কৃষ্ণা দাস কলকাতা নিবাসী। গল্প কবিতা লিখছেন। বিভিন্ন লিটল ম্যাগাজিন ও প্রথম শ্রেণীর পত্রপত্রিকায় প্রকাশ পাচ্ছে। বেশ কিছু পুরস্কার বর্তমানে কবিতার থেকে বেশী গদ্যে টেনে এনেছে। ভালোবাসেন নির্জণে থাকতে, নিজের সঙ্গে থাকতে। মাঝে মাঝে হাতে তুলে নেন রঙতুলি।

নিরুদ্দেশে যাবার আগে               

[১]

নিধি আজ একটু আগেই ফ্লাটে ফিরল। বেল বাজালো। টিংটং। বেল বাজানানোর সঙ্গে সঙ্গেই স্বাতী দরজা খোলে। আজ একটু দেরি হচ্ছে।
বেশ কিছু ফাইল আর খাবারের প্যাকেট নিয়ে নিধি ধৈর্য সহকারে দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে থাকল। ভাবলো হয়তো স্বাতী ওয়াশরুম গেছে। কিন্তু না বেশ কয়েক মিনিট পরও স্বাতী দরজা না খোলায় নিধির বুকটা ধক্ করে উঠল। মেয়েটাকে নিয়ে সত্যিই বড় ভাবনা হয়। আবার কিছু হল নাতো? আজ রবিবার, ওর তো ফ্লাটে থাকারই কথা। তাড়াতাড়ি মোবাইল খুলে স্বাতীকে কল করতে যাবে অমনি দরজাটা খুট করে খুলে গেল।
নিধি দেখল স্বাতীর পরণে জয়পুরি প্রিন্টের লং স্কার্ট আর টপ। পায়ে স্লিপার। কানে মোবাইল চেপে আছে ঘাড় আর কাঁধের বিশেষ কায়দায়। এক হাতে নেলপলিশের শিশি। কোনো রকমে দরজা খুলে নিধির মুখ না দেখেই ফোনে কথা বলতে বলতে ফিরে গেল বেড রুমে। নিধি ফ্লাটে ঢুকে চুপচাপ খাবারের প্যাকেটদুটো ডাইনিং টেবিলে রাখল।
আজ একটা বিশেষ দিন। খবরটা স্বাতীকে দেবে বলেই আজ সে তাড়াতাড়ি ফিরল। স্বাতীর ফোনটা শেষ হলেই সে পুরো বিষয়টা বুঝিয়ে বলবে। তার আগে একটু স্নান করা দরকার। জুন মাসের মুম্বাই বাতাসে প্রচুর জলীয়বাস্প, ঘেমে নেয়ে অস্থির। নিধি ফাইলগুলো বেডরুমের সাইড টেবিলে রাখল। স্বাতী নিচু স্বরে বাংলায় কথা বলছে। অর্থাৎ বাড়িতে। স্বাতীকে নিধি যতটা চেনে তাতে জানে ওর এই ভঙ্গিমা বলে দিচ্ছে গুরুত্বপূর্ণ কিছু কথা আলোচনা হচ্ছে।
নিধি শর্টস আর টি সার্ট নিয়ে ওয়াশরুমে ঢুকে গেল। এক এক করে শার্ট প্যান্ট ব্রা প্যান্টি খুলে একদিকের দেওয়ালে বিশাল বেলজিয়াম গ্লাসটার কাছে গিয়ে দাঁড়াল। পাঁচ ফুট ছয় ইঞ্চির শরীরটার কোথাও অতিরিক্ত মেদ নেই। নিজের বুকের দিকে তাকাল নিধি। যৎসামান্য স্তন যেন কুকড়ে রয়েছে। বয়েস বাড়লেও স্তন যেন কৈশোর ছেড়ে বেরতে পারেনি। বড় বিড়ম্বনা যেন তার নিজেকে নিয়ে। আসলে নিধি নিজেও চায় না ওটা প্রকোট হোক।
