তৃষ্ণা বসাক এই সময়ের বাংলা সাহিত্যের একজন তন্নিষ্ঠ কবি ও কথাকার। গল্প, উপন্যাস, কবিতা, কল্পবিজ্ঞান, মৈথিলী অনুবাদকর্মে তিনি প্রতিমুহুর্তে পাঠকের সামনে খুলে দিচ্ছেন অনাস্বাদিত জগৎ। প্রাপ্ত পুরস্কারের মধ্যে রয়েছে- পূর্ণেন্দু ভৌমিক স্মৃতি পুরস্কার ২০১২, সম্বিত সাহিত্য পুরস্কার ২০১৩, কবি অমিতেশ মাইতি স্মৃতি সাহিত্য সম্মান ২০১৩, ইলা চন্দ স্মৃতি পুরস্কার (বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষৎ) ২০১৩, ডলি মিদ্যা স্মৃতি পুরস্কার ২০১৫, সোমেন চন্দ স্মারক সম্মান (পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি) ২০১৮, সাহিত্য কৃতি সম্মান (কারিগর) ২০১৯ ও অন্যান্য আরো পুরস্কার।

কেষ্ট, কুটির শিল্প এবং কলা

পর্ব ১৮

প্রথম একজন সফল শিল্পপতিকে দেখি অটোয়, আমার পাশে। ভাবা যায়? আসলে পৃথিবীর সমস্ত বড় বড় ব্যাপারগুলোই এইরকম এলেবেলে ভাবে ঘটে আর তাই ঘটার সময় আমরা বুঝতেই পারি না কী হল। সেই দস্যু মোহন টাইপ, কোথা হইতে কী যে হইয়া গেল, বোঝাই গেল না! আরে শাহরুখ খান তো বলেইছেন ‘বড়ে বড়ে শহরো  মে ছোটে ছোটে বাতে হোতে হ্যায় সেনোরিটা’ এটাকে উল্টেপাল্টে নিলেই ছোট ছোট শহরে যে কত বড় বড় ব্যাপার ঘটতে পারে, আপনারা আন্দাজও করতে পারবেন না সেনর, সেনরিটা!
একটু খুলেই বলা যাক। একদিন স্টেশনের স্ট্যান্ড থেকে অটোয় উঠেছি, একাই বসে আছি, আরও গোটা পাঁচেক সওয়ারি না পেলে ছাড়বে না বলাই বাহুল্য।এদিকে সবে একটা ট্রেন বেরিয়ে গেছে, ফলে আর একটা ট্রেন আসা অব্দি হাপিত্যেশ করে বসে থাকা ছাড়া উপায় নেই। 
বসেই আছি। সন্ধের মুখে প্লাটফর্মের কোণের শিমুল গাছটায় কাকেদের জরুরি মিটিং চলছে। অটোস্ট্যান্ডে আলো নেই। প্লাটফর্মেও তথৈবচ। এমন সময় একটা ট্রেন এসে দাঁড়াল। মুহূর্তে একটা সচকিত ভাব।  ট্রেনের আলো এসে পড়ল অটোর মধ্যে আর আমি চমকে উঠে দেখলাম আমার পাশে কখন যেন দুজন এসে বসেছে, তার মধ্যে একজনের গলায় একটা মোটাসোটা গাঁদাফুলের মালা।