সুষমাতুমি যতই এগিয়ে যাও, আমি খুব তাড়াতাড়িই তোমার কাছে আসছি

একদিন নীরেনদার সঙ্গে কী নিয়ে যেন কথা বলছি,  হঠাৎ দেখি সংযুক্তা বিড়বিড়  করতে করতে এসে নীরেনদার সামনে এক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে আচমকা কী মনে পড়তেও,  যে দিক দিয়ে এসেছিল,  সে দিকেই হাঁটা দিয়েছিল।
ওকে  যেতে দেখে নীরেনদা বললেন, কী হল,  চলে যাচ্ছ যে!
সংযুক্তা আমাদের বন্ধু। ওর বাবা একটানা আঠেরো বছর রাষ্ট্রপতি পুরস্কার পেয়েছেন।  ওর স্বামী বাংলা ছায়াছবির প্রবাদপ্রতিম শিল্প নির্দেশক— গৌতম বসু।  ওর মেয়ে চিকি,  মানে অন্নপূর্ণা অন্তত দশটা সফল বাংলা ছায়াছবি বানিয়েছে। কিন্তু ওকে আমরা পাগলি বলেই ডাকি।  সেই সংযুক্তা বলল,  না,  আসলে একটা বানান জানতে এসেছিলাম। আপনার কাছে আসতেই মনে পড়ে গেল।
নীরেনদা বললেন,  এসো এসো,  বসো। ও নীরেনদার সামনের চেয়ারে এসে বসতেই নীরেনদা বললেন, তোমার আর কোনও বানান জানার থাকলে জিজ্ঞেস করতে পারো। এই অবকাশে  একজন সুন্দরী মহিলার বানানের কৌতুহল মেটানোর সুযোগ তো পাব।
এই হচ্ছেন নীরেনদা। মানে নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী। তিনি ছিলেন একাধারে কবি, ছড়াকার, সাংবাদিক, রহস্য রোমাঞ্চকার, গল্পকার,  শিশুসাহিত্যিক, বাংলা ভাষায় প্রথম টিনটিন-এর অনুবাদক এবং অবশ্যই দক্ষ সম্পাদক। তবুও তাঁর মধ্যে ছিল এ রকমই সূক্ষ রসবোধ। বাংলাদেশের ফরিদপুরের চান্দ্রাগ্রামে ১৯২৪ সালের ১৯ অক্টোবর তিনি জন্মগ্রহন করেন।  বাবা জিতেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী।  মা প্রফুল্লনলিনী দেবী।
ওখানকার গ্রামের পাঠশালাতেই তাঁর শিক্ষার হাতেখড়ি।  পরে ১৯৩০ সালে কলকাতায় এসে ভর্তি হন বঙ্গবাসী স্কুলে।  তার পরে মিত্র ইনস্টিটিউশনে।
আনন্দবাজারে আমি যে ঘরে বসতাম,  সে ঘরে আরও তিন জন বসতেন। তিন জনই বিখ্যাত সাহিত্যিক। একজনের নাম দিব্যেন্দু পালিত। অন্য দু’জন হলেন রমাপদ চৌধুরী আর নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী। এঁদের দু’জনের মাঝখানে বসতাম আমি। সেই সুবাদে এঁদের দু’জনের বন্ধুত্ব আমি খুব কাছ থেকে দেখেছি।
একদিন হঠাৎ শুনি রমাপদবাবুর দিকে তাকিয়ে নীরেনদা বলছেন, হ্যাঁরে, সুষমা নামের বউগুলো বুঝি খুব ভোগায়, না?
