ফেসবুক থেকেই মূলত লেখালিখির শুরু ইতিমধ্যেই প্রকাশিত হয়েছে একটি বই।
দুটো শুঁড় নাড়িয়ে আরশোলাটা দেওয়ালের একই জায়গায় বসে আছে। নড়ার নামই নেই। অনামিকা বিছানার একজায়গায় জড়সড় হয়ে বসে আছে আর চেঁচাচ্ছে। প্রতাপ হাওয়াই চপ্পল তুলে বসিয়ে দিলো আরশোলার গায়ে। তারপর সে চেপ্টে যাওয়া আরশোলার শুঁড় ধরে সেটাকে বাইরে ফেলে এলো। অনামিকা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে বলল,” তোমার কি সাহস!”
প্রতাপ একটু ঘাবড়েই গেলো। জীবনে এই প্রথম এরকম একটা কথা শুনলো ও। চিরকাল সবার মুখেই শুনে এসেছে, ওর মতো ভীতু আর কেউ নেই। সদ্য বিয়ের পরে এরকম একটা প্রশংসা পাবে তা ও ভাবতেই পারেনি। খুশী হবে কিনা- সেটা ভাবতে লাগলো প্রতাপ। ঢকঢক করে বোতল থেকে জল মুখে ঢেলে একটু স্বাভাবিক হলো। তারপরে ভাবলো, বউ যদি ওকে সাহসী ভাবেই তাতে ক্ষতি কি? হানিমুনে এসেছে ওরা। হোটেলের ম্যানেজারকে আরশোলা নিয়ে কিছু বলা উচিত। কিন্তু, খুব একটা সাহস পেলোনা প্রতাপ। ম্যানেজারের যা একটা গোঁফ আছে- তা দেখলেই কেমন একটা ভয় হয়। ম্যানেজারকে ঘাঁটিয়ে লাভ নেই। বরং ওর একটু সাহসী হিসেবে নামও হয়।
ছোটবেলা থেকেই সবাই প্রতাপকে ভীতু বলেই জানে। পাড়ায় বন্ধুরা যখন দুষ্টুমি করতো ও চুপ করে একজায়গায় দাঁড়িয়ে থাকতো। তখন পাড়ায় অনেক গাছপালা ছিলো। বন্ধুরা গাছে উঠে ফল চুরি করতো, সাঁতরে পুকুর পাড় হতো, মোষের পিঠে চড়ে ঘুরতো, লুকিয়ে হলে সিনেমা দেখতে যেতো- এসব দুঃসাহসিক কাজের থেকে শতহস্ত দূরে থাকতো ও। ও নাকি দাদুর ধাত পেয়েছে। দাদুও নাকি খুব ভীতু ছিলো। বাড়িতে চোর ঢুকলেও নাকি লুকিয়ে থাকতো। একটু বড় হয়ে বন্ধুরা মেয়েদের বাড়িতে ঢিলের সঙ্গে কাগজ জড়িয়ে প্রেমপত্র ছুঁড়ে দিয়েছে, কেউ বা মেয়ে সেজে মেয়েদের হস্টেলে ঢুকে পড়ে প্রেম নিবেদন করেছে, আবার কেউবা হাতের আঙুলে সূচ বিঁধিয়ে সেই রক্ত দিয়ে প্রেমিকার নাম লিখেছে- এসব ও শুধু দেখেই গিয়েছে। ওর সাহসে কুলোয় নি। ছেলেপুলেদের মধ্যে মাঝেমধ্যে মারপিট লাগতো। তার ধারেকাছেও প্রতাপ নেই। প্রতাপ মাকে ভয় পায়, স্যারদের ভয় পায়, পাড়ার দাদাদের ভয় পায়- এই ইমেজ ছেড়ে কোনদিনই বেরোতে পারলো না। এখন নতুন সংযোজন হয়েছে অফিসের বস। নতুন চাকরি। বিয়ের পরে প্রথম কয়েকদিন ছুটি চাইতেই সাহস পায় নি ও। হানিমুনের ছুটি চাইতে গিয়ে বসকে চিঠি দিয়েই চলে যাচ্ছিলো। বস চিঠির বিষয় জানতে চাওয়ায় তোতলাতে শুরু করলো।
বন্ধুরা ফুলশয্যার রাতে ওকে রসিকতা করে বলেছিলো,” দেখিস- আবার বউকে ভয় পেয়ে পালিয়ে যাস না!”
