আমি একজন সাধারন গৃৃহ বধু সাহিত্য কে ভালবাসি৷ বিভিন্য লিটল ম্যাগাজিনে গল্প লিখে থাকি৷

শীতের সকাল   

প্রবীর বাবুর দিন টা শুরু হয় এক কাপ চা আর এক টা কাগজ দিয়ে৷ ফ্লাক্সে রাখা চা বা কফি দিয়েই তাকে কাজ চালাতে হয়৷ অসুস্থ স্ত্রী৷ বাতের ব্যথায় প্রায় পঙ্গু৷ তাই তিনি নিজেই সময় মত চা বা কফি ফ্লাক্সে ঢেলে রেখে দেন৷ চা ,কফির নেশা মেটানোর জন্য স্ত্রী কে বিরক্ত করেন না৷ খুব আরাম করেই চাএ চুমুক দিতে দিতে পেপার টা পড়তে থাকেন আর অসুস্থ স্ত্রীর ঘুম ভাঙান৷
উঃ সেই একই খবর৷ খুন ,জখম ,বধু হত্যা, ব্যর্থ প্রেমিক তার প্রেমিকার গায়ে এসিড ঢেলেছে৷ দেশের কি অবস্থা ! সব কটা কে ফাঁসিতে ঝলানো উচিত৷ পেপার পড়তে পড়তে তিনি এত উত্তেজিত হয়ে ওঠেন মনে হয় এখনি হার্ট ফেল করবেন৷
কি হলো তোমার? এত চিৎকার করছো কেন!
অসুস্থ কমলা দেবী খড়াতে খড়াতে উঠে আসেন৷ বলেছি না সকালে পেপার পড়া টা বন্ধ করো৷ রোজ  যদি এই খবর তো পড় কেন!
না মানে বলছি এদের ফাঁসিই !
আচ্ছা ঠিক আছে এবার থামঃ৷
প্রমীত এসে বললো, বাবা তোমাকে আর বাজার যেতে হবে না৷ এবার থেকে বাজারের দায়িত্ব টা আমিই নেব৷
ছেলের মুখে রাম নাম শুনে চশমার ধূলো পরিস্কার করে ছেলে কে বার বার দেখতে লাগলেন৷
বললেন,সূর্য টা আজ কোন দিকে উঠেছে৷
রান্না ঘর থেকে কমলা দেবী চিৎকার করে উঠলেন যাবে বলছে যখন যাক না৷ তোমার পেপার পড়তে পড়তেই তো বেলা হয়ে যায়৷ তখন যা তুমি বাজার আনো ! রান্না বসাতেই ইচ্ছে হয় না ৷
মুখে যাই বলুক ছেলে নিজের থেকে দায়িত্ব নিতে এসেছে দেখে মনে মনে খুশিই হলেন প্রবীর বাবু৷
মা একটা বাজারের থলি আর এক টা ফর্দ ধরিয়ে দিয়েছে৷ হঠাৎ আজ সে বাজার কেন যেতে চাইল সেটা সে নিজেও ঠিক মত জানে না৷ টানা এক বছর ধরে প্রমীতের উপর দিয়ে অনেক ঝড় বয়ে গেছে৷ কলেজে পড়ার সময় মহুয়ার প্রেমে পাগল ছিল প্রমীত৷ কলেজ মাঠ থেকে শুরু করে কলেজ ক্যাণ্টিন সব জায়গায় চলতো মহুয়া,প্রমীতের প্রেমের গল্প৷ সবাই জানতো প্রমীত ছিল মহুয়ার প্রেমে পাগল৷ কিন্তু গ্র্যাজুয়েশন কমপ্লিট হতে না হতেই মা বাবার বাধ্য মেয়ের মত কোন এক ইঞ্জিনিয়ার বড়লোক ছেলের সঙ্গে বিয়ের পিঁড়িতে বসে ছিল মহুয়া৷ আত্মীয় স্বজন, পাড়া প্রতিবেশি সবাই জানে এ আঘাত সহ্য করতে না পারায় প্রমীত ঘুমের অসুধ খেয়েছিল৷ হসপিটালে থাকার সময় একজন অয়ার্ড বয় বলেছিল, তুমি নিজেকে কেন শেষ করতে গিয়েছিলে, যে তোমার সঙ্গে এমন করেছে তাকে পারলে না শেষ করতে৷
চমকে উঠেছিল প্রমীত৷ ইচ্ছে হচ্ছিল এর উপযুক্ত জবাব দিতে৷ কিন্তু দুর্বল শরীর তার পারমিশন দেয় নি৷ প্রমীত সহ্য করতে পারে না কেউ মহুয়ার সম্পর্কে বাজে কথা বললে৷
