চাওয়া-পাওয়ার স্রোতে


কাল ২-রা ডিসেম্বর। তমোসা আর দেবেশের ২৫তম বিবাহবার্ষিকী। তবে ওরা দুজনেই এখন একে অপরের থেকে বহু দূরে। চাকরি সূত্রে দেবেশ অনেক কাল আগেই লন্ডনে পাড়ি দিয়েছে আর তমোসা? না! সে কলকাতাতেই রয়ে গেছে, নিজের পুরনো ফ্ল্যাটে। ওদের একমাত্র ছেলে অর্ণব ছোট থেকে কলকাতাতে তমোসার কাছেই মানুষ। সাইকোলজি নিয়ে পড়াশোনা শেষ করে এখন সে এই শহরেই চাকরি করছে।
তমোসা আর দেবেশের মধ্যে যে একটা দূরত্ব রয়েছে, সেটা অর্ণব কখনোই বোঝেনি। ছোট থেকে সে জেনে এসেছে যে তার বাবা-মায়ের বিয়ের পর থেকেই কাজের সূত্রে দেবেশ দেশের বাইরে থাকে এবং তমোসার সঙ্গে অর্ণব থাকে এখানে। ফলে, ছোট থেকে নিজের বাবা-মাকে একসঙ্গে না পাওয়ার সেই আক্ষেপ কিছুটা ঘোচাতে ওর ইচ্ছে, এবার বাবা-মায়ের ২৫তম বিবাহবার্ষিকী তাদের সঙ্গে একই জায়গায় থেকে একসঙ্গে উদযাপন করা। সন্তান হিসাবে এত বছর ধরে অর্ণবের অনেক ইচ্ছেই অধরা থেকে গেছে সুতরাং ছেলের এই ইচ্ছা পুরণ করতে দেবেশ তার স্ত্রীর সঙ্গে শুধুমাত্র প্রাকৃতিক দূরত্বটা কমিয়ে আবারও এই শহরমুখি হল।
এয়ারপোর্ট থেকে গড়িয়ার ফ্ল্যাটে যাওয়ার সময়, দেবেশ ট্যাক্সির জানালার কাচের অপর দিক দিয়ে দেখতে পাচ্ছিল রাস্তার হলদে স্ট্রিটলাইট গুলো যেন ক্রমশ কুয়াশায় ঢেকে যাচ্ছে আর বাইরে কনকনে ঠাণ্ডা হাওয়ার সঙ্গে দূর থেকে কানে ভেসে আসা মাইকে গান যেন ডিসেম্বর মাসের এই চেনা শহরটা-কে তার কাছে অচেনা করে তুলছে। ট্যাক্সিটা যখন ফ্ল্যাটের সামনে এসে দাঁড়াল, তখন ঘড়িতে বাজে রাত ৮টা। কিন্তু গোটা পাড়ার জনমানবহীন অবস্থা আর নিস্তব্ধতা, ওই সময় দেবেশকে আরেকবার মনে করিয়ে দিল যে ডিসেম্বর আদতে পুরাতন-কে ভুলে নূতন-কে স্বাগত জানানোর মাস, তাই তাকেও এটা মানতে হবে।

অনেক বছর আগের কথা। তখন তমাশার জীবনে পুরুষ বলতে ছিল একমাত্র দীপ, ওরফে দীপায়ন সরকার। কলেজে পড়াকালীন ওদের মধ্যে বন্ধুত্বের সম্পর্ক থাকলেও, পরবর্তী সময় সেই সম্পর্ক খুবই ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠে। তখন তমোসা পড়াশোনা শেষ করে চাকরি খুঁজছে আর দীপ নিজের স্বপ্ন তথা গানবাজনা নিয়েই বেশি মত্ত। ছোট থেকে ওর স্বপ্ন ছিল বাংলা গানের ব্যান্ড তৈরি করবে এবং সেই নিয়েই নিজের ক্যারিয়ার গড়বে। ফলে, জীবনের নানা সমীকরণ এবং সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার এই অসীম লড়াইতে সামিল হতে গিয়ে ওদেরও বাকি আর পাঁচটা কলেজ প্রেমের মতো সেই একই কঠিন বাস্তবের সম্মুখীন হতে হয়েছিল। তমোসার বাড়ি থেকে ওর ইচ্ছার বিরুদ্ধে বিয়ে ঠিক করে ফেলা হল এবং সেই নিয়ে প্রায় রোজই তখন বাবা-মায়ের সঙ্গে তমোসার ঝামেলা চলত।
– আমি বিয়ে করতে পারব না, মা।
– তোকে করতেই হবে। এটা ছাড়া আর কোন উপায় নেই তোর।
– আমি কিছুতেই অচেনা মানুষকে বিয়ে করতে পারব না। যাকে এতদিন ধরে ভালোবেসে এসেছি, তাকেই বিয়ে করব, নইলে নয়।
– ভুলেও ভালোবাসার কথা মুখে আনিস না। তোর বোঝা উচিত ছিল বাড়ির কেউই লাভ ম্যারেজটা পছন্দ করে না। এটা আমাদের বাড়ির নিয়মের বিরুদ্ধে।
– তোমাদের কি মনে হয়, দীপ-কে ছেড়ে আমি অন্য কাউকে বিয়ে করলে সুখী হব?
