১৯৯২ সালের আগস্টে জন্ম যশোরের ঝিকরগাছায়। এইচএসসি পর্যন্ত যশোরে পড়ালেখার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিসংখ্যানে স্ন্যাতক। লেখালেখির স্বপ্ন, ইচ্ছা, চেষ্টা ছোটবেলা থেকে-ই। সবসময় মাথায় থাকে, " বিশ্বজোড়া পাঠশালা মোর, সবার আমি ছাত্র।"

হারিয়ে পাওয়া আলো

এখন আর মার জন্য কিছুই করার নেই আমার। অফিস থেকে ইমার্জেন্সি ছুটি নিয়েও কিছুই করতে পারলাম না মার জন্য। মা শুয়ে আছেন হাসপাতালের সাদা বেডে। ডাক্তার বলে দিয়েছেন কাল দুপুরে আসতে।
সবাই চোরা চোখে তাকাচ্ছে। একটু দূর সম্পর্কের আত্মীয়দের দু’একজন জিজ্ঞেস করলেন কখন পৌছলাম।  আমার একমাত্র মামা আমার সাথে কথা বললেন না একটিও। মেজখালা এসে বললেন তাদের বাসায় যেতে। তারপর কাল সকালে এসে ডাক্তারের পরামর্শ শোনা যাবে। সার্বক্ষণিক নার্সের ব্যবস্থা যখন করা গেছে আর ২৪ ঘন্টা ডাক্তারের তত্ত্বাবধানে আছে যখন, তখন আর কোন চিন্তা নেই। রাতটা তার বাসাতে সবাই যাচ্ছে। আমাকেও যেতে বললেন। আমি না করে দিলাম। আমি জানালাম, আমি একটু মার কাছে থাকতে চাই। রাতে ঘুম ভাঙলে তার আর ঘুম হয় না জানিয়ে খালা বললেন, রাতে ক্লান্ত লাগলে যেন অবশ্যই চলে আসি, ঘুমিয়ে গেছেন মনে করে যেন সংকোচ না করি।
সবাই চলে গেলে ভাবলাম, কার্যত মার জন্যে আমি কিছুই করতে পারছি না তবু আমি এই নিশুতি রাতের নির্জন হাসপাতালের করিডরে রয়ে গেলাম কেন? কাকে দেখানোর জন্যে? অন্য কাউকে হয়ত নয়। হয়ত নিজেকেই নিজে প্রবোধ দিচ্ছি, আই য়্যাম ডুয়িং এনাফ। ইমার্জেন্সি ছুটি নিয়ে ৩৩২ কিলোমিটার ড্রাইভ করে চলে এসেছি। এসেও অবশ্য মার জন্য কিছুই করতে পারছি না। আর তাই নিজের আরাম ত্যাগ করে এই রাতে এতটা জার্নি করার পরও হাসপাতালের করিডরে গোটা একটা রাত কাটিয়ে দিচ্ছি ‘মায়ের জন্য'(?)।  এতে মার কোন উপকার হওয়ার কথা না, মা তো এখন ঘুমের ইঞ্জেকশনের প্রভাবে অচেতন কিন্তু আমার নিজের ইগো বুস্ট হলো সেটা তো অভিয়াস, তাই না? এটা কি বয়সের তুলনায় যথেষ্ট ছেলেমানুষি হলো না? গ্রো আপ বিপুল!
কেবিনের দিকে এগোলাম নার্সকে বলতে যে আমিও চলে যাচ্ছি। আর যেকোন প্রয়োজনে ডায়েরিতে লেখা নাম্বারে কল করতে। দেখি কেবিনের দরজার সামনে একটা চেয়ারে বসে আছে মিথুন। পায়ের শব্দ শুনে চোখ তুলে তাকালো। আমি বললাম, তুই যাসনি? মিথুন বলল, আমার ভয় করছে। ফুপু-মার জ্ঞান ফিরুক, দেখা করে যাবো। মিথুন খেয়াল করেনি যে ও উত্তেজনায় আমার হাত দুটো চেপে ধরেছে। আমার আকস্মিক দৃষ্টি টের পেয়ে তাড়াতাড়ি হাত সরিয়ে নিল। মেঝখালা নিশ্চয়ই মিথুনকেও তার সাথে যেতে বলেছিলেন। মিথুন যায়নি। মিথুন উদ্বিগ্ন কখন ওর ফুপু-মা  চোখ মেলে তাকাবেন। হাত নেড়ে ডেকে নেবেন। মিথুনের চোখ জলে ভেজা। মিথুনের চোখ লাল হয়ে আছে। আমার মনে হলো ফুপু-মার জন্য এই রাতে হাসপাতালে অপেক্ষা করার অধিকার ওর আছে। ফুপু-মার সুস্থ হওয়ার, ভালো মন্দের ব্যাপারে তার অনেক কিছুই যায় আসে। মিথুন তার ফুপু-মাকে ভালোবাসে। এই চোখের জল, এই উদ্বেগ ভরা চাউনিতে কোথাও কোন ভান নেই। মিথুনেরই অধিকার আছে আজ রাতে এই হাসপাতালে থাকার। কিন্তু মিথুন এখানে অধিকারবোধের চর্চা করছে না। হাসপাতাল থেকে দূরে থাকা মিথুনের পক্ষে সম্ভব না তাই মিথুন কেবিনের বাইরে এই নিশুতি যাপন করছে।
আমি বললাম, কেবিনের ভিতরে গিয়ে বস!