তবে হানিমুনে আসার আগে বেশ ভয় পাচ্ছিলো ও। এখন আরশোলাটাকে মারতে পেরে একটু স্বস্তি ফিরে পেয়েছে প্রতাপ।
আজ পর্যন্ত কোনদিন ড্রিঙ্ক করেনি প্রতাপ। কিন্তু, হানিমুনে একটা বোতল নিয়ে এসেছে৷ অফিসের সুধাদা বলেছে, একটু ড্রিঙ্ক করলে নাকি সাহস পাওয়া যায়। সুধাদাই ওর একমাত্র সঙ্গী অফিসে। সুধাময়ের ছেলেপুলে নেই- প্রতাপকে পছন্দ করে। বিকেলবেলায় ব্যালকানিতে বসে চায়ের কাপে চুমুক দিচ্ছিলো। সামনেই সমুদ্র। অবিরত ঢেউয়ের গর্জন কিরকম মনটাকে যেন উদাস করে দিচ্ছে। আকাশ ধীরে ধীরে রাঙিয়ে উঠছে। অনামিকার মাথার চুল এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে উতলা হাওয়ায়। সমুদ্রের পাড়ে এখনো প্রচুর মানুষ ভীড় করে দাঁড়িয়ে আছে। অনামিকার হাতটা নিজের হাতে তুলে নেয় প্রতাপ। অনামিকার মুখে লাজুক হাসি। খুব ভালো লাগছে প্রতাপের। এমন সময় মোবাইল বেজে উঠলো। সোমেনদার ফোন। দেখেই মেজাজ খারাপ হয়ে গেলো প্রতাপের। লোকটা ভালো নয়। তবে খুব ক্ষমতাশালী। অফিসের সবাই ওকে ভয় পায়- সমীহ করে চলে। মোবাইল নিয়ে ভেতরে ঢুকে যায় প্রতাপ।
“আচ্ছা প্রতাপ- তুই কি রে? হানিমুনে গিয়েছিস- তাও বস কাজ চাপিয়ে দিলো। কিছু বললি না?”
প্রতাপ চমকে ওঠে এটা তো কারোর জানার কথা নয়। বস ওকে বাড়তি ছুটি দিয়েছে ফাইলটা দেখার জন্য।
” কি ঘাবড়ে গেলি নারে? আমি সব জানি। আর শোন – ফাইলটা তোর ভালভাবে না দেখলেও চলবে। সই করে দিবি শুধু। কিছু সমস্যা হলে আমি তো আছি রে। যা! বউকে আদর কর গিয়ে, আমি আর ডিস্টার্ব করবো না।”
ফোন ছেড়ে দিয়েছে সোমেনদা। চিন্তিত মুখে ব্যালকানিতে যায় প্রতাপ।
কাজু বাদাম সহযোগে ড্রিঙ্ক করতে বেশ লাগছে প্রতাপের। ভুলেই গেলো ও সোমেনদার কথা। পরের দিন সকালে উঠে যদিও মনে পড়ে গেলো। ব্রেকফাস্ট করে ফাইলটা নিয়ে বসলো ও। অনামিকা প্রথমে ফাইল নিয়ে যাওয়ার কথা শুনে অসন্তুষ্ট হয়েছিল। কিন্তু, যখন শুনলো এ জন্য অতিরিক্ত ছুটি পাওয়া যাবে এবং সেই কয়েকদিন ওরা বাড়ি ফিরবেনা- তখন ওর মুখে আবার হাসি ফুটেছিলো। ফাইল কিছুটা দেখে লাঞ্চ করে ওরা বেরিয়ে পড়লো আশেপাশের জায়গাগুলো দেখার জন্য। ফিরতে সন্ধে হলো। এর মধ্যে মা ফোন করে বৌমার কাছে সব খবর নিয়েছে৷ মা প্রতাপকে একা ছেড়ে খুব একটা স্বস্তি পায় না। তবে ছেলের বউয়ের জন্য এবার অতখানি চিন্তা করে নি। অন্যান্যবার অফিসের কাজে গেলে দিনে বেশ কয়েকবার ফোন করতো মা। আজ আর ফাইল দেখার সময় নেই। ব্যালকানিতে বসে আবছা আলোয় সমুদ্রের সৌন্দর্যে ডুবে গেলো ওরা। পরেরদিন আর কোথাও বেরোনো হবে না। তাই সকাল থেকেই ফাইলটা নিয়ে বসলো প্রতাপ। কিছুক্ষণ পরেই ওর চক্ষু চড়কগাছ হয়ে গেলো। এ কি দেখছে ও! এতো পুকুর চুরি! কি করবে এবার ও? সই করে ছেড়ে দেবে? সোমেনদার মুখ মনে পড়ে গেলো। ধরলে ওকে ছাড়বে না। যাক! যা হচ্ছে হোক। এটাই তো সিস্টেম। সন্ধেবেলায় আর ড্রিঙ্ক করতেই ইচ্ছে করছেনা ওর। সমুদ্রের ধারে একবারও যেতে ইচ্ছে করছে না। অনামিকা জোর করেই ওকে ধরে নিয়ে গেলো। পাড়ে এসে ঢেউ আছড়ে পড়ছে। গায়ে জলের ছিটে লাগছে।
” কি হয়েছে বলোতো? তোমার মুখ গম্ভীর কেন?”