এর উত্তরে বাকি আর পাঁচটা মেয়েকে যা শুনতে হয়, তমোসাকেও তাই শুনতে হল। হ্যাঁ! বাস্তবটা মেনে নেওয়া ছাড়া আর কোন উপায় নেই। তমোসাও পারেনি নিজের পরিবারের বিরুদ্ধে গিয়ে বিয়েটা ভাঙতে। ফলে, নতুনকে মাল্যদান করে নিজের জীবনে তাকে স্বাগত জানাতে হয়েছিল। বিয়ের পর অবশ্য তমোসাকে দেবেশের সঙ্গে লন্ডন চলে যেতে হল এবং ওখানে গিয়ে তারা দাম্পত্য জীবন বেশ আনন্দেই কাটাচ্ছিল। কিন্তু ভাগ্য যে অন্য কিছু লিখে রেখেছিল ওর কপালে। হ্যাঁ! শ্বশুরের হঠাৎ মৃত্যুর কারণে তমোসাকে নিজের শাশুড়ির দেখভাল করতে আবারও এই দেশে ফিরে আসতে হল।
চাকরির কারণে দেবেশ ওই সময় ৬-মাস বাদে একবারই নিজের পরিবারের সঙ্গে সময় কাটাতে কলকাতায় আসতে পারতো আর দেবেশের এই দীর্ঘ না থাকার অভাবটাই তমোসার জীবনে যেন ক্রমশ এক শূন্যতা সৃষ্টি করছিল।
এতকিছুর মধ্যে দীপ হয়ত আমাদের কথার মাঝে হারিয়ে গেছিল। বলা ভালো সে সময়ের কালে হারিয়ে গেছিল। তমোসার বিয়ে ঠিক হয়ে যাওয়ার খবরটা সে পেয়েছিল তমোসার থেকেই এবং কথাটা শোনার পর দীপ একেবারেই স্তম্ভিত হয়ে গেছিল। দিনের শেষে ওই অস্তগামী সূর্যটা যেমন করে নদীর কোলে মাথা রাখে, ঠিক একই ভাবে তমোসার কোলে দীপ মাথা রেখে, রাগে দুঃখে কান্নায় ভেঙ্গে পড়েছিল। সে স্বপ্নেও ভাবতে পারেনি যে তমোসা তাকে ছেড়ে অন্য কারোর সঙ্গে ঘর বাঁধবে। নিজের প্রাণের চেয়েও প্রিয় দীপ-কে ওই অবস্থায় দেখে তমোসা একবার ভেবেছিল দেবেশের সঙ্গে কথা বলে সে এই বিয়ে থেকে নিজেকে পিছিয়ে আনবে কিন্তু দীপ তা হতে দেয়নি। কারণ সে জানত ওই মুহূর্তে তমোসাকে বিয়ে করা তার পক্ষে সম্ভব নয়। তার পায়ের নীচের মাটিটা যে তখনো মজবুত হয়নি যার জন্য ভালোবাসার বাঁধন থেকে সে তমোসাকে একেবারে ওইদিন মুক্ত করে দিয়েছিল। দীপ তাকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে দেখে তমোসার খুব রাগ হয়েছিল। সেই রাগে ও দীপকে বলেছিল,
– তুই কী সত্যি আমায় ভালবাসিস দীপ? কীভাবে পারছিস আমায় দূরে সরিয়ে দিতে?
জবাবে দীপ ওর তমোসাকে বিদায় জানিয়ে বলেছিল-
মনমরা শহরটা ডুববে স্মৃতিমেদুরতায়,
আবারও হয়ত দেখা হবে, চেনা আবেগের ভিজে রাস্তায়।
যতই আঙ্গুলের ফাঁক দিয়ে গলে যাক না সময়,
বারবার ফিরবি তুই, আমার সাদা পাতার এলোমেলো লেখায়।

কলকাতা ফিরে আসার পর, ডাক্তারের প্রেসক্রিপশন, ওষুধ আর শাশুড়ির দেখভাল করেই তমোসার সময় কাটত সুতরাং আর পাঁচটা গৃহবধুর মতো তারও হাজার ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও নিজের কথা ভাবার অবকাশ ছিল না। কিন্তু আবারও একদিন অসময় বৃষ্টির মতো ওর জীবনের ফেলে আসা অতীতের খাতা থেকে হঠাৎ ওর সামনে উঠে এসে দাঁড়াল দীপ।
ব্যান্ডের ভূত নিজের ঘাড় থেকে নামিয়ে, দীপ এখন মন দিয়েছে গান লেখায়। এক সঙ্গীত পরিচালকের অধীনে সে এখন গান লেখে। রোজগার মন্দ নয়, তবুও সে বিয়ে করেনি সুতরাং দীপ একাই থাকে নিজের উত্তর কলকাতার ফ্ল্যাটে। এতদিন পর দেখা হওয়া সত্ত্বেও দীপ পুরনো কথা ভেবেই হয়ত তমোসাকে কিছুটা ইচ্ছাকৃত ভাবে এড়িয়ে যেতে চেয়েছিল কিন্তু রাস্তায় একজন মহিলা হঠাৎ যদি কোন চেনা পুরুষের সামনে এসে দাঁড়ায়, তখন অধিকাংশ পুরুষের পক্ষে তাকে উপেক্ষা করা সম্ভব হয় না, যেমনটা সম্ভবপর হয়নি দীপের ক্ষেত্রেও।
এতদিন পর আবারও তাদের মুখোমুখি হওয়া এবং দৈনন্দিনের ওই ক্লান্ত শরীরটা নিয়ে যখন তমোসা ওর দিকে তাকালো, তখন দীপ আর নিজেকে সামলাতে পারল না। সেই চাওনি থেকে সে কিছুটা আন্দাজ করতে পেরে তমোসাকে জিজ্ঞেস করল,
– তুই কী ভালো নেই?