মিথুন প্রবলবেগে মাথা নাড়াতে নাড়াতে আমার বুকে আছড়ে পড়ে বলল, আমি পারবো না, আমি পারবো না।
কেবিন থেকে নার্স বের হয়ে বলল, প্লিজ আপনারা চলে যান। আমি আছি। প্রয়োজনে আমি ফোন করবো। এটা হাসপাতাল।  এখানে এমন শব্দ করবেন না।
আমি মিথুনকে নিয়ে সরে এলাম। নার্সকে বলতে চাইলাম, এটা শব্দ না। এটা কান্না।
তারপর মনে হলো এটা হাসপাতাল, এখানে অশ্রুপাত হয় এবং হবেই। নার্সটির তাতে আপত্তি নেই।  শব্দহীনভাবে কাঁদো না যত পারো! আনন্দে কাঁদো, বেদনায় কাঁদো। কিন্তু শব্দ করে অসুস্থ বিশ্রামরত মানুষকে বিশ্রামের ব্যাঘাত ঘটিয়ো না। একজন অসুস্থ মানুষ যে নিজেই একটা লড়াই লড়ছে তার কাছে তেমনি একটি লড়ায়ে অন্য কারো পরাজয়ের খবর দিও না। সে হয়ত মনোবল হারিয়ে ফেলবে।
মিথুন আবার আমার কাছ থেকে নিজেকে সরিয়ে নিল। অথচ কত না অবলীলায় আমাকে আশ্রয় করতে পারছে। মিথুন হয়ত এই কল্পনায়-ই থাকে। তাই তার কাছে এটা একান্ত স্বাভাবিক। যখন সম্বিত ফিরে পায় তখন আমার চোখের দিকে তাকিয়ে হয়ত বোঝে সে বাস্তবে কল্পনায় হারিয়ে গিয়েছিল। মিথুন যখন সরে যায়, তীব্রভাবে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে, যেন নিজের কোন অঙ্গ থেকে নিজেকে আলাদা করে নিচ্ছে। তাতে অভিমানের প্রকাশ প্রকট হয়ে ওঠে। আদি ও অকৃত্রিম, সরল ও সহজ, ভনিতাহীন ও কোমল, অবোধ ও ছেলেমানুষ মিথুনের ভিতরে এখনও খাঁদ প্রবেশ করেনি, মিথুন এখনও খাঁটি সোনা।
আমি বললাম, থাক, তোমাকে বলতে হবে না মিথুন। তুমি আর কেঁদো না।
ধাতস্ত হওয়ার পর মিথুন বলল, আপনি যাননি কেন? এতো পথ জার্নি করে এলেন!
ভালো প্রশ্ন?  আমি কেন রয়ে গেলাম। মায়ের ব্যাপারে, আমার পরিবারের ব্যাপারে, আত্মীয় স্বজন পরিমন্ডলের যে কোন ব্যাপারে আজ আমি কমপ্লিটলি আউটসাইডার।
প্রশ্নের উত্তরে আমার বিমূঢ় ভাব দেখে সম্বিত ফেরে মিথুনের। ছোট্ট করে বলে, সরি। আমি যে তার ফুপু-মার ছেলে, আমারই যে থাকার কথা সামাজিক রীতি নীতি ছাড়াও নৈতিক দায়িত্ববোধ থেকে, কিন্তু তা যে আমি ব্যর্থ হয়েছি পুরোপুরি ভাবে, আর সে কারনেই আমার মার অসুখে আমার আচিরন যে দেখাচ্ছে আমি যেন একটা পাড়ার ছেলে, প্রতিবেশির অসুখে খোঁজ নিতে যেন এসেছি এবং এই আচিরন যে মিথুনের একটি কথায় তা যে প্রকাশ হয়ে পড়েছে, সেটা যে ভীষন নির্দয়তা-হোক সে ছেলে মায়ের যত্নে উদাসীন-তা মূহুর্তে বুঝতে পারায় মিথুনের এই ক্ষমাপ্রার্থনা।
আমার খারাপ লাগে। স্বতঃস্ফূর্ত মিথুন কেন এইসব হিসাব বুঝবে? মিথুন সরল ও স্বতঃস্ফূর্ত। এই ধূসর পৃথিবীতে এক টুকরো ঝরঝর রবে বয়ে যাওয়া ঝরণা। মিথুন তুমি হিসেবের পাতকুয়ো কখনও  হয়ো না।
আমি বললাম, ইটস ওকে। চলো বসি।
মিথুন কোমল হৃদয়ের অধিকারি। আমাকে হাসপাতালে থাকতে দিতে চাইলো না। বলল, আমি তো আছিই। আমি বললাম, থাকি না আমিও একটু। মিথুন বলল, না। আপনি জার্নি করে এসেছেন। তারপর কি মনে বলল, চলেন আমিও বাসায় যাবো।
মিথুন বাসায় যেতে চাইলে আমাকে নিয়ে আসতেই হবে জেনে এইভাবে আমাকে বাসায় রেস্ট নিতে নিয়ে এলো। মিথুন ছলনায় মানুষকে ভোলায়। মিথুন অপরের জন্য নিজের সর্বস্ব ত্যাগ করে অথচ তার নিখুঁত ছলনায় মানুষটা টেরও পায় না ওই ব্যক্তির স্বাচ্ছন্দ্যের পেছনে কতটুকু ত্যাগ আছে মিথুনের। মিথুন স্বার্থপরতার এই পৃথিবীতে বেশি রকমের ভালো। আমি মিথুনের দিকে তাকিয়ে মনে মনে বললাম, মিথুন তুমি বেশি ভালো।
কিন্তু পৃথিবীতে বেশি ভালো বেশি দুঃখ পায়।
কি ভাবছেন?
