পূর্বনারী

কাগজের অফিসের সম্পাদক রজতাভদার ওপরে সাংঘাতিক রাগ করে গালে হাত দিয়ে বসে আছে আকাশলীনা। পাশেই ল্যাপটপটা বোবা দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে ওর দিকে। সেটাও যেন সম্পাদকের সুরে সুর মিলিয়ে নিঃশব্দে সারাক্ষণ বলছে- “কি হ’ল আকাশলীনা? বলো, নতুন কিছু বলো, নতুন কোনও গল্প, নতুন কথা… পৃথিবীর সব কথা ,সব গল্প যে পুরোনো হয়ে গেল।”
রাগে নিজের মাথার চুল ছিঁড়তে  ইচ্ছে করছে আকাশলীনার।
প্রায় নয় মাস হ’তে চলল এই কাগজের অফিসে। এর মধ্যে একটা দিনের জন্যেও সম্পাদকের হাসিমুখ দেখেনি আকাশলীনা। রজতাভদার মতে- “এই সাংঘাতিক প্রতিযোগিতার বাজারে বস্তাপচা পুরোনো ঘটনা,পুরোনো গল্প কোনও লোক আর পড়বে না, নতুন স্টোরি চাই, একেবারে আলাদা কিছু, মানুষকে নতুন কিছু দিতে হবে।”
প্রতিদিন তার টীমকে ডেকে সম্পাদক একই লেকচার দেন-“নতুন কিছু ভাবো… নতুন কথা লেখো…সামথিং আউট অফ দ্য বক্স। না হ’লে কাগজ বিক্রী বন্ধ হয়ে যাবে, তখন তোমাদেরও চাকরি নট।”
 উফ্ফ্…. কি কুক্ষণেই যে জার্নালিজম নিয়ে পড়াশুনা করে কাগজের অফিসে চাকরি করার ভূত চেপেছিল মাথায়।
আকাশলীনা আর ভাবতে পারেনা। অসহ্য লাগছে।
আর সত্যিই তো… পৃথিবীটাও এত বোরিং হয়ে যাচ্ছে। সেই রামায়ণ-মহাভারতের আমল থেকে  মানুষের জীবনের চাঞ্চল্যকর ঘটনা বলতে তো সেই একই হত্যা, দুর্ঘটনা, নারী হরণ, ধর্ষণ, ভাই-ভাইয়ে ঝগড়া-যুদ্ধ ইত্যাদি। প্রেম প্রণয় ভালোবাসাতেও সেই একঘেয়েমি। দেশ কাল ভেদে ঘটনাগুলো একটু এদিক ওদিক হয় শুধু। নতুনত্ব আর কোথায়? আকাশলীনা যে কোথা থেকে নতুনত্ব খুঁজে আনবে?
“আন্তর্জাতিক নারী দিবসের” স্টোরি তৈরি করতে করতে এসব কথাই ভাবছিল আকাশলীনা। ওর নিজের রাইট আপটাও  যে একেবারেই বস্তাপচা ক্লিশেড্ লেখা হচ্ছে,সেটা ও নিজেও বুঝতে পারছিল।
 গত কয়েক বছরে বোধহয় পৃথিবীর প্রতিটি কাগজে এই ধরনের লেখা লক্ষ-লক্ষ বার ছাপা হয়েছে। বিষয়টিও তো সেই গতানুগতিক- “কয়েকজন সাধারণ নারীর অসাধারণ হয়ে ওঠার কাহিনী।” তবু প্রতিবছরই আন্তর্জাতিক নারী দিবস উপলক্ষে এরকম একটা লেখা তৈরি করতেই হবে ,তাতেও আবার নতুনত্ব চাই… ডিসগাস্টিং…
যাইহোক চাকরি বলে কথা। পছন্দ হোক না হোক কাজ তো করতেই হবে। তার ওপরে আছে ডেড লাইন। “উইমেন্স ডের” আগের রাতেই লেখা শেষ করা চাই।
“কয়েকজন সাধারণ নারীর অসাধারণ হয়ে ওঠার গল্প”
আকাশলীনা অবশ্য গত কয়েক দিন ধরে খুঁজে পেতে এরকম তিনজন মহিলার ইন্টারভিউ সেরে রেখেছে। যদিও ইন্টারভিউয়ের প্রশ্নগুলোও যেমন গতে বাঁধা, জবাবগুলোও ঠিক সেইরকমই। আলাদা আর কি হবে? তবুও ফাইনাল স্টোরিটা তৈরি করার আগে, একটা সিগারেট ধরিয়ে  আকাশলীনা তিন নারীর ইন্টারভিউগুলোতে আরেকবার চোখ বোলাতে শুরু করল…