তার পাশে বসা চেলাটির গদগদ কথা থেকে আন্দাজ করি ইনি একজন ডন গোছের কেউ এবং কোথাও থেকে রাজ্যজয় করে ফিরছেন, তাই এই মালা। কান খাড়া করি এবং ক্রমে ক্রমে জানি কয়েকমাসের হাজতবাসের পর একে আলিপুর জেলে  রিসিভ করতে গেছিল সেই চেলা কিংবা চামচে বা হাতা-খুন্তি যাই বলা যাক কেন। আর ডনের মান রাখতে ইয়াব্বড় একটা গাঁদার মালা পরাতেও ভলেনিতো হাজত-ফেরত ডনটি খোঁজখবর নিচ্ছিল তার অবর্তমানে কাজকর্ম ঠিকমত চলেছে কিনা।  চেলাটি হাত কচলাতে কচলাতে জানাল তারা খুব মন দিয়েই বোমা বেঁধে গেছে, একদম ফাঁকি দেয়নি। তারপর এটাও জানাতে ভুলল না আগামী রবিবার তার জন্যে একটা সম্বর্ধনার আয়োজন করেছে তারা, সেখানে বাংলার স্যারকে কড়কানি দিয়ে একটা জ্বালাময়ী ভাষণও লেখানো হয়েছে।
এত কাছ থেকে একজন বোমাপুত্র থুড়ি ভূমিপুত্রকে দেখে রীতিমতো শিহরিত হই। আর আমি যে বাংলার স্যার নই, তার জন্যেও ঈশ্বরকে ধন্যবাদ দিতে ভুলি না। ভাগ্যিস আমার কবিখ্যাতি এর কানে পৌঁছ্য়নি, তাহলে নিশ্চয় এর সম্বর্ধনাসভায় আমাকে এর প্রশস্তিসূচক একটা  স্বরচিত কবিতা পাঠ করতে হত। কিন্তু পিকচার তখনো বাকি ছিল দোস্ত। অটোস্ট্যান্ড ছেড়ে অটোটা মিলন সিনেমাহলের সামনে আসতেই হলের চড়া আলো এসে পড়ে ভেতরে। আর আমি চমকে উঠে দেখি সেই গাঁদাফুলের মালা শোভিত ডনটি আর কেউ নয়, কেষ্ট, ছোটবেলায় যার সঙ্গে কত খেলেছি। ওর মা পাড়ার অনেকগুলো বাড়িতে ঠিকে কাজ করে। স্কুল ড্রপ আউট কেষ্ট বাড়িতেই  বোমা বাঁধার স্টার্ট-আপ বিজনেস শুরু করে। কে না জানে বঙ্গের দুটি সবচেয়ে সফল কুটির শিল্প-চোলাই আর বোমা। সেই হিসেবে সে একজন বিশিষ্ট শিল্পপতি।এরপর আমার আর বন্ধুগর্বে গর্বিত না হয়ে উপায় থাকে না। পাশাপাশি একটা হীনমন্যতাও আমাকে গ্রাস করে। আমার বন্ধু কোথায় আর আমি কোথায়? গাঁদা কেন, একটা ঘেঁটুফুলের মালাও কেউ কখনো দেয়নি। আমিও অবশ্য কুটিরশিল্পপতি, মানে বাংলায় লেখালেখি তো বাংলা ধেনো বা চোলাই মদের মতোই কুটির শিল্প, তবে ধেনো বা চোলাইয়ের মতো বাজার নেই সাহিত্যের, আর কেষ্টর কারখানার বোমার মতো তা বিস্ফোরণ ঘটাতেও পারে না। আমি নিজের অপারগতার কথা ভেবে মরমে মরে যেতে থাকি, আর অন্যদিকে মালা এবং চেলার জোড়া গ্ল্যামারে কেষ্ট একেবারে একঘর।
কি আশ্চর্য, আরও একজন শিল্পপতির সঙ্গে আমার অটোতেই আলাপ। সে অবশ্য অনেক পরের কথা। কিন্তু এই জাম্পকাট টুকু ব্যবহারে পাঠক ঠকবেন না, গ্যারান্টি!