তোমার স্কুল কেমন চলছে?
ভালো চলছে। এখন চলেন।
মেজখালাকে ফোন করে বললাম আমি আর মিথুন আসছি। পথে তেমন কথা হলো না। আমি ড্রাইভ করছি। মিথুন পিঠ খাড়া করে বসে আছে। পিছনে রাবার ব্যান্ড দিয়ে বাধা চুল থেকে কয়েকটা বেরিয়ে এসে মাথাটাকে অগোছালো করে তুলেছে। মিথুন আনমনা। মিথুন কিছু ভাবছে।
এইরাতেও কিছু খেতে হলো। ঘুমানোর জন্য ভালো ব্যবস্থা করে রেখেছেন খালা। এই এতো জনের জন্যেও। বিছানায় পিঠ দিয়ে ভাবলাম, আমি মায়ের জন্য এতোদূর ছুটে এসেছি কিন্তু মাকে এখনও না আমি চোখের দেখা দেখেছি, না মা আমাকে দেখেছেন। মায়ের জন্য আমি কিছুই করতে পারিনি।
সকালে উঠে শুনি মিথুন ভোরে নাস্তা করেই হাসপাতালে চলে গিয়েছে। মেজখালা চা নিয়ে এসে আমার ঘরে বসলেন। তার মুখ থেকেই শোনা গেল পুরো ঘটনা। গতকাল দুপুরের দিকে মায়ের শরীর খারাপ লাগছিল। মিথুন স্কুলে ছিল। মায়ের ফোন পেয়েই মিথুন স্কুল থেকে চলে আসে। কি মনে করে আসতে আসতে এম্বুলেন্সের জন্য ফোন করেছিল। মিথুন এসে দেখে মা জ্ঞান হারিয়ে মেঝেতে পড়ে আছেন।  এম্বুলেন্সে করে আড়াইশো বেড হাসপাতালে ভর্তি করে সবাইকে ফোন করে। মামা, খালা পরে পৌঁচেছেন। ডাক্তার তখন এসে বললেন, প্রেশারের কারনে একটা মাইল্ড স্ট্রোক। সিরিয়াস কিছু না। আপাতত সামলে নেয়া গেছে। বাকিটা কালকে জানাবেন।
(এইসব হওয়ার পরে খালা আমাকে ফোন করে জানান। আমি সালু ভাইকে (আমার চাচাত ভাই) ফোন দিয়ে আসতে বলি। আর নিজেও রওনা দিই।)
মেজখালা সব জানিয়ে বলেন, নাস্তার দাওয়াত উপরে। আলী ভাইয়ের ওখানে। খালার দুই ছেলে, তিন মেয়ে। মেয়েদের সবার বিয়ে হয়ে গেছে। পাঁচতলা বাড়ির দ্বিতীয় তলায় বড়ছেলে আলমগীর আর তৃতীয়তলায় ছোটছেলে আলী থাকে। খালা আর খালু দ্বিতীয় তলায় বড়ছেলের কাছে থাকেন।
মামা, খালু, মামাতো ভাই ইথুন, ভাবি, আলী ভাই আর ভাবি সবাই বসেছে এখানে ওখানে। খালু টুকটাক কথা বলছেন সবার সাথে। এই সকালেও ভাবি গোশ পরোটা, মিস্টি সবজি, জুস-টুস করে একাকার করেছেন। ইথুন ভাবিও সাথে আছেন। কারো অসুস্থতা আর বিয়েতেই মানুষেরা এখন এক জায়গায় হয়। ফলে কিছুক্ষনের পরই অনুষ্ঠানের আবহ বদলে যায়। বিয়েবাড়িতে হঠাৎই পুরোনো রাগ অভিমান উথলে উঠে যেমন গন্ডগোল বেধে যায় তেমন অসুস্থ বা মরাবাড়িতে হঠাৎ হাসি হাসি মুখ করে শুরু হয় গল্প।
মেজখালা পরোটা নিতে দেখেই আলী ভাই হা হা করে উঠলেন। আম্মা করেন কি, করেন কি। আমি এখনই নিচে থেকে রুটি নিয়ে আসছি। তেলে ভাজা পরোটা খেলে আপনার জন্যে না। আর আপনার জন্যে পনির নিয়ে এসেছি।
আলী ভাই বড়ভাবির কাছে থেকে রুটি আনতে গেলেন। খালা যেখানেই খান না কেন রুটি বানাতে বড়ভাবির ভুল হয় না। সাথে নিয়ে গেলেন আলমগীর ভাই আর বড়ভাবির জন্যে নাস্তা।
এদিকে খালা রেগে গেছেন, আরো তিনি আজ পেয়েছেন সবাইকে। ‘তুই যদি এটা খাবেন না, ওটা খাবেন না করিসই তাহলে দাওয়াত দিছিস কেন? আমি তোর মেহমান। আমার যা ইচ্ছা হবে, যতটুকু ইচ্ছা হবে আমি খাবো। এটা কেমন মেহানদারি যে দাওয়াত করে খেতে মানা করা।’
খালু কিছুই শুনতে পাননি এমন ভাব করতে লাগলেন। সাথে আলীর ভাইয়ার বউ ছোটভাবিও। ইথুন ভাই আর ভাবি মিটিমিটি হাসছেন।
আলী ভাইয়ের ছোটমেয়ে বলল, আপু পরোটা খেলে তোমার গ্যাসের ব্যথা বেড়ে যাবে। আব্বু বলেছে?
