জন্ম- ১৯৬৭, বরানগর। বর্তমানে দার্জিলিং জেলার মিরিক মহকুমার উপশাসক ও উপসমাহর্তা পদে আসীন। চাকরীসূত্রে ও দৈনন্দিন কাজের অভিজ্ঞতায় মধ্যবিত্ত ও নিম্ন মধ্যবিত্ত মানুষের সমস্যা সমাধানে তাঁর লেখনী সোচ্চার।

পর্ব – ৯৭

৯৬

সময় সম্পর্কে তুমি কি ভাব? শ‍্যামলীর দিকে তাকিয়ে স্মিতমুখে জিজ্ঞাসা করলেন অধ্যাপক সান‍্যাল।
শ‍্যামলী বলল, সময়টা যে ঠিক কি, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নাটক ডাকঘর করতে গিয়ে এটা ভেবেছিলাম।
অধ‍্যাপক মিত্র বললেন, ডাকঘর? তুই করেছিলি! কোথায়?
শ‍্যামলী বলল, তখন স্কুলে পড়ি। দিদিরা  আমাকে দিয়েছিলেন প্রহরীর পার্ট। নাটকে ঘণ্টা বাজানোর দায়িত্বে থাকা প্রহরীকে অমল বলছে-
“কেউ বলে ‘সময় বয়ে যাচ্ছে’, কেউ বলে ‘সময় হয়নি’। আচ্ছা, তুমি ঘণ্টা বাজিয়ে দিলেই তো সময় হবে?… বেশ লাগে তোমার ঘণ্টা- আমার শুনতে ভারি ভালো লাগে- দুপুরবেলা আমাদের বাড়িতে যখন সকলেরই খাওয়া হয়ে যায়- পিসেমশায় কোথায় কাজ করতে বেরিয়ে যান, পিসিমা রামায়ণ পড়তে পড়তে ঘুমিয়ে পড়েন, আমাদের খুদে কুকুরটা উঠোনে ওই কোণের ছায়ায় লেজের মধ্যে মুখ গুঁজে ঘুমোতে থাকে- তখন তোমার ওই ঘণ্টা বাজে- ঢং ঢং ঢং, ঢং ঢং ঢং। তোমার ঘণ্টা বেশ বাজে!”
তখন ওই যে সময় বয়ে যাচ্ছে, আর সময় হয়নি, ওই নিয়ে অনেক কথা মনে হয়েছিল। মহলা দিতে দিতে পুরো নাটকটাই মুখস্থ হয়ে গিয়েছিল আমার। তবু ওই “সময় বয়ে যাচ্ছে”, আর “সময় হয়নি” আমায় খুব ভাবায়।
অধ্যাপক সান‍্যাল বললেন, আরো বলো শ‍্যামলী, বেশ লাগছে শুনতে।
শ‍্যামলী বলল, খেয়া কাব‍্যগ্রন্থে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের একটা কবিতা আছে,
আমরা মনে ভেবেছিলাম আসবে না কেউ আজ,…. কে ফুকারে জাগো সবাই, …কোথায় মাল‍্য কোথায় সজ্জা .. রিক্ত করে করো অভ‍্যর্থন, ওরে দুয়ার খুলে দে রে বাজা শঙ্খ বাজা, ছিন্নশয়ন টেনে এনে আঙিনা তোর সাজা…দুঃখ রাতের রাজা। … সব লাইন কটা এখুনি মনে করে ঠিকঠাক বলতে পারছি না, তবে এই কথাগুলো আছে।
অধ্যাপক মিত্র বললেন, হ‍্যাঁ, কবিতাটা শুনেছি।
শ‍্যামলী বলল, ওই কবিতায় ওই যে রাজা আসবেন, আর বেশিরভাগ লোকজন একেবারেই অপ্রস্তুত, তবে দু একজনে বলেছিল রাজার ধ্বজা হেরি। তো আমি বলতে চাইছি সময়কে টের পাওয়া, সে সকলের হয়ে ওঠে না।
