আঁধার পেরিয়ে

(১)
উঠতে বসতে অনুপমের মায়ের নিষেধাজ্ঞা- এটা করিস না ওটা করিস না তোর বাবা জানতে পারলে রক্ষে রাখবে না। পিতৃ শাসনে সংকটময় অনুপমের অরক্ষিত জীবনটা একেবারে জেরবার। অন্ততঃ ও সেটাই মনে করে – এই তো কয়েকদিন আগে খেলায় জেতার পর আনন্দ করতে করতে বাড়ি ফিরতে একটু দেরীই হয়ে গিয়েছিল, রাস্তার আলো জ্বলে গেসলো। ভাবতে পারেনি বাবা সেদিন অফিস থেকে তাড়াতাড়ি ফিরে এসেছেন। বাড়ি ফেরামাত্র কোন কিছু বলার আগেই বাবা ঠাস করে একটা চড় মারেন অনুপমের গালে। মাথা ঘুরে মাটিতে পড়ে যায়। হাত থেকে ছিটকে পড়ে খেলায় জেতা কাপ’টা। ছুটে আসেন মা, “কি করছ কি ছেলেটা মরে যাবে যে”। চোখে মুখে জল দিয়ে মা উঠে দাঁড় করিয়েছিলেন । চোখ দিয়ে এক ফোঁটা জল বার হচ্ছিল না অনুপমের। বরং সারা মুখ দিয়ে একটা আগুনের হলকা বার হচ্ছিল রাগে। কিন্তু মুখে কিছু বলার সাহস তার ছিল না। মা বরং গজ গজ করছিলেন-“ এত বড় ছেলের গায়ে কেউ হাত তোলে”। সন্ধ্যে বেলায় বই নিয়ে বসেছিল ঠিকই কিন্তু মন দিতে পারছিল না এতটুকু। খানিক বাদে মা সুজির হালুয়া করে নিয়ে এসেছিলেন। পেটে খিদে থাকলেও মুখে তুলতে ইচ্ছে করছিল না, খাবারের বাটি’টা বার বার সরিয়ে দিচ্ছিল হাতে করে। মা তখন মাথায় হাত বুলিয়ে চামচে করে মুখে তুলে দেওয়া মাত্রই আর নিজেকে ধরে রাখতে পারেনি অনুপম। ঝরঝর করে কেঁদে ফেলেছিল।
অনুপম জানে বাবার রোজগার পাতি ভাল নয়, প্রাইভেট ফার্মে সামান্যই চাকরী করেন। উত্তরাধিকার সুত্রে পাওয়া বাড়িটা আছে তাই। যদিও একটা অংশ কাকা নিয়ে রিনোভেট করে পেল্লায় বাড়ি করেছে। সাকূল্যে দেড় খানা ঘর ওদের সঙ্গে বাথরুম রান্নাঘর, সামান্য একটু দালান। অনুপমের বোন রজনী এবার মাধ্যমিক দেবে। এই চার জনের সংসার। গত বার অনুপম হায়ার সেকেন্ডারী পাস করেছে, রেজাল্ট যে খুব ভাল করেছে তা নয়। পল সায়েন্সে’এ অনার্স নিয়ে কলেজে ভর্তি হয়েছে। রজনী যেমন পড়া শুনো ছাড়া আর কিছু জানে, অনুপমের পড়ায় তেমন মন। সারাক্ষণই মাথায় ঘোরে ক্রিকেট খেলা। দেড়’খানা ঘরের দেয়াল জুড়ে রয়েছে ভারতীয় ক্রিকেটার দের ছবি। স্বপ্ন দেখে সেও একদিন ঘেরা মাঠে হাজার হাজার দর্শকের সামনে খেলতে নামবে। কিন্তু এসব খেলা চালিয়ে যেতে হলে প্রাথমিক অবস্থায় প্রচুর খরচ। যতই প্রতিভা তার থাকুক না কেন শেখার ব্যাপার তো আছে। এই তো সেদিন কলেজ ক্রিকেটের দল নির্বাচন, কিটস্‌ নিয়ে মাঠে যেতে বলেছিল। অনুপমের ওসব কিছুই নেই। সুতরাং সেখানে যাওয়ারও প্রশ্ন নেই।
