জন্ম ঐতিহ্যমন্ডিত বাঁকুড়া জেলার সুপ্রসিদ্ধ সোনামুখী শহরের কাছাকাছি কামারগড়িয়া গ্রামে। বিশ্বভারতীর বাংলা বিভাগ থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন। পেশা শিক্ষকতা। কর্মসূত্রে দুর্গাপুর ইস্পাত নগরীর চন্ডীদাস এভিনিউ-তে স্থায়ীভাবে বসবাস। নব্বইয়ের দশক থেকে লেখালিখি শুরু। দুর্গাপুর শিল্পাঞ্চল, বিভিন্ন জেলা, কলকাতা সহ আসাম, ত্রিপুরা ও বাংলাদেশের কিছু পত্র-পত্রিকায় নিয়মিত কবিতা, গল্প, প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়। ইতোমধ্যে প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ: " কান পেতেছি উৎসমুখে" ( প্রান্তর প্রকাশনী, দুর্গাপুর )" নাবিক হব ঝড়ের পাখি" ( পাঠক, কলকাতা )।

উন্মুক্ত পাগলামি

(১)

আপোষ ঝরে পড়ছে অঝোর। উজবুক করা সোজা ভেবে কাদা ছিটিয়ে দিচ্ছে চড়ুই। দস্যি হাতের নাগালে নিহত দিবাস্বপ্ন। ঘরের আড়ালে গড়ে ওঠে ঘর। সীমানা টপকে দোল খাচ্ছে ভবিতব্য। শূন্যে ঘুরপাক খায় ভদ্রপল্লির ঈশ্বর। ফুসকুড়ির যন্ত্রণায় হামাগুড়ি আঁকে ঘিলুর কান্না। কথা বলার ধরন হালফিল আঁকড়ে ধরে আঁধার। তবুও মরার চেয়ে সোজা বাঁচা। অতএব পেটে খিল দিয়ে হাপুস রোদন।

(২)

বালির গর্তে রক্তদানের ক্যাম্প। বালির প্রাচীন কোনো স্তরে জল মাখছে রুধির। ফালা ফালা ইচ্ছেগুলো সটান দাঁড়িয়ে। রং বেরং আশ্রয় এখন বালির গর্তে। দশ বিশটা পড়ে পাওয়া চোদ্দ আনা খপাখপ্। আঙ্গুলের ভাঁজে জিরিয়ে নিচ্ছে স্পর্শদোষ। চলো ঝাঁকিয়ে নিই নগ্ন হওয়ার ফর্মুলা। সাড়ে তিন হাত ঠিকানা ওই বালির গর্তে।

(৩)

ইশারা অবাধ্য বড়ই। কখনো বাঁয়ে। কখনো ডাইনে। ইতিহাসের গল্প প্যাথেটিক হয় পেল্লাই ইশারার অবাধ্যতায়। হে রাজন্ অকুতোভয়ে বাঁচতে দাও। ভ্রু ভঙ্গিমায় সুরেলা সোনার কাঠির ছোঁয়া দাও। পরকাল ফর্সা করার আগে নষ্ট হওয়ার ধৈর্য দাও। বোহেমিয়ান অনুরাগ চারিয়ে দিলাম হাড় জিরজিরে নেতিয়ে যাওয়া মাচায়। ফিরে আসা, সে তো চলে যাওয়ার অনায়াস ইশারা।

(৪)

ফাঁপা কথায় গেঁথে দিয়েছি কিছু গর্জিয়াস শব্দ। রোগজীর্ণ হলেও দুধেল গরু বলে কথা। বাঁকা নদীর সোঁতায় ফাঁপা চলন বেমানান মনে হতেই পারে। দুরন্ত জলস্রোত নিজস্ব তালে থইথই। তুমি আমি আরও কেউ কেউ কেমন যেন! ফাঁকতালে গুঁজে দেওয়া চটুল সহবত মিশিয়ে দিলাম। কথা ছিল যাহা বলিব আদ্যন্ত সত্য বলিব। ধান ভানতে যারা শিবের গীত গায় আমি তাদের দলে। অতএব তুমিই আমার কাছে বাদশাজাদী। আজ সারারাত তোমার হারেমের ঘ্রাণ নেব। সফেন রাত্রি দীর্ঘজীবী হোক।

(৫)

মিথুন রাশিতে তুমি বসে আছো। আমি আছি ধনু রাশিতে। মাঝে খেয়া বাইছে ঈশ্বরী পাটনী। অর্ডিনারি শাড়ি পরা কিশোরী অন্নপূর্ণা লাজুক চোখে ঢেউ গুণছে। আমি জল হয়ে আড়নয়নে খেয়া নৌকার পাটাতনে সাঁতারে মেতেছি। আমাদের সন্তান রেস্টুরেন্টে ৫ নম্বর প্রেমিকাকে নিয়ে ফার্স্ট ফুডের মধু চুষছে। মিথুন রাশি ধনু রাশি সন্তানকে স্বত্ব দিয়েছে কন্যারাশির। মোচ্ছবে একাকার সম্পর্কের গোপন কথা। লাল হয়ে যাচ্ছে অন্নপূর্ণার শ্রীচরণ। ” ইয়ে লাল রং কব মুঝে ছোড়েগি”! নৌকা কিনারে বাঁধার আগেই তুমি ষোড়শী মহাকাল ঘরনী হয়ে বাড়িয়ে দিলে তুলোর মতো হাত। সুযোগ বার বার আসে না তো! আমিও টুক করে মেলে দিলাম আমার খামার চষা হাত। তোমার হাত ধরে হাঁটি হাঁটি পা পা। আমরা ভোর খুঁজতে চলেছি…..

