জন্ম- ১৯৬৭, বরানগর। বর্তমানে দার্জিলিং জেলার মিরিক মহকুমার উপশাসক ও উপসমাহর্তা পদে আসীন। চাকরীসূত্রে ও দৈনন্দিন কাজের অভিজ্ঞতায় মধ্যবিত্ত ও নিম্ন মধ্যবিত্ত মানুষের সমস্যা সমাধানে তাঁর লেখনী সোচ্চার।

মহাভারতের পৌরব বংশ, বংশরক্ষা ও জেনেটিক্স – ধারাবাহিক ঘৃণা দ্বেষ আর অসূয়া

সত‍্যবতী কথা

জেনেটিক্স নিয়ে আধুনিক যুগে এক ভারতীয় বিজ্ঞানী নোবেল পেলেও আমাদের আর্য ঋষি গণের কাছে তিনি যে তুশ্চু, তা সহজেই বোঝা যায়। প্রজননের কত কি না আমাদের প্রাচীন আর্য রা জানতেন ! এক মহাভারতের পৌরব বংশটি দেখুন না! ওই তো বিচিত্রবীর্য, তাঁর নামের মধ্যেই প্রজননতন্ত্রের একটি খাঁটি জিনিস বিরাজমান। তো বিচিত্রবাবুর বীর্যের কিছু সমস্যা ছিল। স্পার্মকাউন্ট কম সম হবে আর কি! তো তার মা সত্যবতী তো নাতির মুখ না দেখে ছাড়বেন না। সত্যবতীর বড়ছেলে চিত্রাঙ্গদ ওই সমনামের গন্ধর্বের সাথে লড়াই করতে গিয়ে ইতিমধ্যেই বীরগতি প্রাপ্ত হয়েছেন। শান্তনুর ঔরসে সত্যবতীর মাত্র দুটি পুত্র থাকলে কি হবে, পূর্বকালে পরাশর ঋষির ঔরসে নৌকা বাইবার কালে এক পুত্র হয়েছিল। সেই কানীনসন্তান কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাসকে ডেকে পাঠালেন মা সত্যবতী। হে পুত্র, বংশরক্ষা করো। অমনি ব্যাসদেব এক পায়ে খাড়া। আরে, বন জঙ্গল থেকে এসেছ, একটু সাফসুতরো হও। একটু গন্ধ টন্ধ মাখো, তা নয়, জংগুলে কায়দায় রমণমত্ত হলেন কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস। তাঁর লিঙ্গ দেখে অম্বিকা, কাশী রাজের মেজো মেয়ে, ভয়ে চোখ বন্ধ করে ফেললেন। কাশী রাজের ছোট মেয়ে অম্বালিকাও প্রবল ভয়ে ফ্যাকাশে হলুদ হয়ে গেলেন। চোখ বন্ধ অম্বিকার গর্ভে জন্মাবেন চির অন্ধ ধৃতরাষ্ট্র। অম্বালিকার গর্ভে জন্মাবেন পাণ্ডু। এদিকে ব্যাসের রমণেচ্ছা থামে না। অম্বিকা আবার রজস্বলা হতে ব্যাসের ডাকা ডাকি। অম্বিকা বুদ্ধি করে এক দাসীকে পাঠিয়ে দিলে। সে বেচারি দাসী। যৌনতার কালে পুরুষ একটু আদর টাদর করবেন, সুন্দর কথা বলবেন, অঙ্গ রাগ করবেন, এত আশা দাসীর হবে কেন? দাসী মেয়ে অর্গাজমের কি বোঝে ? তার কিন্তু সুস্থ সন্তান হল। তিনি বিদুর। দাসীপুত্র বলে সিংহাসনে তার অধিকার কেউ স্বীকার করে নি।