সেদিন বাড়ি ফিরে দেখাল বাবা খুব চীৎকার চেঁচামেচি করছেন। মাসকাবারের আগেই সরষের তেল ফুরিয়ে গেছে। একমাত্র বোন’ই পারে বাবাকে বলতে এটা সেটা আনার কথা। সেটা শোনার পর মায়ের ওপর একতরফা বাক্য বর্ষণ। এরপর ক্রিকেটের কিটস্‌এর কথা বলা যায়? বাড়ির এই পরিস্থিতি না হলেও অনুপম বলতে পারত না নিজের চাহিদার কথা। এখন নানান জায়গায় টেনিস বলের টুর্ণামেন্ট হচ্ছে। ভাল ক্যাস প্রাইজ থাকে। অনুপম ধরেই নিয়েছে এই ভাবে খেলে যদি সে পয়সা জমাতে পারে, তবেই একাডেমীতে ভর্তি হবে, স্বপ্ন দেখবে ঘেরা মাঠের খেলার।
খেলাগুলো সাধারণতঃ রবিবারেই হয়ে থাকে। সেদিন আবার বাবা বাড়ীতে থাকেন। মায়ের মধ্যস্থতায় খেলতে যায় বটে ফিরে আসার পর বাবার সেই একই কথা – কলেজের মাইনে , বই পত্তর সবই ভস্মে ঘি ঢালা হচ্ছে। ফ্যা ফ্যা করে ঘোরা ছাড়া তার আর কোন ভবিষ্যৎ নেই। এক এক সময় অনুপমেরও মনে হয় বাবা বোধহয় কথাগুলো খুব মিথ্যে বলছে না। বই নিয়ে পড়তে বসে ঐ কথাগুলোই মাথায় ঘোরে, পড়া হয় না একলাইনও। আবার এই তো সেদিন ম্যান অফ দ্য ম্যাচের পুরষ্কার হিসাবে নগদ পাঁচশো টাকা যখন হাতে পেয়েছিল। হারিয়ে যাওয়া স্বপ্নটা আবার জেগে উঠেছিল। সেই ঘেরা মাঠ, হাজার হাজার দর্শক, দুধ সাদা জামা প্যান্ট প্যাড পরে, মাথায় হেডগিয়ার লাগিয়ে ব্যাট হতে মাঠে নামছে, বয়ে যাওয়া করতালি সঙ্গে নিয়ে। বই সামনে রেখে হাঁ করে তাকিয়ে থাকে খোলা জানলা দিয়ে শূণ্য আকাশের দিকে। অনুপমের তো কোন ক্রিকেট এ্যাকাডেমী নেই, বাড়িতেই নিজেকে তৈরী করে। সরু দালানে, ক্রিকেট বলটা রুমালে বেঁধে কাপড় মেলবার তারে টাঙ্গিয়ে ব্যাট মেরে মেরে প্র্যাকটিশ বজায় রাখে। অসময়ে বাবার চলে আসায়, তাঁর চোখে পড়তেই একদফা ভৎসনা। ভাল লাগে না অনুপমের। এত জায়গায় তো খেলতে যায়, কারুর কি সে চোখে পড়তে পারে না। এমন কোন কোচ কি নেই, তাকে বাড়িতে রেখে খেলা শেখাবে। গল্পে তো এরকম হয়েই থাকে। দীর্ঘশ্বাস ফেলে অনুপম। জীবন তো আর গল্প নয়।
(২)
ইদানীং একটা জিনিষ লক্ষ্য করছে, বাবার মেজাজ আর সেরকম নেই। কারো সঙ্গে কথা বলেন না ঠিকই। তবে গুনগুন করে গান করেন, যেন স্ফুতিতে আছেন। সেদিন নিজের জন্যে একটা পাঞ্জাবী কিনে এনেছেন। সেটা পরে রবিবারের সকালে বেরিয়ে গেলেন, মাকে বলে গেলেন দুপুরে খাবেন না। কোথায় যাচ্ছেন কি জন্যে যাচ্ছেন এসব কথা জিজ্ঞাসা করার ক্ষমতা মায়ের কেন বাড়ির কারুর নেই। এবার প্রায় প্রতি রবিবারেই বাবা চলে যান, ফেরেন সেই সন্ধ্যে পার করে। মা বোধহয় কিছুটা আন্দাজ করেছেন, কিন্তু অনুপম মা’কে সে কথা জিজ্ঞাসা করতে পারে না। বাড়িতে রজনীই ছিল একমাত্র বাবার প্রিয়, সেও মায়ের সঙ্গে গুজগুজ করে কিসব কথা বলে, মা নীরবে কাঁদেন। ব্যাপারটা বেশিদিন গোপন থাকল না।
সেদিন রবিবারে অনুপমের বাবা সকাল সকালই বাজার করতে গেছেন, ফিরিলেন মাছ মাংস নানান সব্জী কিনে। বাড়ির সকলেই আশ্চর্য, আজ পর্যন্ত অনুপম বাবাকে কখনো দেখেনি মাছ মাংস একসঙ্গে কিনে আনতে। শুধু মাকে বললেন” একজন দুপুরে খাবে আমাদের এখানে ভালো করে রান্না করো” । মা শুধু বললেন- “কে আসবে?”