“প্রথম জন রন্ধন পটিয়সী।” চন্দনা মিত্র। রান্নাবান্নাকে শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে গিয়ে বর্তমানে তিনি একটি ‘কুকিং ইনস্টিটিউট’ চালাচ্ছেন, যার খ্যাতি দেশে বিদেশে ছড়িয়ে পরেছে।
  তাঁর এই অসাধারণ সাফল্যের পেছনে ছিলেন তার এক কাকা। চন্দনা দেবীকে এই কাজে সর্বতোভাবে সাহায্য করেছেন সেই কাকাবাবুই। সফল এই নারীটি তার যাবতীয় কৃতজ্ঞতা ও ধন্যবাদ সঁপে দিয়েছেন সেইকাকাবাবুকে এই ইন্টারভিউয়ের মাধ্যমে।
 কথোপকথনটি পড়তে পড়তে আকাশলীনা ভাবছিল চন্দনাদেবীর সাধারণ থেকে অসাধারণ হয়ে ওঠার জার্নিটা র্মোটামুটি ইন্টারেস্টিং। অনেকটা স্বপ্নের “দরিদ্র থেকে ধনী” হয়ে ওঠার গল্পের মতোই।
পাঁচ বাড়ীতে রান্নার কাজ করতে যাওয়া মায়ের হাত ধরে সঙ্গে যেত বাচ্চা মেয়েটি। সেখানে বিভিন্ন বাড়ীর বিভিন্ন স্বাদ ও চাহিদা অনুযায়ী নানারকম রান্না করে মা যেন ম্যাজিক তৈরি  করতেন। মা একসময় সেইসব  রান্নাবান্না শিখেছিলেন তার নিজের মা অর্থাৎ চন্দনার  দিদার কাছ থেকে। মুগ্ধ হয়ে দেখত বালিকা চন্দনা। রান্না করার সময় মা যেন একজন নিপুণ শিল্পী। মায়ের কাজ দেখতে দেখতেই বাচ্চা মেয়েটির মনে রান্নার প্রতি ভালোবাসার জন্ম হয়। বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তাঁর গুন এবং রান্নাবান্নার প্রতি আগ্রহ ও উৎসাহ দেখে দুর-সম্পর্কের সেই  কাকাবাবু চন্দনাদেবীর পড়াশুনার ব্যবস্থা করে দেন। তাঁরই সাহায্য ও আনুকূল্যে আজ তিনি সাফল্যের এই জায়গায়  পৌঁছেছেন। সত্যি ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা তো কাকাবাবুর অবশ্যই প্রাপ্য।
দ্বিতীয় অসামান্যা “সৌদামিনী রায়চৌধুরী”। কনে সাজানো, তত্ব সাজানো বা সেলাই-ফোড়াই যে আজ একটা ইন্ডাস্ট্রি তে পরিণত হ’তে পেরেছে তার পেছনে সৌদামিনী দেবীর অবদান বিশাল। বর্তমানে এই সব বিষয়ে পড়াশোনা করে ডিগ্রি পাওয়া যায়, কর্মসংস্থানের সুযোগ হয়। সেটা খুব কম কথা নয়।
সৌদামিনী তার ইন্টারভিউতে  নিজের বাবাকে প্রায় ঈশ্বরের জায়গায় বসিয়েছেন। সত্যি তো, পিতার উৎসাহ ও অনুপ্রেরণাতেই তিনি বিদেশ গিয়ে  উপরোক্ত বিষয়ে পড়াশুনা করেছিলেন এবং দেশে ফিরে এত বড়ো মাপের কাজ করতে পেরেছিলেন। সুতরাং ইন্টারভিউ জুড়ে বাবার কথাই তো থাকবে…।
শুধু আলাপচারিতার ফাঁক-ফোকড় থেকে বোঝা যায় যে সৌমালিনী  এই গুণগুলি পেয়েছিলেন তাঁর বিধবা ঠাকুমা ও পিসীর কাছ থেকে। অসাধারণ প্রতিভাশালীএই দুই নারী তাঁদের অকাল বৈধব্যের  কারণে কনে সাজানো  বা তত্ব সাজানোর মত মাঙ্গলিক কাজগুলি করতে পারতেন না। সমাজ আজও এই সংস্কারের ঊর্ধ্বে উঠতে পারে নি। অতএব তাঁরা তাদের মন্ত্রগুপ্তি উজার করে দিয়েছিলেন আদরের নাতনী বা ভাইঝিটিকে।  ঠাকুমা ও পিসীমার শেখানো শিল্পচর্চার পথ ধরেই সৌমালিনীর  আজকের সাফল্যের যাত্রা শুরু হয়েছিল।