একেবারে শুরুতে এই প্রশ্নটা হয়ত তমোসাও আশা করেনি ফলে, নিজেকে আর নিজের মধ্যে আটকে রাখতে না পেরে সে দীপকে জড়িয়ে ধরে হাউ হাউ করে কেঁদে ফেলল।
– আমি ভালো নেই, দীপ। একা থাকতে থাকতে আমার একাকীত্ব আমাকে গ্রাস করছে।
– কেন? তোর পরিবার? তারা সকলে থাকতে তুই একা কেন ভাবছিস নিজেকে?
– (একটু ব্যাঙ্গ করে বলল তমোসা) পরিবার? ভালো বলেছিস, দীপ। এখন আমার একমাত্র কাজ হচ্ছে শাশুড়ির দেখভাল করা। নিজের বাবা-মায়ের কাছেও যাওয়ার সময় হয় না।
– আর তোর স্বামী? সে কোথায়?
– দেবেশ আর নেই রে। লন্ডনে ওর গাড়ি দুর্ঘটনায় মৃত্যুর পরই আমি কলকাতায় ফিরে আসি।
হ্যাঁ! এই প্রথম মিথ্যের আশ্রয় নিল তমোসা। স্বামীর ওপর অভিমান ও নিজের একাকীত্ব থেকে নিজেকে টেনে বের করে আনার এটাই তার কাছে শ্রেষ্ঠ উপায় বলে মনে হল। সেদিন বাড়ি ফিরে তমোসার এক মুহূর্তের জন্য হলেও নিজের এই ভুলের কারণে অনুশোচনা হয়েছিল ঠিকই কিন্তু পরের মুহূর্তেই সে নিজেকে এটা বলে সান্তনা দিয়েছে যে পুরো ঘটনাটা হয়ত নিয়তিই তাকে দিয়ে ঘটিয়েছে, তা না হলে এতদিন পর হঠাৎ করে দীপ তার সামনে এসে দাঁড়াত না। নিয়তি হয়ত দীপের মাধ্যমে ওর একাকীত্ব দূর করতে চাইছে, যার সঙ্গে ওর এক সময় ভালোবাসার গাঁথা নিয়তির কারণেই রয়ে গেছিল অধরা।
ওইদিনের পর প্রায় দু-মাস কেটে গেছে, দীপ আর তমোসার মধ্যে এদিকে মেলামেশাও যেন সময়ের তালে ধীরে ধীরে বাড়তে লেগেছে। ফেলে আসার সময়ের চেয়েও আজকের সময়টা তমোসাকে আরও যেন দীপের কাছে এনে দিয়েছে। এখন রাতে একাকীত্বের কারণে তমোসাকে আর বালিস ভেজাতে হয় না। পরিবার সম্মন্ধে বা স্বামীর সঙ্গে কাটানো দিনগুলো নিয়ে কখনোই তমোসা দীপকে কিছু বলতে চাইত না। আর দীপও সেইসব বিষয় তমোসাকে কিছু জিজ্ঞেস করে বিব্রত করত না বরং নিজের বুকে সবসময় ওকে আশ্রয় দিয়েছে।

অনেকক্ষণ ধরে ফোনটা বেজে যাচ্ছে দেখে নিজের অনিচ্ছা থাকা সত্ত্বেও ফোনটা তুলল তমোসা।
– হ্যালো!
– বউমা, তুমি কোথায়? এখনো ওই বাড়ি থেকে বের হওনি?
– না, মা। আজ ফিরতে একটু রাত হবে। আসলে বাবা খুব জোর করছে, তাই এখান থেকেই আজ খেয়ে ফিরব।
– তোমার বাবা-মায়ের শরীর ভালো আছে তো?
– হ্যাঁ! মা। ভালো আছে। রমাকে বলে দিয়েছি,ও আপনাকে খাইয়ে শুয়ে দেবে। আর আমি না ফেরা অবধি ও আপনার কাছেই থাকবে।
– আচ্ছা! বউমা, রাখছি।
কথা শেষ করে ফোনটা টেবিলটার ওপর রাখল তমোসা। দীপের চোখ দুটো তখন স্থির ভাবে চেয়ে আছে তমোসার দিকে। ওই মুহূর্তে ওরা যেন একে অপরের গরম নিঃশ্বাস অনুভব করতে পারছে। নিজের বাঁ হাতটা তমোসার গালে রেখে দীপ, নিজের আরও কাছে ওকে টেনে নিয়ে বলল,
– তুই এখনো আমায় সত্যি মন থেকে ভালবাসিস?
– হঠাৎ এই প্রশ্ন?
– কেন, তোর কী মন নেই?
– আছে হয়ত, জানি না। সেই মনটা কেউ তো আর খুঁজল না।
– আমি খুঁজেছিলাম, তমোসা। আজও খুঁজি।
– কী হবে খুঁজে? শরীরটা তো আজ প্রতিটা সেকেন্ড পেয়েছিস।
– মনটাও তো এই শরীরের তমোসা। তোর শরীরের প্রত্যেকটা ভাঁজে ভাঁজে আমি আজ মন খুঁজেছি। তোর চোখে ভালোবাসা খুঁজেছি, তোর গায়ের গন্ধে মাদকতা খুঁজেছি, তোর ভেজা ঠোঁটে নতুন স্বপ্ন খুঁজেছি।
– এবার থাম, দীপ।
– কেন থামতে বলছিস আমায়? কতদিন আর চুপ করে থাকব তমোসা? তুই কী আজকাল ভালোবাসা মানে শুধু শরীর বুঝিস?
– দেবেশ আমায় খুব ভালোবাসত। মন প্রাণ দিয়ে ভালোবাসত। শুধু…।
– থামলি কেন? শুধু কি?
– ছাড় না। ওসব কথা এখন থাক।
– আবার সংসার করতে ইচ্ছা হয় না, তমোসা?