হু, গ্যাসের ব্যথা বেড়ে যাবে। তোর বাপ কি ডাক্তার? তাহলে জানে কিভাবে? বাপের চ্যালা!
ডাক্তার চাচ্চু আব্বুকে বলেছে। আর আমি আব্বুর চ্যালা না। তোমার চ্যালা। আব্বু বলেছে। বলেছে আমি হচ্ছি তোমার চ্যালা। আমিও নাকি তোমার মতো কোন কিছু মানা করলে শুনি না।
ঠিক করিস। শুনবি না। আজকে আমিও শুনবো না, বলে মেজখালা নিজের প্লেটে পরোটা নিয়ে একটা বাটিতে গোশ নেন।
নিচ থেকে আলী ভাই এসে খালার বাড়া গোশ পরোটা নিজে নিয়ে রুটি আর নিচ থেকে আনা চিনি ছাড়া হালুয়া খালার সামনে দিলেন আর খালাও লক্ষীমেয়ের মতো খেতে শুরু করলেন।
নাস্তার পরে খালার রুমে এসে বসে খালাকে বললাম, খালা, আপনি খুব সুখে আছেন দেখি। দেখে খুব ভালো লাগলো।
এই সামান্য কথায় খালা ঝরঝর করে কেঁদে ফেললেন। বললেন, এই সামান্য সুখটাও আমার বোনের কপালে নসিব হলো না।
আমি হতাশ হয়ে খালার দিকে তাকিয়ে রইলাম। এই একটি টপিক এড়ানোর জন্যে বাড়িতে আসা একপ্রকারের বাদই দিয়েছি বলা যায়। আত্মীয়স্বজন সবাই নাখোশ আমার উপরে। মা অন্যদের এ বিষয়ে কাউকে কিছু বলতে মানা করেন বলে আত্মীয় স্বজনরা তার উপরেও নাখোশ। তারপরও এই প্রসঙ্গ চলে আসে ভুলের রুপ ধরে কথার প্রসঙ্গে প্রকারান্তরে।
আমি কেন বিয়ে করছি না!
আমি চোখ বুঝে দেখার চেষ্টা করলাম সুরভির মুখ। আমার চোখে ভেসে উঠলো বড় বড় চোখ, ছিপছিপে নাক, লম্বাটে মুখ জুড়ে প্রাণোচ্ছ্বল হাসি। নাহ, সুরভি এখনও আমার জীবনে মূর্তিমান। এই অবস্থায় কিভাবে কাউকে আমার সাথে জড়াই! সুরভিকে ঘৃণা করা যায়। দীর্ঘদিন প্রেমের পরে কেউ যদি বাবা-মার ইচ্ছায় অন্য কাউকে নিয়ে ঘর বাঁধে তবে প্রেমিক তাকে কি ঘৃণা করবে না? করবে। কিন্তু, সুরভিকে আমি ঘৃণা করতে পারি না। সুরভিকে ঘৃণা করতে পারি না কারন সুরভি বিয়েটা করতে চায়নি। সুরভি বলেছিল, চলো পালিয়ে গিয়ে আমরা বিয়ে করি। আমি পারিনি। আমি বলেছি, না। বাড়িতে আমার কথা বলতে পারো। কিন্তু পালিয়ে বিয়ে করা সম্ভব না। সুরভি বাসায় আমার কথা বলতে পারিনি। বললে ওর বড় ভাই অন্যের সাথে বিয়ে দিয়ে দেবে। বাবা অসুস্থ। সিরিয়াস হার্টের রোগী। অ্যাটাক হয়ে যাবে। আমি বলেছিলাম আমাদের বিয়ের খবর জানলে ওনার অ্যাটাক হবে না? সুরভি বলেছিল, তখন তো অন্তত তুমি থাকবে আমার পাশে। সুরভির কথা আমি বুঝতে পারি। আমাদের পালিয়ে যাবার কথা শুনলে সবচেয়ে বেশি যেটা হবে তা হলো বাবার অ্যাটাক হবে তিনি মারাও যেতে পারেন। তবুও সুরভি আমাকে পাবে। কিন্তু আমার কথা বাড়িতে বললে বাবার অ্যাটাক হবে, মারাও যেতে পারেন, ভাই তবু মেনে নেবে না। বদনাম হবে কিন্তু আমাদের মিলন হবে না। এই অনিশ্চয়তা নিয়ে সুরভি বাসায় আমার কথা বলবে না। যদি প্রেমিককে না-ই-বা পায় জীবনে তাহলে কলঙ্কের কালি মাখা কেন এই ভুবনে? আমি স্থম্ভিত হয়ে তাকিয়ে থাকি সুরভি দিকে। তারপর ভাবি, নারীর জীবন কি ভয়ানক জটিলতায় ঘিরে রেখেছে আমাদের সমাজ। মুখ ফুটে একটি কথা বলার আগে কত শত হিসেব কষতে হয়!
