিন্ন অঞ্চল তথা রাঢ়ের বহুলাংশ।

শ্রীশ্রী অনন্তদেবের মন্দির

বাঁশবেড়িয়া রাজবাড়ি সংলগ্ন হংসেশ্বরী মন্দিরটি হুগলী জেলার একটি সুপ্রসিদ্ধ দেবালয়। এ প্রসঙ্গে পরে আসা যাবে। কিন্তু এই মন্দির প্রাঙ্গন অঞ্চলে আরো একটি মন্দির মানুষের দৃষ্টি এড়িয়ে যায়। মন্দিরটি হলো শ্রীশ্রীঅনন্তদেবের (শ্রীশ্রীবিষ্ণু) মন্দির। অনাদরে অবহেলায় সে আজ ম্লান ও ভগ্নোমুখো। তবু সে আজও দাঁড়িয়ে আছে। যদিও সংস্কার করা হয়েছে। ফিরিয়ে আনার চেষ্টা হয়েছে তার কারুকার্যময় শোভা।
রাজা রামেশ্বর ১৬৭৯ সালে নির্মাণ করেছিলেন এই মন্দির। পূর্বের অধ্যায়ে উল্লেখ করেছি রাজা রাঘব রায়ের দুই পুত্র। রামেশ্বর ও বাসুদেব। পিতার মৃত্যুর পর দু’ভাইয়ের মধ্যে বিপুল সম্পত্তি ভাগ-বাটোয়ারা হওয়ার ফলে জ্যেষ্ঠত্বের সম্মান স্বরূপ তৎকালীন নিয়মানুসারে রামেশ্বর সম্পত্তির দুই-তৃতীয়াংশ (২/৩) এবং বাসুদেব এক তৃতীয়াংশ পান। রামেশ্বর পাটুলি বাসভূমি ত্যাগকরে পাকাপাকিভাবে চলে এলেন বাঁশবেড়িয়ায়। বস্তুত তাঁর আমল থেকেই বংশবাটী রাজবংশের নাম সমুজ্জ্বলভাবে চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে। রামেশ্বর ছিলেন পরম ভাগবৎ। বাংলায় এই মন্দিরের তুল্য দেব মন্দির আর কোথাও নেই বললেই চলে। মন্দিরের গায়ে দেব দেবীর মূর্তি অতিসুন্দরভাবে খোদাই করা। স্থাপত্যবিদ্যার অনন্য এক নিদর্শন বললেও অত্যুক্তি হয় না। ১৯০২ সালে বাংলার ছোটলাট স্যার জন উডবার্ণ মন্দিরের ইটের গায়ে আঁকা নানা কারুকার্যের ছবি তুলে বলেছিলেন যে, ঘরের দেওয়ালে ছবিগুলো টাঙালে নিঃসন্দেহে ঘরের শোভা বৃদ্ধি পাবে। বিংশশতাব্দীর গোড়াতে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর পাঠিয়েছিলেন প্রখ্যাত শিল্পী নন্দলাল বসুকে। সুচারুভাবে খোদিত শিল্পসৃষ্টি দেখে নন্দলাল বসু বিস্ময়ে হতবাক্‌ হয়ে গিয়েছিলেন। এক মাস ধরে বাঁশবেড়িয়ায় থেকে এঁকে নিয়ে গিয়েছিলেন মন্দিরের প্রত্যেকটি ইটের ছবি।

মন্দিরের দরজার সামনে অস্পষ্টভাবে খোদিত একটি শ্লোক চোখে পড়েঃ
“মহীব্যোমাঙ্গ শীতাংশু গণিতে শক বৎসরে।
শ্রীরামেশ্বর দত্তেন নির্ম্মমে বিষ্ণুমন্দিরং। ১৬০১”।