“তুমি চেননা এলেই দেখতে পাবে”। ব্যস বাবার মুখে আর কোন কথা নেই।
বেলা এগারোটা নাগাদ এক মহিলা এলেন, মাঝ বয়সী, দেখতে মন্দ নয়, তার ওপর বেশ সাজগোজ করেছেন। অনুপম অবাক হয়ে দেখছিল, বাবা তাকে অভ্যর্থনা করে ঘরে নিয়ে এলেন। শুধু মায়ের চাপা গলায় রজনীর উদ্দেশ্যে “ তোকে বলেছিলাম না”। অনুপম জানে না মা তার বোন’কে কি বলেছিল। একটাই বড় ঘর সেখানেই গল্প গুজব চলছিল, মাঝে মাঝে অনুপমের কানে ভেসে আসছিল দুজনের হাসির আওয়াজ। সত্যি’ই তো তার বাবা তো কখনো এভাবে হাসত না । মা রান্নাঘরে রান্না করছে। সুন্দর বাস উঠেছে, কিন্তু অনুপমে কেমন যেন মনে হচ্ছে এগুলো নাহলেই ভাল হত। দেব দেবী’র প্রতি ভক্তি তেমন নেই, অভ্যাস বশতঃ হাত তুলে প্রণাম করে। আজ তার কি হল কে জানে, দেয়ালে টাঙ্গানো ক্যালেন্ডারে রামকৃষ্ণদেব মা কালীর ছবি। সেই দিকেই তাকিয়ে প্রার্থনার ভঙ্গিতে মনের কথা জানাতে চাইছিল। বারে বারেই মনে হচ্ছিল ঠাকুর যেন তার রাগী বাবাকে ফিরিয়ে দেয়।
রান্নাঘরে গিয়ে দেখল মা চোখের জল মুছতে মুছতে রান্না করছেন। “ মা আমার খেলা আছে, যা হয়েছে তাই দিয়ে ভাত দিয়ে দাও”।
“ বোস না দুটো সিটি হলেই মাংসটা সেদ্ধ হয়ে যাবে”।
“ না মা আমার আর সময় নেই, যা হয়েছে তাই দাও”।
“ কতদিন পর মাংস হচ্ছে, একটুকরোও খাবি না”।
“না”। ভাত ডাল মাছ ভাজা খেয়ে অনুপম উঠে গেল। খেলা আছে ঠিকই, কিন্তু এত তাড়াতাড়ি নয়। অনুপম চাইছিল যে করেই হোক বাড়ির বাইরে চলে যেতে। জামা প্যান্ট পরে ব্যাট হাতে অনুপম বেরিয়ে গেল। কিন্তু খেলার মাঠে গিয়েও কিছুতেই মন দিতে পারছে না। ফলে যা হবার তাই হল খুব বাজে ভাবে হেরে গেল। ভাড়ায় খেলতে গিয়েছিল। তাদের সঙ্গে দেখা না করেই চলে এলো।
কড়া নাড়তেই রজনী দরজা খুলে দিল। যা সে কোন দিন দেখেনি, মা চীৎকার করছেন। চোখের ইসারায় কি হয়েছে রজনীকে জিজ্ঞাসা করল। সে ঠোঁটে আঙ্গুল দিয়ে অনুপমকে চুপ করতে বলল।
“ আমি তো বাড়ির গৃহিনী না কি, তোমার পরিচিত কেউ আসতেই পারে তাবলে আমার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেবে না, কে উনি কি সম্পর্ক তোমার সাথে”। মায়ের প্রশ্নে বাবাকে বিচলিত হতে দেখা গেল না।
