১| ভালোবাসা প্রশ্নচিহ্নে

তোমার আলিঙ্গনের উষ্ণতায় জ্বলে পুড়ে ছারখার হয়ে
বুকের উতালপাতাল ঢেউ সমুদ্র মন্থন করে অনুভবে
তোমার চুলের ঘনঘটায় যেন ভালোবাসা আকাশ ঢাকে
বিদ্যুতের ঝিলিকের উপস্থিতি উঁকিঝুঁকি বাহুডোরে

নিঃশ্বাস-প্রশ্বাসে কথা বলে চুপিসারেই কানে কানে
নিঃশ্বাস বায়ুর উষ্ণতা পড়ে অহরহ প্রেমিকের বুকে
নিরাপত্তা বিশ্বাস যেন পথ খুঁজতে খুঁজতে কাঁধে
রঙিন স্বপ্নে বিভোর চারটি চোখ স্বপ্নের আকাশে
ভাসে

আরো কাছে টেনে নিয়ে বাহুডোরে আবদ্ধ হতেই
লজ্জায় রাঙ্গা মুখে ফুটে ওঠে সুখের অনুভূতি অচিরেই
অতৃপ্ত বাসনা কামনার আগুনে জ্বলে ওঠে নিভৃতে
দুটি দেহ মন নাগপাশে ভালোবাসার চরম মুহূর্তে
চিরদিনের মত সুখে দুঃখে সাথে থাকার অঙ্গীকারে
ভালোবাসায় অমৃত আছে বিষও আছে জেনেও
অপূর্ণতা সম্পর্কে দুঃখ কষ্ট মান অভিমানে ঘৃণা তিরস্কারে
কেন দুটি মন ভালোবাসে পরস্পরে একাত্ম হয়ে…?

২| সবজান্তা পাবলিক

আমি মানুষ খুঁজি মনুষ্যত্ব খুঁজিনা এই সমাজে
আমি সবজান্তা পাবলিক বুদ্ধিজীবীদের মাঝে
আমি অন্যের দোষ খুঁজে বেড়াই সমালোচনা করে
জ্ঞানের আলো জ্বালাই রাস্তাঘাটে চায়ের দোকানে আডডার ঠেকে
আমি সমালোচনা করি নেতা-মন্ত্রীদের কাজে
কাউকে সম্প্রদায়িক কাউকে দাম্ভিক বলি অকপটে
আমি ডাক্তার পেটাই পুলিশকে আহত করি ইট পাথরে
আমিই কখনো আইন অমান্য করে উপঢৌকন দি নিজেকে বাঁচাতে
আমি সাম্প্রদায়িকতার বিষ অহরহ ছড়াই সমাজে
হিন্দু মুসলমান নারী পুরুষ নির্বিশেষে
নারীকে বাধা দি মন্দিরে মসজিদে প্রার্থনাতে
মহামারীর দাওয়াই খুঁজে ফিরি বিভিন্ন ধর্মগ্রন্থে
সরকারি কর্মচারীকে অকর্মণ্য বলি শিক্ষক কে বলি
ফাঁকিবাজ
নিজ কাজ উদ্ধারে তাদের পায়েই আমিই তেল লাগাই
আমি উক্তি করি বুদ্ধিজীবীদের প্রতিবাদ না হলে
আমি পাবলিক সবজান্তা সমালোচনাকারী সরকারের কাজে
আমি সুযোগ খুঁজি সরকারি অনুদানের বিনা বাক্যব্যয়ে
আমি ট্যাক্স ফাঁকি দিই তথ্য গোপনে ভিন্ন অজুহাতে
আমি কাতর হই লকডাউনে শ্রমিকের কথা ভেবে
সকাল হতেই লাইন দি বাজারে ও মদের দোকানে সুনাগরিকের পরিচয়ে…

৩| প্রতিবন্ধী

মেয়েটি বাকরুদ্ধ জন্ম থেকেই শারীরিক ত্রুটি
মা অসহ্য যন্ত্রণায় কাঁদছে ‘মা’ ডাকে না সরস্বতী
মনের কষ্টগুলো কখনো কখনো অঝোরে কেঁদে জানায়
আকার-ইঙ্গিতে মনের ভাব কি সম্পূর্ণ প্রকাশ পায়?
দোষ দেবে কাকে ঐ ছোট্ট মেয়েটিকে না মা বাবা ?
অদৃষ্ট নিয়তি ভগবান শারীরিক ত্রুটি কে বসিয়েছে থাবা
প্রতিবন্ধী কে সমবেদনা জানালে কখনো বিরুপ প্রতিক্রিয়া
অপূর্ণতাকে স্মরণ করিয়ে যন্ত্রণায় কখনো ঘৃতাহুতি দেওয়া
প্রতিবন্ধী কে মেয়েটি না সমাজ?
সেও অধিকারী সমাজে সুস্থভাবে বাঁচার মৌলিক অধিকারে
কষ্টটা আরো দ্বিগুণ হয় যখন ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ চরমে ওঠে
অসহায়ত্বের অন্ধকারে হারিয়ে মানবিকতা মুখ ঢাকে
কখনো সময় হয়েছে ভাবার প্রতিবন্ধীরা কি চরম কষ্টে আছে !
ওরাও নাকি আলাদা স্পেশাল শিক্ষা ব্রেইল পদ্ধতিতে
ঠাঁই হয় কোন এনজিও বা স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনে
লড়াই করে বাঁচতে হবে প্রতিবন্ধকতাকে জয় করে
প্রকৃত শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে জীবনের বীজ মন্ত্র উচ্চারণে…