” ফাইলটায় গন্ডগোল আছে। তুমি তো জানো আমি ভীতু মানুষ। ধরলেই গন্ডগোল হবে। ”
” কে বলেছে তুমি ভীতু?”
কোনো উত্তর দেয়না প্রতাপ। আকাশের দিকে তাকিয়ে প্রতাপ দেখে মেঘ জমেছে৷ যে কোনো মুহূর্তে বৃষ্টি শুরু হতে পারে। উঠে পড়লো ওরা।
আজ আবার একটা আরশোলা ঘুরছে। যদিও অনামিকা চুপ করেই বসে আছে। ও বোধহয় ফাইলটা নিয়েই ভাবছে। বেয়ারা এসেছিলো জল দিতে।
আরশোলাটাকে না মেরে শুঁড় ধরে বেয়ারার মুখের সামনে নাড়িয়ে প্রতাপ বলে,” ঘরটা ঠিকভাবে পরিষ্কার করো না। তোমাদের ম্যানেজারকে এবার আমি ধরবো। ”
চেঁচামিচি শুনে ম্যানেজার ছুটে আসে। ম্যানেজারের গোঁফজোড়া ঝুলে গেছে। অনেকবার ক্ষমা চাইলো। বেয়ারা এসে স্প্রে করে গেলো। সবে ড্রিঙ্ক নিয়ে বসেছে প্রতাপ। সোমেনদার ফোন। ইচ্ছে করেই ধরলো না প্রতাপ। দু পেগ খেয়েই হঠাৎ উত্তেজিত হয়ে বসকে ফোন করলো ও। সমস্ত কথা খুলে বললো প্রতাপ। বস খুব খুশী। বললো, ল্যাপটপে সমস্তটা তুলে রাখতে। ফাইলটাও গুছিয়ে রাখতে হবে। আবার কিছুক্ষণ পরেই সোমেনদার ফোন। এবার ধরলো প্রতাপ৷
” শোন, তুই যদি বসকে কিছু জানাস- তাহলে তোর চাকরিতো যাবেই, বেঁচে থাকবি বলেও মনে হয় না।”
” শুয়োরের বাচ্চা। ” প্রতাপ বিশ্বাস করতে পারছে না, ওর গলা দিয়েই এই শব্দগুলো বেরিয়ে এলো। সোমেনদা ফোন ছেড়ে দিয়েছে। ফোন ছেড়ে মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়ে প্রতাপ।
অনামিকা ওর পাশে এসে বসে হাত ধরে বলে,” ঠিক করেছো তুমি।”
হানিমুন থেকে ফেরার পরেই প্রতাপ শোনে, ওদের বাড়ির সামনে নাকি কয়েকদিন ধরে কিছু অচেনা, ষন্ডাগুন্ডা ছেলেকে দেখা যাচ্ছে। মা খুব ভয় পেয়ে গেছে। প্রতাপেরও বাড়ি ফেরার সময়ে মনে হয়েছিলো বাড়ির সামনে কিছু অচেনা মুখ যেন ওদের দিকে তাকিয়ে আছে। রাতে পাঁচিল টপকে কারা ভেতরে ঢোকার চেষ্টা করছিলো। কিন্তু, ফ্ল্যাটের সিকিউরিটি গার্ড দেখে ফেলায় ওরা পালিয়েছে। পরেরদিন সকালে আবার পুরনো ভয়টা যেন ফিরে এলো। অনামিকা বেরোবার আগে প্রতিদিনের মতোই মা দুর্গার ছবি ছুঁইয়ে দিলো প্রতাপের কপালে। অফিসে যাওয়ার জন্য বেরিয়ে সিগারেটের দোকান থেকে এক প্যাকেট সিগারেট কিনে একটা সিগারেট ধরালো প্রতাপ। টের পেলো ওর হাত কাঁপছে। কয়েকজন ওর দিকেই আসছে। দ্রুত এগিয়ে গেলো প্রতাপ। পিছন থেকে লোকগুলো প্রায় ছুটে এসে ওকে ঘিরে ধরলো।
