আমার নাটক, নাটকের আমি

(৭)

“পরে চাকরী করা কালীন রবীন্দ্রনাথের বৈকুন্ঠের খাতা’ নাটকে অভিনয় করেছিলাম, তাবলে মুক্তধারা না করতে পারার অনুতাপ যাবে কোথায়। প্রথমে লালুদা প্রত্যেককে নাটকটা রিডিং  পড়িয়েছিলেন। এক একদিন এক একজনের ভার পড়ত। যেমন তার সংলাপ তেমনি বক্তব্য। আশ্চর্য হতে হয় রবীন্দ্রনাথের দূরদৃষ্টি দেখে। আজও মেধা পাটেকার নর্মদার জলবন্টন নিয়ে আন্দোলন করছেন, আর নাটকে ধনঞ্জয় বৈরাগী। বুঝিয়েছিলেন অন্য নাটকের সঙ্গে মুক্তধারার তফাৎ। গোটা নাটকের  যাবতীয় ঘটনা মঞ্চের বাইরে, মঞ্চে খালি তার রিপোর্টিং। তাসত্ত্বেও নাটকীয়তার এতটুকু হেরফের হয় না। নট-রঙ্গ’র এটি সার্থক প্রযোজনা। বিপুল খরচ সাপেক্ষ। তার চেয়েও দুঃখের কথা ধনঞ্জয় বৈরাগীর চরিত্রে অভিনয় করত প্রকাশ মুখোপাধ্যায় @বুবু। অকালেই ক্যান্সারে মারা যায়। ফলে খুব বেশী অভিনয় হয়নি নাটকটি।
“ এতো তোমার অভিনয় না করতে পারার কথা, অভিনয় করতে পারার কথা শুনি”।
 “ কি বলব নন্দিনী আমি যে লালুদা সান্নিধ্য পেয়েছিলাম এটাই পরম ভাগ্যের কথা।  সেই সময় লালুদার সাহচর্য নাপেলে আজকে এসব কথা বলা হত না। ওইরকম একজন পন্ডিত  মানুষ আমার মতন একজন ননেন্টিটিকে ভালবেসে কাছে টেনে নিয়েছিলেন, জীবনে অনেক কিছু পাইনি নন্দিনী, প্রাপ্ত জিনিষ থেকে বঞ্চিত হয়েছি অনেকবার।  তার জন্যে যে দুঃখ হয়না তা নয়, কিন্তু যখন ভাবি ওইরকম একজন মানুষের সঙ্গ পেয়েছি, একি কম ভাগ্যে কথা, আমার অভিনয় করার কথা  আর কি বলব, সে বড় অল্পই । তারই স্মৃতি রোমন্থন করে আজও ভাল লাগে। অবসরে একলা ঘরে সেই সমস্ত সংলাপ আওড়াই স্বগতোক্তি মত। মাঝে মাঝে মনে হয় আর একবার দেখিনা  হয় কিনা, মঞ্চের অমোঘ আকর্ষণ উপেক্ষা করতে পারি না এখনো। হয়ত তাঁরই সঞ্চারিত করা উপলব্ধি যা মাঝে মাঝে জেগে ওঠে।কিন্তু  শারিরীক প্রতিবন্ধকতার জন্যে আর সাহস  করিনা।পুলিশের চাকরীর অভিশাপে  শরীরের ভারসাম্য নষ্ট হয়ে গেছে, একটা কান বন্ধ, অন্যের কথা যথাযথ শুনতে পাইনা। এরপর অভিনয় করতে গেলে নাটকের প্রতি অবিচার করা হবে।
“যাকগে বাদ দাও ওসব কথা  তোমার অভিনয় স্মৃতি  যা এখনো তোমার কাছে সজীব তার কথা বলো, বলতে তোমারও ভাল লাগবে”।
নিজের কথা বলতে গেলে আমার বড় ভয় করে নন্দিনী, “ আমারে না যেন করি প্রচার আমার আপন কাজে”- মনে হয় এই বুঝি আত্মপ্রচার হয়ে গেলে। যাই হোক তোমার যদি কখনো মনে হয় আমি নিজের কথা বড্ড বেশী করে বলে ফেলছি, সাবধান করে দিও। মাত্র আট বছরের নাটকের জীবন, কতটুকুই বা বলার আছে।
“তবু শুনিনা বড় ভাল লাগছে শুনতে”।
