পৈতৃক

এলাদেবী মেজ ছেলের ঘরে ঢুকে বললেন, “মেজখোকা, আমার ইচ্ছা তুমি আবার বেদ করো।” সতীশবাবু ইস্কুলের রসায়নের মাস্টার, ছেলেদের পরীক্ষার খাতা দেখছিলেন।পাশে ছোট্ট খুকু ঘুমাচ্ছে। মায়ের দিকে না তাকিয়েই বললো, “এ কথা উঠছে কেন মা, তুমি তো জানোই আমি আর বিবাহ করবো না। তাছাড়া খুকু আছে, ওর দেখাশোনাও তো করতে হবে।” খাটে এসে বসলেন এলাদেবী, বললেন “ওর কথা ভেবেই তো বলছি বাবা। ওই একরত্তি দুধের শিশুকে তুমি সামলাতে পারবে না। বৌমা আমার সতী লক্ষী ছিল, মাথায় সিঁদুর নে গেছে, কিন্তু তা বলে সব তো থেমে থাকে না। তোমারই বা বয়স কতো, সারাটা জীবন পড়ে আছে। তাছাড়া, তোমারও তো বংশরক্কা করতে হবে। মেয়ে তো পরের ধণ, আজ আছে, কাল অন্য বাড়ি পাঠাতে হবে। সেই তো পরের হেঁসেল ঠেলবে, আর পরের ভাত খাবে।” এবার খাতা মুখ তুললেন সতীশবাবু।মায়ের পুত্র প্রীতির কথা তার অজানা নয়। বাড়িতে বোনেদের চেয়ে তারা ভাইরা যে সারাজীবন সবকিছুই বেশি পেয়েছেন তা তার নিজের চোখেই দেখা।

“মা, আমার কথা থাক। আর খুকুর দেখাশোনার জন্য তুমি আছো, বড়বৌদি আছে, খুকুর পিসিরা আছে, আর আমি তো আছিই। দাদার ছেলেরা আছে, তোমার বংশরক্ষা নিয়ে চিন্তা নেই, এবার তুমি বরং ছোটখোকার জন্য মেয়ে দেখ। আর খুকুকে আমি সেই শিক্ষাই দেব যাতে ও পরের বাড়ি গেলেও পরের মুখাপেক্ষী না হয়। নিজের ভাত আমার খুকু নিজেই জোটাতে পারবে।”
ছেলের অনড় মুখের দিকে চেয়ে এলাদেবী দীর্ঘশ্বাস ফেলে ঘরের বাইরে বেরোতেই বড়বৌমা জিজ্ঞেস করলো, “মা, মেজঠাকুরপো কি বললে?” এলাদেবী বললেন, “যা আগে বলেছে। বে আর সে করবে না।” পাশ থেকে ছোটননদ শিউলি বললো, “খুকুর কথা বললে না মেজদাকে?”
“বলিনি আবার, কিন্তু আমার কথা কে শোনে। আমারই হয়েছে যত জ্বালা। ছেলে হলে তাও কতা ছিল, মেয়ে নাকি নিজের ভাত নিজে জোটাবে। মেয়ে ডাক্তার মোক্তার হবে নাকি, যতসব” এলাদেবীর গজগজ করে বলতেই থাকলেন।

তা সতীশবাবুর কথা যে ভুল নয় তা সময়ের সাথে সাথে প্রমান হয়ে গেল। এর ওর তার কোলে খুকু বেড়ে উঠতে লাগলো। এর মাঝে সেজপিসির বিয়ে হয়ে গেছে, ছোটকাকিমা এসে গেছে বাড়িতে, আর খুকু ইস্কুলে ভরতি হয়েছে। বড়মা মানে সতীশবাবুর বড়বৌদি মা মরা মেয়েটিকে বড় ভালোবাসেন, ছোটপিসিও। ঠাকুমা এলাদেবীও সব নাতনিদের মধ্যে খুকু কেই একটু বিশেষ চোখেই দেখেন, যদিও নাতিদের প্রতি তার টান সর্বদাই বেশি। সতীশবাবু ইস্কুলের সময়টুকু ছাড়া মেয়েকে চোখে হারান, মেয়ের পড়াশুনো থেকে ঘুম সব তার জিম্মা। তবে ঈশ্বরের কৃপায় মেয়ে পড়াশুনায় ভালো, যা পড়ানো হয় সহজেই বুঝে যায়।
