বাবা, মানে বুঝেছি একটা সেফ জোন!

ছোটবেলায় মায়ের মুখে একটা শব্দ শুনতাম, ‘সেফ জোন’। তখন আসল অর্থটা বুঝতাম না। কিন্তু যত দিন গেল বুঝলাম একটা মানুষ কেমন সেফ জোন হয়ে উঠছেন। তিনি যেন রক্ষাকর্তা। একটা সময় যখন দুষ্টুমি আর বকুনি ছাড়া জীবনে আর কিছুর প্রাধান্য ছিল না, তখন প্রতিটা বকুনির পর এই ‘ সেফ জোন’ হয়ে উঠত বাবা। এমনও হয়েছে মা’য়ের কাছে বকুনি খেয়ে অপেক্ষায় থেকেছি কখন সেই মানুষটি অফিস থেকে ফেরে আর আমি ছুটে এসে তাকে জড়িয়ে ধরি। নালিশ করি। এমনই
এক নদী ছিলেন বাবা। এই নদী আবার যখন কোন বিপদ থেকে বুকে আগলে রাখতেন তখন তাকেই পাহাড় মনে হতো।
আমাদের সংসারে বর্ষার ঘনঘটা ছিল না খুব একটা। ঝরনার জল ছিল। ফুলের বাগান, প্রজাপতি যাওয়া আসা এসব মিলিয়ে বেশ খুশিখুশি পরিবেশ।
তবুও ঝড় যে কোনদিন আসে নি তা নয়। মা পাখি যখন ভিজে ডানায় আগলে রেখেছিল তার ছানা, তার সঙ্গীটি জলে ভিজে আগলে রেখেছিল দুটি প্রাণ আর ছোট্ট বাসাটাকে।
মা গৃহকাজে নিপুণা, সাংসারিক বুদ্ধিতে চৌকস, উচ্চশিক্ষিতা সরলমনা প্রায় সর্বগুণসম্পন্ন এক মহিলা। তবে নিজের পায়ে দাঁড়ানো বলতে যা বোঝায় সে পথে মা হাঁটেননি কোনদিন। আর্থিকভাবে না হলেও একটি মানুষের এগিয়ে যাওয়ার পিছনে যা যা সার্পোট দরকার মা সর্বোতভাবে দিয়েছিলেন বাবাকে। ছোট অবস্থায় তাদের দুজনের এই পারস্পরিক বন্ধন আমার নজর কাড়ত। পেশায় একজন সিভিল ইঞ্জিনিয়ার ও উচ্চপদস্থ হওয়া স্বত্ত্বেও তার মধ্যে কোনদিন কোন অহংকার দেখেনি। যেকোন পরিস্থিতিতে মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা, পরের উপকার করা ও প্রয়োজনে প্রতিবাদ করাটুকু তাদের দুজনেরই চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য।
আমার মনে পড়ে, আচমকা পরিবারে কোন ক্রাইসিস এসে পড়লে তলব পড়ব বাবার। রাত দিন ঝড় জল প্রতিকূল অনুকূল এসবের বিচার না করেই বাবাকে ছুটে যেতে দেখেছি অপরের উপকার করার স্বার্থে। আর পাশে দাঁড়িয়েছেন মা।
বাবা মানেই আমার কাছে প্রতিদিন সকালে বাজার ভর্তি থলি, রবিবারে ঘোলের দোকানের একগ্লাস ঠান্ডাই, পেঁপে দিয়ে খাসির মাংসের ঝোল আর সন্ধেবেলায় বা রাতে পাতে একটা করে মিষ্টি। এমনকি একসাথে ঘুরতে বেরোলে হঠাৎ কোন রেস্টুরেন্টে কাটলেট বা মোগলাই পরোটা। চন্দননগরের লক্ষ্মীগঞ্জ বাজারের বিমল মিষ্টান্ন ভান্ডারের কচুরি ও ছোলার ডালের সাথে প্রথম পরিচয় বাবার হাত ধরেই। তাই ‘কখন অফিস থেকে ফিরবে’ এই অপেক্ষাটা যে আসলে কী, তা আমি খুব ভালো করে বুঝি আজও।
তারপর যখন খোলসটা ছাড়ল একটু একটু করে, স্কুল যাওয়া শুরু হল একা সাইকেলে। বাবা পিছু নিত আমার অজান্তে। টিউশন যাওয়া, কলেজে ভর্তি, চাকরীর হাজারো পরীক্ষা সবটায় সঙ্গ দিয়েছে একটাই ছাতা। ঝড় বা রোদ কোনকিছুতেই ফ্যাকাশে হয়নি তার রঙ। এমনকি জীবনের খুব কঠিন সময়েও যখন নতুন এক চ্যালেঞ্জ নিয়ে পরিবার ছাড়তে হয়েছে তখনও আমায় সেখানে পৌঁছে দিয়েছে এই মানুষটিই। ভীষণ ডিপ্রেশনে যখন কুঁকড়ে উঠেছি, ভেঙে পড়েছি কাদায়, দুটো পাহাড় আমায় আগলে রেখেছিল কঠোর ভাবে। নিজেরা ভেঙে পড়লেও তার আঁচ আসেনি আমার কাছে।
অনেক ব্যর্থতা এসেছে। লড়াই এসেছে। অভিজ্ঞতার হাত ধরে শিক্ষা এসেছে। মায়ের সাথে সময় কাটানো বা মা’কে নিয়ে কথা বলাটা যতটা সহজ হয়েছে বাবা’কে নিয়ে তা নয়। লাজুক মানুষটা কোনদিন বুকে জড়িয়ে হাসতে হাসতে নাম ধরে ডেকেছে কিনা, মনে পড়েনা। তবুও সব রকম পরিস্থিতে আমাদের যে নিরাপত্তা ভরসা জুগিয়ে এসেছে চুপচাপ, তিনি বাবা।
বাবারা হয়ত এমনই ফল্গু ধারা। বুকের ভেতর একটা সবুজ মাঠ নিয়ে চলে। লুকিয়ে রাখে কান্না, কষ্ট, জরা। ওপর থেকে একটা কঠিন আবরণে ঢেকে রাখে পাঁজরের ক্ষত। সিগারেটের নীল ধোঁয়ায় উড়িয়ে দেয় সমস্ত ক্লান্তি। ওপর থেকে দেখে বোঝা দায়, ভেতরে আদপে কী ঝড় চলছে। একটা বটগাছ কিভাবে তৈরী হচ্ছে ক্রমশ প্রাচীন হবে বলে!