৭৬’এর শেষের দিক লালুদা ঠিক করলেন এর পর নট-রঙ্গ’এর পরর্বতী প্রযোজনা দীনবন্ধু মিত্রের সধবার একাদশী। স্কুলে বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস পড়তে গিয়ে দীনবন্ধু মিত্রের নীলদর্পণ সধবার একাদশী নাটকের কথা পড়েছিলাম। এর বেশী আর কিছু জানতাম না। নাটকটা একদিন লালুদা পড়লেন, নিমচাঁদ চরিত্রের সংলাপে ছত্রে ছত্রে সেক্সপীয়ার মিল্টন, বায়রণ বিভিন্ন  ইংরেজ কবির লেখা থেকে কোট করা, আমাদের মতন সাধারণের দাঁত ফোটানো দায়। শুধু পড়লেন না তার সঙ্গে  বোঝাতে থাকলেন সেই নাটকের সময় কাল। ডিরোজিও’র অনুগামী ইয়ংবেঙ্গল সোসাইটির নব্য যুবকেরা ইংরাজি শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে আধুনিক সভ্যতাকে স্বাগত জানাতে চাইল মদ আর গরুর মাংসের মাধ্যমে। ইংরাজি কালচারের অন্ধ অনুকরণের প্রতি দীনবন্ধু মিত্রের এই নাটকের মাধ্যমে তীব্র কষাঘাত। “ সভ্যতার সহিত বিদ্যাভাবের উদ্বাহ হলেই বিড়ম্বনার জন্ম হয়” নিমচাঁদ’এর এই সংলাপই নাটকের মূল বক্তব্য। নিমচাঁদ চরিত্রটি দীনবন্ধু মিত্র তৈরী করেছিলেন মধুসুদন দত্তের আদলে। স্বয়ং মধুসুদন যখন এর প্রতিবাদ করেছিলেন তার উত্তরে দীনবন্ধু মিত্র বলেছিলেন মধু কখনো নিমের মত তেঁতো হয়। বাংলা নাট্য সাহিত্যে একটি অমর প্রহসন। সেই নাটক আমরা অভিনয় করব। এই নাটক গিরিশ ঘোষ অর্ধেন্দু মুস্তাফি অভিনয়  করেছেন, শিশির ভাদুড়ী করেছেন। আমরা একটু সন্দিহান ছিলাম –পারব এই নাটক অভিনয় করতে।
“ কত দিন রিহ্যার্শাল হয়েছিল”।
“ রিহার্শ্যাল বলতে যা বোঝায় তা শুরু হয়েছিল অনেক পরে। প্রথমে বসে বসে সংলাপ আওড়ানো হত, মাস তিনেক পরে  শুরু হল আসল মহলা আর মন্ত্রমুগ্ধের মত দেখছি নিমচাঁদ চরিত্রে লালুদার অভিনয়। কি স্বতঃস্ফূর্ত  কি সাবলীল। কি তার সংলাপ- “আমি হিমাদ্রি অঙ্গজ মৈনাক, পাখার জ্বালায় জলে ডুবে রয়েছি”।
তখন কেদার ভট্টাচার্য লেনে মোহিতদের সামনের ঘর ভাড়া নিয়ে রিহার্স্যাল হত। মোহিত অভিনয় করত না, টেপ রেকর্ডারে মিউজিক অপারেট করত নাটক চলাকালীন। সেই ঘরে একটা দুপুরে মিউজিক রেকর্ডিং হল। সরোদ বাজিয়ে ছিল আমারই বন্ধু অলোক লাহিড়ি, ওরই এক বন্ধু ভারী সুন্দর হারমোনিয়াম বাজিয়েছিল, গানের সুর করেছিলেন বিখ্যাত গায়ক দীপঙ্কর চট্টোপাধ্যায়, সম্পর্কে লালুদার সম্বন্ধী, রাত ন’টার পর সব শেষ হয়েছিল। সেসব দিনের কথা কি ভোলা যায় নন্দিনী? আজও  যখন মোহিতদের বাড়ীর সামনে দিয়ে যাই মনে পড়ে সেই সব দিনগুলির কথা। সেই সকালের আড্ডা, নিরলস মহলা, কত লোকের আনাগোনা, শোনা যাচ্ছে সরোদের ঝংকার, বাঁশীর সুর, হারমোনিয়ামের মেলডি’।