খুকুর ঠাকমা দিনরাত বলে, “মেয়ের বাড় তালগাছের বাড়া”। তা দেখতে দেখতে খুকুর নয় ক্লাশ হয়ে গেল। আর দুবছর পর এগারো ক্লাশে আই এ দেবে খুকু। এবছর থেকে ভিনগাঁয়ের স্কুলে যাচ্ছে খুকু, ” বীণাপানি গার্লস স্কুল”। বাবা যদিও একা যেতে ছেড়েছেন, কিন্তু নজরদারি কড়া। ঠাকমার আপত্তি ছিল, কিন্তু সতীশবাবুর জেদ আর বড়মা, মানে জেঠিমার প্রশয়ে খুকু আই এ দেবে এমনটাই ঠিক হল। সতীশবাবুর মনের সাধ খুকু ডাক্তারি পড়বে। ছেলেবেলা থেকে বহুবার খুকুকে সে কথা বলেছেন। “তুমি মা ডাক্তার হবে, বড় ডাক্তার। একজন ভালো মেয়ে ডাক্তার থাকলে তোমার মাকে অকালে হারাতে হত না।”
লেখাপড়ার সাথে খুকুর গানের গলাটিও ছিল সুন্দর। সেটি বোধহয় মায়ের থেকে পাওয়া। গ্রামে ফুচুদিদের বাড়িতে রেডিও শুনে শুনে বেশ অনেক গান তুলে নিয়েছে খুকু।
কোনকোন রাতে বাবা বলে, “একটা রবি ঠাকুরের গান গা তো মা।” খুকু গান ধরে, “আজি বিজন ঘরে”। আস্তে আস্তে গায়, ঠাকমা শুনতে পেলে রক্ষা থাকবে না।
মায়ের থেকে খুকু আর একটা জিনিস পেয়েছে, একমাথা চুল। আর একখানা ঢলঢলে মুখ। খুকুর বড়মা বলে ওর মা নাকি খুব সুন্দরী ছিলেন, বাড়িতে ছবি নেই তো, তাই খুকু জানে না। রবিবার দুপুরে বড়মা চুলে তেল দিতে মায়ের কত গল্প বলে, চোখ বুজে খুকুর মনে হয়, যেন বড়মা নয়, মা মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে।
দূর্গাপুজোর দশমীতে ফুচুদি প্রনাম এসে বললে, ” সতীশকাকা, এবার আমাদের বাড়িতে বিজয়া সম্মিলনী করবো ঠিক করেছি, খুকুকে গাইতে দিতে হবে”। ফুচুদির বাবা কালেক্টর, গ্রামে সবাই ওদের সম্মান করে। সতীশ বাবু বললেন “খুকু তো গান শেখে নি, একে তো ওর ঠাকুমার আপত্তি, তার ওপর দেশ গাঁয়ে গানের মাস্টারই বা কই? তাছাড়া খুকুর সামনে আই এ, তারপর ওকে ডাক্তারিতে ভর্তি করার ইচ্ছা, সময়ই বা কই”। ফুচুদি বললে ” এতো ঘরোয়া অনুষ্ঠান কাকা, খুকু কি সুন্দর রবি ঠাকুরের গান গায়। বাবা এসেছেন ছুটি নিয়ে, উনি আপনাকেও যাতে বলেছেন। কাল পরশু আসবেন বলতে।”
লক্ষীপুজোর পরদিন মহেন্দ্রনাথ মিত্রর বাড়ির ঘরোয়া জলসায় খুকুর গান সবার খুব ভালো লাগলো। তবে গান আর গায়িকা সবচেয়ে মনে ধরলো অতীন্দ্রর। সে থাকে কলকাতায়, শিবপুরের কলেজে পড়ে কদিন পরই ইঞ্জিনিয়ার হবে। ফুচুদির পিসতুতো দাদা, মামার বাড়ি বেড়াতে এসেছে। খুকুকে একলা পেয়ে বললো, “তুমি খুব সুন্দর গান গাও”। জানি না কেন, ওইটুকু কথাতেই খুকুর বুকটা উথাল-পাতাল করে উঠলো।
রবি ঠাকুর কবেই বলে গেছেন, ” প্রেমের ফাঁদ পাতা ভুবনে।” অতীন্দ্র যাবার আগে ফুচুদির মধ্যস্ততায় বেশ কবার দেখা হল দুজনের। তারপর ফুচুদির হাত দিয়ে চিঠি এল খুকুর কাছে।
“সুচরিতাসু,
রবি ঠাকুর নয়, অন্য এক কবির ভাষায় বলি ” চুল তার কবেকার অন্ধকার বিদিশার নিশা।”
