একটি অকপট পাঠ প্রতিক্রিয়া।অনুভূতি মেখে নিয়ে শব্দ ফসল তোলার যে নান্দনিকতা তা সত্যিই সুখের ঠিকানা।সেই ঠিকানা খুঁজি চলি কবিতায় কবিতায়–

বই এর নাম : “ঘুমন্তবীজের প্রত্নকথা”
কবির নাম: দেবাংশু ঘোষ
প্রকাশ কাল : ডিসেম্বর ২০১৭
প্রকাশক : জয়ন্ত সী
দি সী বুক এজেন্সি
কলকাতা -০৭
মূল্য: পঁচাত্তর টাকা মাত্র

কবি দেবাংশু ঘোষ নিদারুণ ভাবে ব্যর্থ হবার অঙ্গীকারে কবিতার কাছে বার বার ফিরে এসেছেন।কবির কাছে পোড়া রুটি ছিঁড়ে খাবার চেয়ে প্রকৃতি নিয়ে কাব্যযোগ  সহজ বলে মনে হয়। কবির প্রথম কাব্যগ্রন্থ “তারাদের ডেকে নেবো” (২০০০) যা তিনি উৎসর্গ করেছেন, কবি শ্যামলকান্তি দাস এবং সাহিত্যিক নলীনি বেরা মহাশয়কে। তাঁর নব সন্তান “ঘুমন্তবীজের প্রত্নকথা” য় কবি তাঁর দুঃখ-সুখ অনুভূতি ও কাব্যিক পারাপার সব এক মায়ায় মোড়া সুতোর কাঁথায় যেন অঙ্কন করেছেন। কবি দেখতে চেয়েছেন,সেই সব ফেলে আসা বিশ্বায়ন যা ভাসানের গানে গানে আর পাঁচটা দিনের মতো,গোপনীয়।কবি অনুভব করেছেন পর্নমোচী বৃক্ষ,ঝরাপাতা আর ঋতুর চরম স্বাদ।এ ঋতু আসলে কবিতায় গড়া সেই নারী,যাকে কবি ছুঁচে চেয়েছেন-

“পৃথিবীর সব অসুখী মানুষই কবিতা লেখেনা,
তবু অসুখী মানুষ ছাড়া আর কেউ পক্ষী বংসীয় নয়।”

কবি কখনও অশ্রুর রং খোঁজার চেষ্টা চালান,আবার কখনও মেঘের দিগন্তে নান্দনিকতায় আপাদ মস্তক ডুবে যেতে ভালোবাসেন,তাঁর কবিতা যে কতটা আধুনিক বা আধুনিকতার পরের স্ত্রোতের,তা বোঝা যায় তাঁর কবিতায়-

“ধবধবে সাদা জুঁই এর বিছানায়
ভীষন সুন্দর হবো,বিধাতার ঈর্ষা হবে”
অথবা
“নৈঃশব্দের তরঙ্গে
হেটে যাব তপস্বীর মতো না ছোঁয়ার দিকে।”

কবি যেন কবিতার অনুকূল ছায়া,কখনো তিনি চরম পক্ষীবংসীয়,আবার কখোনো তিনি তাঁর ভাবনা থেকে উড়িয়ে দেন পোর্সিলিন পাখিকে।তিনি নির্জন কোন মধুমাস পেরিয়ে অযুত রাত্রি ছুঁয়ে দেখেন,তাঁর কালির গভীরতায় মেপে দেখেন জ্যোৎস্না মাখা স্তনিত পেন্ডুলাম। তাঁর কলমে দেখি সুন্দরের পূজা,পারাপারের অমোঘ সন্ধি;ছুই মেঘের শরীর,নরম নিয়ন আলো—-

সীমান্ত বাংলার নষ্ট চাঁদ যেন তাঁর প্রেমিকা,যার কাছে ভালোবাসা আবহাওয়ার মতো- চঞ্চল তৃষ্ণা —
“ভালোবাসা তবু আবহাওয়ার মতো-
নদী হয়ে যায় দূরে– বহুদূরে—”
কবির ভালো লাগে কান্না-কর-হীন নষ্ট মেয়ে,হয়তো তাঁর কাছে তাঁর কবিতাই তাঁর নষ্ট মেয়ে,যার কাছে কবি কারনে -অকারনে নতজানু,কবি তাই লজ্জা মাখেন,মুহুর্ত বৃষ্টি হয়ে লুকোতে চান সিন্ধু সভ্যতা হতে স্মৃতিপাখির বয়ে আনা কারাবাসে,যেখানে তাঁর গোপন বসতবাড়ি- “সঙ্গী শুধু কাগজ-কলম”।

কবি দেবাংশু ঘোষ তাঁর কবিতার নামকরনে বিশেষ মোহ পরিবেশন করেছেন,যা আমাদের কাছে প্রেমিকার উষ্ণতাযাপন ছাড়া আর কিছু না।তাঁর কবিতা “ঝাঁউবন পুড়ে গেল জ্যোৎস্নায়”, “কবোষ্ণ হাত”, “অনুভা”, “অশ্রু জমে আছে অশ্রুতে”, “তমসুখ”,”লুম্বিনীতীর” যার প্রকৃষ্ট উদাহরণ।
তাঁর কবিতায় বার বার ফিরে ফিরে এসেছে রাত,জন্মকথা,চাঁদ- মূলত এঁঠো,নষ্ট চাঁদ,বৃষ্টি রূপী নারী,আর পুরো প্রকৃতি যার কবোষ্ণ হাতে কবি খুঁজে নেন পিয়ানোর বাতিঘর,উৎসাভিমুখ ঈশ্বরীয় চোখ,নোনাধরা বীজপাত্র,  আর এক আকাশ স্মৃতিভষ্ম বৃক্ষ যাদের তিনি আলোপাখি নাম দিয়েছেন।

