তৃষ্ণা বসাক এই সময়ের বাংলা সাহিত্যের একজন তন্নিষ্ঠ কবি ও কথাকার। গল্প, উপন্যাস, কবিতা, কল্পবিজ্ঞান, মৈথিলী অনুবাদকর্মে তিনি প্রতিমুহুর্তে পাঠকের সামনে খুলে দিচ্ছেন অনাস্বাদিত জগৎ। প্রাপ্ত পুরস্কারের মধ্যে রয়েছে- পূর্ণেন্দু ভৌমিক স্মৃতি পুরস্কার ২০১২, সম্বিত সাহিত্য পুরস্কার ২০১৩, কবি অমিতেশ মাইতি স্মৃতি সাহিত্য সম্মান ২০১৩, ইলা চন্দ স্মৃতি পুরস্কার (বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষৎ) ২০১৩, ডলি মিদ্যা স্মৃতি পুরস্কার ২০১৫, সোমেন চন্দ স্মারক সম্মান (পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি) ২০১৮, সাহিত্য কৃতি সম্মান (কারিগর) ২০১৯ ও অন্যান্য আরো পুরস্কার।

শূন্যকাননের ফুল

১| মারিওভা কফি জয়েন্ট

‘নতুন কফি জয়েন্টটায় গেছিলে কোনদিন?’
‘কোনটা?’
এরো-স্কুটিটাকে কায়দা করে হাওয়ায় ভাসিয়ে রেখেছিল জারা। নোয়ার ঝুলবারান্দার ঠিক এক তলে, একদম নোয়ার মুখোমুখি। কথা বলতে বলতে একটু ছুঁয়ে নিচ্ছে নোয়াকে। ওর চুল, গাল, ঠোঁট। এভাবে ছুঁতে ওর ভালো লাগছে। বিশেষ করে নোয়ার ঠোঁট ছুঁলে ওর শরীরের মধ্যে কি যেন একটা হচ্ছে। এরকম তো আগে কক্ষনো হয়নি। প্রতিদিন বাড়ি থেকে বেরনোর আগে মা পইপই করে বলে দেয়
‘নিউট্রাল মোডটা অন করে নে জারা’
লক্ষ্মী মেয়ের মতো তা করেও জারা। কিন্তু ওর স্কুটি যখন বাড়ি ছাড়িয়ে অনেকখানি এগিয়ে যায়, তখন সে টুক করে গার্ল মোডে চলে যায়। মেয়ে, সে এখন একটা মেয়ে। অন্তত অফিস পৌঁছনোর আগের রাস্তাটুকু সে একটা মেয়ে হয়ে ফুরফুর করে উড়তে উড়তে চলে যায়। আবার অফিস পৌঁছে ব্যাক টু নিউট্রাল মোড। তখন যে যতই ইনিয়েবিনিয়ে কথা বলুক বা অশোভন সংকেত পাঠাক, তার কিচ্ছু হবে না!
আগে বেশ মজা লাগত তার। মনে হত, এটা তার স্বাধীনতা। কিন্তু আজকাল মনে হয় অফিস, কাছারি, স্কুলে কেন নিউট্রাল মোডে থাকার কথা বলা হয় তাদের? ছেলেদেরও বলা হয় অবশ্য। কিন্তু ছেলেরা শোনেই না ওসব। আর সত্যি বলতে কি, ছেলেদের এভাবে বলাও হয় না। না বাড়িতে, না বাইরে। আজকাল তো প্রতিটা ট্রাফিক সিগন্যালে, স্কাই-গ্রাফিতি বোর্ডগুলোয় পর্জন্ত লেখা ফুটে উঠছে –
‘ গার্লস, প্লিজ সুইচ টু নিউট্রাল মোড
গার্লস, প্লিজ সুইচ টু নিউট্রাল মোড’
তারপর লম্বা পরিসংখ্যান আসতে শুরু করে। এই নিউট্রাল মোড, যাকে সরকারিভাবে বলা হচ্ছে নিঊট্রালাব্রিয়াম- আ স্টেপ টুওয়র্ডাস জেন্ডারলেস সোসাইটি, সেটা চালু হবার পর থেকে রেপ ভিক্টিম কত কমে গেছে, তার ডেটা। সব মিথ্যে কথা। জারা জানে। কমলে তার মা এত টেনশনে ভুগত না। শুধু তার মা নয়, আর্থেনিয়ার সব মায়েরা। আর্থেনিয়ার বয়স বেশি না, এখনো পাঁচশো হয়নি। একটা ছোট্ট গ্রহাণুকে সাজিয়ে নেওয়া হয়েছে বিকল্প বাসভূমি হিসেবে। কিন্তু পুরনো পৃথিবী, মানবসভ্যতা- সে তো হাজার হাজার বছরের পুরনো। সেখানে এখন ৩০৩০ সাল। আর্থেনিয়ায় সেই সময়ের হিসেবই রাখা হয়। কারণ প্রশাসনে তো সেই পুরনো পৃথিবীর স্থবির মানুষগুলোই। নতুন সময়ের হিসেব ওরা রাখতে পারে না।
কিন্তু জারা, আর জারার মতন যারা আর্থেনিয়ায় জন্মেছে, তারা জানে এটা ৪৭৬ আর্থেনিয়ান ইয়ার। কিন্তু সে জানা কেবল কাগজে কলমে। তারাও পুরনোদের মতো অভ্যস্ত হয়ে গেছে এই ৩০৩০ এ। তাই জারা এখন ভাবল, এই ৩০৩০ এও আর্থেনিয়ার মতো জায়গাতে রেপ হয়ে যাচ্ছে, ভাবা যায়! প্রশাসন, যাকে এখানে বলা হয় সেন্ট্রাল হাব, সংক্ষেপে সি.এইচ., শুধু বাণী দিয়ে ক্ষান্ত। নিউট্রালাব্রিয়াম! হুঁ অল বোগাস।
জারার খেয়াল হল নোয়া তাকে অনেকক্ষণ আগে কিছু একটা জিগেস করেছিল।
ও একটু লজ্জা পেয়ে বলল ‘ ও সরি, তুমি কিছু বলছিলে তাই না?’
