প্রকল্প ভট্টাচার্য পেশায় লেখক এবং অনুবাদক। মুলতঃ ছোটদের গল্প এবং রম্যরচনা লেখেন তিনি। বহুবছর চেন্নাইয়ে প্রবাসী হয়েও আদ্যোপান্ত বাঙালি। আগে চাকরি করতেন এক বহুজাতিক মার্কেট রিসার্চ কোম্পানিতে, দেড় দশক পর চাকরি ছেড়ে নিজের লেখালেখি এবং প্রকাশনা সংস্থা নিয়েই ব্যস্ত আছেন এখন।

নাম: পরিমলবাবুর পরিবারকথা

পর্ব ৬: সমাজসেবা

(আগে যা ঘটেছেঃ প্রীতির বন্ধু আনন্দ ডাক্তারি পাশ করে সমাজসেবা করতে চায় শুনে পরিমলবাবু এবং তাঁর পরিবার খুব খুশী। কিন্তু নেমন্তন্নে খেতে বসে আনন্দ বলছে সমাজসেবা করতে গিয়ে তার দুঃখের অভিজ্ঞতা।)
পরিমল- কী সর্বনাশ! লোকটা ডাক্তারের চেম্বারে কাগজ পড়তে এসেছিল! কোনো কাণ্ডজ্ঞান নেই!
পরমা- আহা! তুমি নিজে যে চুল কাটার নাম করে রোজ সেলুনে যাও কাগজ পড়তে, তার বেলা!
প্রীতি- এ মা!! বাবা, তুমিও!!
পরিমল- ব্যস, শুরু হয়ে গেল! দেখেছ, আনন্দ! এরা সুযোগ পেলেই…
প্রসূন- আচ্ছা, আচ্ছা, অল কোয়ায়েট! আনন্দর ঘটনাটা পুরো শুনে নিই আগে! ভেরি ইন্টারেস্টিং!
জুঁই- হ্যাঁ, সত্যিই খুব ইন্টারেস্টিং। তারপর কী হল, আনন্দদা?
আনন্দ- আর কী! তো তাঁকে তো সেদিন ভদ্রভাবে বিদায় করলাম। এমন ফ্রাস্টু খেয়ে গেলাম, যে চেম্বার বন্ধ করে ফিরেই এলাম বাড়ি। পরদিন আবার নতুন উদ্যমে চেম্বার খুলে বসেছি। ঠিক ওই এক সময়ে আবার দরজায় ঠকঠক। আসতে পারি?
প্রসূন- আবার সেই লোকটা!
আনন্দ- না, এবার অন্য লোক। এ আবার…
জুঁই- না আনন্দদা, তুমি ওই নাটকের মতো করেই বলো। ওটাই শুনতে মজা লাগছে বেশী।
প্রীতি- রাইট। তুই রোল প্লে করে বল।
আনন্দ- ওকে। তারপর…
………………………………………
(বাইরে থেকে) ডাক্তারবাবু আছেন নাকি?
: হ্যাঁ আছি।  আসুন।  আপনি কি আনন্দবাজার না আজকাল?
(ব্যক্তির প্রবেশ) আজকাল! নাতো, আজকাল আমি এই তল্লাটে তো আসিই না!
: তাহলে গণশক্তি? বর্তমান?
ব্যক্তি: না না বর্তমান নয়, অনেক অতীতে একবার…
: যুগান্তর? টেলিগ্রাফ? স্টেটসম্যান? দ্য হিন্দু? টাইমস অফ ইন্ডিয়া? ডেকান ক্রনিকল?
ব্যক্তি: অরে দাঁড়ান দাঁড়ান, এগুলো তো খবরের কাগজের নাম!
: হ্যাঁ সেটাই তো জানতে চাইছি, আপনি কোনটার খোঁজে এসেছেন এখন?
ব্যক্তি- খোঁজে! কেউ আবার খবরের কাগজের খোঁজে ডাক্তারখানায় আসে নাকি!
: আসে, আসে! এই একটু আগেই এসেছিলেন একজন।  তা আপনি যখন বলছেন সে জন্য আসেননি, তাহলে বলুন কেন এসেছেন!
ব্যক্তি- শখ করে কি আর কেউ ডাক্তারখানায় আসে দাদা! এসেছি বিপদে পড়েই!
: হ্যাঁ সে তো ঠিকই।  তা বিপদটা আপনারই তো, নাকি…
ব্যক্তি: অরে না না আমারই বিপদ! বেশ ভালো বিপদ।  আপনিই যদি কিছু…
: অবশ্যই! সেই জন্যেই তো আমি আছি! আচ্ছা তাহলে বলে ফেলুন কী বিপদ আপনার!
ব্যক্তি: শুনেছি, ডাক্তারদের কাছে কিছু লুকোতে নেই, তাই…
: ঠিকই তো, লুকোবেন কেন! আচ্ছা, লজ্জা করলে এই পর্দার আড়ালে এসে…
ব্যক্তি: আরে না না সেরকম কিছু নয়. আসলে, গত দু’দিন আমি জল ছাড়া  কিছুই  খেতে পারছিনা।
: সেকি! খিদে পাচ্ছে না, নাকি হজমের গন্ডগোল? দেখি জিভটা…
ব্যক্তি: খিদে খুবই পাচ্ছে, কিন্তু.. আর না  খেলে হজমই বা হবেটা কী!
