কৃষ্ণেন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের জন্ম ১৯৬৪। পেশায় মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার। অথচ শিল্প, সাহিত্য আর সংস্কৃতি নিয়েই তাঁর বেঁচে থাকা। তাই অসংখ্য ছোটবড় পত্রিকায় তাঁর বিভিন্ন ধরণের লেখা প্রকাশের পাশাপাশি বিভিন্ন মঞ্চে মঞ্চস্থ হয়ে চলা নাটক ও নৃত্যনাট্য রচনা ও সুরারোপের মাধ্যমেও বিচ্ছুরিত তাঁর প্রতিভা। লেখেন ছোটবড় সকলের জন্যই। প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা ১১, যার মধ্যে ‘দুর্দান্ত দশ’, ‘পাতায় পাতায় ভয়’, ‘ভূতের বৃন্দাবন’, ‘গুহা গোখরো গুপ্তধন’ প্রভৃতি গ্রন্থগুলি ইতোমধ্যেই পাঠকসমাজের কাছে সমাদৃত হয়েছে। তাঁর রচিত ও সুরারোপিত অপেরা-নাটক “আলাদিন” বেশ কয়েকবার মঞ্চস্থ হওয়া ছাড়াও হাওড়ার একটি নাট্য কর্মশালায় ব্যবহৃত হয়েছে। একসময় সম্পাদনা করেছেন সাহিত্য পত্রিকা “আলো অন্ধকার”। পেয়েছেন কয়েকটি পুরস্কার, যার মধ্যে ‘কিশোর ভারতী সাহিত্য পুরস্কার”, “সংশপ্তক পুরস্কার” প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য।

আরশিনগর

 (২৫)
ভীষণ bored হয়ে যাচ্ছি । একেবারে নিঃশেষিত । সারাদিন কর্মযাতনার যাঁতাকলে পড়ে আমার সমস্ত জীবনীশক্তি যেন উধাও হয়ে যাচ্ছে । আর মনের ওপর অসম্ভব চাপ । চাকরী, পড়াশোনা, সৃষ্টি, ভালবাসা, সমস্ত ব্যাপারগুলো যেন ক্যালিডোস্কোপের বিভিন্ন নকশার মতো ঘুরে ঘুরে নানারকম আবর্ত সৃষ্টি করে চলেছে, আর আমি নৃত্যপটিয়সী নর্তকীর মতো তার মধ্যে ঘুরপাক খেয়ে চলেছি অবিরত, একই তাল ও ছন্দে । শুধু বারবার সমে পড়লেই চেতনা ঝনঝন করে উঠছে — আমি কে, আমি কি, আমি কেন ?
(২৬)
দেখ, আমরা বন্ধুরা যেন সবাই কিরকম ছন্নছাড়া হয়ে গেছি । যারা খুব ভাল রোজগার করছে, যারা কিছুই করতে পারছে না, আর যারা ঝিলের জলের মতো তরঙ্গহীন দিন কাটিয়ে যাচ্ছে — সবাই, সবাই । বন্ধুত্বের শিকড় উপড়ে গিয়ে শুধু হাওয়ায় পাতা নড়লে তাকে কি বলবে তুমি ? সংসার-সমাজ-কর্তব্যপালনের অজুহাতে এই যে ‘কী রে, কেমন আছিস, আমিও ভালো’-তে শেষ হয়ে যাওয়া জীবনের দু মিনিটের সেমিকোলন, তারপর আবার দৌড়, এ থেকে হাঁফ ছেড়ে বাঁচা কোন্‌ রাজপথে ?
অথচ এরকম তো কথা ছিল না ! আজ থেকে দশ বছর আগে একদিন ঠেক-এ আড্ডা মারতে মারতে আমরা হঠাৎ ঠিক করেছিলাম ও সবাই মিলে পরস্পরকে কথা দিয়েছিলাম যে, এই দশ বছর আমরা যে যার কেরিয়ার গড়ে তুলবো এবং একটা কিছু হয়ে উঠবো, তারপর আবার দশ বছর পরের কোন এক এরকমই দিনে আমরা আবার মিলিত হবো যে যার অস্তিত্ব নিয়ে । আজ দশ বছর পরে সেইরকমই দিন তো ফিরে এল, কিন্তু আমরা যারা কথা দিয়েছিলাম, তারা কই ?