আমার ডান দিকে বসা রমাপদবাবু মাথা নেড়ে নীরেনদাকে ইঙ্গিকে কী বলেছিলেন,  আমি দেখিনি। আমি তখন কাজে ব্যস্ত ছিলাম। তবে উনি কেন রমাপদবাবুকে এটা জিজ্ঞেস করেছিলেন,  সেটা বেশ বুঝতে পেরেছিলাম।  কারণ,  আমি জানতাম,  নীরেনদার মতো রমাপদবাবুর স্ত্রীর নামও সুষমা।  সে সময় নীরেনদার স্ত্রী খুব ভুগছিলেন।
যখন কোনও দুটি মানুষের বন্ধুত্ব একটা ‘জুটি’ হয়ে দাঁড়ায়, বছরের পর বছর,  যুগের পর যুগ ধরে সেই বন্ধুত্ব অটুট থাকে, তার পিছনে অনেকগুলো কারণ থাকে। আর সব থেকে বড় কারণ হয়ে দাঁড়ায় অনেকগুলো কাকতালীয় মিল। মিল মানে, তাঁরা যে দু’জনেই ঝর্না কলমে লিখতেন,  দু’জনেরই  যে প্রিয়  রং ছিল কালো আর লাল কালি, দু’জনেই কলম বিগরোলে যে ধর্মতলার মোড়ে ‘পেন হসপিটাল’-এ ছুটতেন, দু’জনেই যে একই রকম দক্ষ সম্পাদক ছিলেন,  শুধু তা-ই নয়,  আমরা যারা এই দু’জনকে সহকর্মী হিসেবে পেয়েছিলাম বা খুব কাছ থেকে দেখেছি,  তাঁরা জানি,  দু’জনের মধ্যে কত মিল ছিল। সিগারেট খেলে দু’জনে একসঙ্গে খেতেন।  আগুন লাগার পরে যখন অফিসের মধ্যে ক্যান্টিন তো দূরস্থ,  সামান্য দেশলাই বা লাইটার জ্বালানোও নিষিদ্ধ হয়ে গেল,  তখনও এই দু’জন একসঙ্গে লিফটে করে নীচে নেমে অফিসের গেটের কাছে দাঁড়িয়ে সিগারেট খেতেন। শুধু একজনকে কেউ কখনও একা একা সিগারেট খেতে দেখেছে বলে আমি কখনও শুনিনি। তবে নীচে নামলে উল্টো দিকের গাছতলার চায়ের দোকান থেকে চা না খেয়ে কেউই ওপরে উঠতেন না।  এমনকী, টয়লেটে গেলেও দু’জনে একসঙ্গেই যেতেন।
যখন ওঁরা আনন্দবাজার পত্রিকায় যোগ দেন,  তখনকার সময়ে প্রায় সমস্ত পত্রপত্রিকাতেই দু’জন করে সম্পাদক রাখার একটা রীতি ছিল। সে বিভাগীয় সম্পাদনার ক্ষেত্রেও। একজন অসুস্থ হলে বা ছুটিতে গেলে যাতে অন্য জন চালিয়ে নিতে পারেন। পাকাপাকি ভাবে ‘আনন্দমেলা’র সম্পাদক হওয়ার আগে এঁরা দু’জনেই ছিলেন ‘রবিবাসরীয়’র দুই সম্পাদক।
খেলা নিয়ে দু’জনেরই ছিল তুমুল উৎসাহ। কখনও কখনও দু’জনের মধ্যে তুমুল কথা কাটাকাটিও হত। সেই ঝগড়া দেখলে কে বলবে, ওঁরা ওই পদমর্যাদার দুই দিকপাল কবি আর  লেখক। তবে তাঁদের ঝগড়া কখনও দীর্ঘস্থায়ী তো হতই না, তিক্ততা পর্যন্তও গড়াত না। পরে বুঝতে পারতাম, ওটা ছিল পুরোটাই কপট ঝগড়া।
সে বার বইমেলায় আমার একটা ছোটদের বই বেরোবে। নাম— মায়া কাজল। নাম শুনেই রমাপদবাবু বললেন, নাম দুটোর মাঝখানে একটা হাইফেন দিয়ে দেবেন।
রমাপদবাবু কথাটা শেষ করেছেন কি করেননি, নীরেনদা ও পাশ থেকে বলে উঠলেন,  না না,  হাইফেন দিয়ো না। ওটা সবাই দেয়।  তুমি বরং ওই দুটো নামের মাঝখানে একটা ‘এস’ বসিয়ে দাও।
আমি তো অবাক।  ইংরেজির এস?  সে তো সাপের ফনার মতো লাগবে! নীরেনদা বললেন, তুমি যে ভাবে ভাবছ,  সে ভাবে নয়,  দেখে যাও,  এই ভাবে ‘এস’টা লিখবে।  বলেই ‘মায়া’ লেখার পর ‘কাজল’ লেখার আগেই একটা শোয়ানো এস এঁকে দিলেন। কিন্তু নীরেনদা বললে কী হবে! আমার বস তো রমাপদ চৌধুরী। তাই বাধ্য হয়েই আমি ‘এস’ না লিখে রমাপদবাবুর কথা মতো হাইফেনটাই ব্যবহার করেছিলাম। ফলে সে বই দেওয়া তো দূরের কথা,  নীরেনদাকে কোনও দিন দেখাতেও পারিনি সেই বই।