শ্লোকটির বাংলানুবাদ করলে মন্দির নির্মাণের সালটি পাওয়া যায় সহজে। জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা হিসাব কষে দেখিয়েছেন, মহী = ১, ব্যোম = ০, অঙ্গ = ৬ আর শীতাংশু মানে চন্দ্র = ১। ‘অঙ্কস্য বামা গতি’ এই নিয়মে ১৬০১ শক। অর্থাৎ মন্দিরটি ইংরাজী ১৬৭৯ খৃষ্টাব্দে এবং বাংলা ১০৮৬ সনে নির্মিত। আরো একটি লক্ষণীয় বিষয় হলো, মন্দির প্রতিষ্ঠার সময় রাজা রামেশ্বরের বিনয়ীভাব। প্রবল পরাক্রান্ত হয়েও তিনি নিজের রাজা মহাশয় উপাধির উল্লেখ না করে পারিবারিক বংশোপাধি ‘দত্ত’ লিখেছেন।
মন্দিরের গায়ে প্রধানত দেবদেবীর মূর্তিই খোদিত। শিব, দুর্গা, কালী, শ্রীকৃষ্ণের রাসলীলা, নারায়ণের অনন্তশয্যা ইত্যাদি। চিকন সবুজতায় সুচারু রেখা সংমিশ্রন ও পরিস্ফূটন নৈপুন্যে অনন্য এক শিল্পসৃষ্টি। এ ছাড়াও আরো অনেক চিত্ররাজি আছে তার মধ্যে বিশাল এক নৌজাহাজের চিত্র মনকে বহুদূর নিয়ে যায়। সিংহমুখী দোতলা জাহাজটি সশস্ত্র সৈন্যবাহিনীতে ভরপুর। রণসাজে সজ্জিত। মহাকবি কালিদাসের ‘রঘুবংশ’ পড়া থাকলে চোখের সামনে ভেসে উঠবে, প্রাচীনকালে সাগর তোলপাড় করা নৌশক্তিতে বলীয়ান বাঙালীর দুর্ধর্ষ সাগর অভিযান।
বাঙালী তথা বাংলার অতীত গৌরবের টুকরো এক নগন্য চিত্র বলে দেয়, কেমন ছিল সে যুগের নৌজাহাজ, আজও বর্তমান তারই ক্ষুদ্র প্রতিচ্ছবি। অসংখ্য কারুকাজের মাঝে অতীতের মৌন সাক্ষী।

রাজা রঘুদেব

অষ্টাদশ শতাব্দীর সূচনালগ্নে রামেশ্বর তিন পুত্রকে রেখে দিব্যধামে যাত্রা করেন। পুত্রেরা হলেন রঘুদেব, মুকুন্দদেব ও রামকৃষ্ণদেব। পিতার মৃত্যুর পর বংশের প্রচলিত প্রথানুসারে বিষয় সম্পত্তি ভাগ করে নিয়ে তাঁরা পৃথক হয়ে গেলেন। রঘুদেব পেলেন ২/৩ অংশ, মুকুন্দ ও রামকৃষ্ণ পেলেন ১/৩ অংশ করে।
এই সময়ে বাংলার নবাব ছিলেন মুর্শিদকুলী খাঁ। তিনি নানা স্থানের ফৌজদারদের ক্ষমতা হ্রাস করে তাঁদের নিজের নিয়ন্ত্রণে আনেন। হস্তক্ষেপ করেন জমিদারদের অধিকারেও। নতুন ব্যবস্থার মাধ্যমে প্রায় সকলের কাছ থেকেই রাজস্ব আদায় করাই ছিল লক্ষ্য। যাঁরা দিতে সক্ষম হতেন না, তাঁদের বড়ই উৎপীড়ন করতেন। কারাগারে আটকে রেখে না খেতে দিয়ে দুর্ব্যবহার করেই ধিক্কার দেওয়াই ছিল প্রধান কাজ। এতেও কাজ না হলে দড়ি দিয়ে বেঁধে মলমূত্রে পরিপূর্ণ বৈকুণ্ঠ নামক খাতের ওপর দিয়ে এক দিক থেকে অপর দিকে টেনে নিয়ে যেতেন। এরপরও কাজ না হলে জমিদারি কেড়ে নেওয়ার ব্যবস্থা করতেন অন্যের সঙ্গে। একবার এক ব্রাহ্মণ জমিদার এই রকম শাস্তির কবলে পড়েন। রাজা রঘুদেব ব্রহ্ম নির্যাতনের এই সংবাদ পেয়ে ব্রাহ্মণ জমিদারের বাকি সমস্ত রাজস্ব মিটিয়ে দিয়ে তাঁর জাতিধর্ম এবং প্রাণ বাঁচান। নবাব নিষ্ঠুর হলেও রাজা রঘুনাথের এই বদ্যানতার কথা শুনে তাঁকে ‘শূদ্রামণি’ উপাধি দিয়ে সম্মানিত করেন। সেই থেকে রাজা রঘুনাথ ‘শূদ্রামণি’ হিসেবে সকলের কাছে সর্বতোভাবে পরিচিত হয়ে উঠেন। যদিও কেউ কেউ বলেন ‘শূদ্রামণি’ উপাধি পাটুলির রাজা মনোহর রায়ের অর্জিত সম্মান। কিন্তু শম্ভুচন্দ্র দে তাঁর ‘বাঁশবেড়িয়া-রাজ’ নামক গ্রন্থে প্রমাণ করে দিয়েছেন যে ‘শূদ্রামণি’ উপাধি রাজা রঘুনাথের নিজস্ব।

হংসেশ্বরী মন্দির

রাজা রঘুদেবের পর তাঁর একমাত্র পুত্র গোবিন্দ দেব সমস্ত সম্পত্তির অধিকারী হলেও তিনি স্বল্পায়ু ছিলেন। ১৭৪০ সালে (১১৪৭ সনে) অক্টোবর (আশ্বিন) মাসে রাজা গোবিন্দ দেব যখন ইহলোক ত্যাগ করেন, তাঁর পুত্র নৃসিংহ দেব তখন মাতৃগর্ভে ছিলেন। তিনমাস পরে ১১৪৭ সনে মাঘ মাসে তাঁর জন্ম হয়। সেই সময়, গোবিন্দ দেব নিঃসন্তান অবস্থায় মারা গেছেন, এই অজুহাত তুলে বর্ধমান রাজার পেস্কার মানিকচাঁদ নবাব আলিবর্দী খাঁর দরবারে নালিশ করে গোবিন্দ দেবের তক্ত্য সম্পত্তি ১১৪৮ সনে (১৭৪১ সালে) বৈশাখ মাসে বর্ধমান রাজস্টেট ভুক্ত করে নেন। আর এই সংবাদ পেয়ে নদীয়ার রাজা কৃষ্ণচন্দ্রও জোরজবরদস্তি করে দখল করে নেন গোবিন্দ দেবের হল্‌দা পরগণা। কেবল মজকুরী তালুক মৌজা কুলিহান্ডা দখল করতে পারেননি হুগলীর ফৌজদার পীর খাঁর দেওয়ার ফলে।
বাঁশবেড়িয়ার জমিদারি বাংলার মধ্যে সেই সময়ে একটি সুবিস্তৃত ও সুপ্রসিদ্ধ হিসেবে খ্যাত হলেও মুসলমান রাজত্বের শেষ দিকে অতি ক্ষুদ্রাকারে পরিণত হয়। এতে জমিদার বা তাঁর কর্মচারীদের কোন দোষ ছিল না। কেবলমাত্র নাবালোক উপযুক্ত তত্ত্বাবধায়ক না থাকার জন্যই এই অবস্থার সৃষ্টি হয়। জন্ম থেকেই সহায়হীন নৃসিংহ দেব আত্মীয়-পরিজনের সাহায্যে পৈতৃক সম্পত্তি রক্ষণাবেক্ষণ করবেন, তা না হয়ে তাঁকে কেবলমাত্র লাট কুলিহান্ডার আয়ের উপরই নির্ভর করে ব্যয়সাধ্য দেবদেবাদির সেবা ও সাংসারিক খরচ সামাল দিতে হয়েছিল।
১৭৫৭ সালে যখন ক্লাইভের সুচতুর কৌশলে বাংলা ইংরেজদের হস্তগত হলো, সেই সময় নৃসিংহ দেব ১৭ বছরের তরতাজা যুবক। পৈতৃক সম্পত্তি উদ্ধারের জন্য বৃথা সময় নষ্ট না করে সময়ের উপর নির্ভর করলেন। মন দিলেন পড়াশোনায়। ১৭৭১ সালে ক্লাইভের কৌশলী রাজত্বের দায়িত্ব এসে পড়ল ওয়ারেণ হেস্টিংসের হাতে। ১৭৭২ সালে রেগুলেটিং অ্যাক্টের মাধ্যমে তিনি ভারতের গভর্ণর জেনারেল হলেন। এই সময়ে নৃসিংহ দেব নিজের সুনাম