– মন, শরীর দুটোই লাগে সংসারে। দুটোর মধ্যে একটা না থাকলে, সেটার কোন মানে দাঁড়ায় না দীপ।
– আমার দিক থেকে দুটোই আছে। আচ্ছা! দেবেশ যখন আর পৃথিবীতে নেই, তখন কেন ওর স্মৃতি আঁকড়ে ধরে তুই নিজের জীবনটা এইভাবে শেষ করে দিবি বলতে পারিস?
– তোর সব কথা বুঝতে পারছি, কিন্তু?
– কিন্তু নেই তমোসা। এখানে কোন কিন্তু নেই।
– সব প্রশ্নের উত্তর দেওয়া সম্ভব নয়, দীপ। জীবন অনেক পাল্টে গেছে।
– কোন কিছুই পাল্টায়নি। সবকিছু জানার পরও, আমার প্রত্যেকটা রাত, প্রত্যেকটা দিন শুধু তোর তমোসা। তুই চেষ্টা করলেই পারবি।
উত্তরটা হয়ত তমোসা চেয়েও দীপকে দিতে পারল না। চোখের কোন দিয়ে কখন যে জল বেরিয়ে পড়েছে তার টের টুকু পাইনি সে। দীপের হাতটা শক্ত করে চেপে ধরে ওর কপালে নিজের ঠোঁটের স্পর্শ দিয়ে তমোসা অনেক কিছু বুঝিয়ে দিল। গ্রীষ্মকাল হলেও হোটেলের রুমটা ছিল শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত সুতরাং কম্বলের তলায় প্রাপ্ত বয়স্ক দুজন মানুষ একে অপরকে জড়িয়ে যেন ভালোবাসার একেবারে অন্তিম চূড়ায় পৌঁছতে চাইছে। কিন্তু সত্যি কি ওদের মধ্যে প্রেম আছে? ভালবাসার সম্পর্ক কি আদৌ আছে? নাকি একজন নিজের অজান্তেই অপরজনের সঙ্গে সময়ের তালে ক্রমাগত অবৈধ সম্পর্কে লিপ্ত হয়ে চলেছে, যেখানে একাকীত্ব দূর করাই হল অপরজনের মূল লক্ষ্য।

সেদিন ছিল দীপের প্রথম একক মিউজিক অ্যালবামের লাউঞ্জ পার্টি। পার্ক স্ট্রিটের নামী রেস্তোরাঁয় পার্টির আয়োজন করা হয়েছিল। অসুস্থ শাশুড়ির জন্য তমোসা সারারাত জেগে থাকা সত্ত্বেও দীপের জন্য সে পার্টিতে এসেছিল। কিন্তু হঠাৎ তমোসা অসুস্থ বোধ করায়, দীপ অনুষ্ঠানের মাঝেই বেরিয়ে যেতে বাধ্য হল। তমোসাকে নিয়ে সে নিজের ফ্ল্যাটেই গেল এবং ঢুকতে না ঢুকতেই, তমোসা মুখে দুটো হাত চেপে বাথরুমের দিকে ছুটল। দুপুরে যা খেয়েছিল সবটাই সে বমি করে ফেলল। দীপ সঙ্গে সঙ্গে জল দিয়ে ওর মুখ ধুয়ে, টাওয়েল দিয়ে মুখটা মুছিয়ে ওকে ধরে বিছানায় এনে বসাল।
– বমিটা করে এখন একটু বেটার লাগছে? (জিজ্ঞেস করল দীপ)
– হ্যাঁ। তবে আমার কিছু বলার আছে তোকে।
– বল…।
– আমি প্রেগন্যান্ট, দীপ।
– কি বলছিস? (আকাশ থেকে পড়ার মতো করে জিজ্ঞেস করল দীপ)
– হ্যাঁ! দীপ। পরশু টেস্ট করিয়েছি। দুটো দাগ এসেছে।
– তুই আগে এটা আমায় বলিসনি কেন?
– আমি বুঝতে পারছিলাম না কি করব। ভেবেছিলাম তুই হয়ত রাগ করবি।
– রাগ? কেন? এটা তো আনন্দের খবর রে। আজ আমি খুব খুশি।
– কিন্তু আমি এই বাচ্চা রাখতে চাই না, দীপ। সমাজে আমাদের সম্পর্কের কোন স্বীকৃতি নেই।
– এই বাচ্চার ওপর শুধু তোর নয়, আমারও সমান অধিকার আছে। আমি চাই বাচ্চাটা রাখতে। আর তাছাড়া আমি অনেক আগেই তোকে বলেছি নিজের পরিবারকে সব খুলে বল। আবার নিজের জীবনটা সাজাবার তোর সম্পূর্ণ অধিকার আছে।
– তুই সবটা জানিস না। আমার শাশুড়ি…।
– আর কিছু জানতে চাই না। এইসব নিয়ে পরে আলোচনা করা যাবে। আমি কালকেই একজন ভালো ডাক্তারের সঙ্গে অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিয়ে রাখছি। তোকে এখন থেকে খুব সাবধানে থাকতে হবে।
তমোসা হা করে দীপের চোখের দিকে চেয়ে রইল। ওর মুখ থেকে কোনও কথা আর বেরল না। নিজের ঠোঁট দুটো আলতো করে দীপের ভেজা ঠোঁটে রাখল তমোসা এবং দু-হাত দিয়ে চেপে ধরল ওর মুখটা। এই মুখটা-কেই তো কিছু বছর আগে ও ভালোবেসে ছিল। কিন্তু বর্তমান সময় শরীরের খেলায় যে কখন মনটাও ধীরে ধীরে জড়িয়ে পড়ছে, তার টের পায়নি তমোসা। তমোসার কাছে দীপ ছিল কেবল একটা খেলনা মাত্র, নিজের বিয়ের অপ্রাপ্তি গুলো সে পূরণ করতে আসত ওর কাছে প্রতি মুহূর্তে।
– (তমোসাকে ট্যাক্সিতে উঠিয়ে দিয়ে দীপ বলল) কাল আমার সঙ্গে ডাক্তারের কাছে যাবি তো?