“তুমি কোন চরিত্রে অভিনয় করেছিলে বললে নিশ্চয়ই আত্মপ্রচার হবে”।
“ আমি করতাম কেনারাম ওরফে ঘটিরাম ডেপুটির ভূমিকায়। শক্ত চরিত্র, বলতে দ্বিধা নেই প্রশংসিতও হয়েছিল। আজও যখন একলা বসে নাটকের কথা ভাবি, মনে হয় এই রকম একটি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে আমি অভিনয় করেছিলাম। অর্ধেন্দু মুস্তাফি, মণি শ্রীমাণি এই চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন। এই চরিত্রটি যে উতরে দিতে পেরেছিলাম তা সম্ভব হয়েছিল শুধুমাত্র লালুদার জন্যে। লালুদা এমনভাবে এই চরিত্রটির সত্ত্বা আমার মধ্যে সঞ্চারিত করেছিলেন, নাটক থেকে প্রায় আট বছর বিচ্ছিন্ন থাকার পর নব্বই সালে নট-রঙ্গ’ এর জন্মদিন উপলক্ষ্যে মাত্র তিনটি রির্হাস্যাল দিয়ে ওই চরিত্রে অভিনয় করেছিলাম প্রায় নির্ভুল ভাবে। দেখছ তো নিজের কথা বড্ড বেশী করে বলে ফেলছি।
“না না মোটেই নিজের সম্বন্ধে বেশী বলোনি।
“ এটা আমার গর্ব বলতে পারো,  অনেক নাটকেই তো অভিনয় করেছি, সধবার একাদশী আর ফজল আলি আসছে কথা আলাদা করে কেন  বলতেই হয়।এই তো সেদিন তপন থিয়েটারে গ্রীণরুমে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেবার সময়, বিলু লালুদার ছেলে সোহন বন্দ্যোপাধ্যায় এ ফজল আলি আর ঘটিরাম ডেপুটির চরিত্রে অভিনয় করত।
 আজ এত বছর পরেও বারে বারে স্মৃতি রোমন্থনের মাধ্যমে ফিরে যাই সেই  সোনালী অতীত দিন গুলিতে। আসলে  কি জানো যতই নিজে গর্ব করিনা কেন, ভাল অভিনয়্বের কথা যদি বলতে হয় তবে লালুদার নিমচাঁদ চরিত্রের কথাই বলতেই হবে। বিভিন্ন পত্র পত্রিকা সংবাদপত্র তো প্রশংসা করেই ছিল। আমার নিজের একটা অনুভূতির কথা জানাই, নাটকের একজায়গায় যেখানে অটল নিজের সম্পর্কিত সুন্দরী শাশুড়ী বার করে বাগানবাড়ীতে আনার মতলব করছে, সেখানে নিমচাঁদ তাকে বারণ করছে, নিজের স্ত্রীর কছে ফিরে  যেতে বলছে। তখন অটলের সংলাপ “ তবে তুই তোর মেগের কাছে যা”- এখানে নিমচাঁদের সংলাপ ছিল “ Thou stickest a dagger in me” অটলের ওই সংলাপ শেষ হওয়ার সাথে সাথে  লালুদা মুখ দিয়ে একটা আওয়াজ বার করতেন, মনে হত সত্যি সত্যি  কেউ তাঁর শরীরে ছুরি ঢুকিয়ে দিয়েছে। প্রতিবারই আমরা চমকে যেতাম। এসব কথা বলে বোঝানো যাবে না যারা না দেখেছেন।  এর পরের সংলাপ ছিল  –“ অটল, কি গালাগালিই তুই দিলি”। একটা গভীর বেদনার মধ্যে থেকে উঠে আসা এই সামান্য কটি কথার উচ্চারণে লালুদা বুঝিয়ে দিতেন  নিমচাঁদের ব্যক্তিগত জীবনের ট্র্যাজেডি।

ক্রমশ…