গঙ্গার কথা

বংশধারা বলে লোকে চেঁচায়, কিন্তু আমাদের পৌরব বংশে ও জিনিসটি কি রকম রূপ নিয়েছে দেখা যাক। দেবসভায় আমন্ত্রিত হয়ে বসেছিলেন প্রতীপ। রাজা বটে। রাজসিক হাবভাব। সাত্ত্বিক নয়, তামসিক নয়। রাজসিক। গঙ্গা এসেছিলেন সভায়। মারকাটারি রূপ তাঁর। গঙ্গার পরনে মসলিন। সে মসলিন এমন যে সিথ্রু বললে মন্দ হয় না। পবন করলেন কি সেখানাও উড়িয়ে দিলেন গঙ্গার গা থেকে। গঙ্গা পোস্টমডার্ন মেয়ে। পোশাক নেই তো কি এল গেল। দিব্যি হাসিমুখে দাঁড়িয়ে আছেন। দেবতারা চোখ নত করেছেন। তাঁরা সাত্ত্বিকের দলে। রাজা প্রতীপ কিন্তু সুরধুনী গঙ্গার ওই অনিন্দিতা নগ্নকান্তি দেখে চোখ ফেরাতে পারেন নি। তাতে দেবতারা খুব ক্ষুব্ধ হন। তাঁদের মতে রাজা প্রতীপের আচরণ রুচিবিগর্হিত। রাজাকে সটান মর্ত্যে ফিরে যেতে হল। মর্ত্যে গঙ্গার তীরে জোড়াসন করে বসেছেন রাজা। নদী থেকে উঠে এসে গঙ্গাদেবী প্রতীপ এর কোলে উঠে বসলেন। শাস্ত্রমতে কোলে বসার রকম সকম আছে। কোন কোল প্রণয়িনীর, কোন কোল কন্যা স্থানীযা মানবীর, তা বলা আছে। রাজা প্রতীপ পুত্র শান্তনুর সাথে গঙ্গার বিয়ে দিলেন। সে বিয়ে শান্তনুর পক্ষে সুখের হয় নি। একের পর এক পুত্র সন্তান জন্মেছে গঙ্গাগর্ভে আর সদ্যোজাত শিশুকে নদীগর্ভে নিক্ষেপ করেছেন মা। শান্তনু কিছু বলতে পারেন নি। না, ব্যক্তিত্বের অভাবের জন্যে নয়। গঙ্গার সাথে বিয়ের আগেই গঙ্গা হবু বরের সাথে ওইভাবে কন্ট্রাক্ট করেছিলেন। গন্ডগোল বাধলো অষ্টমগর্ভে।

বিয়ে বিয়ে খেলা

আসলে গঙ্গার সাথে শান্তনুর বিয়ে বাস্তবে গঙ্গার পক্ষে একটা বিয়ে বিয়ে খেলা। সবাই ভাবে ম্যারেজেস আর মেড ইন হেভেন – এক্ষেত্রেও অন্যার্থে তা হয়েছিল। অষ্টবসুগণ কি একটা দোষ করায় মানবজন্ম নিতে বাধ্য হন। তা তাদের সাথে গঙ্গার ওইরকম চুক্তি হয় যে, গঙ্গার গর্ভে তাঁরা জন্মাবেন, আর সদ্যোজাতকে নদীগর্ভে বিসর্জন দিয়ে পুনরায় স্বর্গে পুনর্বাসন পাবার সুযোগ করে দেবেন গঙ্গা। বেচারি শান্তনু এত কিছু জানতেন না। অষ্টম বারে শিশু জন্মালে পূর্ব চুক্তি অনুযায়ী গঙ্গা তাঁকেও বিসর্জন দিতে যাবেন, এমন সময় শান্তনু আপত্তি করলেন। বিয়ের আগে শান্তনুর থেকে গঙ্গা প্রতিশ্রুতি আদায় করেছিলেন যে গঙ্গার কোনো কাজে কোনোরকম বাধা তিনি দিতে পারবেন না। বাধা দিলে সাথে সাথে বিয়ে বাতিল। গঙ্গার চুক্তিটি শান্তনু খুব তলিয়ে দেখেন নি। তাই তিনি বিশেষ ভাবেন নি। অষ্টম সন্তানকে বিসর্জনের সূত্রে শান্তনুর আপত্তিকে ছুতো করে একতরফা বিয়ে ভেঙে দিলেন সেই সাংঘাতিক রূপসী।