মাথা নেড়ে ট্যাক্সির কাচটা উঠিয়ে দিল তমোসা। অনেকক্ষণ আগেই ট্যাক্সিটা রাস্তার শেষ প্রান্তে গিয়ে মিশে গেছে কিন্তু তখনো রাস্তায় ওই একই স্থানে দাঁড়িয়ে ছিল দীপ, মঘ্ন নিজের অলিক স্বপ্নে।

স্বামী দেবেশের অনুপস্থিতিতে তমোসার মিথ্যে দিয়ে তৈরি এই জীবনের এক একটা দিন এভাবেই দীপের সঙ্গে কাটছিল। কিন্তু পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করল যখন তমোসার শাশুড়ির মৃত্যুতে ওনার ছেলে তথা দেবেশ ফিরে এল দেশে। দেবেশ ফিরে আসায়, সমস্যায় পড়ল তমোসা।
দেবেশের সঙ্গে তমোসার বিয়ে হয়েছে প্রায় আড়াই বছর হয়ে গেল কিন্তু কোন সন্তান না থাকায়, ওদের দাম্পত্য জীবনে ভালবাসাটা যেন ক্রমশই ফিকে হয়ে আসছে। বিশেষ করে যখন দেশে ফিরে দেবেশ লক্ষ্য করল যে তার স্ত্রীর মধ্যে এক আমূল পরিবর্তন ঘটেছে। আসল কারণটা সেই মুহূর্তে দেবেশ জানত না সুতরাং নিজেকে দোষী ভেবে, সে তমোসার কাছাকাছি থাকার চেষ্টা করত এবং ওকে আরও বেশি করে সময় দিতে লাগল। স্বামীর কাছ থেকে অত্যাধিক ভালোবাসা পেতে পেতে তমোসা ধীরে ধীরে দীপকে ভুলে থাকার চেষ্টা করতে লাগল। সে বুঝতে পারত যে দেবেশের মতো কর্তব্য পরায়ণ স্বামী আর হয়ত সে পেত না। কিন্তু তাও ওর মনে শান্তি নেই। কি করেই বা থাকবে? কারণ এখন শুধু দীপ নয়, ওর গর্ভে ধীরে ধীরে বাড়তে থাকা সন্তানটাও যে ক্রমশ ওর জীবনটা জটিলতায় ভরিয়ে তুলছে।
এখন তমোসা সবসময় একটা ভয় নিয়ে থাকে। দীপের সঙ্গে দেখাসাক্ষাৎ সে অনেকটাই কমিয়ে দিয়েছিল। ফোনে কথা বললেও, আগের চেয়ে পরিমাণটা যথেষ্ট কম। হঠাৎ এই পরিবর্তন দেখে দীপের মনে সন্দেহ জাগে এবং সে সাময়িক কিছু আন্দাজ করতে পেরেছিল। তবে, এতদিন ধরে তমোসার মিথ্যে গল্পটা হয়ত তার পক্ষে অন্তত সেই দিনটার আগে অবধি বোঝা সম্ভব ছিল না। ‘সেইদিন’ অর্থাৎ তমোসার জন্মদিনের দিন, যখন দীপের সামনে প্রকৃত সত্যটা প্রকাশ পেল।
ওইদিন স্ত্রীর জন্মদিন পালন করতে দেবেশ তমোসাকে নিয়ে পার্ক স্ট্রীটের এক নামী রেস্তোরাঁয় গেছিল। হাল্কা কিছু গয়না আর দেবেশেরই দেওয়া নতুন একটা লাল শাড়ি পরে তমোসাকে দেখতে শুধু সুন্দর নয়, অতুলনীয় রূপবতী লাগছিল। রেস্তোরাঁয় ঢোকার মুহূর্তে তমোসার জায়গাটা বড্ড চেনা লাগল। কিছুক্ষনের মধ্যেই ও বুঝতে পারল যে এই একই রেস্তোরাঁয় সে কিছু মাস আগে দীপের সঙ্গে তার মিউজিক অ্যালবাম লাউঞ্জ পার্টিতে এসেছিল। একটু অস্বস্তিবোধ করলেও, স্বামীর জন্য সে ওই পরিবেশের সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিল।
ওদের জন্য বুক করে রখা টেবিলের সামনে গিয়ে যখন একটা কেক, কার্ড আর ফুলের তোড়া দেখতে পেল তমোসা, তখন সে ওই রেস্তোরাঁয় আসার আসল উপলক্ষটা বুঝতে পারল। নিজের ২৯তম জন্মদিনটাও তমোসা জীবনের নানা জটিলতার কারণে ভুলে গেছিল।
– হাপ্পি বার্থডে তমোসা।
– থ্যাঙ্ক ইউ দেবেশ।
– আর থ্যাঙ্কস জানিয়ে সময় নষ্ট করো না। এবার কেকটা কাটো।
– একা নয়, দেবেশ। একসঙ্গে কাটব তাহলে।