সুরভি বাড়িতে আমার কথা জানাতে পারেনি। আমিও সুরভির পরামর্শ মানতে পারিনি। পালিয়ে বিয়েটা আমাদের করা হয়নি।
সুরভির বিয়ে হয়ে গেছে নির্ধারিত সময়েই। একটি মেয়ে বাচ্চা। দেখা হয়েছিল একদিন। বলেছিল, স্বামীর প্রতি পালন করি কর্তব্য। ভালো আমি বেসেছিলাম ওই একজনকেই। দ্বিতীয়বার ভালোবাসার ক্ষমতা কেড়ে নিয়েছে সে।
আমি কোন প্রতিবাদ করিনি। কারন ততদিনে আমিও জেনে গেছি আমার জীবনেও ভালোবাসা বলতে ওই একজনই। দূর ভবিষ্যতেও আর কাউকে ভালোবাসার কথা ভাবতে পারি না। তাই মা বা আত্মীয়স্বজন যতবার বিয়ের কথা বলেছে ততবার আমি চোখ বন্ধ করে সুরভির কথা ভেবেছি আর আমার চোখে ভেসে উঠেছে সুরভি হাস্যমুখর কটাক্ষ আর সেই দুর্বিনীত গজদন্ত। আর ততবার আমি নিঃসন্দেহ হয়েছি,  নাহ, আমি আর দ্বিতীয়বার কাউকে ভালোবাসতে পারবো না।
আমি অসহায় হয়ে খালার কান্নারত মুখের দিকে তাকিয়ে থাকলাম। আমার নিজের অবস্থা তাকে বোঝানোর মতো ভাষার দক্ষতা আমার নেই।
তাদের সময়ে হয়ত জীবন এতোটা জটিল ছিল না। বিয়ের আগে হয়ত কোন ভালো লাগার ব্যাপার হতো না। বাবা-মায়ের পছন্দে বিয়ে, তারপর তার সাথে সাংসারিক জীবন। মেনে নেয়া বা মানিয়ে নেয়া। এই সময়ের মানুষের মনের জটিলতা তিনি কি বুঝতে চেষ্টা করবেন? এসব ‘কিছুই না’ বলে কি উড়িয়ে দেবেন না? তাছাড়া গল্পের ডালপালা ছড়ানোর ঝুঁকিও রয়েছে। আমি চুপ করে থাকারই সিদ্ধান্ত নিই।
হাসপাতালের উদ্দেশ্যে রওনা দিয়ে আমি মনকে আবার ভাবার অনুমতি দিই। মিথুনের সম্পর্কে সবাই জানে। তবু কেউ এটা নিয়ে কথা বলে না। আমি পড়াশোনার জন্য বাড়ি ছাড়লে মিথুন আমার ঘরেই পড়াশোনা করতো। আমাদের বাড়িতে পড়ার দারুন পরিবেশ ছিল। মায়ের অল্প বয়সে বিয়ের পরে পড়াশোনা আর করতে পারেননি। পরবর্তীতে আমাদের পড়ার জন্য তিনি জীবনকে এক প্রকার উৎসর্গ করেছেন বলা যায়। শুধু আমাদের জন্য না। আমার মামাতো ভাইবোনদেরও পড়াশোনার জন্য উৎসাহিত করার চেষ্টা করেছেন। ইন্টারে থাকার সময়ই মিথুনের বিয়ের প্রস্তাব আসতে থাকতে। মিথুন মাকে এসে ধরে। মিথুনের নাকি পড়ার খুব শখ। পড়াশোনার শেষে চাকরি করবে, নিজের পায়ে দাঁড়াবে। তারপর বড়দের পছন্দ অনুযায়ীই বিয়ে করবে। কিন্তু এখন বিয়ে হলে আর পড়াশোনা হবে না। ফুপু-মা যেন বিয়েটা আটকান। বিয়ের সে প্রস্তাব মা ফিরিয়ে দেয়ার ব্যবস্থা করেছিলেন। মিথুন আমার ঘরে পড়াশোনা করতো। আর মার সাথে সারাটা দিন কুটুর কুটুর গল্প। মা বুঝতে পেরেছিলেন আমার প্রতি মিথুনের ভালোলাগা।  মার আপত্তি ছিল না। বরং আগ্রহ ছিল শতভাগ। আত্মীয় স্বজন সবাই একপ্রকার ধরেই নেয় মিথুনই আমার মায়ের কাক্ষিত সেই ঘরের বৌ। একদিন মা ইনিয়ে বিনিয়ে বললে আমিই বলি যে, বিয়েটা করা আমার পক্ষে সম্ভব না। মিথুনকে আমি কখনও এমন ভাবিনি, তাছাড়া আমি এখন বিয়ে নিয়ে ভাবার মতো মানসিক অবস্থায়ও নেই।