বৃষ্টি যখন রুপোর কুচি তখন চাকরিজীবন শুরু। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে পাওয়া। এক সরকার অধিগৃহীত প্রেস, যার আছে গৌরবময় ইতিহাস আর ইতিহাসের ভারে ন্যূব্জ সাতশোর বেশি কর্মী, যাঁদের অনেকেরই ধারণা নেই ম্যানেজমেন্ট ট্রেনি খায় না মাথায় দেয়। প্রথম দিনসাতেক তো ইউনিয়নের এক দাদা যাকে আড়ালে বলা হত মহিষাসুর, তাঁর দাপটে রিসেপশনে বসে টিফিন খেয়ে ঘরের মেয়ে ঘরে ফিরে আসি। ধীরে ধীরে তাঁদের বিশ্বাস, ভালবাসা, এমনকি বছর বাইশের মেয়ের পক্ষে খুব ভারি শব্দ- শ্রদ্ধা অর্জন। পুরনো আর নতুনের সন্ধিক্ষণে নব্বই দশকের শুরুর দিক। মেশিন চিনি। মানুষ চিনি। কত অভিযোগ অভিমান তাদের। যেতে আসতে ঘণ্টা পাঁচ তো কম করে। নৌকা ছাড়া সব কিছু চড়তে হয়। নানান রুট ট্রাই করে দেখি দূরত্ব আর কমে না।
বেলঘরিয়া নেমে অটো করে যেতে যেতে এক ভদ্রলোকের সঙ্গে আলাপ।তাঁর নিজের লেদ কারখানা। ধরা যাক তাঁর নাম রামবাবু। ভাব্বাচ্যে কথা বলতেন। কী করা হয়? শুনলেন ছাপাখানায় কাজ করি। জোর করে অটোভাড়া দিতেন রোজ। ছাপাখানা মানে খুব দুস্থ ভাবতেন নিশ্চয়।
একদিন শুধোলেন –ক কেলাস অব্দি পড়া হয়েছে? কেলাস এইট?
আমি বললাম, আর একটু বেশি।
এরপর কথোপকথন এগোল এইরকমভাবে-
-তাহলে দশ কেলাস?
-আর একটু বেশি
-বারো কেলাস? (কিঞ্চিৎ অধৈর্য)
-আর একটু বেশি
এইভাবে শিব্রামী স্টাইলে গুপ্ত কথা আস্তে  আস্তে ভেঙ্গেও বিপর্যয় ঠেকানো গেল না। রামবাবু জেনে গেলেন আমি যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করে ছাপাখানায় কালিঝুলি মাখছি। ওঁর চোখে তীব্র ভর্তসনা ফুটে উঠল –ছিঃ!
হায় একি সমাপন! তারপর থেকে উনি আর আমার অটোভাড়া তো দেনই নি, উপরন্তু দেখলে না চেনার ভান করেছেন। সুতরাং বুঝতেই পারছেন হে পাঠক, এই দুই শিল্পপতির সঙ্গে আমার এনকাউন্টার আদৌ সুখকর হয়নি। অথচ এ ব্যাপারে আমি যে একদম আনাড়ি তা নই। ছোটবেলা থেকে কত যে বাণিজ্যে বসতি লক্ষ্মী রচনা লিখেছি তার ইয়ত্তা নেই। যদিও আমরা যখন বড় হয়ে উঠছি তখন রাজ্যের কলকারখানার চিমনিগুলো সত্যিই চ +ই+ এমনি এমনি হয়ে গেছে, সেসব দিয়ে আর ধোঁয়া বেরোয় না। আমার এক মামা জুটমিলে চাকরি করতেন, মামীর হাতের অসাধারণ রান্না আর যত্নের লোভে ছুটিছাটায় যাবার ইচ্ছে করলেও সবসময় সে সাধ পূরণ হত না। হঠাত হঠাত খবর আসত মিল বন্ধ হয়ে গেছে। তখন আমাদের পরিবারেও শোকের ছায়া নেমে আসত।