৪| পণ

তার নীলাম্বরী চোখে ধূসর রঙের মেঘ জমেছে
আকাশের বুক চিরে ঝড় বিদ্যুৎ সহ বৃষ্টি ঝরবে
আগুন রঙের বেনারসী শাড়িতে সেজেছে নববধু রূপে
আজ তার চিরবিদায় মায়া কাটিয়ে শ্বশুরবাড়ির পথে
দেনা পাওনার বেড়াজালে কন্যা দায়গ্রস্থ পিতা ঋণের ফাঁদে
আড়ম্বর জাঁকজমকে নববধূ বরণ উলুধ্বনিতে
কত আশায় কত স্বপ্নে বিভোর হয়ে ঘর বাঁধে
তাসের ঘরের মতো স্বপ্নগুলো ভাঙে কলহের জেরে
মাস ছয়েক কাটিয়ে সংস্কারের অভাবে আরও পণের লোভে
আরো নাকি টাকা চাই জামাইয়ের ব্যবসা মন্দা চলছে একনাগাড়ে
কণ্যা সেকথা জানালে দুশ্চিন্তায় বাবা-মায়ের ঘুম উড়ে গুমড়ে মরে
অত্যাচার লাঞ্ছনা-গঞ্জনা নিত্যদিন বেড়ে সীমা অতিক্রমের পথে

সহ্যসীমা কমে তলানিতে পিঠ ঠেকে দেওয়ালের কোণে
বাবা-মায়ের করুণ অসহায় অবস্থার কথা মেয়ে জানে
আকুতি মিনতি কান্নার গঙ্গা বয় কর্ণপাত করেনি কেউ
গৃহবধূর ঝুলন্ত মৃতদেহ উদ্ধারে অসহায়ত্বের ইতিকথা টানে

৫| হিসেব

অপূর্ণতার হিসাবটা অংক কষে খাতায় লিখে রাখা
যোগ বিয়োগের ফর্মুলা প্রয়োগে হিসাব মেলাতে চাওয়া
চাওয়া পাওয়ার হিসাব সব গুলিয়ে মিলছে না জীবনের অংক বড় জটিল
অপূর্ণ ইচ্ছে গুলো হঠাৎ স্বপ্নে ভিড় করে, অদৃষ্ট আড়ালে হাসিতে খিলখিল
ইচ্ছে অনিচ্ছেরা অনেক সময় আপোষ করে নেয়
মেনে নেওয়া আর মানিয়ে নেওয়ার অদ্ভুত খেলায়
সং ও সারের ইতিকথা রয়েছে ঘরবন্দী দেওয়ালে
জীবন খাতায় কাঁচা পাতায় উপন্যাস লিখে যায়
যন্ত্রণাগুলো খেলায় মেতে আছে মজ্জায় প্রতিটি কোষে
উপশমের ওষুধ সেবনেও একই কি অবস্থা শরীরে ও মনে
একটু একটু করে স্তব্ধ হচ্ছে জীবনের ছায়াপথ ফুরিয়ে
কখন না জানি ফুড়ুৎ করে উড়ে যায় অচীন পাখি অলীকে
শরীরে এই খাঁচায় মুক্ত মনের আসা-যাওয়া মুহুর্তে
দ্রুততম মন যা প্রতিমুহূর্তে বদলায় আপন খেয়ালে
ভাঙা গড়ার এই খেলায় অংশ নেওয়া নিয়তির পরিহাসে
হিসেবগুলো উল্টে-পাল্টে ব্যালেন্স শিট শূন্য রেখে
অদৃশ্য অঙ্গুলি হেলনে সবাই কাঠের পুতুল পৃথিবীর এই রঙ্গমঞ্চে

৬| সত্য-মিথ্যা

রেটিনায় কি ধরা পড়ে সব সত্য বা মিথ্যার ছবি,
সমাজের চোখে চামড়া পুরু হয়ে হয়েছে কি ছানি ?
বিশ্বাস অবিশ্বাসের পাল্লা দোলাচলে, কি উপায়ে মাপি ?
মিথ্যার আস্ফালনে সত্য মহাশূন্যে, শাক দিয়ে মাছ ঢাকি !
সত্য এখানে চোখের বালি অস্বস্তি বোধ পর্দাতে
দৃষ্টি হয়তো আবছা হয়ে ক-ফোটা জল গড়িয়ে পড়ে,
জলের সঙ্গে নোংরা পরিস্কারে যদি মৌলিক দৃষ্টি ফেরে
মুখোশগুলো মুখ ঢাকে ভ্রু কুঁচকে চোখের পর্দা টানে।
সত্য দাহ হয় অহরহ স্বার্থ যেখানে আত্মকেন্দ্রিক
মিথ্যার মুখোশ ছিঁড়ে ফেলার সাহস যেন ঐতিহাসিক
বিড়ালের গলায় ঘন্টা বাঁধার লোকের আজ বড়ই অভাব
মুখোশের আড়ালে মুখ ঢাকে চেনা গণ্ডির অচেনা স্বভাব !
দশ চক্রে ভগবান ভূত হয় দৃষ্টি কি সেখানে ঐচ্ছিক?
রিপু ইন্দ্রিয়ের কি বা দোষ ত্রুটি, তারাও এখন যান্ত্রিক!
দূষণে ভেজালে জর্জরিত সর্বত্র অস্তিত্বের লড়াই মৌখিক,
সত্য সর্বদা প্রমাণিত বিশ্বাস মিথ্যা এখানে মৌলিক…