জন্ম- ১৯৬৭, বরানগর। বর্তমানে দার্জিলিং জেলার মিরিক মহকুমার উপশাসক ও উপসমাহর্তা পদে আসীন। চাকরীসূত্রে ও দৈনন্দিন কাজের অভিজ্ঞতায় মধ্যবিত্ত ও নিম্ন মধ্যবিত্ত মানুষের সমস্যা সমাধানে তাঁর লেখনী সোচ্চার।

পর্ব – ১৫৭

অরুণ বললেন, বাজে কথা ছাড়ো তো, তুমি বিয়ে নিয়ে ভুলভাল বকা বন্ধ করো। তোমার ভালর জন‍্যই বলছি তোমার এইসব কথায় আমার শ্বশুর মশায় খুব আহত হয়েছেন।
শ‍্যামলী বলল, হুম, আপনার শ্বশুরবাড়ির লোকদের সবার সঙ্গেই এ নিয়ে আমার মতভেদ রয়েছে। তো অরুণদা, এ কথাটা তো আমার নয়!
অরুণ বললেন, আলবৎ এটা তোমার মনগড়া কথা।
শ‍্যামলী বলল, এই বক্তব্যের সঙ্গে আপনি সহমত নিশ্চয়ই?
অরুণ বললেন আশ্চর্য তো, তুমি বিবাহিত জীবনকে নোংরা কথা  বলবে, আর আমি একটা বিবাহিত পুরুষ হয়ে তা মেনে নেব?
শ‍্যামলী অবাক হয়ে বলল, বিবাহিত জীবন সম্পর্কে নোংরা কথা কোথায় বললাম অরুণদা? আমি তো শুধু বলেছি ম‍্যারেজ ইজ় লিগালাইজড প্রসটিটিউশন। এটা একটা নোংরা কথা মনে হল আপনার?
অরুণ বললেন, নোংরা নয়? সাংঘাতিক নোংরা কথা। তুমি ভাবতেই পারছ না, এসব বলে নিজের জন্মদাতা পিতা মাতাকে তুমি লোকচক্ষে কতদূর হেয় করছ।
শ‍্যামলী বলল, এটা আমার কথা নয়, এক মনীষীর কথা।
অরুণ ধমক দিয়ে বললেন, কোনো জ্ঞানী গুণী মনীষী এমন ভুলভাল কথা বলতেই পারেন না। ভূ ভারতে কেউ এমন বোকা বোকা কথা বলে নি, আর বলবেও না। শুধু তুমি বুদ্ধিভ্রষ্ট হয়েছ বলে নিজের আর নিজের পরিবারের মুখে চুনকালি লাগাচ্ছ। তুমি জান না, তোমার বাবা তোমার এই কথায় কতদূর বিরক্ত হয়েছেন।
 শ‍্যামলী বলল, অরুণদা, এই ম‍্যানেজার পোস্টে প্রমোশন পাবার আগে আপনাকে ব‍্যাঙ্কিং পরীক্ষা দিতে হয়েছিল না?
অরুণ বিরক্ত হয়ে বললেন, হ‍্যাঁ, কেন?
শ‍্যামলী বলল, না, এমনি জিজ্ঞাসা করছি আর কি?
অরুণ বললেন, আবার তুমি কথা ঘোরানোর চেষ্টা করছ?
না অরুণদা, আমার মনে হয় আজ বছর পাঁচেক হল আপনি ম‍্যানেজার পোস্টে প্রমোটেড হয়েছেন, তাই না?
 অরুণ কড়া গলায় জানতে চাইলেন, এই আলোচনার সাথে আমার চাকরির কি সম্পর্ক?
শ‍্যামলী ঢোঁক গেলার অভিনয় করে বলল, বলছিলাম কি এই চাকরি জোটাতে গিয়ে আপনাকে একটু আধটু অঙ্ক আর জেনারেল নলেজ চর্চা করতে হয়েছে?
অরুণ অবাক হয়ে বললেন, বলছ কি শ‍্যামলী, ব‍্যাঙ্কের চাকরি পেতে আমায় রীতিমতো পরীক্ষায় বসতে হয়েছে। তার আগে আমি এম কম করেছি। তারপর বিজনেস ম‍্যানেজমেণ্ট পড়েছি।
শ‍্যামলী বলল, তাই জন‍্য ভাবছি আপনি অল্প স্বল্প হলেও অঙ্ক আর জিকে পড়েছেন!
