পেশা : শিক্ষকতা , সংগীত শিল্পী । শিক্ষাগত যোগ্যতা :স্নাতকোত্তর , এম .ফিল । ভালোলাগা : গান ও কবিতা । রবীন্দ্রনাথ এর প্রতিটি গান এর দর্শন ও ইতিহাস বোঝা ও পড়া প্রায় নেশার মত । লেখা শুরু কলেজ থেকে । কবিতা ও গল্প প্রকাশিত হয়েছে বহু পত্রিকায় । ভালো লাগে অনুবাদ করতে । কিছু অনুবাদ কবিতা প্রকাশিত হয়েছে । নিজস্ব কবিতা বা গল্পের বই প্রকাশে এখনো আগ্রহী নই । হয়তো সেই মুহুর্ত এখনো আসেনি । এখনো সেই মুহূর্তের অপেক্ষায় ।

ঘরকন্না

আজকাল কড়িকাঠ বলে কিছু হয় না। আজকাল ঘুলঘুলি থাকে না, কুলুঙ্গি থাকে না, জাফরি কাটা চৌখুপি বারান্দাও থাকে না হয়ত। রুদ্রর এই সাড়ে চারশো স্কোয়ার ফিটের ওয়ান বি এইচ কে তেও নেই। রানিবাঁধের গ্রামের বাড়িটায় ছিল।ওখানে রুদ্র ওদের বর্ধমানের বাড়ি থেকে তার বাবা ও মা-এর সাথে যেত শীতের ছুটিতে।রুদ্রর ঠাকুমা, দাদু ও এক কাকা থাকতেন ওদের গ্রামের বাড়িতে।রুদ্রর বাবা চাকরি সূত্রে বর্ধমান।সারা বছর রুদ্র অপেক্ষা করত শীতের ছুটিতে রানিবাঁধ বেড়াতে যাওয়ার জন্যে।ওখানে গেলে সারাদিন ঠাকুমার আদর আর কাকার হাত ধরে টই টই করে ঘুরে বেরানোকী  ভাল লাগত রুদ্রর।আগেকার দিনের মাটির দালান,কাঠের কড়ি বরগা, কুলুঙ্গিতে প্রদীপ রাখা, ঘুলঘুলিতে পায়রার বাসা। মাটি লেপা উঠোন, তাতে শুকোত পৌষের ধান, সোনালি মড়াই।কাকা বলতেন প্রকৃত চাষি ঘরের লক্ষণ।রুদ্র অত বুঝত না। সারাদিনের দুষ্টুমির পর ঠাকুমার  সাদা গোলাপি ফুলছাপ দেওয়া বিছানায় অবলীলায় ধুলো পায়ে উঠে যেত…আর মা বকলে কাঠের ফ্রেমের আয়নায় লাগান টিপ তুলে মার কপালে আবার লাগিয়ে দিয়ে ছুটত নড়বড়ে কাঠের সিঁড়ি বেয়ে,উঠত একতলা থেকে দোতলায়, দোতলা থেকে ছাদের চিলেকোঠায়, চিলেকোঠায় জমানো রাজ্যের পুরোনো আসবাব, ভাঙা তোরঙ্গ থেকে আরও অনেকদূরে।
এখনও রুদ্র উঠছে, আরও উঠছে।স্কুল থেকে কলেজ, বাড়ি থেকে হোস্টেল,কলেজ থেকে ট্রেনি সেলসম্যান, হোস্টেল থেকে কলকাতার মেস, ট্রেনি সেলসম্যান থেকে সেলসম্যান, তারপর এরিয়া ম্যানেজার, মেস থেকে এই এক কামরার ফ্ল্যাটে।রুদ্র জানে সে আরও উঠবে।আসলে ওঠা ছাড়া আর কিছু করার নেই ওর।
আজ রুদ্রর ছুটি ।বহুদিন পর সে ছুটি পেয়েছে।বছর প্রান্তের লক্ষ্য সে পরিপূর্ণ করেছে।তাই তার ছুটি প্রাপ্য হয়েছে। কিন্তু ছুটি হলে রুদ্র পড়ে মুশকিলে।সে কি করবে? কোথায় যাবে? কাদের সাথে সময় কাটাবে?  চিত্ হয়ে শুয়ে শুয়ে রুদ্র ভাবছে। চোখ ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে তার শূন্য ঘরটা দেখছে।রানিবাঁধের পৈত্রিক সম্পত্তি বিক্রি করে এই ফ্ল্যাটটা কিনেছে।বাবা মা একটা অ্যাকসিডেন্টে মারা গ্যাছেন,কাকা বিয়ে-থা করেননি। কাকার মৃত্যুর পর রুদ্র রানিবাঁধের সম্পত্তি বিক্রি করে দিয়েছে। ওই ঘুলঘুলি, দালান, চিলেকোঠার মুল্যে মহানগরীর বুকে এই বাসস্থান, মাত্র চৌত্রিশ বছর বয়েসে। কিন্তু একা ভীষণ রুদ্র। বাবা মা আত্মীয় পরিজনহীন জীবন। কাজের ধরনের জন্যে বন্ধু সবই কাজের জগতের। কলেজের বন্ধুদের সঙ্গেও তেমন যোগাযোগ নেই। যাকগে, আজ না হয় ঘুমিয়েই কাটাবে। কারোর সাথে কথা না বলে, না বেড়িয়ে।