সুখাতি ও সাধারণ হিতকর কাজের জন্য ওয়ারেণ হেস্টিংসের অনুগ্রহভাজন হয়ে উঠলেন। নৃসিংহ দেব ছিলেন বহুগুণের অধিকারি। আরবি, পারসি ও সংস্কৃতে ছিল তাঁর বিশেষ দখলদারি। দখল ছিল আয়ুর্বেদ শাস্ত্রেও। জ্যোতিষ ও উড্ডীশ তন্ত্রের বঙ্গানুবাদ করেছিলেন।। বিজ্ঞতা ছিল সঙ্গীতেও। সিদ্ধহস্ত ছিলেন চিত্রাঙ্কনেও। ওতারেণ হেস্টিংসের বিশেষ অনুরোধে নৃসিংহ দেব বাংলার সেই সময়কার সুন্দর একটি উৎকৃষ্ট একটি মানচিত্র অঙ্কন করে দেন। অত্যন্ত আপ্লুত হন ওয়ারেণ হেস্টিংস। পুরস্কার দিয়ে সম্মানিত করেন নৃসিংহ দেবকে। পাইকপাড়া রাজবংশের পূর্বপুরুষ গঙ্গাগোবিন্দ সিংহ ছিলেন ওয়ারেণ হেস্টিংসের দেওয়ান তথা পারস্য ভাষার শিক্ষক। তিনি বাংলার সেই মানচিত্রের বিনিময়ে ধানঘাটা পরগণা উপহার স্বরূপ দিলেন নৃসিংহ দেবকে।
১৭৮৫ সালে ওয়ারেণ হেস্টিংস লন্ডনে ফিরে গেলে তাঁর স্থলাভিষিক্ত হন লর্ড কর্ণাওয়ালিস। নতুন গভর্ণর জেনারেলের কাছে সময় সুযোগ বুঝে নৃসিংহ দেব তাঁর পৈতৃক কথা উত্থাপন করলে, কর্ণওয়ালিস তাঁকে লন্ডনের ডিরেক্টর সভার কাছে আবেদন করতে বলেন এবং কথা দেনপ সাধ্যমত সাহায্য করবেন। এই কাজে বিপুল অর্থব্যয়ের সম্ভবনা দেখে নৃসিংহ দেব নিজের খরচ কমিয়ে দেন। কিন্তু তাতে সফলতা না পেয়ে ১৭৯১ সালে বিশ্বস্ত এক আত্মীয়ের হাতে জমদারির দেখাশোনার দায়িত্ব দিয়ে কাশীধামে যাত্রা করেন।
কাশীতে গিয়ে সাধু-সন্ন্যাসীদের সংস্পর্শে তান্ত্রিকমতে যোগাভ্যাস শুরু করেন এবং অল্পদিনের মধ্যে পারদর্শিতা অর্জনে সমর্থ হলেন। এই সময়ে, ভূকৈলাসের রাজা গোকুলচন্দ্র ঘোষালের ভ্রাতস্পুত্র জয়নারায়ণ ঘোষালও কাশীতে বাস করছিলেন। তিনি অনেকদিন ধরে মনস্থ করেছিলেন সংস্কৃত কাশীখন্ড বঙ্গানুবাদ করবেন। কিন্তু তাঁর কাব্য রচনার শক্তি বা সামর্থ ছিল না। সাহায্য চাইলেন নৃসিংহ দেবের। দুই রাজা মিলে পবিত্র কাশীধামে সংস্কৃত কাশীখন্ডের বঙ্গানুবাদে মন দিলেন। সেই অনুবাদের পরিচয় :
মনে করি কাশীখন্ড ভাষা করি লিখি।
ইহার সহায় হয় কাহারে না দেখি।।
মিত্র শত চৌদ্দশকে পৌষমাস যবে।
আমার মানস মত যোগ হইল তবে।।
শূদ্রামণি কুলে জন্ম পাটুলি নিবাসী।
শ্রীযুত নৃসিংহ দেব রায়গত কাশী।।
তাঁর সহ জগন্নাথ মুখুর্য্যা আইলা।
প্রথম ফাল্গুনে গ্রন্থ আরাম্ভ করিলা।।

তাহার করেন রায় তর্জ্জমা খসড়া।
মুখুর্য্যা করেন সদা কবিতা পাতড়া।।
রায় পুনর্ব্বার সেই পাতড়া লইয়া।
লিখেন পুস্তকে তাহা সমস্ত শুধিয়া।।