মাঘনিশীথের কোকিলের কথা বলেন জীবনানন্দ দাশ। সাধারণ ভাবে কোকিলের পরিচয়, সে বসন্তের পাখি। কিন্তু, কবি যখন “মাঘনিশীথের কোকিল” বলেন, আমার কি রকম যেন শিহরণ হয়।
শ‍্যামলী জীবনানন্দ দাশের কবিতা বলতে থাকে,
হৃদয়ের অবিরল অন্ধকারের ভিতর সূর্যকে ডুবিয়ে ফেলে
আবার ঘুমোতে চেয়েছি আমি,
অন্ধকারের স্তনের ভিতর যোনির ভিতর অনন্ত মৃত্যুর মতো মিশে
থাকতে চেয়েছি।
হে নর, হে নারী,
তোমাদের পৃথিবীকে চিনিনি কোনোদিন;
আমি অন্য কোনো নক্ষত্রের জীব নই।
যেখানে স্পন্দন, সংঘর্ষ, গতি, যেখানে উদ্যম, চিন্তা, কাজ,
সেখানেই সূর্য, পৃথিবী, বৃহস্পতি, কালপুরুষ, অনন্ত আকাশগ্রন্থি,
শত-শত শূকরের চিৎকার সেখানে,
শত-শত শূকরীর প্রসববেদনার আড়ম্বর;
এই সব ভয়াবহ আরতি!
গভীর অন্ধকারের ঘুমের আস্বাদে আমার আত্মা লালিত;
আমাকে কেন জাগাতে চাও?
হে সময়গ্রন্থি, হে সূর্য, হে মাঘনিশীথের কোকিল, হে স্মৃতি, হে হিম হাওয়া,
আমাকে জাগাতে চাও কেন।
অরব অন্ধকারের ঘুম থেকে নদীর চ্ছল চ্ছল শব্দে জেগে উঠবো না আর;
শ‍্যামলী বলল, জানেন ম‍্যাম, ওই “সময়গ্রন্থি” কথাটা লিখতে কবজির জোরদার এলেম লাগে।
অধ্যাপক সান‍্যাল বললেন, শ‍্যামলী সাহিত্যের দিক দিয়ে তো বললে, এবার তুমি একটু ফিজিক্সের দিক দিয়ে বলো।
শ‍্যামলী বলল, আমি তো শুনব বলে এসেছি ম‍্যাম।
অধ্যাপক সান‍্যাল বললেন, যা মনে হয়, তাই বলো না।
শ‍্যামলী সঙ্কুচিত হয়ে বলল, ম‍্যাম,  আমরা সময় মাপার জন্য বিস্তর চেষ্টা করেছি। লাঠি পুঁতে, সূর্যের আলোয় তার ছায়ার চলন দেখে মানুষ সময় মেপেছে, আর পাত্রের ফুটো দিয়ে জল গড়াতে দিয়ে, বা বালু পড়তে দিয়ে সময়ের পরিমাপের চেষ্টা করেছে মানুষ। এখনো গ্রামের লোকজন আকাশে সূর্যের অবস্থান দেখে সময় আন্দাজ করে। আকাশে সূর্যের আপাতচলন দেখে সূর্যের উদয় আর অস্তের কথা খেয়াল করেছে মানুষ। আবার আকাশে বিভিন্ন স্থানে নক্ষত্রের ধারে পাশে সূর্যের চলন কল্পনা করে বৈশাখ, জ‍্যৈষ্ঠ, আষাঢ়, শ্রাবণ মাসের কথা ভেবেছে। খেয়াল করলে এইসব মাসের নামে বিশাখা, জ‍্যেষ্ঠা, শ্রবণা, ভদ্রা, কৃত্তিকা, মঘা, চিত্রা নক্ষত্রের আভাস পাওয়া যায়।