: সেও ঠিক, কিন্তু কিছুই খেতে পারছেন না কেন!  অসুবিধেটা কীরকম?
ব্যক্তি: আজ্ঞে অসুবিধা, মানে, ঠিক শারীরিক নয়…
: বুঝলাম না… পেটের গন্ডগোল? বুকে ব্যাথা?
ব্যক্তি: কোমরের কাছাকাছি আর কি…
: কোমরে ব্যথা?
ব্যক্তি: ঠিক কোমরেও নয়, মানে পকেটে…
: পকেটে!! পকেটে আবার ব্যথা করে নাকি!
ব্যক্তি: করে দাদা, করে! পকেট একেবারে ফাঁকা থাকলে বুঝবেন এ ব্যথা কি যে ব্যথা…
: ধুর মশাই, আপনার হয়েছেটা কি বলুন তো? আর আমার কাছেই বা  এসেছেন কেন?
ব্যক্তি: হয়েছে অভাব মশাই, অভাব! পকেটে পয়সা নেই।  চাকরি হারিয়ে নানা জায়গায় ধুপ বিক্রি করি, গত দু’দিন কোনো বিক্রিই হয়নি! সেইজন্যেই আপনার কাছে আসা… দাদা, কিছু ধূপের প্যাকেট কিনুন প্লিজ!!
:ধুপ!
ব্যক্তি: হ্যাঁ দাদা, ধুপ।  জুঁই চন্দন এবং গোলাপ এই তিন সেন্টের ধুপ… দাদা, একবার কিনে দেখুন, গন্ধে আপনার চেম্বরে রোগী গিজগিজ  করবে! সক্কলে ধন্য  ধন্য  করবে, আহা, এমন গন্ধমাদন ডাক্তার আর দুটো দেখিনি!
: আচ্ছা হয়েছে হয়েছে, দিন দু প্যাকেট আর এখন আপনি আসুন!
…………………………………………………
পরিমল- যাচ্চলে! সেলসম্যান!
আনন্দ- হুম।
পরমা- নতুন পেয়ে তোমাকেই গছিয়ে গেল!
আনন্দ- হুম।
প্রসূন- ডাক্তারদের চেম্বারেও এইভাবে সেলসম্যান ঢুকে পড়ে নাকি!
আনন্দ- হুম।
প্রীতি- কী তখন থেকে হুম-হুম করছিস বল তো!
আনন্দ- আর কী করবো! রাগে, দুঃখে আর তখন কি আমার কথা বেরোয়! করতে গেলাম ডাক্তারি, আর উলটে আমাকেই কী না কী ধূপ বিক্রী করে চলে গেল!
প্রিয়ম- আঙ্কল, তুমি নিশ্চয়ই সেদিনও চেম্বার বন্ধ করে বাড়ি ফিরে এসেছিলে?
আনন্দ- মাস্তার প্রিয়ম, তুমিই ঠিক আমার দুঃখটা বুঝেছ! ঠিক, সেদিনও আমি চলে এলাম, আর ভাবলাম আর এই গ্রামে ডাক্তারি নয়। বন্ধুকে সব জানালাম। সে বলল, আর একটা দিন দেখে নে, কথায় আছে বার বার তিনবার। যদি আগামীকালও কিছু না হয়, তাহলে…
জুঁই- গেলে আবার পরদিন?
আনন্দ- হ্যাঁ, গেলাম, আর নতুন কেনা ধূপ জ্বালিয়ে বসলাম। বলা তো যায় না, ধূপটা হয়তো সত্যিই আমার জন্য লাকি!
প্রসূন- তো লাক ফিরলো কিছু?
আনন্দ- তাহলে শোনো।
………………………………………………
(বাইরে থেকে) ডাক্তারবাবু আছেন নাকি?
: সর্বনাশ, এই বোধহয় আর এক নমুনা এলো! (জোরে) না আমার ধুপ দীপ সলতে দেশলাই কিচ্ছু চাই না!
(ব্যক্তির প্রবেশ) ধুপ দীপ দেশলাই… তার মানে?
: আপনি কি গায়ে মাখা সাবান? নাকি মাথায় মাখা তেল? সর্বরোগহরা বটিকা নাকি যাত্রাপালা অদ্য রাত্রি নয় ঘটিকা?
ব্যক্তি: বিশ্বাস করুন, আমি কিছুই বুঝতে পারছি না!
: আপনি কি সেলসম্যান? তাহলে বলে দিই, আমার এখন কিছুই দরকার নেই।
ব্যক্তি: ওহ, এই ব্যাপার! না না আমি সেলসম্যান নই।
: তাহলে নিশ্চই খবরের কাগজ পড়তে এসেছেন? বলে রাখি, সে গুড়েও বালি!