অরুণ হতাশ হয়ে বললেন, তোমার মাথা পুরোপুরি খারাপ হয়ে গেছে শ‍্যামলী। অঙ্ক আর জিকে আমি অল্পস্বল্প পড়েছি? তুমি ভাবলে কি করে?
শ‍্যামলী বলল বাঁচালেন অরুণদা। তাহলে অঙ্ক আর জিকে নিয়ে একটা সোজা গোছের প্রশ্ন করলে রাগ করবেন না তো?
অরুণ বিরক্ত হয়ে বললেন, এত রাতে তুমি আমায় পড়া ধরবে? তোমার আস্পর্ধা তো কম নয়?
শ‍্যামলী হেসে উঠে বলল, অরুণদা, রাগ করছেন কেন? রাগ করে বোকারা। চালাক লোকেরা বলে, বলো না, কি প্রশ্ন করবে? আমি কথা দিচ্ছি, মোটেও শক্ত প্রশ্ন করব না, আর একটু একটু ধরিয়েও দেব। রাজি হোন না অরুণদা, ভয় কিসের?
হতাশ হয়ে অরুণ বললেন, আচ্ছা বলো, পড়েছি পাগলের হাতে
শ‍্যামলী খল খল করে হেসে বলল,  পড়া ধরে মাঝ রাতে…
এবার অরুণদা প্রশ্নটা করছি, খুব সহজ, বাচ্চারাও পারবে এমন প্রশ্ন, সেটা হল কোন্ বিশিষ্ট গণিতবিদ, গণিতশাস্ত্রে যাঁর মৌলিক অবদান আছে, সাহিত‍্যে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন?
 অরুণ বললেন, গণিতের লোক, সাহিত্যে নোবেল? তুমি ঠিক বলছ?
শ‍্যামলী বলল, আজ্ঞে হ‍্যাঁ।
অরুণ বললেন, একটু ধরিয়ে দাও।
শ‍্যামলী বলল, ভদ্রলোক প্রিন্সিপিয়া ম‍্যাথেমেটিকা নামে বই লিখে ১৯১০ সালে বের করেছিলেন।
অরুণ বললেন, ইঃ, বড্ড কাঁচা কথা বললে তুমি, প্রিন্সিপিয়া লিখেছেন আইজ‍্যাক নিউটন। তাঁর সময়ে নোবেল পুরস্কার চালুই হয় নি। এ হেহেহে, আমাকে বোকা বানাতে চেয়ে তুমি নিজেই বোকা বনেছ!
শ‍্যামলী বলল, আজ্ঞে না ম‍্যানেজার সাহেব। আইজ‍্যাক নিউটন সাহেবের বইটির নাম ছিল ফিলজফিয়া ন‍্যাচারালিস প্রিন্সিপিয়া ম‍্যাথামেটিকা। সে বই ১৬৮৭ সালের জুলাই মাসের পাঁচ তারিখে বেরিয়েছিল। আর আমি যে নোবেল পুরস্কার বিজয়ীর কথা বলছি তিনি আলফ্রেড নর্থ হোয়াইট হেড এর সাথে একযোগে বই লিখে ১৯১০ সালে বের করেছেন প্রিন্সিপিয়া ম‍্যাথেমেটিকা সংক্ষেপে যে বইটি পিএম নামে পরিচিত।
অরুণ হার মানতে না চেয়ে বললেন, অন‍্য একটা প্রশ্ন করো।
শ‍্যামলী বলল, আচ্ছা বলুন তো, কোন্ ব্রিটিশ গণিতবিদ আমেরিকার বিরোধিতা করেছেন বলে কারাদণ্ডে দণ্ডিত হয়েছিলেন, আর জেলে বসে বসেই ১৯১৮ সালে ইন্ট্রোডাকশন টু ম‍্যাথেমেটিকাল ফিলজফি নামে বই লিখেছেন?
দীর্ঘশ্বাস ফেলে অরুণ বললেন, আর কোনো প্রশ্ন করো।
শ‍্যামলী বলল, আচ্ছা, গণিত আর তর্কবিজ্ঞান আসলে যে হরে দরে একই বিষয়, এটা প্রতিষ্ঠা করে ১৯০৩ সালে দি প্রিন্সিপলস অফ ম‍্যাথামেটিকস বইটি কে লিখেছেন?
অরুণ বললেন, অন‍্য কোনো প্রশ্ন করো?