সূর্যের উত্তরায়ণ ও দক্ষিণায়নের কথাও ভেবেছে মানুষ। তার আসল কারণ অবশ্যই পৃথিবীর সাড়ে তেইশ ডিগ্রি ঝুঁকে থাকা। তাইতে সূর্য একবার কর্কটক্রান্তি রেখা অবধি গিয়ে সরাসরি আলো দিয়ে আসে। আবার যায় মকরক্রান্তি রেখার দিকে। কিন্তু এগুলো একেবারেই আমাদের সময়ের পৃথিবীর হিসাব। পৃথিবী সুদূর অতীতে সব সময় ঠিক এইভাবেই চলেছে, বা অনাগত ভবিষ্যতে যে ঠিক এভাবে চলবে, তার স্থিরতা নাই। একটা বক্রপথের দূরত্ব অতিক্রম করার ধারণাকে যেন আমরা সময় বলে বুঝতে চাইছি। যেন ছায়া দেখে আলোর অস্তিত্ব ভাবছি। কিন্তু আমাদের সৌরজগতের সব জায়গায় এই ধারণা খাটবে না। প্রতিটি গ্রহের চলনের হিসেব আলাদা আলাদা। সূর্যের চারিদিকে পাক খাবার কায়দা কেতাতেও যথেষ্ট তফাত আছে। তাই পৃথিবীর বুকে সময় মাপার হিসাব সৌরজগতের কোণে কোণে খাটবে না। তাই মানুষ তাকালো দূর নক্ষত্রের দিকে। জোড়া নক্ষত্র পরস্পরকে পাক খায়। ওদের ওই পাক খাওয়া দেখে সময়ের একটা ধারণা গড়লো মানুষ। মহতো মহীয়ানের সঙ্গে অণোরণীয়ানের দিকেও তাকাল মানুষ। সিজিয়াম মৌলটার একটা বিশেষ আইসোটোপ যেভাবে দোল খায়, তা গণনা করে সময় মাপার ব‍্যবস্থা হল। এগুলোর সূক্ষ্মতা অনেক বেশি ।
অধ্যাপক মিত্র বললেন, বলাকার একটা কবিতায় রবীন্দ্রনাথ সময়কে একটা অদৃশ্য নদীর মতো ভেবেছিলেন।
শ‍্যামলী বলল, বৈষ্ণব কবি বিদ‍্যাপতির একটা পদে পড়েছিলাম, তোহে জনমি পুন, তোহে সমাওত, ন তুয়া আদি অবসানা। আমাদের এই গোটা বস্তুজগৎ যেন একটা ছোট্ট বিন্দুতে সংহত ছিল। তার পর বিগ ব‍্যাং। সেই সময়টা কত আগে, তাও আন্দাজ করা গিয়েছে। কিন্তু তার আগে কি ছিল, তা বলা যাচ্ছে না। আবার সমস্ত বিশ্বজগৎ সঙ্কুচিত হয়ে অসীম ঘনত্বে পৌঁছনোর পর সময় বলে কিছু থাকবে না। সময় রয়েছে বস্তুকে ঘিরে। যেখানে বস্তু নেই, সেখানে সময় বলেও কিছু নেই। বিছানার চাদরের চার কোণ চার জনে ধরে, সেই চাদরের উপর লোহার বল গড়িয়ে দিলে বলটা যেখানে থাকে, চাদরটা সেখানে তাকে ঘিরে বেঁকে থাকে। বিজ্ঞানীরা বলেন, যেখানে বস্তু নেই সেখানে সময় বলেও কিছু নেই।
অধ্যাপক সান‍্যাল বললেন, শ‍্যামলী, তুমি মন দিয়ে পড়াশুনাটা করে যাও। কোনো কারণেই ছেড়ে দিও না।
শ‍্যামলী বলল, আমি তো পড়তেই চাই। কিন্তু আমি একটা অস্থির সময়ের মধ্যে রয়েছি।

ক্রমশ…