আমাদের সেই ঠেকটাই বা গেল কোথায় ? সেই সবুজরঙা বাড়িটা, যার একচিলতে রকে সন্ধে থেকে রাত, গভীর রাত পর্যন্ত চলতো আমাদের তুমুল হৈ-হল্লা ? সেই বাড়িটা আজ ঝকমকে, অন্যরকম । তার গায়ে এখন নতুন নেমপ্লেট লাগানো । ওটা এখন একটা অনুষ্ঠান বাড়ি । বিয়ে-পৈতে-জন্মদিনে ওখানে এখন একদিনের মালিকরা লোক ডেকে খাওয়াতে আসে; আর সেইসব দিনেই আমাদের হয়ে-ওঠা বন্ধুরা বাইক চেপে বৌ নিয়ে নিমন্ত্রণ রক্ষা করতে আসে, না-হওয়া বন্ধুরা উল্টোদিকের ফুটপাথে দাঁড়িয়ে শুকনো গালে বিড়ি টানে, আর দিনগত পাপক্ষয়ের বন্ধুরা সাইকেল চেপে মুখ লুকিয়ে যেতে যেতে হঠাৎ চোখাচোখি হলেই বিবর্ণ মুখে কাষ্ঠহাসির প্রলেপ টেনে পালিয়ে বাঁচে । এইভাবেই আমরা বন্ধুরা আবার মিলিত হই । আজ — দশ বছর পরে ।
(২৭)
দেখা হল বহুদিন পর ; মনে হল শেষ দেখা যেন ।
জানি এটা কখনোই শেষ দেখা নয়,
তবু ভাবি,
শেষ দেখা দিয়ে তুমি চলে গেলে কোচিংয়ের পথে —
রাস্তায় একহাঁটু জল, জল ভেঙে দৌড়ে যায় রিক্‌শা,
রাস্তার পাশে গাড়িবারান্দায় ঝোলে শায়া, ফ্রক, গেঞ্জি,
ফুটপাথে ভিজে যাওয়া গাছগুলো নিঃসঙ্গ দাঁড়িয়ে,
তুমি চলে গেলে একটুকরো দেখা দিয়ে . . .
আজ খবরে বললো ডিভিসি সিদ্ধান্ত নিয়েছে জল ছাড়া হবে,
ভিটেছাড়া হবে আরও কিছু মানুষ,
ডাকপিওন দুপুরে এসে দিয়ে গেছে দুটি ভিজে পোস্টকার্ড,
ঝিরঝিরে বৃষ্টি পড়ছে তো পড়ছেই,
বাড়িতেও ড্যাম্প ধরার মতো ভিজে নিঃসঙ্গতা ছিল,
আমি প্রতীক্ষায় ছিলাম বৃষ্টিতে ভেজার,
ভিজতে বেরিয়ে দ্বিতীয় সিগারেট ধরানোর ফাঁকে
তোমার অনন্ত শেষ দেখা,
ঈশ্বরীর ঠোঁটের হাসি আমার চোখে আটকে দিয়ে
বৃষ্টি আমায় ঈশ্বরীকে এক পলক দেখিয়ে নিয়ে
চলে গেল ঐই দূরে . . . বৃষ্টি পড়ছেই . . .
একসঙ্গে ভিজতে ভিজতে নাচছে অনেকগুলো শূয়োর . . . .
(২৮)
জানো কৃষ্ণেন্দু, প্রীতমের না, স্বরনালীতে কী একটা গন্ডগোল হয়েছে, ক্রমশই গলা বসে যাচ্ছে । তুমি কি প্রীতমকে চেনো ? বোধহয় না । আহা, আমাদের নাটকের গ্রুপে কী অসাধারণ অভিনয় করতো প্রীতম । ওর চেহারা, কন্ঠস্বর, অভিনয় দেখে আমি প্রায়ই ভাবতাম, মর্জিনা-আবদাল্লার গল্প নিয়ে একটা নাটকের স্ক্রিপ্ট লিখবো, তাতে ওকে দিয়ে হোসেনের রোলটা করাবো । শুধু ওরই জন্যে আমি নাটকটা লিখতাম । শুধুই জীবন্ত হোসেনের জন্যে । কিন্তু কী হল বলো তো ? ও কি আর অভিনয় করতে পারবে ? বড় যে আশা ছিল ওর !
হোসেন কী করে আর জীবনের গান গাইবে ?
