১. পশ্চিমবঙ্গে দেগঙ্গাতে বনগাঁ থেকে ৫০ কি.মি দূরে অবস্থিত একটি স্বল্পখ্যাত প্রত্নতাত্ত্বিক ক্ষেত্র।
২. বাণী বসু তাঁর খনা মিহিরের ঢিপি গ্রন্থে লিখেছেন – “দুধারে পাটক্ষেতের থেকে ঢিবির উচ্চতা বড়জোর আট কি দশ ফুট।সরু পথ টানা চলে গেছে ওপর দিয়ে। দুধারে গাছ।বেলা গড়িয়ে যাওয়া মেঘলা সকালে ছায়া ছায়া সবুজ অন্ধকার গায়ে দিয়ে যেন ঘুমিয়ে রয়েছে ঢিবিটা”।
৩. লঙ হার্স্ট একদা লিখেছিলেন – “Another site more promising for excavation that the fort is mound known as Varaha Mihir’s house just to the north-east of the Berachampa railway station”…
৪. চন্দ্রকেতুগড়ের এই অংশটি খনা মিহিরের ঢিপি নামেই পরিচিত ছিল জনশ্রুতিতে। গুপ্তসম্রাট দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্তের সভা আলো করে থাকা নবরত্নের মধ্যে বিখ্যাত জ্যোতিষবিদ বরাহের পুত্র মিহির ও তাঁর স্ত্রী খনার নাকি বাড়ি ছিল ওখানে।

৫. লোককথা নিয়ে বিতর্ক বিস্তর।খনার অস্তিত্ব, পরিচয় নিয়েও বহু ব্যাখ্যা আছে ঐতিহাসিকদের মধ্যে। কারো মতে তিনি সিংহলি রাজকুমারী গণিত বিশারদ লীলাবতী। যিনি পরে খনা নামে বিখ্যাত হন। কারোও মতে খনা শব্দটি ক্ষণ বা ক্ষণজন্মা থেকে উদ্ভূত। আবার কেউ বলেন,খোনা বা বোবা শব্দ থেকে খনা নামটি এসেছে।
৬. খনার অস্তিত্ব নিয়ে যতই দ্বন্দ্ব বা ধন্দ থাকুক না কেন বেড়াচাঁপার কাছে চন্দ্রকেতুগড়ের এই ঢিপিটা খনন করে জ্যোতিষশাস্ত্রের সাথে সম্পর্কযুক্ত বিভিন্ন জিনিস যেমন চূণী, পান্না, পোখরাজ, মাটি ও পাথরের ফলকের ওপর রাশিচক্রের খোদাই করা ছবি পাওয়া গেছে।
৭. ১৯৫৬ – ৫৭ সালে আশুতোষ মিউজিয়ামের উদ্যোগ এখানে খননকার্য চালানো হয়। খননকারীদের মতে, এখানে আসলে একটি মন্দির ছিল এবং সেটি হয়তো বিষ্ণুমন্দির।
৮. প্রায় দেড়হাজার বছর আগে নির্মিত এই মন্দিরের চত্বর ৩০০ ফুট দীর্ঘ, প্রস্থে ১০০ ফুট, ৬৩ ফুট বিস্তৃত। এখানে থেকে ৩৭টি ধাপযুক্ত একটি ইঁটের গহ্বরও পাওয়া গেছে।

৯. একদল ঐতিহাসিকদের মতে চন্দ্রকেতুগড় শুঙ্গ রাজাদের অধীনে ছিল, যাদের নামকরণ হত বৈদিক দেবতাদের বা মিত্রদের নামে, যেমন পুষ্য মিত্র, অগ্নি মিত্র।
১০. চন্দ্রকেতুগড়ে পাওয়া মন্দির থেকে সূর্যদেবতার মূর্তি না পাওয়া গেলেও কুলঙ্গিতে পদ্মের নকশা পাওয়া গেছে। পদ্ম যেহেতু সূর্যের প্রতীক। আর মিহির শব্দের অর্থও যেহেতু সূর্য। তাই অনেক ঐতিহাসিক এটিকে বৈদিক যুগের সূর্যদেবতার মন্দির বলেছেন।
১১. শ্রীপারাবতের উপন্যাসে এই ঢিপিকে খনা মিহিরের ঢিপি আর তাঁদের চন্দ্রকেতুর সমসাময়িক বলেছেন। উপন্যাসের প্রয়োজনে খনা মিহির চন্দ্রকেতুর সময় উজ্জ্বয়িনী থেকে পালিয়ে আসেন বললেও এর ঐতিহাসিক ভিত্তি পাওয়া কঠিন। কারণ খনা, মিহির গুপ্তযুগের চরিত্র আর চন্দ্রকেতু ত্রয়োদশ শতাব্দীর।
১২. তবে মন্দিরটি গঠনশৈলীর সাথে গুপ্তযুগের আর্কিটেকচার সারনাথ ও নালন্দার মিল আছে। কালীপ্রসন্ন চট্টোপাধ্যায়ের ক্ষণা-মিহির নামক উপন্যাসে তাঁদের দেউলিয়া আসার উল্লেখ না থাকলেও গোটা বঙ্গদেশে শুধু এই স্থানকে কেন্দ্র করেই খনা – মিহিরের বাসস্থানের লোককথা প্রচলিত।

১৩. তবে খনার মত চরিত্র কিংবদন্তি হয়ে ওঠার একটা বড় সময় ধরে প্রচলিত বিশ্বাস জড়িয়ে আছে। বাংলার জলবায়ু, চাষাবাদ নিয়ে এতো গূঢ় অথচ সঠিক গণনা, প্রচলিত ছড়ার আকারে প্রবাদে পরিণত হওয়া কোনো একটি বিশেষ সময়কালের মধ্যে সীমাবদ্ধ হতে পারে না।
১৪. খনার অস্তিত্ব নিয়ে যতই বিতর্ক থাকুক না কেন এই খনা – মিহিরের ঢিপি ইতিহাস ও কিংবদন্তির মিশেলে প্রত্নতাত্ত্বিক ক্ষেত্র হিসেবে আজও বিস্ময়ের উদ্রেক করে আমাদের মনে।
১৫. প্রচলিত লোককথা, কিংবদন্তি কীভাবে ইতিহাসের উপাদান হয়ে উঠতে পারে খনা – মিহিরের ঢিপি তার একটি অবিস্মরণীয় উদাহরণ।
(ছবি সংগৃহীত)