নোয়া ঝুলবারান্দায় দাঁড়িয়ে অবাক চোখে জারাকে দেখছিল। মেয়েটা খুব অদ্ভুত। আর্থেনিয়ায় এমন মেয়ে দেখা যাবে না একটাও। কথা বলতে বলতে মাঝেমাঝেই ও যেন কোথায় হারিয়ে যায়। আসলে মেয়েটা অনেককিছু নিয়ে ভাবে। সব বিষয়ে ওর একটা নিজস্ব চিন্তাভাবনা আছে। বছরখানেক হবে, নোয়া ঘুরতে ঘুরতে এখানে এসে পড়েছে। এমন কোন মানুষ চোখে পড়েনি, যে কোন কিছু নিয়ে কিছু ভাবে বা নিজের মতামত এত জোরালোভাবে প্রকাশ করে। এই আর্থেনিয়ায় সবাই বাঁধা গতে চলে, বাঁধা পথে বাড়ি ফেরে। ওয়াল স্ক্রিনে মঙ্গল বনাম পৃথিবীর সুপার অ্যানিম বল দেখে। আর রবিবার রবিবার ভাবলেশহীন মুখে কমিউনিটি রিলিজিয়ন হলে গিয়ে বসে থাকে। তারা সেন্ট্রাল হাবের প্রতিটি নির্দেশ অক্ষরে অক্ষরে মানে, কোথাও অন্যায় হচ্ছে জেনে বুঝেও, চোখ বুজে সেখান থেকে সরে পড়ে, ভুলেও প্রতিবাদ করে না। আর এ মেয়েটা একেবারে আশ্চর্জ! বাঁধা ছকের বাইরে যেতেই ওর যত উৎসাহ। আর সেভাবেই ও নোয়াকে আবিস্কার করেছে একদিন। সেই দিনটা মনে পড়লে আজো শরীরটা শিরশির করে ওঠে। এই হ্যাঙ্গিং কমপ্লেক্স, লোকের মুখে মুখে যার নাম ঝুল কলোনি , তার পাশ দিয়ে অফিস যাওয়ার পথে একদিন জারা দেখল, ঝুল কলোনির একটা বাড়ির ঝুলবারান্দায় একটা ছেলে টবে ফুল ফোটাচ্ছে। ফুল ফোটা কীভাবে চোখের সামনে দেখা যায়? যায়। পৃথিবী এখন চাষবাসে নতুন করে উন্নতি করছে। বিশেষ করে ফুলচাষে। একঘণ্টায় ফোটা, দুঘণ্টায় ফোটা ফুল তো ছিলই, সম্প্রতি হই চই ফেলে দিয়েছে দু মিনিটে ফোটা ফুল, যে ফুলের চারা মাটিতে পুঁতে জাস্ট ট্যু মিনিটস বলার অপেক্ষা। এটা কানে এসেছিল, কিন্তু চোখে দেখেনি জারা। আজ সে চোখের সামনে দেখল একটা ছেলে বারান্দার টবে জাদুকরের মতো ফুল ফোটাচ্ছে। সে তার এরো স্কুটিটা স্ট্যাটিক মোডে নিয়ে গিয়ে অবাক হয়ে দেখল কী অপূর্ব একটা ফুল, রংটা আগুন লাল, ফুটে উঠল আস্তে আস্তে। আগুন লাল বলল বটে, কিন্তু সত্যি সত্যি আগুন কখনো চোখে দেখেনি জারা। আর্থেনিয়ায় কোন প্রাকৃতিক রং ই নেই। থাকবে কি করে, কোন প্রকৃতিই তো নেই সেখানে। সব তৈরি করা, বানানো। তার মানে কিন্তু নকল গাছপালা, পাহাড় বানিয়ে বসানো তা নয়, এসব ভার্চুয়ালি প্রজেক্ট করা, যাতে নদী, পাহাড়, বনজঙ্গলের একটা ইলিউশন তৈরি হয়। জারা যেমন ফেরার সময়, প্রায়ই একটু ঘুরে নদীর ধার হয়ে আসে। নদীর নাম বাঁশি। সেই নদীর সূর্জাস্ত দেখার জন্যে কত লোক আসে সেখানে। মেলার মতো ভিড় হয়। জারা জানে, নদীটা সত্যি নয়, ভার্চুয়াল। কিন্তু সূর্জটা সত্যি। পৃথিবী আর আর্থেনিয়া একই সোলার সিস্টেমের মধ্যে পড়ে। রোদ্দুরের রংটাই জারার দেখা একমাত্র প্রাকৃতিক রং। তবে রোদ্দুরের রং সব সময় একরকম থাকে না। এই ছেলেটা যে ফুল ফোটাল, তার রং সূর্জাস্তের রোদের রঙ্গের মতো। জারা মুগ্ধ গলায় বলল ‘আগুন লাল’
ছেলেটা চমকে তাকাল।
‘তুমি আগুন দেখেছ কখনো?’