(২৯)
প্রিয় কৃষ্ণেন্দু,
আমার একটা কথা মাঝেমাঝে বড়ো জানতে ইচ্ছে করে, জানো ? এই যে তোমার সঙ্গে আমার মননের এত মিল, এর মানে কি আমার অনুভূতিগুলো তোমার মনেও একইভাবে অনুরণন তোলে ? আমার তো তাই মনে হয় । নাহলে কেন তোমার সুখদুঃখও আমার মধ্যে একই প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে ?
আচ্ছা, কোন লেখকের সঙ্গে পাঠকের সেতুবন্ধনের ক্ষেত্রেও কি কথাটা একইভাবে প্রযোজ্য ? সেখানেও কি পাঠক লেখকের সঙ্গে একইভাবে অশ্রু ঝরায়, কিংবা আনন্দিত হয়, রমণীর প্রেমে উদ্‌ভ্রান্ত হয়ে পড়ে, অথবা প্রিয় মানুষের মৃত্যু তাকেও একইভাবে শোকস্তব্ধ করে দেয় ?
জানি না । আমি এসব জানি না । তবু লিখে যাই, কারণ না লিখে আমার উপায় নেই । মনের মধ্যে শুধু বেজে ওঠে ঝংকার, দামামার মতো কোন ধ্বনি যেন বারবার আমাকে সতর্ক করে দিয়ে যায় — আমার জন্ম, মৃত্যু, কর্ম, আশা, আকাঙ্খা, সবকিছুর লক্ষ্য একটাই, আমাকে লিখতে হবে । আরও, আরও লিখতে হবে । এ জন্ম, না হলে আরেক জন্ম, দরকারে বারবার পুনর্জন্ম গ্রহণ করতে হবে আমায় ।
দ্যাখো, ঐই দূরে বাঁধ ভাঙছে প্রচন্ড শব্দে
আদিম উন্মাদনায় মেতে উঠেছে মানুষ
পৃথিবীতে পুনরায় বড়ো কোন সৃষ্টির প্রয়োজন
আর অন্ধকারে নয়, এবার আলোয় হবে পুনর্জন্ম পৃথিবীর
সবাই সবার হাত ধরো
সবাই সবার কাছে ঋণী হও
এসো সকলেই গ্রহণ করি প্রতিজ্ঞা
এসো সকলেই গ্রহণ করি পুনর্জন্ম ….
(৩০)
টিভির পর্দাটা খুব ছোট । তবু ওতেই ধরা পড়ে গেছে গোটা আকাশ । দেখছিলাম সেই বিশাল আকাশে এক ততোধিক বিশাল অশনি সংকেত, যা ক্রমশ এক বৃহত্তর বৃত্ত হতে হতে ছড়িয়ে পড়ছিল গোটা আকাশ জুড়ে ।
আগাগোড়া মুখোশ এঁটে রেখেছিলাম মুখে, আর গায়ে ছিল নির্বিকার তকমা । তবু কিভাবে যেন সেগুলো বারবার খুলে যাচ্ছিল, আর বারবারই আমি জোর করে সেগুলো পরে নিতে চাইছিলাম ।
ছবির পন্ডিতমশাই বললো, ‘দুজন ছিল, নয় দশজন হবে !’
ছবির বামুনদি বললো, ‘এগারোজন ।’
ছবির পন্ডিতমশাই অবাক হয়ে চাইলো । বামুনদিও মুখ তুললো । দুজনের চোখে চোখে কথা হবার সময়েই সত্যজিৎ রায় ক্যামেরা ঘুরিয়ে নিলেন ।
ওই তো পর্দা জুড়ে হাজার হাজার কালো কালো লোক — লোক না শুধুই প্রাণ — ওরা এগিয়ে আসছে, ভীষণ এগিয়ে আসছে, টিভির পর্দা ছিঁড়ে ফেলে ওরা এগিয়ে এল, ধীরে ধীরে বৃত্তের আকারে এগিয়ে এসে ঘিরে দাঁড়ালো আমার চারপাশে, আর তারপর ওদেরই মধ্যে কে একজন যেন একটানে আমার মুখোশটা খুলে দিয়ে ছুঁড়ে দিল শূন্যে, অনন্ত আকাশ পার হয়ে সেটা ভাসতে ভাসতে চলে গেল আমার দৃষ্টিসীমার বাইরে ।
(৩১)
প্রচন্ড তোলপাড় চলছে মনের মধ্যে । ঘুরে ঘুরে ঘুরে ঘুরে চলেছি । মাঠে, পার্কে, স্টেশনে, রাস্তায় রাস্তায় । কী খুঁজি ? কিছু কি খুঁজি ? সেই কস্তুরীমৃগের মতো ?