এই সময়ে নৃসিংহ দেবের কর্মচারি তাঁকে লিখে পাঠালেন যে, বিলাতে আপিলের জন্য টাকার ব্যবস্থা হয়েছে। কিন্তু নৃসিংহ দেবের মন তখন ধর্মের প্রতি এতই অনুরক্ত যে তিনি বিষয় বৈভবের দিকে ফিরেও তাকালেন না। মনে মনে বাঁশবেড়িয়ায় একটি মন্দির প্রতিষ্ঠার সংকল্প করেছিলেন। কর্মচারিকে সেই মন্দির নির্মাণ করার উপকরণ কেনার জন্য টাকা পাঠানোর কথা লিখে পাঠালেন। টাকা পৌঁছানোর পর মন্দির নির্মাণের সমস্ত উপকরণ কিনে এবং মন্দির গঠনের উপযুক্ত কয়েকজন স্থপতিকে নৌকা করে আগে পাঠিয়ে দিলেন। তারপর পিছনে পিছনে তিনি স্বদেশ যাত্রা করলেন। নৌকায় আসতে আসতে নৃসিংহদেব একটা ছবি আঁকলেন মনে মনে, কেমন ধরনের হবে মন্দিরটি। আমাদের শরীর মন্দিরে যেমন ঈড়া, পিঙ্গলা, সুষুম্মা, ব্রজ্রাক্ষ ও চিত্রিনী নামে পাঁচটি নাড়ী আছে, মন্দিরটি হবে ঠিক সেই রকমের, অর্থাৎ পাঁচতলা। এক এক তলা এক একটি নাড়ী হিসেবে গড়ে উঠবে। কুন্ডলিনী শক্তিরূপে দেবী হংসেশ্বরী বিরাজ করবেন তার মধ্যে।
১৭৯৯ সালে ডিসেম্বর মাসে, আট বছর পর রাজা নৃসিংহ দেব ফিরে এলেন বাঁশবেড়িয়ায়। ভিত্তি স্থাপন করলেন হংসেশ্বরী মন্দিরের ১৮০২ সালে মন্দিরের দোতলা গাঁথার কাজ শেষ হয়েছে সবে, রাজা নৃসিংহ দেব নশ্বর দেহ ত্যাগ করে অমৃতলোকে যাত্রা করলেন। তাঁর দুই রাণীর মধ্যে বড়রাণী অনুমৃতা হলে বিষয় সম্পত্তি পরিচালনার সমস্ত দায়িত্ব এসে পড়ে ছোটরাণী শঙ্করীর কাঁধে। রাণী শঙ্করীও স্বামীর রেখে যাওয়া দায়িত্ব ও আরব্ধ কাজ সুসম্পন্ন করে আপন পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করেন।
১৮১৪ সালে হংসেশ্বরী মন্দিরের নির্মাণ কাজ শেষ হয়। সুবৃহৎ এই মন্দিরটি দেখতে ভীষণ সুন্দর। স্থাপত্যকলা বিশেষ কৃতিত্বের দাবিদার। মন্দির জুড়ে পাথরের ওপর কারুকার্য দেখার মতন। সুন্দর স্তম্ভ বিশিষ্ট সামনের ঘরটির ছাদ এক সময় চিত্রিত ছিল, যদিও এখন তা নষ্ট হয়ে গেছে। গর্ভগৃহে দ্বারের উপর অনুপম গণেশ মূর্তি গ্রথিত। মন্দিরটি পঞ্চতল ত্রয়োদশ চূড়াবিশিষ্ট এক রত্ন মন্দির এবং রত্নগুলি কোণাকার। পরিকল্পনায় ও গঠন বৈচিত্রে অনন্য। গর্ভগৃহে পাথরের মতন সুদৃশ্য পদ্মবেদীর (পঞ্চমুন্ড) উপর দেবী হংসেশ্বরী বিরাজিতা। চতুর্ভূজা দেবী দেবাদিদেব শিবের নাভি পদ্মের উপর উপবিষ্টা। পদতলে শ্বেতপাথরে নির্মিত মহাদেব দক্ষিণে মাথা করে প্রলম্বিত। তাঁর নাভি থেকে উঠেছে পদ্মের মৃণাল। দারু ব্রহ্মের (নিম কাঠের) নীলবর্ণের দেবী বস্ত্র পরিহিতা হয়ে সেই পদ্মের উপর বাম হাঁটু মুড়ে বসে আছেন আর তাঁর দক্ষিণ পদ শিববক্ষে। উপরের বাম হাতে অসি, নিম্নের বাম হাতে নরমুন্ড। দক্ষিণ হাত দুইটিতে বর ও অভয়।