এতে মা মিথুন দুঃখ পেল, মা পেল হয়ত তার থেকেও বেশি। মাকে ছোটমামা কথা শোনালো তার থেকেও বেশি। আমাদের বাড়িতে মিথুনের আসার ব্যাপারে নিষেধ করা হলো, মিথুন তা মানলো না। মিথুন আগের মতোই আমাদের বাড়িতে থাকতো, বাড়ি গিয়ে নিজের বাড়িতেও থাকতো। কিন্তু মা একা থাকে, মায়ের খোঁজ খবর যত্নের ব্যাপারে নজর রাখতে লাগলো আগের মতোনই। এর মধ্যে মিথুন স্কুলে চাকরি নিল, মাঝে কয়েকটি বছরও গড়িয়ে গেল।মিথুনের জন্যে আরো কয়েকটি বিয়ের প্রস্তাব এলো। মিথুন হেসেই উড়িয়ে দিল সে সব প্রস্তাব। কারন জিজ্ঞেস করলে কিছুই বলে না। মামা মুখে কিছু বলে না,  মামীও মুখে কিছু বলে না। মায়ের মনে পড়ে মিথুনের বিয়ের প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়েছিলেন তিনিই। আর এখন মিথুন যে প্রস্তাবগুলো ফিরিয়ে দিচ্ছে তার কারনও তিনিই, আর তার ছেলেও বটে।
অসুস্থ হয়ে পড়ার আগের দিন মিথুনের সাথে হয়তবা মায়ের কথা-কাটাকাটি হয়ে থাকবে। মা হয়ত মিথুনকে আর এতো আসতে মানা করে থাকবেন। না এসে বরং একজন সারাদিনের জন্যে কোন মহিলা বা মেয়েকে দেখার জন্যে বলে থাকবেন, স্পষ্টতই মিথুনের পরবর্তী ঘর সংসারের জন্যে এই বাড়ির মায়া কাটানোটা মায়ের কাছে জরুরি মনে হয়ে থাকবে-কিন্তু মিথুন তার ফুপু-মার কথা সেদিন শোনেনি। একজন ঠিকে কাজের লোকের খোঁজ করতে সে অস্বীকৃতি জানায়। সে জানায় তাকে তার ফুপু মা এতো সহজে ঝেড়ে ফেলতে পারবে না। সে আসবে।
তার ফুপু মার মুখের উপর সে আসবে জানালেও মিথুন কিন্তু পরদিন আসে না। সেদিন সন্ধ্যায় মিথুন বাড়ি গিয়ে বিছানা পড়ে ফুলে ফুলে কাঁদে, তবু বাড়ির কেউ তাকে জিজ্ঞেস করে না তার কি হয়েছে। মিথুন সকালে কিছু না খেয়ে স্কুলে যায়। স্কুলে গিয়ে ক্লাসের তার ফুপু-মার ফোন পায়। তার ফুপু-মা তাকে গতকালের বলা কথা মনে রাখতে নিষেধ করে, তাকে জানায় তার শরীরটা খারাপ লাগছিল তাই কি দিয়ে কি বলে ফেলেছে। মিথুন ফোনে কন্ঠস্বর শুনে বুঝতে পারে গতকাল না, শরীর খারাপ লাগছে তার ফুপু-মার আজকে।মিথুন বাজপাখির মতো স্কুল থেকে উড়ে আসে তার ফুপু-মার বাড়িতে। তাকে হাসপাতালে নিয়ে আসে।  অনুশোচনা দগ্ধ মন নিয়ে রোগীর বেডের পাশে বসে থাকে নিঃশ্চুপ হয়ে।
এই দুজন অসমবয়সী নারীর মান অভিমানের মাঝখানে আমার নিজেকে অনাবশ্যক, অনাকাঙ্ক্ষিত, বাড়তি একজন বলে মনে হচ্ছিল। কিন্তু এই দু’টি নারীর মাঝে স্থান করে নেয়ার একটা উদগ্র ইচ্ছা যা মনের মধ্যে ক্রমশ বেড়ে উঠছিল, সেই ইচ্ছা প্রকৃত পক্ষে প্রমান করে এই দুটি নারীর সাথে আমি কতটা যুক্ত। আমার মা, যার প্রতি আমি অবহেলা করে এসেছি  একটা গোটা জীবন যদিও আজ বুঝি এর দায় ভার  শুধুই আমার না, অতিরিক্ত প্রশ্রয় আর আকড়ে ধরার প্রবনতা দ্বারা অনাদরের একটা বড় অংশ যিনি নিজেই ক্রয় করেছেন-তার প্রতি সন্তান হিসেবে আমার যুক্ততাটি সর্বজন বিদিত