পূর্ণজা 

কথায় কথায় women empowerment বলি আমরা। সমাজের privileged class এ যারা বাস করি। আলমারিতে একশটা শাড়ি, ব্যাঙ্কের লকারে সোনাদানার ছড়াছড়ি। ছেলে মেয়ে যে স্কুলে পড়ে, তার কেতই আলাদা, গর্ব করে শোনাই, পরের বছর এডমিশানেই লাখ নেবে! মাঝে মাঝে পার্টি দি, স্কচ আর রেশমি কাবাব ছাড়া জমে না, ও হ্যাঁ, সঙ্গে টাকনা বর্তমান রাজনীতি, ধর্ষণ বা অ্যাসিড আক্রমণ এ পুড়ে যাওয়া মেয়েটাকে নিয়ে একটু সহানুভূতি অথবা বস্তি বা রাস্তায় থাকা লোকগুলোকে নিয়ে একটু হাহুতাশ। হ্যাঁ, টাকনাই। ওগুলো বললে আসলে নিজেকে বেশ মহান মহান লাগে। ভুলে যাই তাদেরই  অক্লান্ত পরিশ্রমের ফলেই আমি দিব্যি ঝাঁঝালো  সোনালী তরলটি হাতে ঘন নীলের মধ্যে রূপালী জরির কাজ করা কাঞ্জিভরমটি পরে, নবরত্নের গয়নাগুলো পরে পাশে দাঁড়ানো দারুণ দেখতে লোকটার গায়ে ইচ্ছে করে হেলে পরে, একটু আলগা শরীর খুলে দেখিয়ে ফ্লার্ট করছি; আমি মাতাল হয়ে পড়ে থাকব, আমার উচ্চপদস্থ বর ততোধিক মদ গিলে উপুড় হয়ে পড়ে থাকবে আমার পাশে। আর পর দিন সকালে পাশের বস্তি থেকে রাতে বরের মার খেয়ে কালশিটের দাগ নিয়ে এসে বাসন্তী ঠিক বেল বাজাবে সাতটার সময়। women empowerment!!! ওই সকালবেলায় বেলটি না বাজলে আমার women empowerment টি ধোঁয়া হয়ে উড়ে যেত কবে!!! 

এমন তিনজন বাসন্তীর গল্প বলব আজ। আমার জীবনের। পুতুল দুর্গা আর লক্ষ্মী।

পুতুল আসত ক্যানিং থেকে। তিন মেয়ে। দুটি বা তিনটি ছেলে হয়ে মারা গেছে। পুত্র সন্তানের তীব্র আকাঙ্খায় তার বর তাকে ছাড়ে না, আবার কাজের বাড়িও মানবে কেন বেশি কামাই!!! ফলে দুটি গর্ভের পাতন আপনাআপনিই, অতিরিক্ত খাটুনির জন্য। তৃতীয়াটির সময় আমরা জানতে পারি, কারণ আরেক বাড়ি কাজ করার সময় তার রক্তপাত শুরু হয়, তারা ঘাড় থেকে বোঝা নামায় একটা রিকশাতে তুলে দিয়ে। পুতুল শুধু ক্ষীণ স্বরে ওদের বাড়ির আরেক পরিচারিকাকে বলেছিল ফার্ন রোডে দিদির বাড়ি নিয়ে চল। সেই অচৈতন্য মানুষটির পা দিয়ে গড়িয়ে আসা রক্ত মুছে দিল মা। বিকেলে আমি ডাক্তারের কাছে নিয়ে গেলাম। দেখা গেল হাতুড়ের কাছে একা একা গর্ভপাত করাতে গেছিল, সেটি সম্পূর্ণ হয় নি!!! আবার ভর্তি করা হল। একমাস কাজ করতে পারল না। দুটো বাড়ির কাজ চলে গেল। ওর পতিদেবতাকে খবর দিয়ে ডেকে একটি কথাই বলা হল, আর একবার এমন চেষ্টা করলে স্রেফ পুলিশে দেব!!  