ঐতিহাসিক ও গবেষকরা বলেন, সারা বাংলায় এই রকম দেহরূপ মন্দির দ্বিতীয়টি পাওয়া মুশকিল। এমন কী মন্দিরময় ওড়িষ্যার ভুবনেশ্বরে কোর্ণাক মন্দিরও এই মন্দিরের কাছে হার মেনে যায়।
এই মন্দির নির্মাণে ব্যয় হয়েছিল প্রায় পাঁচ লক্ষ টাকা। আর প্রতিষ্ঠা উপলক্ষ্যে সারা ভারতের নানা স্থান থেকে ব্রাহ্মণ পন্ডিত ও অধ্যাপকদের আমন্ত্রণ করে তাঁদের প্রচুর অর্থ দান করা হয়েছিল। মন্দিরের প্রবেশ দ্বারে এখনো লক্ষ্য করা যায় :
শাকাব্দে রস বহ্নি মৈত্রগণিতে শ্রীমন্দিরং
মোক্ষদ্বার চতুর্দ্দশেশ্বর সমং হংসেশ্বরী রাজিতং
ভূপালেন নৃসিংহদেব কৃতিনারব্ধং তদাজ্ঞানুগা
তৎপত্নী গুরুপাদপদ্মনিরতা শ্রীশঙ্করী নির্ম্মমে।।
শকাব্দা ১৭৩৬
রাণী শঙ্করী চরিত্রাবলে অসাধারণ বলশালিনী ছিলেন। রাজকার্য পরিচালনায় কারো মুখাপেক্ষী ছিলেন না। নাটোরের রাণী ভবাণী কিংবা ইন্দোরের রাণী অহল্যা বাই-য়ের মতনই ছিলেন প্রজাকল্যাণ্যে নিবেদিত প্রাণ। আবার তিনি ছিলেন আড়ম্বরশূন্যা। যৎসামান্য অশনবসনেই পরিতৃপ্ত হতেন। তাঁর নামের সঙ্গে রাণীমা শব্দটি সমার্থক হয়ে উঠেছিল। তাঁর স্নিগ্ধ শান্ত মাতৃময়ী রূপ প্রজাদের অন্তরে দোলা দিয়ে যেত। রাণীমা সম্বোধন করেই গর্বে দুলে উঠত তাদের বুক।
প্রজাবৎসল রাণীমা ছিলেন মিতব্যয়ী। কিন্তু তাঁর একমাত্র পুত্র কৈলাস দেব ছিলেন একেবারে তাঁর বিপরীত। আর এই বিষয়ে তাঁদের মধ্যে প্রায়ই বিবাদ লেগে যেত। এক সময়ে তা এমন চরম পর্যায়ে গিয়ে পৌঁছায় যে তা আদালত পর্যন্ত গড়ায়। ১৮৩১ সালে কৈলাস দেব পৈতৃক সম্পত্তির অধিকার পাওয়ার জন্য আদালতের দ্বারস্থ হন। মামলায় এক দিকে যেমন অর্থের অপচয় হতে শুরু করল, তেমনই অপর দিকে তত্ত্বাবধানের অভাবে ঠিকমতো খাজনা আদায়ও সম্ভব হলো না। গভর্নমেন্টের খাজনা বাকি পড়ল। সঠিক সময়ে খাজনা না দেওয়ায় বাকিদারের খাতায় নাম উঠল। বিষয় সম্পত্তি রক্ষা করাই দায় হয়ে দাঁড়াল দেখে সাত বছর পর, ১৮৩৮ সালে উভয়েই আপোষ-মিমাংসায় নিস্পত্তি করে নিলেন। রাণী শঙ্করী হংসেশ্বরীর সেবার জন্য ২৪ পরগণা অঞ্চলে ১৫টি এবং হুগলীর অন্তর্গত কুলিহান্ডার ৬টি মহল পেলেন। উভয়ের মধ্যে মামলার নিস্পত্তি হয়ে যাওয়ার পর কৈলাস দেব নাবালোক পুত্র দেবেন্দ্রকে রেখে ইহলোক ত্যাগ করলেন। পুত্রশোকে ভেঙে পড়লেন রাণী শঙ্করী। তারপর কিছুদিনের মধ্যে দেবেন্দ্রকে জড়িয়ে ধরে ধীরে ধীরে সোজা হয়ে দাঁড়ালেন। দেবেন্দ্রকে গড়ে তুললেন মনোমত করে।
