“সরলতা ও সহজবোধ্যতাকে আমি মহৎ শিল্পের প্রথম শর্ত বলে আদৌ মানি না। সরলতাই যদি মহৎ শিল্পের প্রধান লক্ষন হত, তাহলে Art- এ সমঝদারির কোন প্রয়োজন হত না;”
                                                                                                            – সত্যজিৎ রায়

বিংশ শতাব্দীর একজন অসামান্য প্রতিভার অধিকারী ছিলেন এই মাহান পরিচালক। একধারে তিনি যেমন একজন পরিচালক ঠিক তেমনি তিনি ছিলেন একজন বলিষ্ঠ লেখক। সঙ্গীত পরিচালনায় এবং ছবি আঁকার ক্ষেত্রেও তার পারদর্শিতা অনস্বীকার্য।
এই প্রতিভাবান চলচিত্র পরিচালকের জীবন এবংকাহিনী আজ আমার লেখার বিষয় না, এক কথায় শিল্পের প্রায় সবকটা দিকে ওনার অসীম প্রতিভার বহু নিদর্শন আমাদের জানা আর সে সমস্ত বিষয় নিয়ে যথাযত আলোচনা করতে শুরু করলে খাতার পাতা হয়তো কম পড়ে যাবে। তাই আপাতত সত্যজিৎ রায়ের একটা দিক নিয়েই আমরা দু চারটে কথা আলোচনা করব। মূলত ভারতীয় সিনেমাকে বিশ্ব সিনেমার দরবারে উপস্থাপন করার ক্ষেত্রে এই মানুষটির অবদান অনস্বীকার্য।
বিভূতিভুষন বন্দ্যোপাধ্যায় এর অমর সৃষ্টি ‘পথের পাঁচালি’-র হাত ধরেই এই মহান পরিচালকের চলচ্চিত্র জগতে আগমন। ‘পথের পাঁচালি’ এমন একটি সিনেমা যেখানে প্রত্যেকটি দৃশ্য দেখে মনে হয় যেন হাতে আঁকা ছবি, আর সত্যিইতো, সত্যজিৎ রায় এর প্রত্যেকটা Script এক একটা কাগজে আঁকা ছবির থেকে কম কিছু নয়। সিনেমা জগতে আসার আগে উনি ছবি আঁকতেন, এবং জুনিয়র ভিজুয়ালাইজার হিসেবে একটি ব্রিটিশ কোম্পানী কর্মরত ছিলেন তিনি। পরবর্তীতে অন্য একটি সংস্থার সাথে যুক্ত হয়ে যান তিনি, আর সেখান থেকেই সুযোগ আসে জিম করবেটের লেখা “ম্যান ইটার্স অফ কুমায়ন” এবং পণ্ডিত জহরলাল নেহেরুর লেখা “ডিসকভারি অফ ইন্ডিয়া” বই দুটির প্রচ্ছদ আঁকার।
প্রত্যেকটি পরিচালকের ছবি তৈরী করার পেছনে কোন না কোন অনুপ্রেরণা কাজ করে। আর সত্যজিৎ রায়ের ক্ষেত্রে একটি বিখ্যাত ছবি ‘বাই সাইকেল থিব’ উনাকে ছবি বানানোর অনুপ্রেরণা যোগান দিয়েছিল। আর তার পরবর্তী অধ্যায় যে ভারতবর্ষে সিনেমা জগতে একটি ইতিহাস তৈরি করে সে বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই।
প্রত্যেকটি পরিচালকের কিছু নিজস্বতা থাকে, থেরক্স ব্রেঁসো, তিনি চাইতেন না কোন চরিত্রের মধ্যেযে কোন রকমের আবেগ থাকুক। হাজারবার ওয়ার্কশপ করিয়ে যখন চরিত্রের মধ্যে আবেগ শূন্য থাকত ঠিক তখনি ফাইনাল টেক নেওয়া হত।