তমোসার ইচ্ছা মতোই হল, হাতে হাত রেখে ওরা কেকটা কেটে ফেলল। তমোসার পছন্দ মতোই খাবার অর্ডার করা হয়েছিল। সেদিন ওদের দেখে মনে হল এইরকম সময় ওরা অনেক দিন পর একসঙ্গে কাটাচ্ছে। হাসিঠাট্টা ও দেবেশের কথার মাঝে তমোসা হারিয়ে যাচ্ছে এমন সময় একজনকে দেখে সে চমকে উঠল। যেমনটা আরেকজনও হল তমোসাকে দেখে। সেই ব্যক্তি আর কেউ নয় সয়ং দীপ। হ্যাঁ! সেদিন ওই রেস্তোরাঁয় একটা গানের অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়েছিল আর সেই কারণে ওখানে এসেছিল দীপ।
রেস্তোরাঁর নেভা নেভা আলোতে সেইভাবে সবাইকে স্পষ্ট না দেখা গেলেও, ওরা দুজন দুজনকে ঠিকই চিনতে পেরেছিল আর তমোসার সঙ্গে দেবেশকে দেখে জীবনের দ্বিতীয় বৃহৎতম আঘাতটা হয়ত ওই মুহূর্তে পেয়েছিল দীপ।
এতদিন ধরে যে মিথ্যেটা তমোসা বলে আসছিল, তার বিন্দুমাত্র টের পায়নি দীপ। ওই সময় ওর মনে হচ্ছিল জীবন যেন ওর সঙ্গে পরিহাস করছে। হয়ত সে ঘুমের মধ্যে ওই দৃশ্য দেখছে এবং কিছুক্ষণ পর চোখ খুললেই সে যেন অন্য কিছু দেখতে পাবে। কিন্তু বাস্তবটা যে বড়ই কঠিন, সেটা হাজার মানতে না চাইলেও আমাদের মানতে হয়।

ওই রাতটা হয়ত তমোসা আর দীপের কাছে ছিল সবচেয়ে দীর্ঘ এবং কঠিনওতম রাত। দুজন দুজনের থেকে অনেক দূরে অথচ কারোর চোখেই ঘুম আসছিল না।
পরদিন সকালে দেবেশ ঘুমাচ্ছে দেখে তমোসা আর দেরি করল না। পাশের ঘরে গিয়ে সে দীপকে ফোন করল। প্রথমবার দীপ ফোনটা কেটে দিলেও, নিজের মনের মধ্যে উঁকি দেওয়া কিছু প্রশ্নের উত্তর পেতে সে দ্বিতীয়বার ফোনটা তুলল এবং ‘হ্যালো’ বলতেই অপর দিক থেকে তমোসার গলার স্বর ভেসে এল, নিজের একের পর এক বক্তব্য পেশ করতে থাকল।
– আমাকে ভুল বুঝিস না, দীপ। আমি তোকে সবটা খুলে বলতাম। আমি যে খুব ভালো আছি, এমনটা ভাবিস না। প্রতিদিন এইভাবে দুটো মানুষের মধ্যে ভাগ হতে হতে আমি সত্যি হাঁপিয়ে উঠেছি। আমি শেষ হয়ে যাচ্ছি।
– কিন্তু আমার সঙ্গে এই মিথ্যে খেলাটার কী খুব দরকার ছিল, তমোসা?
– আমি জানি আমি মিথ্যের আশ্রয় নিয়েছি কিন্তু ওই মুহূর্তে আমার কিছু করার ছিল না দীপ। তখন ভেবেছিলাম পরে তোকে সব বুঝিয়ে বললে তুই বুঝবি।
– কী বুঝবো, তোর এই ছলনা?
– না! রে, দীপ। আসলে কলকাতা ফিরে আসার পর আমি খুব একা হয়ে পরেছিলাম। দেবেশের অনুপস্থিতি-তে আমার জীবনে একটা শূন্যতা তৈরি হয়েছিল। আমার ফ্রাস্ট্রেটেড লাগত আর এর মধ্যে তোর সঙ্গে আবার দেখা হওয়ায়, নিজের বর্তমান ভুলে অতীতে ফিরে গেছিলাম। তখন বুঝতে পারিনি অতীত আর বর্তমান একসঙ্গে সামনে এসে দাঁড়ালে জীবনটা এতটাই ভয়াবহ হয়ে ওঠে।
– দেবেশের না থাকার শূন্যতাটা পূরণ করতে তুই আমাকে ব্যবহার করলি। এর মানে তুই আমাকে কোনোদিনও ভালোবাসিস নি। তুই দেবেশের কাছে না পাওয়াটা আমার মধ্যে রোজ খুঁজে গেছিস। প্রত্যেকটা মুহূর্ত তুই আমার মধ্যে ওকে খুঁজেছিস।
– যদি এই ভাবনাটা সঠিক হত, তাহলে আজ তোর সন্তানকে এইভাবে নিজের গর্ভে লালন পালন করতাম না। ভালো থাকিস দীপ। (এই বলে তমোসা ফোনটা রেখে দিল)
সেদিনের পর দীপের সঙ্গে আর যোগাযোগ বা দেখাসাক্ষাৎ কোনটাই হয়নি তমোসার। দীপ অধ্যায়ের ইতি ওখানেই ঘটল কিন্তু ওদের সন্তান?