শুরুটা মনে পড়ল নিধির। ছোট থেকেই সে ছেলেদের সঙ্গে ক্রিকেট খেলতো মেন রোডে। মনে পড়ে তখন প্রথম যখন অল্প অল্প স্তন দেখা দিচ্ছিল তার তখন কী অসহায় অবস্থা। একটার পর একটা টি সার্ট পরে এই উথ্থান চাপা দিতে চাইতো। মা বকতো ছেলেদের সঙ্গে খেলতে গেলে। নিধি শুনতো না। তার মেয়েদের মত পুতুল খেলা বা ইন্ডোর গেমস একটুও ভালো লাগতো না। ভালো লাগতো না ফ্রক পড়তেও। তিন বছরের বড় দাদার প্যান্ট টিসার্ট পড়ে পালাতো খেলতে। বাবা প্রশ্রয় দিত। পরে বাবাই প্যান্ট টিসার্ট কিনে এনে দিত। বাবার আদরে নিধি নিজের ইচ্ছা মতো চুল কেটে বয়কাট করে ফেলেছিল একদিন । বাবার ওপর মা কিছু বলতে পারতো না। বাবার আড়ালে তাকে বকতো শাসন করতো।
ধীরে ধীরে যত বড় হতে লাগল ও বুঝতে পারল অন্য মেয়েদের থেকে ও কত আলাদা। অন্য মেয়েদের মত তার সাজগোজে কোন ইন্টারেস্ট নেই। ছেলেদের প্রতিও নয়। কলেজে পড়তে পড়তেই দেখলো কত বান্ধবী প্রেম করছে লুকিয়ে শারীরিক সম্পর্ক করছে অথচ এ বিষয়ে তার কোনই আগ্রহ নেই। তার চলাফেরা হাঁটা বসা দাঁড়ানোয় কোনই মেয়েলি ছাপ নেই। মুখের গড়নে পুরুষালী কোঠরতা।
বাড়িতে তুমুল অশান্তি লেগেই থাকত। তাকে নিয়ে নানা কটু মন্তব্য মাকে শুনতে হত পাড়াপ্রতিবেশী ও আত্মীয় স্বজনের কাছে। ভীষণ খারাপ লাগতো যখন দেখতো তার জন্য মাকে কাঁদতে হচ্ছে। অথচ নিধি নিরূপায়। বুঝতে পারতো ভগবান ভুল করে তার শরীরটা মেয়েদের মত আর মনটা ছেলেদের মত করে ফেলেছে। বাবা কিছু না বললেও দাদাও যেন বিরক্ত ছিল খুব। গ্রাজুয়েশন শেষ হতে না হতেই ফ্যাসন ডিজাইনের কোর্স করতে মুম্বাই চলে এলো। বলা ভালো বাড়ি থেকে পালিয়ে বাঁচল।
স্বাতীর সঙ্গে দেখা তারও অনেক পরে। তবুও হয়ে গেল দশ বছর। সে নিধি আহুজা, তখন একজন ফ্যশনডিজাইনার হিসাবে মুম্বাইএ স্ট্রাগল শুরু করেছে। স্বাতী মিত্র তখন সবে একটা মাল্টিন্যাশন্যাল কোম্পানিতে ঢুকেছে জুনিয়ার ট্রেনি হিসাবে।
মুম্বাই এর মত শহরে থাকার জায়গা পাওয়াটা অনেক ভাগ্যের আর ভাড়াও আকাশ ছোঁয়া। অনেক খুঁজে শেষ পর্যন্ত দু’জনেই একটা বাড়িতে পেয়িংগেস্ট হিসাবে ঠাঁই নিল। প্রথমে দু’জনে একই ঘর শেয়ার করলেও ‘হাই হ্যালো’র বাইরে কখনও কথা হয়নি।
নিধির মনে পড়ছে স্বাতী একদম আলাদা চরিত্রের ও মানসিকতার। নিধি নিজে যেমন বড়লোকের মেয়ে,ডাকাবুকো শক্তপোক্ত, হইহট্টগোল ভালোবাসে। কর্মসূত্রে নানা পার্টি অ্যাটেন্ড করে গভীর রাতে ঘরে ফিরতে হত ওকে। স্বাতী ছিল ঠিক উল্টো, নরম-সরম নম্র-ভদ্র। স্বাতী সন্ধের মধ্যেই আস্তানায় ফিরে আসতো। খুব চুপচাপ, বাইরের জগতের চাকচিক্য জাঁকজমক যে তার ভালো লাগত না। অবসরে কলকাতায় ফেলে আসা পরিবার, বন্ধু আর প্রেমিকের সঙ্গে কাটানো মুহূর্তগুলোয় যেন বিভোর হয়ে থাকতো। অফিস থেকে ফিরে ফোনে ব্যস্ত থাকতো প্রেমিকের সাথে নইলে বাড়ির সঙ্গে।