শেষ পর্যন্ত মামা অন্ধ্রের বিজয়ওয়াড়ায় চাকরি নিয়ে চলে গেলেন। পরিবার থেকে দূরে, শুধু পেটের দায়ে পড়ে থাকা। সেখানে একদিন বড় বড় চিংড়ি এনেছেন মামা বাজার থেকে, সব্জি ছিল ঝিঙ্গে। দক্ষিণী রাঁধুনীকে নির্দেশ দিয়েছেন চিংড়ির ঝাল আর ঝিঙ্গে পোস্ত করতে। হাত দিয়ে দেখিয়েও দিয়েছেন কীভাবে ডুমো ডুমো করে ঝিঙ্গে কাটবে। তার ফলশ্রুতি নিজেই দেখতে পেলেন দুপুরে, রান্নাঘরে খাবারের ঢাকা খুলে, রাঁধুনি চিংড়িগুলো ডুমো ডুমো করে কেটে  পোস্ত দিয়ে রেঁধে বাটিতে যত্ন করে বেড়ে গেছে। ঝিঙ্গে শব্দটি সে চিংড়ির বাংলা ধরে নিয়েছে আর কি! এ হচ্ছে বাংলার শিল্পের দুর্দশা যতরকম বিপর্যয় ব্যক্তিজীবনে ঘনিয়ে তুলতে পারে, তার একটা সামান্য উদাহরণ। 
এইসব দেখেই হয়তো অনেক যুবক, তার মধ্যে আমার ছোটমামাও পড়ে, ভেবেছিল  চাকরিবাকরির চেষ্টা না করে স্বাধীন ব্যবসা করবে। সে ছোটবেলা থেকেই কেন জানি আমাকে দেখলে বলত ‘মাংকি নানা কায়দা জানে’, আর আমি সেটা শুনলে কেনই বা রেগে হাত পা ছুঁড়তাম কে জানে। এ ছাড়াও আমার রেজাল্টে সবাই খুব বাহবা দিলে সে সব আনন্দ এক ফুঁয়ে নিভিয়ে দিয়ে বলত, দূর এটা একটা রেজাল্ট হল? আমাদের তো নামই ডাকত না ক্লাসে! আমি বহু বছর অব্দি সেটাকে খুব গৌরবের বিষয় ভেবে এসেছি।একবার সে নাকি অংকে শূন্য পেয়ে টালির চালের ফাঁকে লুকিয়ে রেখেছে, দাদু যতবার খোঁজ করেছে, বলেছে, এখনো খাতা বেরোয়নি। হায়, একদিন কিছু একটা পাড়তে গিয়ে সেই অমূল্য খাতাটি দাদুর হাতেই দেবতার আশীর্বাদের মতো পড়ল।দাদু খাতাটি উল্টেপাল্টে দেখে খড়ম খুলে তাড়া করেছিলেন জনশ্রুতি। তো সেই ছেলে যখন দাদাদের মতো চাকরির দিকে না গিয়ে ব্যবসা শুরু করল, তখন টিপিক্যাল বঙ্গ মানসে সেটা মোটেই ভালো ঠেকেনি। বাঙ্গালির কাছে ব্যবসা বলতেই তো মুজতবা আলির গল্প মনে পড়ে। দুপুরে মনিহারি দোকানে একজন গিয়েছে সাবান কিনতে। দোকানদার ঘুমোচ্ছে। অনেক ডাকাডাকির পর উঠে বলল ‘ও   সাবান বেচার নয়’ তবে অনেকেই উৎসাহ দিয়েছিল। তাদের মধ্যে একজন ছিল আমাদের পাড়ার দীপকদা। সে বেচারি তখন বেকার, চাকরির পরীক্ষা দিয়ে দিয়ে ক্লান্ত। মামার ব্যবসার ব্যাপারে সেই সবচেয়ে বেশি উৎসাহ দেখাল। জ্বালাময়ী বক্তৃতাই দিয়ে ফেলল একটা। তারপর তার খেয়াল হল কীসের ব্যবসা সেটাই জিজ্ঞেস করা হয়নি। সে শুধোল ‘ও মামা, তোমার ব্যবসাটা কীসের?’
ছোটমামা বর্ধমান কোম্পানির ডিলারশিপ নিয়েছিল। সেই যে রেডিওতে বিজ্ঞাপন হত ‘বর্ধমান কা টোরা ধাগা, টুটেগা নেহি’
সে সগর্বে বলল ‘চেন-সুতো –কলার’
দীপকদা শেষ শব্দটা শুনল, তাও অন্তিম র-টা বাদ দিয়ে।
অতঃপর সে খুব কৌতূহলী গলায় জিজ্ঞেস করল ‘কলা! তা কাঁদি হিসেবে কেনো? না ডজন হিসেবে?’ 

ক্রমশ…