ছোট থেকেই মেধাবী দেবেন্দ্র মাতৃভাষা ছাড়াও সংস্কৃত, পারসি ও ইংরাজিতে বিশেষ দক্ষতার সাথে সিনিয়র বৃত্তি পরীক্ষায় সস্মমানে উত্তীর্ণ হন। সে সময়ে ইংরাজিতে সিনিয়র বৃত্তিই ছিল চূড়ান্ত পরীক্ষা। আর এর ফলে কৃতবিদ্য দেবেন্দ্র হুগলীর ইংরেজ কর্মচারিদের সৌহৃদ্যসূত্রে আবদ্ধ হন। হুগলীর ম্যাজিস্ট্রেট হ্যালিডে সাহেব, পরে যিনি স্যার ফেডরিক হ্যালিডে নামে খ্যাত হয়ে লেঃ গভর্ণরের পদে অধিষ্ঠিত হয়েছিলেন, তিনি বাঁশবেড়িয়া রাজবাড়িতে গিয়ে দেবেন্দ্র দেবের সঙ্গে সময় অতিবাহিত করতেন।
হুগলী কলেজে সে সময়ে বার্ষিক পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে গভর্ণর জেনারেল স্বয়ং উপস্থিত থেকে পুরস্কার দিতেন। লর্ড ডালহৌসির আমলে দেবেন্দ্র দেব ওই সভায় হুগলী জেলার জমিদারদের মধ্যে সর্বোচ্চ স্থান দখল করেন অশক্ত শরীরে রাণী শঙ্করী নতুন করে প্রাণ পেলেন। বিষয় সম্পত্তি রক্ষা করার যোগ্য উত্তরাধিকার এতদিনে বংশে এসেছে। দেবী হংসেশ্বরী মুখতুলে চেয়েছেন। কিন্তু মানুষ ভাবে এক, হয় আর এক। ১৮৫২ সালে এপ্রিল মাসে অল্প বয়সে কর্মভূমির মায়া ত্যাগ করে চিরঘুমের দেশে পাড়ি দিলেন দেবেন্দ্র। জীবনে অনেক ঝড়ঝঞ্ঝা সামাল দিয়েছেন রাণী শঙ্করী, কিন্তু পৌত্রশোক সামাল দিতে পারলেন না। ছয় মাস পরে অক্টোবর মাসে শ্রীশ্রীশ্যামাপূজার আগের দিন, ভূতচতুদর্শী রাত্তিরে ৮০ বছর বয়সে পৌত্র দেবেন্দ্রকে অনুসরণ করলেন।
রাণী শঙ্করী ছিলেন আড়ম্বরশূন্যা। যত সামান্য অশনবসনেই ছিল তাঁর তৃপ্তি। তিনি ছিলেন স্নেহ মায়া মমতার বন্ধনে ভরা আপন মাধুর্যে মিশ্রিত অনন্য এক নারী। মৃত্যুকালে রাণীমা তাঁর সমস্ত বিষয় সম্পত্তি হংসেশ্বরী দেবীর সেবায় অর্পণ করে প্রপৌত্র রাজা পূর্ণেন্দু ও তাঁর দুই ভাইকে সেবাইত নিযুক্ত করে যান। রাণীমা’র মহিমান্বিতগুণে ইংরেজ সরকারও খুব প্রসন্ন ছিলেন। কলকাতার কালীঘাটে রাণী শঙ্করীর একটি বাড়ি ছিল। তাঁর সম্মানে কলকাতা মিউনিসিপ্যালিটি (অধুনা কর্পোরেশন) সেই বাড়ির সামনে অবস্থিত গলি পথটির নামকরণ করে দিলেন ‘রাণী শঙ্করী লেন’, যা আজও হরিশ মুখার্জী রোডের উপর বর্তমান।
Facebook Comments