কিছু মাস পর দীপ আর তমোসার সন্তান জন্ম নিল ঠিকই, কিন্তু পিতার পরিচয় পেল দেবেশ-এর। আরও স্পষ্ট করে বললে, ওইদিন ফোনে ওদের সমস্ত কথোপকথন দেবেশ পাশের ঘর থেকে শুনতে পেয়েছিল এবং কিছুদিন পর যখন তমোসা ওদের সন্তানকে জন্মের আগেই মেরে ফেলতে চেয়েছিল, তখন দেবেশই ওকে আটকেছিল। এই পুরো ঘটনা সম্মন্ধে যে দেবেশ আগে থেকেই অবগত, সেটা সে তমোসাকে ওইদিনই জানিয়েছিল এবং এটাও স্পষ্ট করে দিয়েছিল যে সন্তানকে নিজের নাম দিলেও, সে আর কোনোদিনও তমোসাকে ক্ষমা করতে পারবে না। আর পারেনি বলেই দেবেশ আবারও লন্ডন ফিরে গেছিল এবং অন্য দেশের অন্য শহরে বসে সে তার সমস্ত দায়িত্ব পালন করে গেছে। তমোসার সঙ্গে বিবাহ বিচ্ছেদ না হলেও, তার সঙ্গে সে কোন বৈবাহিক সম্পর্ক রাখেনি।
দেবেশের এই সিদ্ধান্ত মেনে নেওয়া ছাড়া তমোসার আর কোন উপায় ছিল না সুতরাং ছোট্ট সন্তানটিকে সঙ্গে নিয়ে সে কলকাতাতেই রয়ে গেল। প্রথমদিকে নিজের বাবা-মায়ের ফ্ল্যাটে থাকলেও, পরে বাবা-মায়ের অবর্তমানে তমোসা গড়িয়ায় ফ্ল্যাট কিনে চলে আসে এবং তারপর থেকে তমোসার কাছে জীবনের অর্থ হল, ওর একমাত্র ছেলে অর্ণব আর একটা শেষ হয়েও শেষ না হওয়া বৈবাহিক সম্পর্ক।

ওই রাতে সারা শহরটা তাড়াতাড়ি ঘুমের কোলে ঢোলে পড়লেও, গড়িয়ার সেই ফ্ল্যাটের দুই বাসিন্দার চোখে একটুও ঘুম নেই। অর্ণবের মনের আকাশে যেন সেই রাতে আতশ বাজির মেলা বসেছে। সারাদিন সে ব্যস্ত ছিল ঘর সাজাতে আর এখন সে অধীর আগ্রহ নিয়ে জানালার বাইরে তাকিয়ে, হয়ত অপেক্ষায়। হ্যাঁ! বাবার সঙ্গে এতবছর পর দেখা হওয়ার অপেক্ষায়।
খানিকক্ষণ পর কলিং বেলটা বেজে উঠল এবং বাবা এসেছে ভেবে দৌড়ে দরজাটা খুলতে গেল অর্ণব। দরজা খুলে দেবেশকে দেখে অর্ণব আবেগপ্রবণ হয়ে তাকে জড়িয়ে ধরল। পিছনে দাঁড়িয়ে থাকা তমোসাকে দেখে দেবেশ, ছেলের সামনে সাময়িক সৌজন্যতা দেখালেও, অতীতের কোন কথাই সে ভুলে যায়নি। ফলে, দীর্ঘ সময়ের পর স্ত্রীর কাছাকাছি এসেও, পুরো রাতটা সে ছেলের সঙ্গেই গল্প করে কাটালো।
পরদিন বাবা-মায়ের বিবাহবার্ষিকী উপলক্ষে অর্ণব অনেক কিছু প্ল্যান করেছিল কিন্তু সকালে ঘুম থেকে উঠে সে দেখে দেবেশ কোথাও একটা বেরনোর জন্য তৈরি হচ্ছে। যেই বিষয় তাকে প্রশ্ন করতেই দেবেশের উত্তর,
– শুধু আমি নই। তুমি আর তোমার মাও আমার সঙ্গে যাবে।
‘মা’ শব্দটা শুনে তমোসা একেবারে হকচকিয়ে গেল। এতো বছর ধরে যেই স্বামী শুধুমাত্র কর্তব্য পালন করে এসেছে এবং তার প্রতি ভালোবাসার ভাণ্ডারটি শূন্য করে রেখেছে। আজ সে-ই কিনা তাকে নিয়ে কোথাও বেরবে বলছে, এটা ভেবেই সে অবাক হয়ে গেছিল।
এরপর আর বেশি সময় নষ্ট না করে, তমোসা আর ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে দেবেশ বেরিয়ে পড়ল এক সত্যের মুখোমুখি হতে। কী সত্যি ওদের জন্য অপেক্ষা করছে, তা কিচ্ছুক্ষণের মধ্যেই প্রকাশ পেল যখন ওদের ট্যাক্সিটা এক মানসিক হাসপাতালের সামনে এসে দাঁড়াল।
ট্যাক্সি থেকে নেমে দেবেশ এগিয়ে গেল এবং সেখানকার দু-চারজন কর্মীর সঙ্গে কথা বলে যখন একটা ঘরের সামনে অর্ণব আর তমোসাকে নিয়ে গিয়ে সে দাঁড় করাল, তখন অপরদিকের মানুষটিকে দেখে তমোসা মাটিতে বসে পড়ল। একদম নিথর। কিচ্ছুক্ষণ ওই ভাবেই সে বসে রইল, মুখ থেকে তার কোন কথাই যেন ওই মুহূর্তে বের হচ্ছিল না। কিন্তু চোখের কোন দিয়ে অজস্র জল গড়িয়ে পড়ছে মাটিতে। তমোসার ঘোর কাটল তার ছেলের কথায়। সেই অপরদিকের মানুষটিকে দেখে তার মায়ের এই হঠাৎ মানসিক পরিবর্তন, কিছুই বোধগম্য হল না অর্ণবের সুতরাং বিশ্বের সমস্ত কৌতূহল নিয়ে সে দেবেশকে জিজ্ঞেস করল,
– উনি কে হন বাবা, যাকে দেখে মা এইভাবে ভেঙ্গে পড়ল?