এই পুতুল কিন্তু একমাত্র রোজগেরে। অন্ধকার থাকতে উঠে কলকাতা আসছে। ছ বাড়ি কাজ সেরে ফিরছে। গোয়ালে ঢুকে গরুর যত্ন করছে। বাড়ির সামনে ক্ষেতে শাক সব্জি ফলিয়েছে। টাকা জমিয়ে ধানী জমি কিনেছে। সেইসব দেখাশোনা করতে করতে অল্প বিস্তর মহাজনী কারবার শুরু করেছে। গ্রামের লোক ঈর্ষায় ঘরে আগুন লাগিয়ে দিল একবার। একটু একটু করে আবার সব গড়ে তুলল। বড় মেয়েটি পাচার হয়ে গেল। কত খোঁজ করল! নতুন একটা বাড়ি কাজ থেকে ছাড়িয়ে দিল। বলল ওর মেয়ে হারিয়েছে বলে আমি তো অসুবিধায় পড়তে পারি না! সত্যিই তো। একজন কাজের লোকের মেয়ে পাচার হয়ে গেছে, তাতে আমাদের কী!!! 

দুর্গা। কাঁকুলিয়ার বস্তিতে ওই দশফুট বাই দশফুটা ঘরের বাসিন্দা। যেখানে বয়স্ক দুই দেহ মিলে যায় রাতে ইঁদুরের খুটখুট! তিন ছেলেমেয়ে। শাশুড়ি। নেশাখোর অপদার্থ স্বামী। নিজে বাচ্চাবেলায় বিয়ে করে পস্তেছে বলে ছেলেমেয়েদের পড়তে ঢোকাল। নিজে সংসার সামলে আরোও চার বাড়ি কাজে ঢুকল। বড় মেয়ে পনেরোতে, ছোটটি তেরোতে বিয়ে করে ফেলল। আঠারোর মধ্যে ছেলেটি এক সন্তানের বাপ হয়ে গেল। দুর্গা শুধু খেটে যাচ্ছে । এক সময় আমি পরামর্শ দিলাম, এত ভালো রান্নার হাত তোমার, তুমি হাতগাড়িতে খাবার বিক্রি করা শুরু কর। সেই আরম্ভ । দেখতে দেখতে এত ব্যস্ত হয়ে গেল, আমাদের বাড়ির কাজটাই ছেড়ে দিতে হল। কিন্তু খুব আনন্দ পেলাম। সেই দুর্গার ছোট জামাই আর তার বাড়ির লোক চড়াও হয়ে একদিন দুর্গাকে বেদম পিটিয়ে গেল, কারণ দুর্গা ওর ছোট মেয়েটিকে আবার স্কুলে ভর্তি করতে চেয়েছিল। এখন দুর্গার ডান হাত সারাক্ষণ কাঁপে। খাটতে খাটতে আর মার খেয়ে এই অবস্থা! Women empowerment!

যখন আমাদের রান্না করত দুর্গা, ও আসতে না পারলে লক্ষ্মী বলে একজন মহিলাকে দিয়ে যেত বদলী হিসেবে। আমার ছেলে ঋকু যখন হামাগুড়ি দিতে শিখেছে, সারা ঘর জুড়ে, সিঁড়ি বেয়ে ছাদে উঠে হামাগুড়ি দিয়ে বেড়ায় আর ফোকলা দাঁতে হাসে; তখন ভাবলাম বিকেল বেলাতেও যদি আর একবার ঘর পরিষ্কার করানো যায়!!! সেই লক্ষ্মী পূর্ণ সময়ের জন্য নিযুক্ত হল। তার কয়েক বছরের মধ্যে দুর্গা রান্নার ব্যবসার জন্য আমার কাজটা ছাড়তে বাধ্য হল! লক্ষ্মী বিকেলের সঙ্গে সকালের রান্নাতেও ঢুকল। 

ঋকুর উপনয়নের দিনে, রাতে সবার শেষে আমি খেতে বসলাম লক্ষ্মী আর পুতুলের  সঙ্গে, এ ও সে বলল, কাজের লোকেদের সঙ্গে খেতে বসলে এমন দিনে! তা আমি বললাম এদের ছাড়া যে এমন দিনটি উৎরোতে পারতুম না! সেটি ভুলি কি করে!!! 