যতই খুনসুটি হোক, তাঁদের কাকতালীয় মিল ছিল অভাবনীয়। নীরেনদার থেকে নীরেনদার স্ত্রী ছিলেন ঠিক এক বছর আট মাসের বড়। আবার রমাপদবাবুও ছিলেন নীরেনদার  থেকে ঠিক ওই এক বছর আট মাসেরই বড়। মানে, নীরেনদার জীবনসঙ্গিনী  এবং জীবনের সবচেয়ে প্রিয় বন্ধু— দু’জনেই ছিলেন কাকতালীয় ভাবে একেবারে একই বয়সি।
রমাপদবাবু সারা বছরে মাত্র একটা উপন্যাস লিখতেন। নীরেনদাও লিখতেন খুব কম। এত বছরে লিখেছিলেন মাত্র ২৯টি কবিতার বই।  ১৪টি রহস্য কাহিনি।  ৬টি আলোচনাগ্রন্থ। ৩টি ভ্রমণ কাহিনি। একটি করে উপন্যাস,  আত্মস্মৃতি, কাব্যনাট্য।  এ ছাড়া ছোটদের জন্য সতেরোটি ছড়া-কবিতার বই। সৃষ্টি করেছেন অনবদ্য গোয়েন্দা চরিত্র— ডিটেকটিভ ভাদুড়ী মশাই।
মাত্র পাঁচ বছর বয়সে তিনি কবিতা লিখেছিলেন। কিন্তু সেটা কোথাও ছাপা হয়নি। ১৬ বছর বয়স  থেকে তাঁর লেখা কবিতা সেই যে বেরোনো শুরু হয়, তা ‘নীলনির্জন’ নামে সিগনেট প্রেস থেকে প্রথম বই হয়ে বেরোয় ১৯৫৪ সালে।
তিনি চাকরি করেছেন দৈনিক প্রত্যহ,  সত্যযুগ,  মাতৃভূমি,  স্বরাজ,  ভারত,  ইউনাইটেড প্রেস অব ইন্ডিয়ায়।  ১৯৫১ সালে যোগ দেন আনন্দবাজার পত্রিকায়। আনন্দমেলার সম্পাদক হন ১৯৭৬ সালে।
আনন্দবাজারে আসার পরে  রমাপদবাবুর সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠতা আরও বাড়ে। নীরেনদা যে রমাপদবাবুর কত বড় বন্ধু ছিলেন, তার প্রমাণ, তিনি যখন বানানবিধি লিখছেন সেই ‘কী লিখবেন,  কেন লিখবেন’ বইটিতে তিনি স্পষ্ট করে লিখে দিয়েছিলেন, পদবি হিসেবে ‘চৌধুরী’তে আর দীর্ঘ ঈ-কার ব্যবহার করা যাবে না। হবে ই-কার। একমাত্র রমাপদ চৌধুরীর ক্ষেত্রেই পুরনো বানান বলবৎ থাকবে।
এ নিয়ে নানা জন নানা কথা বললেও উনি  কিন্তু নিজের সিদ্ধান্ত থেকে এক পা-ও সরে আসেননি।  এ ভাবে স্বীকৃতি বুঝি একজন যথার্থ বন্ধুই দিতে পারেন তাঁর প্রিয় বন্ধুকে।
নীরেনদা সব চেয়ে বেশি ঘৃণা করতেন মেকি দেশপ্রেমকে।  আর সব চেয়ে বেশি ভালবাসতেন শিশুদের। তাই বড়দের জন্য অজস্র লেখা লিখলেও ছোটদের জন্যও কম লেখেননি। লিখেছিলেন,  সাদা বাঘ,  বিবির ছড়া,  ও কলকাতা,  ডাইনোসর,  ভোরের পাখি,  ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি, রাত পাহারা, পাঁচ বছরের আমি’র মতো এক-একটা  হীরকখণ্ড। আর এই লেখালিখির জন্যই তিনি পেয়েছিলেন,  সাহিত্য আকাদেমি,  তারাশঙ্কর,  আনন্দ শিরোমণি,  বিদ্যাসাগর,  উল্টোরথ,  স্বর্ণাঞ্জল, জীবনকৃতি এবং বঙ্গবিভূষণ। পাঠকের ভালবাসার পুরস্কার তো বহু আগেই পেয়েছিলেন পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমির এই প্রাক্তন সভাপতি।
আমি তখন একের পর এক সংকলন সম্পাদনা করছি।  একদিন রমাপদবাবুকে বললাম,  এ বার বইমেলাতেও কয়েকটা সংকলন সম্পাদনা করছি।  আমি কিন্তু যৌথ সম্পাদক হিসেবে আপনার নামটা রাখব।
উনি বললেন,  কীসের বই?
