না বলা 

 ভারী ব্যাগ নিয়ে বিশালাকায় সুটকেস , ট্রলি থেকে নামানো আর ওঠানো এক বিড়ম্বনা তো বটেই । অনু এবার ঠিক যে অবস্থায় দেশে এসেছিল , হাতে ছিল একটা ব্যাগ প্যাক , ব্যাস্‌ ! এখন ফেরার সময় সায়নের জন্য আর আদরের নাতি তাতাই এর জন্য নানান মুখরোচক আর বারণ করা স্বতেও জামাকাপড়ের বোঝা মা তার কাঁধে ঝুলিয়ে দিলো । দুটো কড়া বাক্য যেই অণু বলতে গেলো , ব্যাস অমনি চোখ ছলছল’ । এবারের দুর্গা পুজোর জামা আগাম কিনে রেখেছে , না নিলে আবার কবে আসা হবে তাই …
আবার বলল ” কি যে সব হোল , তোর বাবাকে এমন তো দেখিনি কখনো , তাই অজানা ভয়ে মাথার ঠিক ছিলনা রে , তাই অমন করে  সেদিন ফোনটা করে ফেলেছিলাম । অনেক খরচ হয়ে গেল তোর” । বড্ড ভারী পরিস্থিতিকে স্বাভাবিক করার একমাত্র উপায় ছিল তখন  বত্রিশ ইঞ্চির সুটকেস চুপচাপ ভরে নিয়ে আসা । মা যখন কথা গুলো বলছিল কেন যে অণু চুপ করে ছিল , সেটা এখন খুব  মনে হচ্ছে অণুর । তারও কি তাহলে এটাই মনে হয়েছিলো, যখন তিন দিন নার্সিং হোমে রাখার পর বাবা কে সম্পূর্ণ সুস্থ বলে ডক্টর ‘ বাড়ি নিয়ে যান ‘ বলেছিলেন । 

আজকে রাঙা কাকীমা অণু চলে যাচ্ছে বলে দেখা করতে এসে তার মা কে বলছিলেন ” ভাগ্য করে মেয়ে পেয়েছিলেন দিদি , ফোন পেয়ে কী ভাবে অতো দূর থেকে ছুটে এসেছে , নয়তো অন্য ছেলেমেয়েরা হলে  আরেকটু  দেখে বূঝে তবেই আসতো , যে বাবা থাকবে না যাবে । দূর থেকে খরচা করে আসা , তা সেটা উশুল হওয়া তো চাই ” ।
হাতে বোর্ডিং পাস টা নাড়াচাড়া করতে করতে কেন যেন মনে হচ্ছে অণুর, যে বাবা যেন সেই সময় স্থির দৃষ্টি তে তার দিকে চেয়েছিল । হয়ত কোন উত্তরের আশায় । 
স্কুল বাস থেকে নামার সময় কিছু না বললেও মা কী করে বুঝে নিয়ে  বলত ‘ কিছু হয়েছে স্কুলে ?’ আর বাবা ! আর  বাবা  কিভাবে অনায়াসে অণুর চাহনি দেখে বুঝে  নিতো ঐ লালের উপর রুপোলী চকচক জামাটাই তার বেশি পছন্দ । তাই হিসাবের বাইরে একটু বে-হিসাবী হতে বাবা সেদিন পিছুপা হয়নি , বাজেটের কড়া নিষেধ সত্ত্বেও ।
কেন যে এইসব খেয়াল আসছে অণুর মনে ? বুকের ভিতর টা চিনচিনে একটা যন্ত্রণা যেন গলার কাছে এসে আটকে গেছে । 
’  আমি আ -আ মি  কি ধরা পড়ে গেছি বাবা ?’ 
স্ক্রিনে ফ্লাইটের গেট নম্বর দিয়ে দিয়েছে , গলাটা শুকিয়ে যাচ্ছে অণুর  । অণু র কানে যেন আবার সেই কথাগুলি  কেউ ফিসফিস করে বলছে ‘ভাগ্য করে এমন মেয়ে পেয়েছিলেন দিদি ।’ আর ছোট্ট অণু ! ছোট্ট অণু যেন বলছে ‘ তুমি কী করে বুঝলে  বাবা !”