” বেশী পাকামো করলে জানে শেষ করে দেবো।”
ওদের দিকে তাকিয়ে হঠাৎই বুকের কাঁপন থেমে গেলো প্রতাপের। নিজেই বুঝতে পারলো না ও সাহসটা আসছে কোথা থেকে! দাড়িওয়ালা ছেলেটা এই কথা বলার পরে কেমন যেন হাসি পেলো ওর।
মুখ থেকে বেরিয়ে এলো, ” আমি তো ভেবেছিলাম আমিই সবথেকে ভীতু। যে তোদের পাঠিয়েছে তাকে বলিস- আমি বড়জোর মরে যাবো- ও সারা গায়ে কালি নিয়ে মরবে।”
দাড়িওয়ালা ছেলেটার হাতের ঘুসি আছড়ে পড়লো প্রতাপের মুখে। প্রতাপ ছিটকে পড়লো। মুখ দিয়ে রক্ত বেরোচ্ছে। একটা দাঁত বোধহয় পড়ে গেছে৷ ল্যাপটপের ব্যাগটা উধাও।লোকজন ছুটে এলো। তখনি এরা পালিয়ে গেলো। চায়ের দোকানে প্রতাপের চোখেমুখে জল দিয়ে প্রাথমিক সেবাশুশ্রূষার পরে সবাই ওকে ডাক্তারখানায় যেতে বললো। প্রতাপ হাত দেখিয়ে একটা ট্যাক্সি থামিয়ে উঠে পড়লো।
অফিসে ঢোকার মুখে প্রতাপ বুঝতে পারলো ওর মুখ দিয়ে রক্ত বেরোচ্ছে একটু একটু। রুমাল দিয়ে মুখ মুছতে মুছতে ঢুকলো ও। ভেতরে ঢুকতেই দেখে সোমেনদা কয়েকজনের সঙ্গে গল্প করছে।
” কিরে, কি হয়েছে তোর? কোথাও পড়ে গেছিলি নাকি?”
প্রতাপের মনে হলো ওর সামনে হোটেলের সেই আরশোলাটা দাঁড়িয়ে আছে। কোনো উত্তর না দিয়ে বসের কামরায় ঢোকে প্রতাপ। জামা খুলে ভেতর থেকে বের করে ফাইলটা। বস বিস্মিত হয়ে তাকিয়ে থাকে ওর দিকে। তারপরে ওকে জড়িয়ে ধরে বলে, “সাবাশ! এবার দেখবো কে ওকে বাঁচায়! আমি আগেই চেষ্টা করেছিলাম। ধরতে পারিনি। এবার… “।
অফিসের সিকিউরিটির দায়িত্বে থাকা প্রভুকে দিয়ে ওকে পাঠিয়ে দিলো বাড়িতে। অনামিকা প্রথমে একটু ভয় পেয়েছিলো। তারপরে ওষুধ লাগিয়ে দিয়ে ফিকফিক করে হাসতে থাকে। “কি হলো- হাসছো কেন?”
অনামিকা বলে, ” তোমার বাড়ি আর পাড়ার লোকজন তোমায় দেখে অবাক হয়ে গিয়েছে। বলছে- ভীতু ছেলেটা কিসব কান্ড করছে!”
তারপর লাজুক হেসে বলে,” তুমি যখন আরশোলাটাকে মারলে তখনই বুঝতে পেরেছি তুমি মোটেই ভীতু নয়।”
দুহাতে প্রতাপকে জড়িয়ে ধরে বলে, “আমার ছেলে বা মেয়ে যাই হোক- তাকে বাবার সাহসের গল্প শোনাবো। ”
চোখ ঝাপসা হয়ে যায় প্রতাপের। গলার কাছে কিছু একটা যেন দলা পাকিয়ে উঠছে। ওর চোখের সামনে একটা বাচ্চার মুখ ভাসছে। ভীষণ আদর করতে ইচ্ছে করছে।