তার পর সেই দিনটা এল। নিধি কোনোদিন ভুলবে না দিনটা। সেদিন বাড়ি ফিরে দেখল স্বাতী অসুস্থ। তার মুখ দিয়ে গ্যাঁজা বেরুচ্ছে প্রায় অচেতন। সঙ্গে সঙ্গে অ্যাম্বুলেন্সে খবর দিয়ে হাসপাতাল নিয়ে গেল স্বাতীকে। জ্ঞান আসতে স্বাতী জড়ানো গলায় বলল তার বাড়িতে যেন তার অসুস্থতার কথা  না জানানো হয় । ক’টাদিন পর হাসপাতালে থেকে স্বাতীকে নিয়ে আস্তানায় ফেরা হলেও নরম মেয়েটা ভেতরে বাইরে শক্ত হয়ে গেল।
তখন স্বাতীকে দেখভাল করা ছাড়া উপায় ছিল না ওর। মুম্বাইয়ে স্বাতীর কেউ ছিল না। ধীরে ধীরে স্বাতী সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে গেল। পরে সবটা জানা গেল। স্বাতীর বস ওকে রেপ করেছিল। চাকরির ভয় দেখিয়ে তা কাউকে না বলার হুমকি দিয়েছিল। বেচারির বাড়িতে বন্ধ কারখানার শ্রমিক বাবা, অসুস্থ মা আর ছোট ভাই। ওরা ওর পাঠানো টাকার জন্য সারা মাস তাকিয়ে থাকতো। চাকরি চলে যাবার ভয়ে স্বাতী সেদিন কাউকে কিছু না বলে অফিস থেকে বেরিয়ে এসেছিল। কোন রকমে বাড়ি ফেরার পথে প্রেমিককে ফোনে খবরটা জানিয়েছিল। ছেলেটা সেকথা শুনে স্বাতীকেই উল্টে নোংরা কদর্যভাষায় দোষারোপ করে। পাষন্ড সেদিনই তার সঙ্গে সম্পর্কও ছেদ করে। বেচারি স্বাতী দুটো ট্রমা একই দিনে দু’বার নিতে পারেনি। আর তাই ঘুমের ওষুধ কিনে এনে চিরদিনের জন্য ঘুমতে চেয়েছিল। নিধি কী করে তা করতে দিতে পারে?
তারপর থেকেই ক্রমশ স্বাতী আপনজনের মত আঁকড়ে ধরছিল ওকে। অনেক খুঁজে ওকে একটা কোম্পানিতে শেষ পর্যন্ত চাকরীতে জুড়ে দেওয়া গেছে।
এভাবে থাকতে থাকতে কবেযে একে অন্যের পরিপূরক হয়ে গেছে ওরা বুঝতেই পারেনি। তার পর মানসিক আদান প্রদান হতে হতে কী ভাবে যেন শারীরিক আদান প্রদানও ঘটে গেছিল এক দিন। সেই শুরু। তার পর থেকে ওদের নিজস্ব মনের ঘরে আকাশ উঁকি দিল যেন। যেখানে  পারস্পরিক শ্রদ্ধা ভালোবাসা নির্ভরতা ছাড়াও আছে তুমুল শারীরিক আনন্দ।
দু’জনে টাকা জমিয়ে একদিন নতুন ওয়ানবিএইচকে ফ্লাটও কেনা হয়ে গেল। তাও দেখতে দেখতে বছর পাঁচেক তো বটেই।
আজ ডক্টর ত্রিবেদী জানিয়েছেন সব টেস্ট ও.কে। তিনি কোন রিস্ক ফ্যাক্টর পাননি। অথ্যাৎ তিনি সেক্স ট্রান্সমিশন করতে রাজি। আর সেটা খুব তাড়াতাড়ি। কিন্তু খবরটা এখনও স্বাতীকে জানানো হল না। ওয়াশরুম থেকে বেরিয়েই ওকে জানাতে হবে। ওর প্রতিক্রিয়াটা খুবই ইম্পর্ট্যান্ট।
নিধি শাওয়ারটা ছেড়ে দিয়ে নীচে চুপ করে দাঁড়াল। আঃ শান্তি। ঠান্ডা জল ভেতরটাও যেন স্নিগ্ধ করে দিচ্ছে। স্বাতীর মুখটা মনে ভেসে এল। নিধি চোখ বন্ধ করল।

[২]