(৬)

অবিশ্বাস ফুঁ দিচ্ছে পাগলামি। জোয়ান কাতরতার সর্পিল ঘুর্ণনে বাঁধা ঘোড়ার ডিম। হঠকারিতার প্রলাপে চান করছেন শাহেনশা। কিছু খুচরো কুটকাচালি হা ডু ডু খেলছে।রোজ সকালে পাগলা বিশু বিশ্বাস ছড়ায় মুঠো মুঠো। হরির লুট কুড়োতে ব্যস্ত পাগলের সারি। মেহেরজান বিবি ছাইমাখা বেড়াল ছানাকে খামোখা চুমু দিলেই স্ট্রীট ডগেরা চিৎকার করে ওঠে “ইয়ে যো মহব্বত হ্যায়…!
রাঁধন বাড়ন ফেলে তড়িঘড়ি রাধা ছুটছে কদমতলা। ঘাই মারা কায়দায় অবিশ্বাস্য চোখ স্নিগ্ধতা ঘাঁটে। কথা বলার ফতোয়া নিয়ে ছুটোছুটি মাপছে নির্জলা বাতাস। ঘরবন্দী টিকটিকির নট নড়ন চড়ন। এন. আর. সি-র ছাড়পত্র খয়রাতি করছে পাগলাগারদ।

(৭)

চাঁদের কিরণ জমা করছে ডাস্টবিন। অন্ধকারে মাসুল গুণছে ধেড়ে ইঁদুরের ধূর্তামি। চাঁদ কোনো বস্তু নয়। জাস্ট একটা থেরাপি। চাঁদামামা বলতেই কেঁপে ওঠে বুকের মাটি। ফুড়ুৎ করে লগনসা শ্বাস ছলকে
ওঠে। অ্যাডভান্স ভীমরতি চেপে ধরে চুপসে যাওয়া চোয়াল। খড়ের চালের বাতার ফাঁকে তরলমনস্কা জ্যোৎস্না গুঁড়ির উঁকিঝুঁকি। ঘরের জমাট আঁধার কামসূত্রের ড্রেসিং টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে রমনখুশ মুখ দেখছে। ডাস্টবিনের কিলবিল পোকারা গান গাইছে ” চাঁদ উঠেছে ফুল ফুটেছে…..”

(৮)

গাঁ গঞ্জ কোদাল ঝুড়ি কাঁখে নিয়ে শহরের পথ ধরেছে। জমি জিরেত গোয়াল বাথান বিধবার সাজে কপাল চাপড়াতে চাপড়াতে ছুটে চলেছে। ঝোপঝাড় বনবাদাড় থেকে বাস্তু জীবজন্তু বেরিয়ে এলোমেলো তালে কারবালার গান গাইছে। শিকড় ছিঁড়ে যাচ্ছে পটাং পটাং। নিমেষে গাঁয়ের মেঠো পথ হাঁ করা অজগর। আর পুকুরগুলো উড়ে যাচ্ছে নক্ষত্রের দিকে। গাঁ বলে কিছু ছিল নাকি কোনোদিন! কে জানে…..

(৯)

শহরের গায়ে হুড়মুড়িয়ে পড়ছে অজস্র শহর।
কানাগলির মৃতদেহ খুবলে খাচ্ছে ঝাঁকে ঝাঁকে চিল শকুন। চটকল তেলকল উপবাসী বহুদিন। গফুর জোলা শহরে এখন বাম্পার লটারির টিকিট বিক্রি করছে। আমিনা বিউটি পার্লারের দক্ষ শ্রমিক। শহরের রাজপথে প্রজাতন্ত্র দিবস প্রতিদিন। প্রজার হাড় পাঁজাকোলা করে তুলে নিয়ে যাচ্ছে অদৃশ্য কিছু ছায়ার অনুচর। একুশে আইনের সফল প্রয়োগে শহরে পথ থাকলেও পথিক নেই। একটানা সাইরেনের আওয়াজে গড়াগড়ি দিচ্ছে ঢাউস বহুতল। গাড়ি বারান্দায় লুকিয়ে আছে প্রগতির চাকা।

(১০)

পাগলে মিথ্যা কথা বলে না। ছাগলে ঘুষ খায় না। এই ভেবে মহর্ষি বৃক্ষসকল মনে মনে প্রার্থনা করছেন পাগল ছাগলে ভরে যাক চরাচর। অলস সময়কে বগলদাবা করে পাগল ভোলানাথ ষাঁড়ের পীঠে চড়ে শিঙ্গায় ফুঁ দিচ্ছে। অন্যদিকে ইস্রাফিলের বাঁশির তোড়ে কেয়ামত ওয়ার্ম আপ করছে। আমরা সবাই পাগল হব। পাগলামিতে মাতাবো জাহান! পাগল ছাগলে মিলে নতুন পৃথিবী গড়বো! তালিয়াঁ…..