কবি বিনয় মজুমদার’কে  লেখা “নৌকা” কবিতায় কবি দেখেন কিভাবে দৃশ্যছায়া পড়ে রয় রক্তের অন্তরে –
“এ দ্বীপে কোন নারী কোনোদিন ফেলেনি পায়ের ছাপ,
যাকে ছুঁয়ে বৃষ্টি আঁকা যায়”।

কবি দেবাংশু ঘোষের কবিতা আঁকার মতো স্বচ্ছ অথচ ভাবনার মতো গভীর।কবিতার শরীরের মুহুর্তের যে ক্ষণিক বসবাস,শিল্পস্বত্তায় তার যেন নিয়ন প্রতিচ্ছবি। এ যেন এক নিরক্ষীয় কাব্যযোগ,উষ্ণ কলম,কবি-ভাবনা, অগনিত পাখি সব আছে,অথচ কবিতা গুলি রেখা বরাবর হারিয়ে যায় অস্তাচলে,যাদের ধরেও ধরে রাখা যায়নি,রাখা যায় না। কবি দেখিয়েছেন কীভাবে ছায়াপথ ভেসে গেছে,কীভাবে-
“বনবীথি অশ্রু ফেলে আঁধারে
আকাশ জেগে আছে রাত্রি। “

তিনি আবার তাঁর চিত্রকর কে প্রশ্ন করেন,তাঁর দৃষ্টির ভেতর যে শব্দ-হাহাকার ধ্বনিত হয়,তা চিত্রকর তুলি মাখা করবেন  কিনা? তিনি যেভাবে কবিতায় ফুল ফোটার আর পাপড়ি ঝরে পড়ার শব্দ আঁকেন ঠিক সেভাবেই–

“বিশ্বায়নের প্রতিটি মুহুর্তে যেভাবে খুন হচ্ছি,,যেভাবে খুন হচ্ছে,
তুমি আঁকবে চিত্রকর”।

কবি যেন নরম রোদের অবহেলিক “স্পেকট্রাম”, যাঁর কলম আদুরে শব্দ তুলে রাখে রূপকের কৌটোয়,অথবা বাস্তবতার মায়জালে-
“জ্যোৎস্না ছুঁয়েছে ফসিল ছুঁয়েছে ঘরবাড়ি সুখ দুখ-
মানুষের কাছে আজ তবু বেশি ভয়াবহ মানুষেরই মুখ।”

কবির তীক্ষ ভাবাবেগ ও কবিতায় নিবিড় বসবাস তাঁর ব্যাক্তি মনকে যেন বারে বারে টেনে নিয়ে গেছে আলোগাছ,মেঘ রোদ নদীর বুকে।যেখানে তিনি প্রত্যাশার নীল ছায়ায় আদিম সব আশ্লেষ মুছেছেন,রক্তের নগ্ন হওয়া অনুভব করেছেন আর গাছকে প্রশ্ন ছুঁড়েছেন-
“কবে তুমি বড় হবে আর
কত বড় হলে হবে আলোগাছ।”

তাঁর কাব্যগ্রন্থ সত্যিই এক “ঘুমন্তবীজের প্রত্নকথা”। তাঁর জীবন বীজ আশ্রিত,অন্ধকারের সেই ডাক সামলে তিনি হতে চেয়েছেন কাব্য মেঘ-
“পুড়ে যায় খান্ডব বন
দেবী নেই,ধ্যানজ ঈক্ষায়
জেগে থাকে শুধু স্বপ্নবীজ।”

এই যে পড়লাম বীজ,এই ঘুমন্ত এসরাজ,রাত্রিজাগরিত তন্দ্রালু ছায়া,তার মাঝেই কবির প্রত্নকথা লেখা হয়ে চলেছে।কবি যাদুকরের মতো একা হেঁটে গেলেও,তাঁর কলম আমাদের মতো পাঠক কে টেনে নিয়ে গেছে দিগন্তে,যেখানে তাঁর স্বপ্নবীজ ছুঁয়ে দেখেন। কাব্যগ্রন্থের মধ্যে একটি ২ লাইনের কবিতায় সবার চোখ আটকাবে,যার নাম, “পোষ্টমর্ডান” –

“শব্দেরা বৃক্ষ না হলে
মাটি কী পায় শেকড়ের তাপ”
কবি সযত্নে তাঁর শূন্য খাঁচার অধরা শব্দদের বৃক্ষ করে তুলেছেন,আর আমরা পাঠকেরা সেই শেকড়ের তাপ সংগ্রহ করে কবিতা যাপন করছি।উক্ত কবিতাটিকে সবচেয়ে সার্থক বলে মনে করি।

অন্যভাবে দেখলে কবিতার প্রতি যে নিষ্ঠা কবি দেখিয়েছেন,তার সফল ছবি যেন প্রত্যেকটি কবিতার বুকে সযত্নে আঁকা আছে।দীর্ঘসময় পরে প্রকাশিত কবি দেবাংশু ঘোষের “ঘুমন্তবীজের প্রত্নকথা” কবিকে পাঠকের অন্দরমহলে চিরন্তন করে রাখবে এই আশা রাখি।

পবিত্র পাত্র (সামান্য পাঠক)