তবুও সারাক্ষন ধরে ঐ অয়ার্ড বয়ের কথা টাই কানের কাছে ভোঁ ভোঁ করছিল৷ কিছুতেই মন থেকে মুছে ফেলতে পারছিল না৷ এত সকালে বাজার৷ সে নিজেও জানে না কি কিনবে৷ মায়ের দেওয়া ফর্দর কথা তার মাথা তেও নেই৷ বাবাই বাজার করে৷ কোন দিন সে বাজারের থলির দিকে ফিরেও তাকায় নি৷ অয়ার্ড বয়ের কথা টা তার কানে আজও বাজতে থাকে৷ মহুয়ার ক্ষতি সে করতেই পারে৷ বেশ কিছু টা দুরেই মহুয়া দের বাড়ি৷ বরের সাথে ঘুরতে তাকে দেখেছে প্রমীত৷ মহুয়াও দেখেছে প্রমীত কে৷ কিন্তু দুজনেই নিরব থেকেছে৷ কথা বলা হয় নি৷
প্রমীতের যুদ্ধ টা হল নিজের সঙ্গে৷ মনের মধ্যে কতই না ঝড় বইতে থাকে৷ বাবার পড়া পেপারের প্রতিটি শব্ধ মাথায় গেঁথে আছে৷ মাথার মধ্যে কিল বিল করতে থাকে সেই শব্দ গুলো৷ পেপারের কোথাও এক কোনে লেখা নাইট্টিক এসিডের কথা৷ সে এসিড তো এখনো মনের মধ্যে উঁকি দেয়৷
প্রমীতের মন প্রমীত কে বলে, হোক না একটা দুর্ঘটনা৷আরেক টা ভালো মন চিৎকার করে ওঠে, না প্রমীত না৷ প্রমীতের শরীরের মধ্যে চলতে থাকে দুই মনের ক্রমাগত যুদ্ধ৷ মাথা ঘুরতে থাকে প্রমীতের৷ মনে হয় এখনি বমি করে ফেলবে৷ দুই মনের ক্রমাগত যুদ্ধে প্রমীতের শরীর ক্লান্ত৷ এই শীতেও তার মাথা দিয়ে ঘাম ঝড়তে থাকে৷ শীতের সকালের মিষ্টি রোদ মনে হচ্ছে যেন গ্রীষ্মের উত্তাপ৷
মায়ের হাতে বাজারের ব্যাগ টা ধরিয়ে দিল প্রমীত৷ কমলা দেবী দেখলেন খালি ব্যাগে একটা লম্বা ফর্দ পড়ে আছে৷ অনেক দিন পর ছাদে গেল প্রমীত৷ আগে এই ছাদের সঙ্গে বেশ ভাল সম্পর্ক ছিল৷ বাবা কে লুকিয়ে প্রমীত এই ছাদেই আসতো সিগারেট খেতে৷ শুধু মা জানতো ছাদের উপর প্রমীতের গোপন ভালবাসার কথা৷ কেন ছাদের উপর তার এত টান৷ আজ অনেক দিন পর ছাদে এসে প্রমীত একটা সিগারেটে টান দিল৷ আকাশে চাঁদ উঠেছে৷ জ্যোৎস্নার আলোয় আলোকিত হয়ে আছে সারা ছাদ৷ চাঁদের দিকে চোখ পড়তেই তার মনে হল এ যেন মহুয়ার মতই এক সুন্দরী অহঙ্কারি নারী৷ এতই দর্প যে সে তার পা পর্যন্ত মাটিতে রাখতে চায় না৷ প্রমীতের ইচ্ছে হল  তার দর্প ভেঙে চুরমার করে দিতে৷ মাটিতে নামিয়ে আনতে৷ মনে হল চাঁদের অহঙ্কার কে মাটিতে মিশিয়ে ফেলতে পারলেই শান্তি৷ চাঁদ যেন মহুয়া৷ চাঁদের অহঙ্কার কে পুড়িয়ে দিতে পারলেই যেন মহুয়ার অহঙ্কার পুড়ে ছাই হয়ে যাবে৷ মহুয়ার রূপ কে পুড়িয়ে দেওয়ার জন্যই আজ সে আলু পটলের দোকান যাওয়ার পরিবর্তে ফার্মাসিস্টের দোকানে পৌঁছে গিয়েছিল৷ কিন্তু খারাপ মন ভালো মনের কাছে পরাজিত হওয়ার জন্য প্রমীত এই মুহুর্তে আকাশের চাঁদ দেখছে৷ এক টার পর এক সিগারেট ধরাতে লাগল প্রমীত৷ সিগারেটের ধোঁয়ায় ভরে উঠল ছাদ৷ প্রমীতের মনে হল তার ছাড়া ধোঁয়ায় চাঁদ ঢাকা পড়েছে৷ এক টার পর এক পোঁড়া সিগারেট ছুড়তে লাগল চাঁদের দিকে৷ চাঁদ যেন পুড়ে ছাই হয়ে যাচ্ছে প্রমীতের সিগারেটের ছেঁকায়৷ একটা পরম তপ্তি অনুভব করল সে৷ চাঁদ কে টেনে নামাতে না পারলেও প্রমীতের মন থেকে অহঙ্কারি মহুয়ার ছবি মুছে যেতে লাগল৷ চাঁদের সঙ্গে যুদ্ধ করে ক্লান্ত প্রমীত নিচে নেমে এল৷ মা দেখল এই শীতের রাতেও প্রমীতের মাথা দিয়ে ঘাম ঝড়ছে৷