“ আমার কি কোন ব্যাক্তিগত ব্যাপার থাকতে নেই, সব কথা তোমাদের বলতে হবে”। মা যেন আজকে একটা এস্পার ওস্পার করতে চাইছে। “ হ্যাঁ বলতে হবে আমরা বানের জলে ভেসে আসেনি ছেলে মেয়ে দের আমি বাপের বাড়ি থেকে নিয়ে আসিনি, যা জানতে চাইছি বলতে হবে”। অনুপম ব্যাট হাতে করে মায়ের পিছনে এসে দাঁড়িয়েছে। সেই প্রথম বাবার চোখে মুখে অপরাধ বোধ দেখতে পেল। অনুপম’কে দেখে কেমন যেন কথা বলার খৈই হারিয়ে ফেললেন বাবা। গলার স্বর এক ধাক্কায় অনেকটা নীচেতে নেমে এল।
“ ঠিক আছে যখন জানতে চাইছ সব কথা বলব, তবে এখন নয়”। অনুপমের মনে হল বাবা কি তাকে দেখে লজ্জা পেল। সেটা তো অনেক আগেই বোঝা উচিত ছিল। আধ খানা ঘরে রজনী বই নিয়ে বসে আছে। অনুপমের আবার সেই ক্যালেন্ডারের দিকে চোখ পড়ল।
(৩)
পঁচিশে ডিসেম্বর ফুলেশ্বর ডাক বাংলোয় পিকনিক করতে যাওয়ার কথা। ক’দিন হল বাবার ঠান্ডা লেগে জ্বর হয়েছে। পিকনিকের টাকা বাবার কাছ থেকে চাইতে হবে না, প্রাইজ মানি হিসাবে যা পেয়েছে, তার থেকে অনায়াসেই দেওয়া যাবে। কিন্তু বাবার শরীর খারাপ বলেই কিন্তু কিন্তু করছিল, যাই হোক গতকাল থেকে বাবার জ্বর ছেড়ে গেছে,তবে শুয়ে বসেই থাকছে দুর্বলতার জন্যে। গোটা বাড়িতে গুম মেরে যাওয়া আবহাওয়া। অনুপম সংকোচ বশতঃই মাকে জিজ্ঞাসা করেনি বাবা কি বলেছেন। অনেক সকাল সকালই অনুপম বেরিয়ে গেল, বাবা তখনও বিছানা ছাড়েন’নি। যদিও আটটা বেজে গেছে। যাবার সময় মাকে বলে গেল, পিকনিকের কথা যেন না বলে।
বন্ধু বান্ধবদের সাথে দেখা হবার পর , সবাই মিলে হৈ হৈ করে ট্রেনে চেপে যাবার সময় বাড়ির গুমোট ভাবের ছাপ এক নিমেষে উধাও হয়ে গেল অনুপমের মন থেকে। ডাক বাংলোর মাঠে অনেকেই পিকনিক করতে এসেছে। বেশীর ভাগই বিভিন্ন অফিসের স্টাফেরা। অনুপমের বন্ধুরা পিকনিকের আয়োজন করছে, কোন রকমে টিফিন খেয়ে অনুপম সামনের মাঠের কাছে চলে গেল ওখানে দুটো অফিস টিমের মধ্যে খেলার আয়োজন হচ্ছে। একটা দলে মহিলার সংখ্যা বেশী, ফলে মাঠে নামাবার মত একজনকেও পাওয়া যাচ্ছে। অনুপমই সমস্যাটা বুঝতে পেরে জিজ্ঞাসা করল “ আমি কি খেলতে পারি”?
