জন্ম- ১৯৬৭, বরানগর। বর্তমানে দার্জিলিং জেলার মিরিক মহকুমার উপশাসক ও উপসমাহর্তা পদে আসীন। চাকরীসূত্রে ও দৈনন্দিন কাজের অভিজ্ঞতায় মধ্যবিত্ত ও নিম্ন মধ্যবিত্ত মানুষের সমস্যা সমাধানে তাঁর লেখনী সোচ্চার।

পর্ব – ১৬৪

ক্লাস পড়িয়ে বেরোনোর সময় করবী মিত্র শ‍্যামলীকে হাতছানি দিয়ে ডাকলেন। বললেন, কি রে, শরীর খারাপ না কি?
শ‍্যামলী সচকিত হয়ে বলল, ক‌ই না তো?
করবী মিত্র বললেন, নেক্সট ক্লাস শেষ হলে টিচার্স কমন রুমে আমার সঙ্গে দেখা করবি।
মাথা নিচু করে শ‍্যামলী বলল, আচ্ছা।
পরের ক্লাসটায় শিক্ষক পড়ানোর ফাঁকে বললেন, প্রশান্ত মহলানবীশ আসলে ছিলেন ফিজিক্সের লোক। কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজেরর অধ‍্যাপক। কিন্তু স্ট‍্যাটিসটিকসের একটা ম‍্যাগাজিন, কার্ল পিয়ার্সনের বায়োমেট্রিকা হাতে পেয়ে তিনি ওই সাবজেক্ট নিয়ে আগ্রহী হন। তার পর প্রেসিডেন্সিতেই স্ট‍্যাটিসটিকসের চর্চা ভাবনা শুরু করেন। সেটা ঊনিশ শো একত্রিশ সালের  ডিসেম্বর। তারপর কলকাতার একটু উত্তরে বরানগরের বনহুগলিতে ইন্ডিয়ান স্ট‍্যাটিসটিকাল ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা করেন। সেটা ঊনিশশো বত্রিশ সাল। এরপর শিক্ষক জিজ্ঞাসা করলেন, তোমরা কেউ ভারতের আরেকজন বিশ্বখ্যাত গণিতবিদের নাম জান?
অনেকেই হাত তুলি তুলি করে ভরসা পেল না। শ‍্যামলী শুধু উঠে বলল, শ্রীনিবাস রামানুজন। বেঁচে থাকলে, আসছে ডিসেম্বরে তাঁর সাতানব্ব‌ই বছর বয়স হত?
শিক্ষক জিজ্ঞাসা করলেন, তাই? তাহলে কত সালে তিনি মারা গিয়ে ছিলেন?
শ‍্যামলী বলল, রামানুজন জন্মেছিলেন ১৮৮৭তে। বাইশে ডিসেম্বরে। আর মারা গেলেন ১৯২০তে। ফেব্রুয়ারির ছাব্বিশ তারিখে। তখন মোটে বত্রিশ বছর বয়স।
সমস্ত ক্লাস হায় হায় করে উঠল।
প্রশ্ন উঠে এল, কী অসুখ হয়েছিল রামানুজনের?
শ‍্যামলী চুপ করে দাঁড়িয়ে র‌ইল। শিক্ষক বললেন, জানিস না, তাই তো? আমিও জানি না।
শ‍্যামলী বলল, আপনি জিজ্ঞাসা করলে আমি বলতে পারি।
শিক্ষক বললেন, তাহলে বল্, আমরা শুনি।
রামানুজন  তাঁর মায়ের নির্দেশ মেনে কঠোরভাবে নিরামিষাশী ছিলেন।  আমাশয় ধাঁচের পেটের একটা সমস্যায় অনেকদিন ভুগেছেন। লণ্ডনে ঠাণ্ডায় প্রোটিন খাদ‍্যের অভাবে সিরিয়াস ভিটামিন ডেফিসিয়েন্সি ধরল তাঁকে। তার পর পর‌ই যক্ষ্মা।
শ‍্যামলীকে বসতে বলে শিক্ষক জিজ্ঞাসা করলেন, ট‍্যাকসি নম্বর জিনিসটা কি জানো?
 কয়েকটি মেয়ে হাত তুলি তুলি করে কিছুতেই তুলল না। শিক্ষক বললেন, বিলেতে অসুস্থ অবস্থায় রামানুজন তখন হাসপাতালে। অসুস্থ বন্ধুকে হাসপাতালে দেখতে এসেছেন গুণমুগ্ধ বন্ধু জি এস হার্ডি। রামানুজন এর সাথে হার্ডি অন‍্য কি নিয়ে আর গল্প করবেন, হার্ডি বললেন, শোনো, আজ আমি যে ট‍্যাকসি চড়ে এখানে এলাম, তার নম্বরটা ১৭২৯।
 তা শুনে রামানুজন খুবই খুশি হয়ে বললেন, বাঃ, এ তো চমৎকার একটা নম্বর!
হার্ডি জানতেন, সংখ্যার সঙ্গে রামানুজনের গভীর সখ‍্যতার কথা। তারপর কি হল কেউ বলতে পারবে? এবার কিন্তু শ‍্যামলী উঠবে না। ক্লাসের আর কেউ?
 মেয়েরা হাত তুলি তুলি করে তুলল না। শিক্ষক শ‍্যামলীকে বললেন, তুমি একটু চেষ্টা করবে নাকি?
শ‍্যামলী বলল, ১৭২৯ হল সেই সর্বকনিষ্ঠ সংখ্যা, যাকে দু জোড়া ঘনসংখ‍্যার যোগফল হিসেবে প্রকাশ করা যায়।
শিক্ষক বললেন, আরেকটু বিস্তারিত করে বল্?
শ‍্যামলী বলল, বারোর ঘন আর একের ঘন, যোগ করলে ১৭২৯। আবার দশের ঘন আর নয়ের ঘন, যোগ করলে ১৭২৯। এমন বৈশিষ্ট্য এর নিচে কোনো সংখ‍্যার নেই।
মেয়েরা কয়েকজন বলল, আশ্চর্য তো, রামানুজন তো আগে থেকে জানতেন না, বন্ধু কত নম্বরের ট‍্যাকসি চড়ে আসবে?
শ‍্যামলী শিক্ষককে বলল, আপনি অনুমতি দিলে , আমি আরেকটি গল্প বলতে পারি।
শিক্ষক বললেন, বল্?
শ‍্যামলী সবে শুরু করতে যাবে, এমন সময় ঘণ্টা পড়ে যেতে সব মেয়ে ক্লাস ছেড়ে চলে গেল। শিক্ষক শ‍্যামলীর দিকে তাকিয়ে হেসে বললেন, চল্ টিচার্স রুমে চল্, তোর গল্প শুনব।

ক্রমশ…