ব্যক্তি: কাগজ? না না, সে তো আমি বাড়িতেই পড়ে এসেছি।
: আহা শুনেও ভালো লাগলো।  তাহলে আসুন, বলুন কী জন্য এসেছেন?
ব্যক্তি: আমি কিন্তু এসেছি আপনারই জন্যে।
: আমার জন্যে! তার মানে?
ব্যক্তি- আপনি নতুন এসেছেন এই পাড়ায়, আদব কায়দা জানেন না হয়তো, তাই অসুবিধায় পড়তে পারেন, সেই ভেবেই…
: ওহ, হ্যাঁ, তা যা বলেছেন! আরে আপনি দাঁড়িয়ে কেন, বসুন না!
ব্যক্তি: বসব? আচ্ছা, আমি কিন্তু রুগী নই, এমনিই এসেছি আলাপ করতে।
: আরে মশাই রুগী যে আজ আর আমার চেম্বার এ আসবেনা, সে আমি জানি। মনে হয় এই এলাকায় কারো জ্বরজারিও হয় না।
ব্যক্তি: আরে না না তা কেন, তবে লোকজন বেশীরভাগ নিজে নিজেই…
: নিজে নিজেই!
ব্যক্তি: মানে ওষুধের দোকান থেকে, বা গুগল সার্চ করে ব্যবস্থা করে নেয়।  ডাক্তারদের ওপর ভরসা প্রায় হারাতে বসেছে সকলে।  চিকিৎসার খরচ, সেই সঙ্গে সুস্থতার কোনো গ্যারান্টিও যখন নেই…
: সর্বনাশ, তাহলে আমার সমাজসেবা!
ব্যক্তি: আমি একটা আইডিয়া দিতে পারি।  এই চেম্বারে একটা লাইব্রেরি খুলুন।
: লাইব্রেরি! ডাক্তারি পাশ করে লাইব্রেরিয়ান হবো!
ব্যক্তি: তেমন বুঝলে হাসপাতালেও জয়েন করতে পারেন, তবে রোগীর পরিবার রেগে গেলে মারধরও করতে পারে, তখন আমি আপনাকে বাঁচাতে পারবোনা!
: মারধর করে নাকি! ওরে বাবা!
ব্যক্তি: করে বৈকি! সেইজন্যেই তো এই এলাকায় আর কেউ ডাক্তারি করতে আসতে চায় না!
: আপনি বাঁচলে বাপের.. না না, ডিগ্রির নাম।  হ্যাঁ লাইব্রেরিই হোক!
ব্যক্তি: অতো ঘাবড়াচ্ছেন কেন! বইপত্রের ব্যবস্থা আমি কিছু করে দেব, আপনি চাইলে কোচিং সেন্টার খুলতে পারেন একপাশে.. পড়াশোনাটাই তো আসল, তাই না?
: হ্যাঁ সে তো বটেই!
ব্যক্তি: আর চিকিৎসকের থেকে শিক্ষক কি সমাজসেবায় পিছিয়ে আছেন?
: কখনোই নয়! ওষুধের দোকান থেকে ওষুধ কেনা গেলেও, বিদ্যাবুদ্ধি তো আর কেনা যায় না! সেই ভালো, আমার সমাজসেবাও হবে, আর এইভাবে মাছি না তাড়িয়ে সত্যিকারের কাজের কাজও হবে! অনেক ধন্যবাদ দাদা. তা আপনার পরিচয়টা কিন্তু…
ব্যক্তি: আমি এখানে একটা স্কুল খুলেছি, তারই প্রধানশিক্ষক।
: ওহ, আপনিও শিক্ষক, তাহলে তো কথাই নেই! আপনার নামটা…
ব্যক্তি: ড: শ্যামল রায়. এম ডি
: তার মানে! আপনিও ডাক্তার!! একেবারে এম ডি!!
ব্যক্তি: তার মানে আমি আপনার আগে এখানে, এই চেম্বারেই বসতাম, আর অন্যদের কাগজ পড়িয়ে, ধুপ কিনে দিন কাটাতাম!
: সেকি!
ব্যক্তি: হ্যাঁ, আর সেইজন্যেই আপনার নেমপ্লেট দেখে ভাবলাম আমার তো সমাজসেবা অনেক হলো, এবার আর এক বন্ধুকে সাবধান করে দিই!
: অনেক ধন্যবাদ দাদা, তাহলে কাল থেকেই সমাজসেবা, মানে লাইব্রেরি চালু!
………………………………………………………………
পরিমলঃ অ্যাঁ!!
আনন্দ- অ্যাঁ নয় কাকাবাবু, হ্যাঁ। সমাজসেবা মুলতুবি রেখে আপাততঃ আমি ফিরে এসেছি। দেখা যাক, আবার যদি ভবিষ্যতে সুযোগ সুবিধা হয়…
প্রিয়ম- মা, আমিও বড় হয়ে ডাক্তার হবো আর লাইব্রেরী চালাবো!
(সকলের হাসি)

সমাপ্ত