যোজনগন্ধা

খুব দুর্ভাগ্যের ব্যবস্থা বলতে “বাপের বিয়ে দেখানো” বলা হয়। তো নিজের বাপের বিয়ে দেখা শুধু নয়, বিয়ের যোগাড় যন্তর, মায় পাত্রী বাছাই অব্দি করেছেন দেবব্রত। কে বলুন তো? সেই অষ্টম গর্ভের গঙ্গা পুত্র। পাত্রী হলেন সত্যবতী। তিনি মৎস্যরাজের কন্যা। কন্যাকালে গায়ে তাঁর মাছের আঁশটে গন্ধ। পরে মুনি পরাশরের আশীর্বাদে গায়ে সুন্দর গন্ধ হয় তাঁর। বহুদূর অবধি সেই সুগন্ধ পাওয়া যেত তাঁর। তাই ওঁর আরেক নাম যোজনগন্ধা। মুনি পরাশর অবশ্য এমনি এমনি বর দেন নি। ডবকা ছুঁড়ি নৌকো বাইছিল। সে মৎস্যরাজের মেয়ে। মুনি সে সব জানে না। কুমারী মেয়েকে মুনি কামনা করে বসলো। সত্যবতী বললো নৌকোয় না আছে আড়াল, না আছে আবডাল। কি করে হবে? মুনির তপঃপ্রভাবে ঝঞ্ঝা সৃষ্টি হয়ে মিলনের কাঙ্খিত আড়াল গড়ে দিল। মিলিত হলেন কুমারী সত্যবতী পরাশরের সাথে। সেই কানীনসন্তান কৃষ্ণদ্বৈপায়ন ব্যাস। মুনির বরে সত্যবতীর গায়ে সুন্দর গন্ধ হল। তা অনেক দূর থেকে পাওয়া যেত। এমন চমৎকার মেয়েকে নিজের বাপের জন্যে পাত্রী হিসেবে বাছাই করেছিলেন সেই অষ্টম গর্ভের সন্তান দেবব্রত।
ভীষ্মের প্রতিজ্ঞা
দেবব্রত তো নিজের বাপের বিয়ের বন্দোবস্ত করলেন। সত্যবতী বুদ্ধিমতী মেয়ে। দেবব্রতকে কে দেখেই বুঝে গিয়েছেন এ কি জিনিস। সত্যবতী দাবি করলেন তিনি শান্তনুকে বিয়ে করতে পারেন, তবে দেবব্রতের রাজা হওয়া চলবে না। রাজা হবে সত্যবতীর ছেলে। দেবব্রত রাজি। দেবব্রতের ভালমানুষি ভাল ঠেকল না সত্যবতীর। সে বললো, তুমি নয় রাজা না হলে বাপু, তোমার বংশধর যে আমার ছেলেদের রাজত্ব কেড়ে নেবে না, তার কি গ্যারান্টি আছে বাপু ? গ্যারান্টি দিলেন দেবব্রত। বললেন বিয়েও করবো না। চিরকুমার থাকব। ভীষণ প্রতিজ্ঞা শুনে সবাই নাম দিল ভীষ্ম। আড়ালে হয়তো কেউ কঠিন হাসি হাসলেন। সত্যবতীর সন্তান কি রাজা হয়েছিল ? ও কার সন্তান? কার বংশধারা ?

শিখণ্ডী কথা

বাপের বিয়ে হলে নতুন করে দুই ভাই হল দেবব্রতের। চিত্রাঙ্গদ আর বিচিত্রবীর্য। চিত্রাঙ্গদ মারা পড়লো সমনামের গন্ধর্বের সাথে লড়তে গিয়ে। এবার বিচিত্রবীর্যের বিয়ে দাও। সেই বিয়ে দিতে গিয়ে কাশীরাজের তিন কন্যা অম্বা, অম্বিকা ও অম্বালিকাকে কেড়ে আনলেন দেবব্রত। অম্বা কেঁদে হাত জোড় করে বললেন আমাকে ছেড়ে দাও, আমি শাল্বের বাগদত্তা। অম্বা শাল্বের কথা তুলে ছাড়া পেলেন। তবে দুর্ভাগ্য তাঁকে ছাড়লো না। শাল্বের রাণী হওয়া হলো না অম্বার। রামচন্দ্রের দেশে অন্য পুরুষের ছোঁয়া মেয়ে কেউ নেয় ? শাল্ব অম্বাকে নিলেন না। মরলো সে মেয়ে। বার বার জন্মে আর বার বার আত্মহত্যা করে শিখণ্ডী রূপে জন্ম নিল সে। শিখণ্ডী না পুরুষ, না মেয়ে। সে ক্লীব। হিজড়া জন্ম বা নপুংসক জন্ম সে যুগেও ছিল। ভীষ্মকে হত্যা করতে ব্যবহার করা হয়েছিল এই শিখণ্ডীরূপিণী অভিমানিনী অম্বাকে।

ব‍্যাস ও কর্ণ

একটা বৃত্তের পরিধির উপর একটা জ্যা যদি কেন্দ্র ভেদ করে যায়, তাকে বলি ব্যাস।
একটা সামান্তরিকের বিপ্রতীপ কোণদুটি ছোঁয়া সরলরেখাকে বলি কর্ণ ।
ব্যাস ও কর্ণ , এই দুই জ্যামিতিক ধারণা, মহাভারতের দুটি আশ্চর্য চরিত্র। দুজনেই নিজ নিজ গর্ভধারিণীর কন্যাকালে জাত সন্তান। কানীনসন্তান।