‘না, ছবি দেখেছি। আর বাঁশি নদীতে সূর্জাস্তের সময় ঠিক এইরকম রং হয়’
‘বাঁশি নদী? বাঃ! এইরকম নামের নদী আছে আর্থেনিয়ায়?’
‘তুমি এখানে নতুন এসেছ না? আচ্ছা, আমি তোমাকে সব ঘুরিয়ে দেখাব’
‘এখানে আসার পর থেকে কেউ আমার সঙ্গে প্রথম যেচে কথা বলল। তুমি আমার নতুন দেশের প্রথম বন্ধু। এই ফুলটা তোমার’
জারা আনন্দে চেঁচিয়ে উঠল
‘তোমার হাতে ফোটা প্রথম ফুল আমাকে দিয়ে দিলে?’
‘একদিন এক বাগান ফুল ফুটিয়ে তোমাকে দেব। নেবে তুমি?’
জারা কিছুক্ষণ কথা বলতে পারল না। তারপর আস্তে আস্তে বলল
‘কী ফুল এটা?’
‘গোলাপ। শুধু গোলাপ নয়, আজবনগরের গোলাপ’
‘আজবনগর! তুমি বুঝি আজবনগর থেকে এসেছ?’
উত্তর না দিয়ে একগাল হেসেছিল ছেলেটা, পরে জেনেছিল ওর নাম নোয়া।
আজ নোয়ার ঝুলবারান্দার সামনে স্কুটিতে বসে সেই দিনটার কথা ভাবছিল জারা। নোয়ার কথায় সে বলল
‘ও সরি, তোমাকে নিয়ে কফি জয়েন্টটায় যাব ভাবছিলাম। যাবে?’
‘শিওর। কবে? আমি তো বেকার মানুষ, তুমি সময় বার কর’
‘দাঁড়াও’ জারা স্কুটির বাস্কেট থেকে তার কলভাষটা বার করতে গেল, আর অমনি টাল সামলাতে না পেরে পড়তে লাগল। পতনরোধক বেল্ট পরতে ভুলে গেছে যথারীতি, মা মনে না করিয়ে দিলে প্রায়ই পরা হয় না সেটা। তাছাড়া তার তো ঝুল কলোনিতে আসার কথাই নয়। তাই সে পড়তেই থাকল, যার মানে সে আর্থেনিয়ার মাটিতে আছড়ে পড়ে চুরমার হয়ে যাবে মুহূর্তের মধ্যে। কিন্তু সেটা হল না। মুহূর্তের ভগ্নাংশের মধ্যেই, ঝুল বারান্দা থেকে ঝাঁপিয়ে তাকে ধরে নিল নোয়া, তার অন্য হাতে ছাতার মতো কী একটা। সেটার সাহায্যে তারা উঠে এল বারান্দায়। থরথর করে কাঁপতে থাকা জারাকে বুকে চেপে নোয়া বলল মৃদু বকুনি দিয়ে
‘পাগলি মেয়ে! একটু খেয়াল করবে তো!’
নোয়ার বুকের মধ্যে মুখ গুঁজে আস্তে আস্তে শরীর অবশ হয়ে আসছিল জারার। হঠাত বিপদ্ঘন্টির শব্দে সে চমকে উঠল, নোয়াও। কোন বড় ধরনের বিপদ ঘটলে এইরকম ঘণ্টা বাজে। সঙ্গে সঙ্গে সামনের ট্রাফিক ওয়ালে ফুটে উঠল খবর।
‘আ গার্লস ডেড বডি ফাউন্ড বিসাইড মারিওভা কফি জয়েন্ট। শি ওয়াজ ব্রুটালি রেপড….’
আর কিছু পড়তে পারল না জারা। তার চোখ ঝাপসা হয়ে এল। তারপর শরীরে জেগে উঠল তীব্র ক্রোধ। নোয়া আস্তে আস্তে বলল
‘ঐ মারিওভাতেই যাওয়ার কথা হচ্ছিল না আমাদের?’

ক্রমশ…