“তুমি খেলবে? তোমাদের পিকনিক হচ্ছে না”।
“ হ্যাঁ, তাতে অসুবিধে নেই, ওরাই সব ব্যবস্থা করবে, আপনারা কোন অফিসের”।
“ আমরা ইউনাইটেড ব্যাঙ্ক নেতাজী সুভাষ রোড ব্রাঞ্চ”।
“ আমি খেললে অপর পক্ষ আপত্তি করবে না তো”।
“ আরে না না ফ্রেন্ডলি ম্যাচ, তোমাকে সাব স্টাফ বলে চালিয়ে দেব”। সাব স্টাফ কথাটা কেমন যেন মনের মধ্যে লাগল অনুপমের। যতই একসঙ্গে খেলা হোক না কেন অনুপম যে ওদের সমকক্ষ নয় সেটা যেন দাগিয়ে দেওয়া হল। মনটা সামান্য খারাপ হয়ে গেলেও খেলার ব্যাপারে এইটুকু সমঝোতা সে করতেই পারে।
যতই অনুপমকে সাব স্টাফ বলুক না কেন, খেলার পারদর্শীতার দিকে দিয়ে ওর ধারে কাছে কেউ নেই। ফলে ফলাফল যা হবার তাই হল। অপর পক্ষ অভিযোগ করছিল ও তোমাদের অফিসের কেউ নয়। ওসব অনুপমের দেখার দরকার নেই, খেলার শেষে এক প্লেট মিষ্টি, আর কোল্ড ড্রিংকস্‌ এটাই লাভ। সারাদিনের পর বিকালে ট্রেন ধরে বাড়ি ফেরা। রামরাজাতলা স্টেশনে নামতেই অনুপম চমকে উঠল বাবাকে দেখে। বন্ধুদের হাতে ডেচকি কড়া, হাতা খুন্তি। অনুপম’কে দেখে ওর বাবাই এগিয়ে এলেন। “ এই তোর খেলতে যাওয়া?” বন্ধুদের মুধ্যে রাজুই বলে উঠল, “ না কাকু ও সারাক্ষণ একটা অফিসের টিমের হয়ে খেলেছে, আমরাই পিকনিক করেছি”।
“অফিসের টিমের হয়ে খেলল কি করে”।
“ ওকে সাব স্টাফ বানিয়ে দিয়েছে”। সবাই হো হো করে হেসে উঠল।
হঠাৎই অনুপমের চোখে পড়ল বাবার ধুতিতে পায়ের পাতায়, হাটুতে কাদা। “ এত কাদা লাগল কি করে তোমার পায়ে”?
“ হোঁচট খেয়ে পড়ে পাশের ড্রেন ছিল পা’টা ঢুকে গেসলো, হাঁটু’টা কেটে গেছে বোধহয়”। বাবার ধুতি সামান্য উঠিয়ে হাঁটুর দিকে চমকে উঠল।
“ হ্যাঁ, এই তো রক্ত পড়ছে। তোমার জ্বর হয়েছিল, তুমি এলে কেন?” এত কথা বাবার সঙ্গে সচারচর বলে না অনুপম, আজ বন্ধুরা পাশে রয়েছে বলেই নির্দ্বিধায় বলতে পারছিল সব কথাগুলো।
“ খবরে শুনলাম ফুলেশ্বরের গঙ্গায় নৌকোডুবি হয়েছে, কয়েক জন কে পাওয়া যায়নি, তোর মায়ের কাছে ফুলেশ্বর শুনে আর স্থির থাকতে পারলাম না”।
স্টেশন চত্বর ছেড়ে রাস্তা নেমেই অনুপম রিকসা স্ট্যান্ডের দিকে এগিয়ে গেল। তাড়াতাড়ি তার বাবা বাধা দিলেন, “ দাঁড়া দাঁড়া , রিকসা করতে হবে না , হেঁটেই বাড়ি যেতে পারব, একখুনি কুড়ি’টা টাকা নিয়ে নেবে”।
“ না বাবা একে তুমি দুর্বল, পায়ের যা অবস্থা তোমাকে রিকসাতেই যেতে হবে। আমার প্রাইজ মানি থেকে কুড়ি টাকা দিয়ে দেব”। অনুপম যেন কিছুক্ষণের মধ্যেই অনেক বড় হয়ে গেছে।
বাবাকে পাশে নিয়ে রিকসা করে যেতে যেতে বাবা তার মাথার হাত বুলিয়ে বুলিয়ে দিতে বললেন, “ এবার লেখাপড়া টা ভাল করে কর, না হলে তো ঐ সাব স্টাফ হয়েই থাকতে হবে”। অনুপমের চোখের সামনে বাড়ির দেয়ালে টাঙ্গানো ক্যালেন্ডারে রামকৃষ্ণদেব আর মা কালীর ছবিটা ভেসে উঠল।