হলেও মিথুনের সাথে আমি কিভাবে যুক্ত? মিথুন, যে মিথুন আমাদের বাড়ি উঠে আসে আমাকে হাসিল করার লক্ষ্যে কিন্তু কালের পরিক্রমায় পরিণত হয়েছে আমার মায়ের এক্সটেন্ডেড রুপে; ইয়েস, আমি বুঝতে পেরেছি আমি কেন মিথুনের সাথে নিজেকে, নিজের অস্তিত্বকে সমাপতিত করে ফেলছি। মিথুন এখন হয়ে পড়েছে আমার মায়ের বর্ধিত স্বত্তা। যার ফলে আমি এখন নির্দ্বিধায় মিথুনের সাথে একাত্মবোধ করতে পারছি।
আমি হাসপাতালে পৌঁছে দেখি মিথুন আর আমার মা একসাথে কথা বলছে। মা বিছায়ায় শুয়ে আর মিথুন বসে আছে বিছানার নিকটেই একটা চেয়ারে। আমি কেবিনের ভিতরে না ঢুকে দরজায় দাঁড়িয়ে থাকি। মনে হয় এর থেকে ভিতরে যেতে অনুমতি নেয়ার দরকার আছে আমার।  তাহাদের দু’জনের নিজস্ব ভুবন, তাহাদের ভুবন। তারা দু’জনই আমার দিকে একসাথে চাইলো। হাতের ইশারায় মা আমাকে ডাকলো। হাত দিয়ে মুখটি ভালো করে ছুঁয়ে দেখে জিজ্ঞেস করলেন, কিরে কেমন আছিস? আমি হেসে উঠতে গিয়ে রেগে উঠলাম আবার ফের হেসে উঠলাম। আমি বললাম, হাসপাতালের বেডে শুয়ে আছো তুমি, আর আমাকে কিনা জিজ্ঞেস করছো কেমন আছি! মা বললেন, কয়েক দিন আগে না বললি তোর কেমন একটা শরীর খারাপ মতো হয়েছে। আমাদের কথা কয়েকদিন আগের বিষয়াবলি নিয়ে হতে লাগলো। মার অসুখ বিসুখ এসব নিয়ে আমি কোন কথা বলতে চাচ্ছিলাম না। এইসব কথোপকথনে আমি অনুভবের মতো করে বুঝতে পারছিলাম, মিথুন কি একটু ইর্ষান্বিত আমার প্রতি? আমি কি এখন উড়ে এসে জুড়ে বসা কেউ ? যে অমোঘ ভালোবাসা মানুষকে যুক্তিবোধ থেকে বিযুক্তি দেয় সেই দুর্নিবার অধিকারবোধ যে মিথুন মায়ের প্রতি অনুভব করে তা যেন একটু আমি বুঝতে পারছি। আমার ধারনাকে প্রায় সত্য করে দিয়ে মিথুন উঠলো, বলল,  আমি একটু ফল-টল কিছু কেটে আনি। এই অজুহাতে মিথুন কেবিনের বাইরে গেল। অজুহাতই, কারন ফল, পানি, ছুরি, ফ্লাস্ক আরো অনেক কিছু কেবিনের আলাদা অংশে আছে। মাকে ‘আসছি’ বলে আমি কেবিন থেকে বেরিয়ে আসি।
মিথুন কি আমার জন্যেই অপেক্ষা করছিল? নইলে রেলিঙে অমন করে দাঁড়িয়ে আছে কেন? সকালে মিস্টি রোদ পড়েছে মিথুনের গালের উপর, চুলের উপর সেই সোনা রঙের আলো তৈরি করে লালচে চুলের বিভ্রম। চুলে হাত দিয়ে সেই স্বর্গীয় আলো ছোঁয়ার তীব্র ইচ্ছাটাকে দমন করার জন্য আমাকে শারিরীক কসরতই করতে হলো একরকম। আমি মিথুনের পাশে গিয়ে দাঁড়ালাম। অপেক্ষার সময় দীর্ঘ হয়। সময়ের দৈর্ঘের বৃদ্ধি মানুষকে ধৈর্যহীন করে তুলতে পারে। তাছাড়া এই এখনকার আমি বা গোটা আমি গোটা সময় ধরে অহেতুক সময়কে কি দীর্ঘ করে তুলিনি? মিথুনের পক্ষে আর কত নিশ্চুপ হয়ে থাকা সম্ভব। উপরন্তু মিথুন এখন আত্মনির্ভরশীল,  স্বাবলম্বী। আমার এই মিথুনকে, তার আত্মবিশ্বাসকে ভালো লাগছে। তবু বুঝি তীব্র ভালোবাসার মাঝে একটু ধৈর্যহীনতা, একটু হারাই হারাই ভাব আছেই তাই মিথুন বলে ওঠে, কিছু তাও বলবেন না?