আমি যখন বললাম,  ছোটদের গল্পের বই। তখন সঙ্গে সঙ্গে তিনি আড়চোখে নীরেনদাকে দেখিয়ে বললেন, ওকে বলুন।  ও তো ছোটদের গল্প লেখে।
কথাটা শুনে নীরেনদা আমার দিকে তাকিয়ে বললেন,  কী হয়েছে?
আমি ব্যাপারটা বলতেই উনি বললেন, আমার নাম তুমি রাখতেই পারো। তবে আগেই বলে রাখি, আমি কিন্তু ভূমিকা-টুমিকা লিখতে পারব না।  তুমি লিখে নিয়ে আসবে,  আমি সই করে দেব।
আমি চমকে উঠলাম। বিখ্যাত সমস্ত সাহিত্যিকই কি একই রকম হন! লীলা মজুমদার, শংকর,  মহাশ্বেতা দেবী,  সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়,  শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়, সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়,  সুচিত্রা ভট্টাচার্য,  নবনীতা দেবসেন,  রঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়— যাঁদের সঙ্গেই যৌথ ভাবে সম্পাদনা করেছি,  তাঁরা প্রত্যেকেই এই একই কথা বলেছেন এবং কেউই কখনও আমার কাছে কোনও দিন জানতে চাননি,  ওই সংকলনে কে কে লিখছেন?
বুঝতে পেরেছিলাম, অন্যান্যদের মতো নীরেনদারও পূর্ণ আস্থা আছে আমার ওপরে। ফলে সে বার আমাদের দু’জনের যৌথ সম্পাদনায় প্রকাশিত হয়েছিল— ছোটদের সেরা ৫১।
মাসখানেক আগে আমি যখন নীরেনদার ছোট মেয়ে শিউলির ম্যান্ডেভিলা গার্ডেন্সের বাড়িতে গিয়েছিলাম, নীরেনদা তখন খুব কষ্ট পাচ্ছিলেন।  ওঁর ছেলের বউ মিলুদি বলেছিলেন, দিনে পাঁচবার করে নেবুলাইজেশন চলছে।
হ্যাঁ,  এখানেও রমাপদবাবুর সঙ্গে নীরেনদার হুবহু মিল। দু’জনেই ভেন্টিলেশনে ছিলেন।  দু’জনেই ঠান্ডায় কাবু হয়ে পড়েছিলেন। উনি সে দিন বারবারই বলছিলেন,  আমি এ বার ভাইয়ের কাছে যাব। ভাই মানে,  রমাপদ চৌধুরী।
সে দিন উনি এমন এমন কথা বলেছিলেন,  আমি বুঝতে পেরেছিলাম রমাপদবাবুর মতো তাঁরও স্মৃতিশক্তি এতটুকুও দুর্বল হয়নি। জ্ঞানের নাড়ি একেবাবে টনটনে। না,  সে দিন নীরেনদার চোখ-মুখ দেখে আমার একদমই ভাল লাগেনি। তারও কয়েক মাস আগে নীরেনদার সাক্ষাৎকার নেওয়ার জন্য কবি অমৃতা চট্টোপাধ্যায়কে নিয়ে নীরেনদার বাঙুরের বাড়িতে গিয়েছিলাম।  তখনও এ রকম লাগেনি।  সে দিনই প্রথম মনে হয়েছিল,  নীরেনদার বয়স বয়ে গেছে। কিন্তু ওঁর কি এত বয়স হয়েছিল যে, চলে যেতে হবে! নাকি জানুয়ারিতে স্ত্রী বিয়োগের পর শববাহী গাড়ির পেছনে যেতে যেতে তাঁর গাড়ি হঠাৎ রেড সিগন্যালে আটকে পড়ায় উনি যেহেতু বলেছিলেন,  ‘সুষমা, তুমি যতই এগিয়ে যাও, আমি খুব তাড়াতাড়িই তোমার কাছে আসছি।‘ সেই কথা রাখার জন্যই কি বছর ঘোরার আগেই  উনি এই ভাবে চলে গেলেন!  নাকি সেটা কোনও রকমে সামলে নিলেও, আর একজন দীর্ঘদিনের প্রিয় মানুষ— রমাপদ চৌধুরীর মৃত্যু তিনি মেনে নিতে পারেননি!  তাই রমাপদবাবু চলে যাওয়ার মাত্র পাঁচ মাসের মাথাতেই তিনিও চলে গেলেন! কে জানে!
লিখেছেন – সিদ্ধার্থ সিংহ