এইটুকু পড়েই এক ছুট্টে ছাদে চলে গেল খুকু। তারপরের কথা আর মনেই নেই। শেষে লেখা ছিল, “পড়া হয়ে গেলে চিঠিটা ছিঁড়ে ফেলো।”, কিন্তু এমন চিঠি কি ছেড়া যায়। খুকুর গোপন তোরঙ্গে এমন চারটি চিঠি জমে গেল। খুকুর মনেও সারাক্ষন কি যে হয়, পড়াশোনায় মন নেই, খালি মনে হয় কবে অতীনের দেখা পাবে আবার। সেবার পরীক্ষায় খুকুর ফল আশানুরূপ হল না।
গোপন কথাটি চিরকাল কি গোপন থাকে? কি করে জানি অতীনদার চিঠিগুলো পড়বি তো পড়, ঠাকমার হাতেই পড়ল। তার পর যা হবার তাই হল। সারাদিন যে কিভাবে কাটলো খুকুর সে বলার কথা না। ইস্কুল যাওয়া হল না, খাওয়া হল না। বাবা ফিরতেই আবার ঠাকমার চেঁচামেচি শুরু হল। ” বাবা সতীশ, তোমায় বলেছিলাম, মেয়েকে বিদ্যেধরী করো না। দেখো এখন। বামুনের মেয়ে কায়েতের সঙ্গে পিরীতি করছে। এখনি এ মেয়ের বিয়ে দাও। নইলে বংশের নাম পোড়াবে।” সতীশ বাবু বাজপড়া গাছের মত চুপচাপ বসে রইলেন। খুকুকে জিজ্ঞেস করলেন “এসব সত্যি তাহলে”? খুকু চুপচাপ বসে কাঁদতে থাকলো।
সতীশবাবু সব চিঠিগুলো পড়ে বড়বৌদিকে ডেকে বললেন, ” গনেশকে ডেকে আমার ঘরের আয়নাটা খুলিয়ে রাখো, আমি খুকুকে নিয়ে একটু ঘুরে আসছি।” বড়মা বললেন “ঠাকুরপো, কথা শোনো আমার, এখন যেও না। মেয়েটা সারাদিন কিছু খায়নি, দুগাল ভাত খাক, তারপর না হয় যা বলার বল”। ” চিন্তা কোরো না বড়বৌদি, তুমি ভাত বেড়ে রাখো, আমরা আধঘন্টায় ফিরে আসছি”, বলে খুকু কে নিয়ে সতীশবাবু বেরিয়ে গেলেন।
ঘন্টাখানেক পর যখন সতীশবাবু আর খুকু ফিরলো, বাড়িতে আর একবার চিতকার কান্নাকাটি শুরু হল। এবারও কারন খুকু। তার মাথায় সতীশবাবু বাটিছাঁট দিয়ে নিয়ে এসেছেন। সঙ্গে বাজারের থলে তে সাদা শাড়ি। এলাদেবী প্রায় মূর্ছো যান, বড়মা বললেন, “একি ঠাকুরপো, মেয়ে কি তোমার বিধবা, এ সাজে আমি খুকুকে দেখতে পারবো না”। সতীশবাবু বললেন ” এ সাজ সারাজীবনের তো নয়, ডাক্তারি পাওয়া অবধি খুকু এই সাজেই থাকবে। ঘরে আয়না থাকবে না, মুখ দেখার বালাই নেই। ডাক্তারি তে একবার ভর্তি হলে তোমরা মন ভরে তোমাদের খুকুকে সাজিও। ততদিন এই সাজই সবাই কে মেনে চলতে হবে৷ আর হ্যাঁ, যতদিন খুকু এই সাজে থাকবে, আমিও চুল দাড়ি কাটবো না। আমি রতনকে বলে এসেছি, মাসে একবার এসে ও খুকুর চুল এভাবেই কেটে দিয়ে যাবে। আর খুকু, তোমায় একটা কথা বলে রাখি সবার সামনে। তুমি ডাক্তারি পেলে তখনও যদি তোমরা চাও, আমি তোমার অতীনের সাথেই বিয়ে দেব। সে কায়েত হোক আর যাই হোক। জাতপাত আমি মানি না। কিন্তু নিজের ভাত নিজে রোজকার না করতে পারলে সারাজীবন এই বৈধব্য বেশেই থাকতে হবে তোমাকে”।
“তারপর? তারপর কি হল ঠামু?”