ঋত্বিক ঘটকের ক্ষেত্রে পরিচালকের নিজস্ব স্বত্ত্বায় থেকেই অভিনয় করতে হবে।
আর এই জায়গায় দাঁড়িয়ে সত্যজিৎ রায় তার চরিত্রগুলোকে নিজের মতো বাছাই করে তারপর অভিনেতা – অভিনেত্রীরা তাদের মতো চরিত্রের গঠন করত। পরিচালকের দৃষ্টিভঙ্গি এবং অভিনেতা – অভিনেত্রীর দৃষ্টিভঙ্গির সমন্বয়ে একটা পূর্ণাঙ্গ শট তার প্রত্যেকটি ছবিতে দেখা যেত।
একজন চিত্র পরিচালক এবং অন্যদিকে একজন পেইন্টার হিসেবে এই মানুষটি ফিল্ম আর পেন্টিংয়ের পার্থক্যটা খুব সহজে বুঝতেন। চলচ্চিত্র যুগে যুগে নিজের মধ্যে বিবর্তন ঘটিয়েছে, তার ভাষা- তার প্রয়োগ প্রণালী সমস্তই আজ পরিবর্তিত। কিন্তু পেয়েন্টিংয়ের প্রথম যুগ থেকে আজ পর্যন্ত একই ইম্প্রেশনের ভিত্তিতে ছবি চিত্রিত হয়ে চলেছে, সর্বকালের ‘ফরম ডিভাইসে’র কোন পরিবর্তন পেন্টিং-এ সম্ভব নয়।
সত্যজিৎ রায় এর মতে চলচ্চিত্রের সবচাইতে দুরূহ দিক হল শিল্পের মাত্রা ও ভারসাম্য বজায় রাখা। অভিনয়ের রীতি, ক্যামেরার দৃষ্টিভঙ্গী, আলোর তারতম্য, আবহসঙ্গীত ও শব্দের ব্যবহার, শট পরিবর্তনের লয় – এর সবকিছুই একক ও সম্মিলিতভাবে ছবির মাত্রা নির্ণয় করে। এর মধ্যে যে কোন ত্রুটির প্রয়োগ মাত্রা ছাড়িয়ে গেলেই ছবির ভারসাম্য থাকে না।
এই মহান চিত্র পরিচালক সম্পর্কে যা বলব যতো বলব ততই কম বলা হবে, আমারও লেখার একটা গণ্ডী করে দেওয়া হয়েছে তাই খুব বেশী কিছু আর বলতে পারলাম না, ওঁর জীবনী কম বেশী সকলেরই জানা তাই একটু অন্য আঙ্গিকে সত্যজিৎ রায়কে বলার চেষ্টা করলাম মাত্র। শুধু শেষ একটা কথা বলে আমি ইতি টানব;
সত্যজিৎ রায়কে একবার প্রশ্ন করা হয়েছিল, আপনার করা শ্রেষ্ঠ ছবি কোনটি? উত্তরে তিনি জানান, “আমার ছয়টি ছবির মধ্যে ‘পথের পাঁচালী’, ‘অপরাজিত’, ও ‘অপুর সংসার’ কে পরস্পরের সঙ্গে তুলনা করা চলতে পারে। ‘জলসাঘর’, ‘পরশপাথর’ও ‘দেবী’ – এই তিনটি ছবির জাত তিনরকমের এবং পরস্পর কিংবা পূর্বোক্ত তিনটির সঙ্গে তুলনীয় নয়। সর্বাঙ্গীন বিচারে এদের কোনটিকেই আমি সার্থক বলে মনে করি না। ‘পথের পাঁচালী’র দরদ ও কাব্যময়তা, ‘অপরাজিত’-র চরিত্র বিশ্লেষন, ‘অপুর সংসার’ এর ছন্দ ‘দেবী’-র চিত্রভাষা, ‘জলসাঘর’ –এর atmosphere ও ‘পরশপাথর’ এর মৌলিকত্ব – আমার মতে সার্থক।“
নিজের তৈরি করা ছবিগুলো সম্পর্কে এতটা নিখুঁত বিশ্লেষণ হয়তো সত্যজিৎ রায়-এর পক্ষেই সম্ভব।।