বংশরক্ষার ধারাবাহিক

ব্যাসের ঔরসে তো অম্বিকার গর্ভে জন্মান্ধ ধৃতরাষ্ট্র জন্মালেন আর অম্বালিকার গর্ভে জন্মালেন পাণ্ডু। দুই অসুস্থ সন্তান। পুত্র উৎপাদনের শক্তি এই দুজনের ছিল না। সঙ্গমকালে জননীর তীব্র ঘৃণা ও বিবমিষা এ রকম অসুস্থ সন্তানের জন্মের কারণ হতেও পারে। তো বিবাহের পর পাণ্ডু তাঁর দুই রাণীকে নিয়ে বনে বেড়াতে যান। পাণ্ডুর যে সন্তান উৎপাদনের ক্ষমতা নেই, সেটা কুন্তী ও মাদ্রী জানতেন। তাঁরা নিজের নিজের চাহিদা মতো দেবতাদের সঙ্গ প্রার্থনা করে গর্ভবতী হলেন। ধর্মরাজ, পবন ও ইন্দ্র এই তিন গুরুত্বপূর্ণ দেবতার অঙ্কশায়িনী হলেন কুন্তী। আর মাদ্রী ডেকেছিলেন অশ্বিনীকুমারদ্বয়কে। দেবতাদের সৌজন্যে পাণ্ডু পাঁচ পাঁচটি অমিতক্ষমতাসম্পন্ন পুত্র লাভ করলেন।

বিদ্বেষের জন্ম

ওদিকে ধৃতরাষ্ট্রের দ্বারা গান্ধারীরও গর্ভসঞ্চার হওয়া সম্ভব ছিল না। গান্ধারী দেবতাদের সঙ্গও পান নি। কুন্তী ও মাদ্রী যে গর্ভবতী হয়েছেন, সেই খবর শুনে প্রবল অসূয়া ও দ্বেষ পরায়ণ হয়ে গান্ধারী নিজ নাভিমূলে আঘাত করেন। ওই আঘাতে একটি টিউমার গড়ে ওঠে। টিউমারকে সে সময় অরবুদ বলা হত। ওই জিনিসটি যে অরবুদ, এটা প্রথমে বোঝা যায় নি। পরে সময়কালে যখন সন্তান হলো না, তখন, ওই টিউমারটি অপারেশন করে বের করে এনে একশোখানি টুকরো করে আলাদা আলাদা দ্রোণ বা পাত্রে ঘি ভরে তাতে রাখা হল। পরে সেখান থেকে দুর্যোধন প্রমুখের জন্ম হয়। অসূয়া বিদ্বেষ ছিল তাদের সৃজনের সাথে অঙ্গাঙ্গী জড়িয়ে। তা হলে পৌরব বংশের শান্তনুর বংশরক্ষা জিনিসটি কি রকম দাঁড়াল ?
এই যে ভাইয়ের বিয়ে দেবেন বলে দেবব্রত ধরে আনলেন কাশীরাজের তিন তিনটি মেয়েকে, এর ফলে তিনটি মেয়ের জীবনই কি ছারখার হয়ে যায় নি? অম্বা বললো সে শাল্বের বাগদত্তা। তাতে বিচিত্রবীর্যের অঙ্কশায়িনী হওয়া থেকে মুক্তি পায় সে। কিন্তু জীবন পায় কি ? শাল্ব তাঁকে প্রত্যাখ্যান করেন। গভীর মর্মজ্বালা নিয়ে আত্মহত্যা করেন অম্বা। দেবব্রতের প্রতি চির জাগরুক ঘৃণা ও বিদ্বেষ থেকে বার বার জন্মে আত্মহত্যা করে ক্লীবজন্ম পান অম্বা। নাম তখন শিখণ্ডী। দেবব্রত জানতেন শিখণ্ডী আসলে অম্বা। ঘৃণার এক ধারাবাহিকতা এই শিখণ্ডী জন্মে।
বিচিত্রবীর্য তো সন্তান উৎপাদন করতে পারেন নি। ব্যাসদেবকে নিয়োগ করতে হয়ে ছিল। আর ব্যাসের চেহারা ও ব্যবহার ঘৃণা ও বিবমিষার উদ্রেক করেছিল অম্বিকা ও অম্বালিকার মনে। কর্ণের চেহারা ও ব্যক্তিত্ব, সহজাত কবচ কুণ্ডল ও বর্ম চিনিয়ে দিত তাঁর অভিজাত জন্মরহস্যটি। তাই যেন তাঁকে পাণ্ডবেরা বারে বারে হেয় করেছে। বাল্যকালে কর্ণের সাথে অস্ত্র ক্রীড়ায় সামিল হতে চায়নি কুন্তী তনয়েরা। দ্রৌপদী পর্যন্ত স্বয়ংবর সভায় অপমান করেছে কর্ণকে।
ঘৃণা দ্বেষ আর অসূয়া পরতে পরতে জড়িয়ে আছে এই গল্পে। ঘৃণা ধিক্কার দীর্ঘ নিঃশ্বাস করুণ করে দিয়েছে গল্পটাকে।