নিধির ঘুম ভেঙে গেল। অভ্যাস বশত বিছানায় স্বাতীর গা’য়ে পা ঠেকাতে গিয়ে ক্রমশঃ সরে গেল ওর দিকে। নেই! কী ব্যাপার! স্বাতী কোথায়? কাল রাতে স্বাতীকে খুব গম্ভীর লাগছিল। কেন জানে না নিধি ওর খবরটা আর জানাতে পারেনি। রাত হয়ে গেছিল অনেক। ক্লান্তও ছিল। তাই ডিনার করে দু’জনেই শুয়ে পড়েছিল।
নিধি বিছানায় উঠে বসল। ব্যালকনির দরজাটা খোলা। ধরফড় করে নিধি উঠে দাঁড়াল। দ্রুত পায়ে ব্যালকনিতে এসে দেখল স্বাতী চুপচাপ দাঁড়িয়ে রেলিং ধরে। আবছা আলোয় ওকে কেমন রহস্যময়ী লাগছে। হাওয়ায় ওর খোলা চুল উড়ছে।
“ক্যা হুয়া তেরে কো”? পিছন থেকে স্বাতীকে আলতো জড়াল নিধি। নিধির নিশ্বাস পড়ল স্বাতীর ঘাড়ে।
স্বাতী চুপ, কোনও কথা নেই।
“বোল রে”? নিধি স্বাতীর ঘাড়ে আলতো ঠোঁট ছোঁয়াল।
স্বাতী তবু চুপ।
নিধি এবার ওকে জোর করে নিজের দিকে ফেরাল, প্রায় ধমকে উঠল, “বোল হামে, ক্যা হুয়া?”
স্বাতীর ঠোঁট দিয়ে অস্ফুট শব্দ বেরিয়ে এলো, “মা নে ফোন কিয়া।”
“তো”?
“মুঝে ঘর বুলায়া।”
“তো”?
“সাদি কে লিয়ে।”
নিধি চুপ হয়ে গেল। ধীরে ধীরে হাতের বাধন আলগা হয়ে গেল। চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকল দু’জনে। বারোতলা নীচে নিওন আলোয় রাস্তাগুলো ঝকঝক করছে। দু’একটা গাড়ি হুস হুস করে বেড়িয়ে যাচ্ছে রাতের নিঃশব্দতাকে ভেঙে। দু’জনে পায়ে পায়ে আবার রুমে ঢুকল। নিধি জল খেলো, স্বাতীকেও জলের বোতল এগিয়ে দিল।
বাকি রাতটা দু’জনের চোখে আর ঘুম এলো না। অথচ দু’জনেই ঘুমের ভান করে দু’দিকে পাশ ফিরে শুয়ে থাকল। নিধির চোখে স্বাতীর কত কী কথা যে ফ্লাসব্যাকে ধরা পড়ছে। সেই প্রথম দিন থেকে আজ পর্যন্ত কত কী। কিছুদিন আগেও বলল বাড়ি থেকে বিয়ের জন্য চাপ দিচ্ছে, ও না বিয়ে করলে ভাই বিয়ে করতে পারছে না, ইত্যাদি। এসব ভাবতে ভাবতে ভোরের দিকে নিধি  ঘুমিয়ে পড়ল।
পর দিন সকাল হতেই নিধি স্বাতীর খোঁজ করে। স্বাতী কিচেনে মুখ নিচু করে সকালের ব্রেকফার্স্ট বানাচ্ছিলো। নিধি দেখে বলল, “আ বে মুহ্ কিঁউ লটকায়ে?”
স্বাতী উত্তর না দিয়ে যা করছিল তাই করতে লাগল।
“শুন তু চাহে তো সাদি কর লে। কাহানি খতম!” বেশ মেজাজের সঙ্গেই বলল নিধি। হয় এস্পার নয় ওস্পার। এই সব মন খারাপকে ও এতটুকু গুরুত্ব দিতে চায় না
“সাদি মাই ফুট! আই হেট জেন্স” এবার স্বাতীই ঝাঁঝিয়ে উঠল।
“তব?”
“ভাইয়াকে সাদিমেঁ জানা পড়েগা এক উইককে লিয়ে। তুঝে ছোড়কে”।
নিধি ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকল স্বাতীর দিকে। ব্যাপারটা বুঝতে একটু সময় নিল। তার পরই অট্টহাস্য করে বুকে জড়িয়ে ধরল স্বাতীকে, “মেরি আমানত, মেরি জাআআআআআন!”
স্বাতী গভীর ভাবে জড়িয়ে ধরল নিধিকে।
ঠিক তক্ষুনি বারোতলার কার্নিসে বাঁসা বাধা মনখারাপ ঝটপট পাখা মেলে উড়ে গেল নিরুদ্দেশে।