এই সময় আমার সুগার ধরা পড়া পড়ল। সেটা বাড়তে বাড়তে এমন জায়গায় পৌঁছল যে সকালে আমার ঘুম ভাঙত না, চোখ খুলতেই পারতাম না। লক্ষ্মী জানত, ও এসে চা করে ডাকলে তবে কোনোরকমে আমি উঠব। ঝড় হোক জল হোক লক্ষ্মীর নিজের শরীর খারাপ থাক্, ও ঠিক আসত। অন্য বাড়ি যেতে না পারলেও আমার বাড়িতে আসত। বহু বছর আর্থিক সমস্যাতে ভুগেছি ভীষণ ভাবে, একবার এমন অবস্থা হল ঋকু ছাড়া কারুর জন্য কিছু কিনতে পারলাম না পুজোর সময় । কিন্তু সারা বছর যারা এমন খাটছে, তাদের তো বঞ্চিত করতে পারি না! লক্ষ্মী কিন্তু একমাত্র যে বোনাসের টাকা আর শাড়ি ফেরত দিতে এসেছিল! এ বড় কম কথা নয় কিন্তু! টাকার লোভ খ্যাতির লোভ যে কী, তা তো দেখছি চারিদিকে!!! সেখানে এই ঔদার্য, এমন ভাবনা দুর্লভ মনে হয়েছে।

শক্তপোক্ত চেহারা ছিল লক্ষ্মীর। ভূতের মত খাটতে পারত। মাথা ঘামাত কম, চোখ বুজে খেটে যেত। টাকা জমিয়ে দুই ছেলেকে দোকান কিনে দিল। বাড়ি তৈরি হল। সুভাষগ্রামে জমি কিনল। নিজে দুপুরে রোজ খাওয়ার সময়ও পেত না, ঘুমোত না। সকালে আমাদের বাড়ি চা রুটি/পাঁউরুটি খেত। একটু বসে। ওইটুকুই বিশ্রাম । 

এই লক্ষ্মী গত মাসে হঠাৎ এমন অসুস্থ হয়ে গেল, যে হাসপাতালে ভর্তি হল প্রথমে। তারপর দেখা গেল ক্যান্সার, একদম শেষ অবস্থা । সারা শরীরে পচন ধরে গেছে । আর এল না। ক’দিন আগে ছেলের থেকে খবর পেলাম ও আর নেই। সারা জীবন অগাধ পরিশ্রম করে ছেলেদের দাঁড় করিয়ে নিজে একটুও বিশ্রাম পেল না! তার আগেই…

 এই কুড়ি বছরে লক্ষ্মীকে এক এক সময় খুব বকেছি। নানা কারণে। ক’দিন ধরেই সেইসব মনে পড়ছে । ওই একমাত্র যে মায়ের সময়েও ছিল। মায়ের কথা বলার একজন মানুষ কমে গেল। জানি না সত্যি মৃত্যুর পর কিছু থাকে কিনা, পরজন্ম বলে কিছু থাকে কিনা! কিন্তু এইসব সময়ে বিশ্বাস করতে খুব ইচ্ছে করে যে এখন লক্ষ্মী ভালো আছে।

এই পুতুল দুর্গা লক্ষ্মী নামের মানুষগুলো না থাকলে আমরা কি আমাদের বড় বড় কাজগুলো এত নিশ্চিন্তে করতে পারতাম! আমরা সেমিনারে বক্তৃতা দিই। আলোচনা সভা কর্মশালায় এদের নিয়ে গালভরা ভাষণ দি। কিন্তু এক দিন আসতে না পারলে মাইনে কাটি। বলি অকৃতজ্ঞ শ্রেণী! ছুটি চাইলে বিরক্ত হই। মাইনে বাড়াতে বললে মনে মনে অসন্তুষ্ট হয়ে কোনোরকমে বাড়াই। কত খাবার নষ্ট করি। ওদের দিই না। ওদের বলি অন্ত্যজ । 

আমি বলি, ওরা সব পূর্ণজ। যেদিন বুঝব ওরাও আমাদেরই মত, আমাদের মতই ভালোবাসতে চায়, ভালোবাসা পেতে চায়, সেদিন আমরাও পূর্ণ হব। তার আগে পর্যন্ত women empowerment একটা গালভরা শব্দই থেকে যাবে, আভিধানিক একটা শব্দ মাত্র!