গোটাটা পাওয়ার পর মানুষের বুঝি সাধ জাগে ছেলেখেলা করার, আমি বলি, কি বলবো বলো? মায়ের এই অবস্থায় এখানে একা কি আর রাখা যায়? নিয়েই যেতে হবে আমার কাছে। কথা বলার সময় বিরতি না দিয়েই, কথা বলতে বলতেই আমি মিথুনের মুখশ্রীর প্রতি দৃষ্টি রাখি। দেখতে থাকি কিভাবে মুখের রেখা পরিরেখাগুলো পরিবর্তিত হচ্ছে, ভেঙে যাচ্ছে-হতাশায়? নাকি আমার অর্বাচীনতা দেখে রাগে বিরক্তিতে? আমি কথা শেষ করি না। বলতেই থাকি, নিয়ে গেলেও তাও তো মাকে একা থাকতে হবে। আমার অফিস, কাজ। সেটাও ভাবছি। এখানে অন্তত চেনা পরিচিতরা আছে। ওখানে কে-ই-বা সময়ে অসময়ে দেখবে! এখানে তো তুমিও আছো। আমি একটু বিরতি দিই কথায়। মিথুন এখন পুরোপুরি দ্বিধাগ্রস্ত। ইংরেজি ভাষা কি বলবে একে, পাজলড! মিথুন বুঝতে পারছে না প্রস্তাবটি কি আসবে, পরে আসবে নাকি আদৌ আসবে না। আমি বলি, মাকে তো একা রাখা যাবে না মিথুন। তুমিও কি মার সাথে আসবে আমার সাথে?
এখানে মিথুনের জন্য রয়েছে একটি ধাঁধা। একটি সাধারন প্রশ্ন একটি ধাঁধায় রুপান্তরিত হতে পারবে শুধুমাত্র মিথুনের উত্তরের গুনে। নতুবা এটি একটি অত্যন্ত সাধারন এবং আধিপত্যবাদি প্রশ্নই। আমি জানি মিথুনের উত্তর কি হবে এই প্রশ্নের, সেই উত্তর আমার পছন্দেরও। আমি শুধু চাই মিথুন উত্তরটি দিয়ে একটি সাধারন প্রশ্নকে একটি সুখকর ধাঁধায় পরিনত করুক। মিথুন ঝট করে তাকালো আমার দিকে। মুখ জুড়ে কি খুঁজছিল সেটা আমি জানি। পেল কিনা মিথুন বলতে পারবে। অবশেষে মিথুন বলল, মাকে আমি ছাড়বো না, আমিও যেতে পারবো না। আমি যে এখন বাচ্চাদের পড়াই।
আমি কৃত্রিম রাগ দেখিয়ে বললাম, তবে?  তবে আমি কি প্রতি মাসে মাসে আসবো? আর মাও আরো আরো এমন অসুস্থ হয়ে পড়ে যদি?
নাহ, আর অসুস্থ হবে না মা (ফুপু-মা বলল না!), আর মাসে মাসে না, মাসে দু’বার!
আমি হেসে ফেললাম, তুমি বড় দুষ্টু হয়েছ মিথুন। খুব দুষ্টু। আর সাথে বড়ও হয়েছ।
হু, বড় তো হয়েছিই, আমি এখন বাচ্চাদের,  ছেলেমেয়েদের পড়াই, ছেলেমেয়েদের সামলে রাখি আর…
আর?
আমি বুড়োখোকাকেও সামলাতে পারবো।’ বলে ঝরঝরে কন্ঠে হেসে ফেললো। আমার দৃষ্টিতে বুঝি লজ্জা পাচ্ছিল। বলল, মা একা রয়েছে। চলেন।
কেবিনে ঢুকে মিথুন ব্যস্ত হয়ে পড়লো জানালার পর্দা সরিয়ে দিতে। মাকে বলল, খুব সুন্দর সূর্য উঠেছে আজ। কেমন মিস্টি মিস্টি আলো। মা মিস্টি আলো দেখে ফেলেছেন, মিথুনের চেহারায়।
মিথুনের হাস্যোজ্জ্বল মুখটি মা কাছে টেনে নিলেন আর আমি অনন্তকাল ধরে যেন দেখছি মা আদর করছেন মিথুনকে। পর্দা সরানো জানালার কাঁচ গলে আসছে সকালের নরম লালাভ সোনালি আলো, ক্রমশ আবৃত করে চলেছে দুই আপ্লুত নারীকে। এমন একটি দৃশ্যের সামনে জীবনের যেকোন অসমতা, অপূর্ণতা নিঃশেষ হয়ে যাওয়ার নিয়তি নিয়ে আসে। আমার জীবনের হারিয়ে যাওয়া আলো আজ এই শুভ শুভ্র সকালে ফিরে পেলাম বলে প্রত্যয় হয়। কে বলে যা হারায় তা চিরকালের জন্য হারায়? জীবন সমুদ্রের মতো, যা কিছু হারায় তা ফিরায়ে দেয় করুনাধারায়।