“তার আর পর কি রে দিদিভাই, তারপর দুবছর খুকু ওই সাদা শাড়ি আর বাটিছাঁট চুল নিয়ে ঘুরলো। শেষে ডাক্তারিতে ভর্তি হয়ে তবে শান্তি।”
“আর অতীনের কি হল?”
“কি আবার হবে? ফুচুদির থেকে সে সব খবরই পেয়েছিল। পুজোর আগে এসে সেবার খুকুর ইস্কুলের বাইরে দাঁড়িয়েছিল। খুকু তো লজ্জায় মরে, ওমন ন্যাঁড়া মাথা নিয়ে অতীনের সাথে কিছুতেই দেখা করবে না। ভাবলো ওকে দেখেই অতীন পালাবে।”
“তা পালালো?”
“পালালেই ভালো হত, তাহলে খুকুর জীবনটা শান্তি তে কাটতো।” কথাটা বলেই প্রতিমাদেবী তার স্বামীর দিকে চাইলেন। লোকটা দিব্যি মিটিমিটি হাসছে, সেই পঞ্চাশ বছর আগেকার মতন।
“এইটা তোমার ছেলেবেলার গল্প,তাই না ঠামু”।
” আমার হোক বা অন্য কারো, একটা কথা বলি শোন। আজ যে তোর মা বাবার ওপর এত অভিমান করলি, তোর রেজাল্ট খারাপ হয়েছে বলেছে বলে, কই, সেদিন তো খুকু তার বাবার ওপর রাগ করার সাহস করেনি। আর করেনি বলেই, বাবার শাসন ভালোবাসা ছিল বলেই তো খুকু ডাক্তার হতে পেরেছিল। সেই সময়, যখন দেশগাঁয়ে মেয়েদের পড়াশোনা নিয়ে কেউ ভাবতোই না। আজ তোদের কত সুযোগ, কত সুবিধা। আর একটা কথা বলি, সেই যে খুকুর বাবা খুকুর ঠাকুমাকে বলেছিল। মেয়ে পরের বাড়ি গেলে যাবে, কিন্তু নিজের ভাত নিজে রোজকার করে খাবে। সংসার করা আর নিজের ভাত নিজে জোগাড় করায় তো কোনো বিরোধ নেই।”
“শুধু নিজের কেনো, বরের ভাতটাও জুটিয়ে দিলেই বা মন্দ কি। আমি যখন চাকরি ছেড়ে ব্যবসা শুরু করলাম তখন অনেকদিন তো তোমার রোজকারে খেয়েছি”। বললেন অতীন্দ্র বসু।
“উফ, চুপ কর দেখি, সে সব আমি সুদে আসলে পুষিয়ে নিয়েছি। কিন্তু কথাটা হল দিদিভাই, মেয়েরা যদি লেখাপড়া না শেখে, রোজকার না করে, দেশই বা এগোবে কি করে? দেখো তো, আজ থেকে সত্তর বছর আগেও আমার বাবা কথাটা বুঝেছিলেন, আর তুমি এখন না বুঝলে চলবে? মন দিয়ে পড়াশোনা কর, ওইসব ফেসবুক হোয়াটসঅ্যাপ সব করেও সময় পাবে চাইলেই। আর রাগ করে থেকো না, খেয়ে নিয়ো দাদাইয়ার সঙ্গে। আমি একবার নার্সিংহোম থেকে ঘুরে আসি।”
ডাঃ প্রতিমা বোস এই বলে রোজ কার মত রাউন্ড দিতে বেরিয়ে গেলেন