– অর্ণব, জালের পিছনে দাঁড়িয়ে থাকা এই মানুষটা হল দীপ, তোমার আসল বাবা। এতদিন ধরে আমি শুধু তোমায় পিতার পরিচয়টাই দিয়েছি মাত্র।
কথাটা শোনা মাত্রই যেন অর্ণবের মাথায় বাজ ভেঙ্গে পড়ল। কথাটা যে ওকে এতটা নাড়িয়ে দেবে, সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু তাও সে নিজেকে কোনরকমে সামলে নিয়ে দেবেশের কাছে সমস্তটা জানার আগ্রহ প্রকাশ করল। আর দেবেশও এতদিন ধরে গোপন রাখা সেই অতীতের কালো অধ্যায়ের কথা অর্ণবকে খুলে বলতে লাগল।
অর্ণবকে সত্যের মুখোমুখি করানোটাই ছিল দেবেশের মূল লক্ষ্য তাই কলকাতার বাইরে থেকেও সে দীপের সন্ধান চালিয়ে গেছে। এতো বছর ধরে দীপকে খোঁজার পর যখন সে এই মানসিক হাসপাতাল ও দীপের বর্তমান অবস্থার কথা জানতে পারল, ঠিক তখনই অর্ণব তার বাবা ও মায়ের বিবাহবার্ষিকী পালন করার ইচ্ছা প্রকাশ করল। কাকতালীয় ভাবে দুটো ঘটনা একসঙ্গে হওয়ায়, সুযোগটা দেবেশের কাছে চলে এল এবং সেও আর দেরি করতে চায়নি কারণ দেবেশ মনে করে যে অর্ণব এখন সাবালক সুতরাং পরিবারের সমস্ত কিছু জানার অধিকার তার আছে। বিশেষ করে যখন এটা তার অস্তিত্বের প্রশ্ন। ফলে, উপলক্ষ বিবাহবার্ষিক হলেও, এবার দেবেশ এসেছিলই অর্ণবকে প্রকৃত সত্যের সন্ধান দিতে।
আসা যাক দীপের কথায়, তার এই পরিণতি সমন্ধে কেউই জানত না। একই শহরে থেকে এমনকি তমোসাও না। রেস্তোরাঁয় দেবেশ আর তমোসাকে একসঙ্গে দেখা এবং পরদিন তমোসার সঙ্গে ফোনের ওই কথোপকথনের পর দীপ মনের দিক থেকে ভীষণ ভাবে ভেঙ্গে পড়েছিল। সে একেবারেই মানতে পারেনি যে তমোসা এইভাবে তার সঙ্গে প্রতারণা করবে। তার মধ্যে অন্যের অভাবটা সে ক্রমাগত ভাবে পূরণ করার চেষ্টা করবে। দীপ ক্রমশ নিজেকে জীবনের মূল স্রোত থেকে সরিয়ে ফেলতে লাগল এবং ডিপ্রেশনে থাকতে থাকতে আজ তার ঠিকানা এই মানসিক হাসপাতালের ৪০৬ নম্বর রুম।
ফেরা যাক গল্পে, দেবেশের থেকে সমস্তটা শোনার পর অর্ণব নিজের মায়ের দিকে তাকাল ঠিকই কিন্তু না অর্ণব না তমোসা, কারোরই মুখ থেকে কথা বের হল না। অর্ণবের মনের অবস্থা সেই মুহূর্তে ভাষায় প্রকাশ করা প্রায় অসম্ভব। নিজের মায়ের কারণে আজ ওর জীবনের পুরো চিত্রটাই গেল পাল্টে। এতদিন ধরে যাকে ও বাবা ভেবে আসলো, সে আদতে ওর কেউই নয়। আবার উল্টোদিকে, ওর জন্ম দেওয়া বাবা আর মা আদতে একে অপরের কেউ হয় না। তাদের মধ্যে কোন বৈবাহিক সম্পর্ক কোনোদিনও স্থাপন হয়নি। ফলে, নিজের আসল পরিচয়টা ওর মনের মধ্যে নিয়েই অর্ণব একা চুপচাপ ওখান থেকে বেরিয়ে গেল।
ছেলের কাছে ক্ষমা চাওয়ার ইচ্ছা থাকলেও, ওর সামনে যাওয়ার সাহস পেল না তমোসা। দিনের শেষে একই ফ্ল্যাটে ফিরে এলেও, ওরা মনের দিক থেকে ছিল একে অপরের থেকে অনেক দূরে। ওই দিন তমোসার একটা মিথ্যে যেন শেষ করে দিল আজকের চার-চারটে জীবন। সঙ্গীতকে পেশা করে এগিয়ে চলা দীপ আজ একজন মানসিক ভারসাম্যহীন ব্যক্তি। স্ত্রীকে অসীম বিশ্বাস ও ভালোবাসা দেওয়ার পরও, দেবেশের কাছে নিজের দাম্পত্য জীবন বহুবছর আগেই প্রহসনে পরিণত হয়েছে। ছেলে অর্ণবের কাছে ওর নিজের সঙ্গে নিজের যুদ্ধটাই সবচেয়ে কঠিন। কারণ ওর মনের মধ্যে ক্রমশ নিজের অস্তিত্বের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন উঁকি দিচ্ছে। আর তমোসার? সে এখন অপরাধবোধে ভুগছে। একজন মা যখন তার সন্তানের চোখের দিকে চেয়ে কথা বলতে অক্ষম হয়, তখন সবচেয়ে বেদনাদায়ক মুহূর্ত বোধহয় সেটাই। আর এই বিষয়টা তমোসার মনে প্রতিনিয়ত কাঁটার মত বিঁধে চলেছে। তবু এইভাবেই বেঁচে থাকে কিছু সম্পর্ক। এইভাবেই চাওয়া-পাওয়ার স্রোতে এগিয়ে চলে জীবন। আর এইরকম হাজার হাজার গল্প রয়ে যায় আমাদের মাঝে, যেখানে কে দোষী এবং কে অন্যায়ের শিকার, সেটা আপাতত না হয় উহ্য থাক।

(সমাপ্তি)