রুদ্র পাশ ফিরে শুল।আবার তাকাল আশে পাশে।এহ…কি অবস্থা! একে কি ঘর বলা যায়? কি অগোছালো! জামা প্যান্ট, তোয়ালে, ফাইল পত্র ছড়ানো চারিদিকে, বিছানার একদিকে ওর ল্যাপটপ, মোবাইল, মানিব্যাগ জড় হয়ে আছে।ঘরে ঝুলও জমেছে বেশ। বিছানার চাদরটা বহুদিন বদলান হয়নি। বাকি ফ্ল্যাটটারও একই অবস্থা। একটা ঠিকে কাজের মেয়ে আছে। সে সকালে এসে ঝাঁটপাট দিয়ে,কাপড় কেচে দিয়ে যায়। ফ্ল্যাটে রান্নার পাট্ নেই কোন।ওই চা বা নুডলস্ বানাবার মতো সামান্য ব্যবস্থা।বাইরেই রুদ্র খাওয়া সেরে নেয়।রুদ্র এখনও বিয়ে করেনি।কারণ তার পাত্রী খোঁজার লোক নেই। সে নিজে যে কয়েকজন পাত্রীকে নির্বাচন করেছিল তাদের সে এই ফ্ল্যাটে এনে বহু রাত মিথ্যে ঘ ঘর খেলেছে। কিন্তু কিছুদিন পরেই সে ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। কত নাম… সুস্মিতা, রিনা, ছন্দা,পারমিতা, সুকন্যা…কেও রূপসী, কেও স্কলার, কেও ভাল চাকরি করে কেও বা একদম নরম সরম পুতুল পুতুল! কিন্তু কিছুদিন পড়ে দ্যাখে এরা একই রকম ভাবে হাসে, কাঁদে, অভিমান করে, ঝগড়া করে। এদের চোখ একই রকম। হাঁটাচলা, কণ্ঠ্য স্বর সব এক!এমনকি কিছুদিন পর রুদ্রর মনে হতে লাগে যে বিছানায় এদের অভিব্যাক্তি বা শীৎকার ও একই রকম। রাতের নীল আলোয় রুদ্র যখন এদের শরীরে পাকা ধানের গন্ধ খোঁজে তখন তার নাকে আসে উগ্র এক চেনা গন্ধ…সেই অ্যাকসিডেন্টের পর যখন ধানক্ষেতের ধারে পড়ে থাকা মা আর বাবার থেতলে যাওয়া শরীর দুটো দেখেছিল রুদ্র সেই সময়ের রক্তের গন্ধের সাথে মেশা পোড়া ডিজেল এর গন্ধ… যে ট্রাকটা ওদের গাড়িটাকে ধাক্কা মেরেছিল পেছন থেকে… ওরা যখন রানিবাঁধ যাচ্ছিল…সেই ট্রাকটার ধাতব গন্ধ… চারিদিকে পাকা ধান সেই সময় অথচ রুদ্র কিছুতেই সেই গন্ধ পায়নি সেদিন। রাতের নীল আলোয় রুদ্রর বমি পায় তখন আর  পরের দিন থেকে তার খোঁজ শুরু হয় আরেকটা ধান ক্ষেতের।
রুদ্রর ঘর শীততাপ নিয়ন্ত্রিত।এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহেই বেশ গরম। একটা ঠাণ্ডা হিম ভাব চতুর্দিকে, জলের নীচ স্পন্দনহীন সাঁতার কেটে যাওয়া ডুবুরির মত রুদ্র ভাসছে এক অতলান্তিক হিমেল আমেজে, তাকে আবৃত করে ডুবিয়ে দিচ্ছে তার ফাইলের মাঝে, তার বাসি জামা কাপড়ের স্তূপের মাঝে। চোখ যদিও বন্ধ নেই রুদ্রর। গ্রীষ্মের তাপের মত খর চোখে রুদ্র মাপছে তার কামরাটাকে। ঠিক কতটা কাটছাঁট করলে এটাকে ঘর বলা যাবে? রুদ্র আস্তে আস্তে কাটতে শুরু করল ঘরটাকে- আয়তক্ষেত্র ঘরটাকে বর্গক্ষেত্র বানিয়ে ফেলল, এয়ারকনডিশন মেশিনটাকে খুলে বাইরে ফেলে দিল।জামা কাপড়, মোবাইল, ল্যাপটপ ছুঁড়ে ছুঁড়ে ফেলে দিল। বিছানার চাদর থেকে ঘসে ঘসে তুলল বিভিন্ন রঙা লিপস্টিকের দাগ, মুছতে মুছতে দেখল চাদরটার রঙ পাল্টে সাদা হয়ে গেল,তাতে গোলাপি ফুলগুলো ফুটেও উঠল! ডিসটেম্পার করা দেওয়ালগুলো ভেঙে ভেঙে এল চুন সুরকির দেওয়াল, এক দুটো কুলুঙ্গিও বানিয়ে ফেলল। জানে যে শহরের পায়রারা ঘুলঘুলিতে আর বসে না,তাও ঘুলঘুলি তৈরি করল রুদ্র। আর এত কিছু করে হাঁফাচ্ছে রুদ্র, ঘাম গড়িয়ে পড়ছে ওর কপাল বেয়ে। চারপাশ তাকাচ্ছে…… সব ঠিক আছে তো? হটাৎ দেখল যে আসল জিনিসটাই লাগান হয়নি। একটা আয়না! আয়না না থাকলে কি ঘর হয়? একখানা কাঠের ফ্রেমের আয়না লাগিয়ে ফেলল রুদ্র দেওয়ালে। কাচটা মুছেও নিল ভাল করে। কিন্তু একি! আয়নার কাচে এক কোণে টিপটা কোথায়? টিপ না লাগান থাকলে কি করে হবে? আর টিপ কোথায় পাবে রুদ্র? রুদ্র খুঁজতে লাগলো সারা ফ্ল্যাটে একটা টিপও যদি পাওয়া যায়… শুধু একটা টিপ ।