সারা আকাশ জুড়ে থমথমে মেঘ সারাটা দিন, অবিরত ঝিরঝির ঝিরঝির করে বৃষ্টি হয়ে চলেছে, মাঝে মাঝে অল্প অল্প জমা জলে ব্যাঙেদের সংসার, আর বাসের কন্ডাক্টরদের মতো ডেকে ডেকে যাচ্ছে তারা, যেন বলছে — এসো, এই দারুণ বৃষ্টির যাত্রায় সঙ্গী হও ।
আমিও তো যাত্রী । সারাদিন ধরে শুধু চলছি । দেখছি, স্টেশনে লেবুর ঝুড়ি সামনে নিয়ে চাদর মুড়ি দিয়ে ফলওলা চুপসানো মুখে বসে আছে ট্রেনের প্রতীক্ষায়, বাসস্ট্যান্ডে দাঁড়ানো বন্ধ বাসের ভেতর থেকে বেরিয়ে আসছে ধোঁয়া আর তর্কবিতর্কের জোরালো আওয়াজ, ভেঁপু বাজাতে বাজাতে প্রথম-শাড়ি-পরা মেয়েটাকে নিয়ে বাড়ি চলে গেল তার মাসমাইনের রিক্সা, ভিজে কাকদুটো করুণ নয়নে পরস্পরের দিকে দেখছে, একটু পরেই হয়তো উড়ে যাবে শুকনো কোন জায়গায় — কিন্তু আমি ? আমি কোথায় যাবো?
কার যেন দাঁড়াবার কথা ছিল না আমার জন্যে ? না, কেউ তো নেই । তবে কি সে-ই কথা রাখলো না, না কি আমিই ভুল করলাম ? কার যেন আমার সামনে বসে গান শোনাবার কথা ছিল না আজ বিকেলে ? না কি কারও আমার সঙ্গে ঘুরে ঘুরে আমার দুঃখকষ্টগুলো হাল্কা করার কথা ছিল ?
কই, কেউ কেন আসে না, থমকে দাঁড়ায় না আমায় দেখে, মুখে ফুটে ওঠে না উদ্ভাসিত আলো, অথবা বিরক্তি প্রকাশ করে না আমার দেরীর জন্য ? এ কী হল আমার ?
‘জানলাতে মুখ রেখে দেখি, দূরে কাছে
আকাশ জুড়ে বিষণ্ণতা ছড়িয়ে আছে
মন বসে না কোন কাজে, কোন খেলায় —
মাঝেমাঝেই বুকের মধ্যে ঝন্‌কে ওঠে
এখন এই পড়ন্ত বেলায় ।’
(৩২)
ভাল লাগে না । অব্যক্ত এক যন্ত্রণা যেন কুরে কুরে খায় সবসময় । কবিতা, নাটক, ছবি, গান, পৃথিবীর সমস্ত শিল্পকলা ভিড় করে আসে মনের মধ্যে, আর আমি সেগুলো নিয়ে বিছানায় লুটোপুটি খাই, কাঁদি, হাসি, তাদের সঙ্গে সহবাস করি । তবু মন শান্ত হয় না কিছুতেই ।
আমি তো জন্তু নই যে সমস্ত অনুভূতি ভুলে শুধু খাবার যোগাড় করার জন্য দিনপাত করে যাব । বোধহীন কোন অমানুষও নই যে সাংসারিক কর্তব্যেই কেটে যাবে এই তুচ্ছ জীবন । আমার চাই মনের মুক্তি, বোধের মুক্তি ।
তাই বুকচেরা এক হাহাকার আর কান্নায় আমার পৃথিবী ছিন্নভিন্ন হয়ে যেতে চায় । পৃথিবীর সকল মানুষকে ডেকে বলতে ইচ্ছে করে, ওগো, তোমরা বলো, আমি কোথায় পাবো তারে ?
কিন্তু কী যে পেতে চাই, তা কি নিজের কাছেই স্পষ্ট, এখনও ?