১৯৬১ সালের সেপ্টেম্বরে লণ্ডনে পরমাণু অস্ত্র বিরোধী আন্দোলনে সামিল হয়েছিলেন বলে কোন্ গণিতবিদকে ঊননব্বই ব‌ৎসর বয়সে শান্তি ও সুস্থিতি ভঙ্গের দায়ে সাত দিনের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছিল?
অরুণ বললেন, না শ‍্যামলী হচ্ছে না, আর কোনো প্রশ্ন করো।
শ‍্যামলী বলল তথাস্তু। আচ্ছা জাম্বু বলুন তো, ১৯৬৭ সালে ভারতে একটি ফিল্ম রিলিজ হয়েছিল, আমন, পরিচালক ছিলেন মোহনকুমার, সুর করেছিলেন শংকর জয়কিশন, অভিনয়ে ছিলেন সায়রা বানু, রাজেন্দ্র কুমার, বলরাজ সাহানি, চেতন আনন্দ, নাসিরউদ্দিন শাহ্, গান গেয়েছিলেন মহম্মদ রফি আর লতা মঙ্গেশকর, সেই আমন ফিল্মে কোন্ ব্রিটিশ গণিতবিদ অভিনয় করেছেন?
অরুণ বললেন একজন গণিতবিদ মেইনস্ট্রিম হিন্দি সিনেমায় অভিনয় করেছেন?
শ‍্যামলী বলল, আজ্ঞে হ‍্যাঁ, সেই ১৯৬৭ সালে, যখন আপনি সবে সতের বছরের কিশোর। আর স্কুলের চৌহদ্দি টপকে গিয়েছেন।
অরুণ বললেন, পারছি না শ‍্যামলী। তুমি বলে দাও।
শ‍্যামলী বলল, ব্রিটিশ গণিতবিদ ভদ্রলোকের নাম বার্ট্রাণ্ড রাসেল। আমার প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর হল, বার্ট্রাণ্ড রাসেল। গত সত্তর সালের ফেব্রুয়ারিতে সাতানব্বই বৎসর বয়সে তিনি প্রয়াত হন।
অরুণ বললেন, বার্ট্রাণ্ড রাসেল? তিনি তো বিরাট বড় দার্শনিক।
শ‍্যামলী বলল, হ‍্যাঁ গণিত নিয়ে তাঁর অনেক মৌলিক কাজ ছিল। ১৯৫০ সালে তাঁকে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয়।
 অরুণ বললেন, বাঃ শ‍্যামলী বাঃ, কি রকম কথা ঘোরাতে পারো তুমি। বলতে গেলাম বিয়েটাকে লিগালাইজড প্রসটিটিউশন বলে তুমি গর্হিত কাজ করেছ, আর তুমি বার্ট্রাণ্ড রাসেলের কথা তুলে সব এলোমেলো করে দিলে।
শ‍্যামলী খিল খিল করে হেসে বলল, কিচ্ছু গুলিয়ে দিইনি অরুণদা। ওই সাংঘাতিক কথাটা আপনার ভাষায় বিরাট বড় দার্শনিক রাসেল সাহেব তাঁর ম‍্যারেজ অ্যাণ্ড মরালস্ নামে বইতে লিখেছেন। ১৯২৯ সালে মোটামুটি সাতান্ন বছর বয়সে তিনি বইটি লেখেন। রাসেলের বিরুদ্ধে তখন খুব ছিছিক্কার হয়েছিল দুনিয়া জুড়ে । কোর্ট কাছারি অবধি হয়েছিল। তখন অ্যালবার্ট আইনস্টাইন রাসেলের পক্ষে দাঁড়িয়ে বললেন, মাথামোটারা প্রায় সব সময়েই মহাত্মা ব‍্যক্তিদের নিন্দায় আকাশ বাতাস মুখরিত করে তোলে।
আর ১৯৫০ সালে, আপনি যে সালে জন্মেছিলেন, সেই সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পেয়ে সাতাত্তর বছর বয়সী রাসেল বললেন, আমাকে ওরা আমার ম‍্যারেজ অ্যাণ্ড মরালস্ বইটার জন‍্য নোবেল পুরস্কার দিয়েছে। নোবেল কমিটি অবশ‍্য বলেছিলেন, রাসেলের জীবনভর লেখালেখির জন‍্য এই স্বীকৃতি।
বাসন্তীবালা আবার জানলার ওপার থেকে বললেন, কিরে শয়তানী, আজ কি তুই সারা রাত ধরে ফোনে বকবক করবি?

ক্রমশ…