দীপ্তি মানাই ঘোষ,প্রথম দশকের শেষের দিকে লেখালেখির সূচনা লগ্ন।প্রথম প্রকাশিত লেখা হয়-চৌডল পত্রিকায়।লিখছেন প্রথমসারি লিটল ম্যাগাজিন গুলিতে। বহমান জীবনের যা কিছু সত্য আন্দোলিত করে, যা কিছু হৃদয় নিঙড়ে উঠে আসতে চায় তা-ই লেখার প্রেরণা। আর একজন পাঠকও যদি ভালোবাসে, সে-ই প্রেরণা হয়ে ওঠে।

ডিপ্রেশন ও জীবনানন্দ

যেদিন থেকে পুঁজিবাদী সভ্যতা মানুষ কে শিকড় ছেঁড়া করল,সেদিন থেকেই মানুষের যাপনে একটি নূতন শব্দ যুক্ত হল -” ডিপ্রেশন “। এই ডিপ্রেশন শব্দটির সঙ্গে পরিচিত ছিল না ভারতবর্ষের মতো কৃষিজীবী দেশ, এই শব্দটা হয়তো আজও অজানা অনার্য আদিম সভ্যতার কাছে। বাংলা সাহিত্যে এই “ডিপ্রেশন ” বহু চর্চিত একটি বিষয় হয়ে উঠেছে দুই বিশ্বযুদ্ধের সমকালে।যা জগদ্দল পাথরের মতো অনড় হয়ে বসে আছে আজ ও আগামীর বুকে। সে যা ই হোক।জীবনানন্দ আর ডিপ্রেশন এই  নিয়েই আলোচনায় আসা যাক।
আজকের দিনে এই মিথ্যেটার বিরুদ্ধে চ্যালেঞ্জ করতে চাই যে জীবনানন্দ ডিপ্রেশনে ভুগে আত্মহত্যা করেন নি।বরং ঠিক উল্টো টা।তাঁর চেয়ে বড় ডিপ্রেশনের সুচিকীৎসক অল্পই আছেন।অনেকেই তাঁকে নির্জনতার কবি,তাঁর কবিতার বিপন্ন বিস্ময় শব্দটিকে জীবনানন্দীয় ডিপ্রেশন বলে দেগে দিয়ে জীবনবিমুখ করে তোলেন কবিকে।জীবনানন্দের কাব্য পরিক্রমায় দেখা যায় তাঁর সব কাব্য মিলে গোটা একটাই কাব্য।যা তাঁর জীবনবেদ।
বিষয়টা স্পষ্ট হবে ধূসর পান্ডুলিপি ও বনলতা সেন কাব্য দুটি পাশাপাশি রাখলে। “বোধ” কবিতায় কবির সেই বিপন্ন বিস্ময় দেখি।”মাথার ভিতর স্বপ্ন নয় প্রেম নয় কোন এক বোধ কাজ করে” এইটাই বিপন্ন বিস্ময়।যাকে অনেকে নিছক ডিপ্রেশন হিসাবে দেগে দেন।এই বিস্ময় কল্লোল যুগের সব কবির মধ্যেই দেখা যায়।কারন এই সময় ১৯১৪ ও তার পরবর্তী।প্রথম বিশ্বযুদ্ধ ও তার গর্ভে সৃষ্ট দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ।যখন মানুষের লোভ গ্রাস করলো প্রকৃতিকে।ধ্বংস হতে থাকল গ্রামীন সভ্যতা।নষ্ট হল শুভ চেতনা, মূল্যবোধ। মানুষ হয়ে উঠল একাকী নির্জন।কিন্তু এই বোধ ডিপ্রেশন নয়।ডিপ্রেশন থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য আকুল এক বিবেক।এই বিবেক যতক্ষণ জেগে থাকে,মানুষ সাঁতার কাটতে পারে হতাশা আর যন্ত্রণার সমুদ্রে।গভীর গভীরতর অন্ধকারে কবি এই বিবেকের আলোকেই জাগিয়ে রাখতে চেয়েছেন।মানুষকে দাঁড় করিয়েছেন আত্মার মুখোমুখি।  “আট বছর আগের একদিন” কবিতায় দেখি নাম যশ খ্যাতি সন্তান থাকা সত্তেও আত্মহত্যা করছেন মানুষ টি।কিন্তু সেখানেই কবি দেখিয়েছেন “বুড়ি চাঁদ গেলো বুঝি বেনোজলে ডুবে/ চমৎকার ধরা যাক দু একটা ইঁদুর এবার” এইতো জীবন চেতনা।মৃত্যুর বিষণ্ণতাকে কাটিয়ে উঠে জীবনের জয়গান। “বোধ” কবিতায় যে বিবেক, যে বেঁচে থাকার আকুতি জায়মান থেকেছে তা ই স্থিত হয়েছে আট বছর আগের একদিন কবিতায়।এরপর আর একটি কবিতাতেও কবি পিছনে ফিরে যান নি।সেই স্থিত বিবেক আর শুভ বোধ ক্রমশ বিশুদ্ধ আর আলোকিত হয়েছে পরবর্তী কাব্য “বনলতা” সেন এর কবিতার মধ্যে।
কবির জীবন খুঁজে চলার প্রত্যয় স্থিত হয়েছে “বনলতা সেন” কাব্যে।যে কাব্যটির কবিতাকে সরলীকরণে অভ্যস্থ বাঙালি নিছক প্রেমের কবিতা হিসাবে দেগে দেয়।কিন্তু এর চেয়ে বড় আত্ম জাগরণের কাব্য বাংলা সাহিত্যে নেই।কবি প্রত্যেক নায়িকার মধ্যে সভ্যতার এক স্নেহময় আলোকে খুঁজেছেন।সুচেতনাকে খুঁজেছেন।যা মানুষের অন্তরে আছে। তাই কবি বলেন” পৃথিবীর রণরক্ত সফলতা সত্য।তবু শেষ সত্য।নয়” আর সেই বনলতা সেন সেতো কবি’র বিশুদ্ধ চেতনা। মানব সভ্যতার সেই আলো।যার মুখোমুখি নিবিষ্ট হয়ে নষ্ট সমাজের মানুষ শান্তি পায়। বেঁচে থাকার প্রেরণা পায়।
কবির রূপসী বাংলা কাব্যের দিকে তাকালে দেখা যায়।নাগরিক ক্লান্তি থেকে মুক্তি চেয়েছেন বাংলার সবুজ ঘাসকে ভালোবেসে।শুধু বাংলা নয়।পৃথিবীর ইতিহাস ভৌগলিক পরিসীমা ঐতিহ্য সংস্কৃতিকে এক সূতোয় বেঁধে তিনি বিশ্ব মানব কে আহ্বান জানিয়েছেন। যা বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে অনিবার্য ছিল।
ডিপ্রেশন নয়।বিপন্ন বিস্ময় জীবনানন্দের শেষ কথা নয়।জীবনের কবি জীবনানন্দ।সারাজীবন জুড়ে তিনি বেঁচে থাকার প্রেরণা খুঁজেছেন প্রকৃতি আর মানুষের সান্নিধ্যে।জীবন আর আনন্দের অবিমিশ্রতাই জীবনানন্দ। হ্যাঁ তাঁর কাব্যে বিষন্নতা এসেছে। এই  বিষন্নতা রাধার মতোই ভেজা।প্রগাঢ় ভালোবাসার প্রকৃতি ও জীবন কে ছেড়ে চলে যাওয়ার বেদনা,কখনও বা হারিয়ে ফেলার বেদনা। এ যেন সেই “দুঁহু ক্রোড়ে দুঁহুঁ কাঁদে বিচ্ছেদ ভাবিয়া”।প্রিয়কে বেঁধে রেখেও হারানোর ভয় লেগে থাকে।যে ভয় ছিল জীবনানন্দের।প্রিয় দেশ,প্রিয় গ্রাম,প্রিয় গ্রাম বাংলার প্রকৃতিকে হারানোর ভয়।
কবির বিশুদ্ধ বোধ।বেঁচে থাকার, ভালো থাকার প্রেরণা ধরা আছে বনলতা সেন কাব্যের “সুচেতনা” কবিতায়।
“সুচেতনা এই পথে আলো জ্বেলেই এই পথেই পৃথিবীর ক্রমমুক্তি হবে”… এই জীবনানন্দের জীবনবেদ