তিন কন্যার গল্পের শেষ গল্পের নায়িকা “রুমেলা সেনগুপ্ত”। ছোটবেলা থেকেই মামাবাড়িতে মানুষ হয়েছিলেন রুমেলা। এক ভয়াবহ পথ দুর্ঘটনায় তাকে হারাতে হয়েছিল বাবা ও মা দুজনকেই,একেবারে শৈশবেই। তারপর থেকেই এই ব্যবস্থা।
দাদু ছিলেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক। মামারাও নিজ নিজ ক্ষেত্রে বিশেষ কৃতী। দাদু ও মামাদের কাছ থেকে সবরকমের সাহায্য পেয়ে রুমেলা নিজেও বিজ্ঞানের কৃতী ছাত্রী।
তবে আজ তিনি প্রচারের আলোয় এসেছেন তার শিক্ষাগত যোগ্যতার কারণে নয়। একটি বাংলা ছবিতে রবীন্দ্রসঙ্গীত গেয়ে তিনি জাতীয় পুরস্কার পেয়েছেন।
তাঁর ইন্টারভিউতে রুমেলাদেবী জানিয়েছেন,পড়াশুনার সুযোগ করে দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দাদু ও মামারা তার অন্যান্য শখ,আহ্লাদ এবং প্রতিভাকে কতখানি উৎসাহ দিয়েছেন,সেই গল্প…।
কথায় কথায় অবশ্য জানা গিয়েছিল- কেমনভাবে শৈশবের প্রতিটি দিন রুমেলার ঘুম ভাঙত পূজোর ঘর থেকে ভেসে আসা দিদার কন্ঠের রবীন্দ্রসঙ্গীতের সুর শুনে। এমন কি বেলা বাড়ার সাথে সাথে রান্না ঘরের বাসনপত্রের  আওয়াজের মধ্যে দিয়ে ভেসে আসতেন রবীন্দ্রনাথ।
নাহ এই সমস্ত গল্পই পুরোনো হয়ে গিয়েছে। সবই বস্তাপচা সেন্টিমেন্ট… রজতাভদা নিশ্চয় লেখাটা ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে বলবেন- “নূতনত্বটা কোথায় এখানে? ” কি যে করে আকাশলীনা এখন…আর ভালো লাগেনা…
হঠাৎ বিদ্যুৎ চমকেরএকটা কথা আকাশলীনার  মনের মধ্যে ভেসে ওঠে – আচ্ছা তিনজন সফল নারীই  তাদের ইন্টারভিউয়ের মাধ্যমে দাদু বাবা মামা কাকা অর্থাৎ তাঁদের  পূর্বপুরুষদের সবিশেষ শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা জানালেন। সে শ্রদ্ধা অবশ্যই তাঁদের প্রাপ্য। কিন্তু তাঁদের এই সাফল্যের পেছনে প্রত্যেকের  দিদা, ঠাকুমা, মা-মাসী-পিসীর যে ভূমিকা এবং যে অসামান্য অবদান, সেই অবদানকে  সম্মান জানিয়ে বাংলা ভাষাকে নূতন একটা শব্দ উপহার দিলে কেমন হয়? শব্দটা যদি হয়-‘”পূর্বনারী”। আন্তর্জাতিক নারীদিবসকে সেলিব্রেট করার জন্য এর থেকে ভালো আর কি হতে পারে?
আকাশলীনা আন্তর্জাতিক নারী দিবস উপলক্ষে তৈরি  লেখাটার নাম দিল-“পূর্বনারী “।
পত্রিকার সম্পাদক রজতাভদা এবং বাংলা ভাষার পাঠক পাঠিকার নামটা  পছন্দ হবে তো?
*********
“পূর্বনারী” শব্দটি বাংলাভাষাকে উপহার দিয়েছেন কবি কৃষ্ণা বসু।তাঁকে আমার আন্তরিক শ্রদ্ধা জানাই।