কর্মজগতে একজন অন্দরসজ্জাবিদ। অন্দরসজ্জা নিয়ে লেখেন বহু দিন। "বাঙালি বাড়ির অন্দরসজ্জা" নামে একটি বই আছে আনন্দ পাবলিশার্স থেকে। এছাড়াও কবিতা, রম্য রচনা, মজার ছোট গল্প লেখেন। দেব সাহিত্য কুঠির থেকে দুই বাংলার কবিতার একটি বইয়ের সম্পাদনাও করেছেন। বল্টুদা ওঁর লেখা একটি চরিত্র। সমাজে ঘটে যাওয়া অনেক কিছুই বল্টুদা তুলে ধরেন। বিভা পাবলিকেশন "বল্টুদা দি গ্রেট"-এই নামে বই ও বার করেছে। আকাশবানী এফএমের বহুদিনের আর জে। এছাড়াও চ্যানেল ওয়ানে সাহিত্যিক দের নিয়ে একটি আড্ডা "লিকার চা" হোস্ট করেন।

বল্টুদার ট্র্যাভেল এজেন্সি – ৩

দারুণ একটা ডিনার সেরে বেরিয়ে পড়লেন রাস্তায়। বাসে উঠে এবার আরামের ঘুম। গা হেলিয়ে দিয়েছেন যে যার সিটে। রান্নার লোকজন বাসের মেঝেতে বসেই কিছু কাটাকাটি করছিলেন ছুরি দিয়ে। আগামীকাল সকাল সকাল পুরীর হোটেলে পৌঁছেই যাতে তাড়াতাড়ি জলখাবার দিয়ে দিতে পারেন, এসব ব্যপারে রান্না যারা করেন তাদের কোন ভুল হয় না। কিছুক্ষন কাটাকাটির পর এবার আলোটা নিভিয়ে দিয়ে একটু ঝিমিয়ে নেবার প্রস্তুতি তারাও শুরু করলেন। আলোয় ঝলমলে রাত। গাড়ি এগিয়ে চলেছে।

তখন বোধহয় মাঝরাত। হঠাৎ করে গাড়ি গেলো থেমে। কী ব্যাপার? গভীর রাতে ন্যাশনাল হাইওয়ের মত জনশূন্য রাস্তায় গাড়ি থামলে ভয় হয় বই কী। মনের মধ্যে নানান খারাপ চিন্তা আসে। বাসের পর্যটকেরা যে যার মত সাবধান হলেন। কেউ কেউ মানিব্যাগ থেকে টাকা জুতোর মোজার মধ্যে ভরে নিলেন। মেয়েরা একটু আড়াল করে টাকা লুকোলেন। খুলে ফেললেন গয়নাগাটি।  যতটুকু বাঁচানো যায় আর কী।

বল্টুদা বাসের গেটের দিকেই বসে। ঘুম এসে গিয়েছিলো। মাঝরাতে গাড়ি থেমে গেছে দেখে ড্রাইভারের উপর রাগ হলো খুব। যেই ড্রাইভারকে কিছু একটা বলতে যাবেন, দেখলেন সিটে ড্রাইভার নেই। অদ্ভুত ব্যপার। উঁকি দিয়ে বাসের খালাসিকে খোঁজার চেষ্টা করলেন, আরে,সেও নেই। এবার একটু টেনশন হলো বল্টুদার। ঘুম কাটিয়ে জানালা দিয়ে বাইরের দিকে তাকালেন বল্টুদা। আরে…কী আশ্চর্য! ড্রাইভার আর খালাসি মিলে রাস্তা থেকে কী সব কুড়োচ্ছেন। কী এগুলো?

বাস থেকে নেমে পড়লেন বল্টুদা। সঙ্গে আরো কয়েকজন কৌতূহলী জনগণ। অদ্ভুত কাণ্ড, রাস্তায় ছড়িয়ে রয়েছে রাশি রাশি সোনা। পেঁয়াজের গায়ে চাঁদের আলো এসে পড়লে সে যে সোনার মতই লাগে। এবার বল্টুদাও মাঠে নেমে পড়লেন। ডেকে পাঠালেন বৌদিকে।  বৌদির নেতৃত্বে মহিলা বাহিনী প্রস্তুত হলেন, বল্টুদার ডাকে পুরুষ বাহিনী।  শুরু হলো পেঁয়াজ কুড়নোর উৎসব।  প্রায় হাফ কিলোমিটার রাস্তা জুড়ে পেঁয়াজ ছড়িয়ে রয়েছে। দল বেঁধে সবাই পেঁয়াজ কুড়তে শুরু করলেন। কুড়িয়ে নিয়ে এসে জড়ো করা শুরু হলো বাসের মধ্যে। কিছু চটের বস্তা ছিলোই, সেগুলোর মধ্যে ভর্তি হতে থাকলো পেঁয়াজ। এছাড়াও ডেকচি, কড়াই, জাগ, এমনকি ছোট ছোট বাটির মধ্যেও পেঁয়াজ রাখা হতে থাকলো। বল্টুদা ঘোষণা করলেন যেহেতু ট্যুর অপারেটার তিনি–পেঁয়াজের অধিকারও তাঁর। কেউ খুব একটা আপত্তি জানালেন না। বল্টুদা এবার বললেন, পুরীতে গিয়ে পেঁয়াজ উৎসব করবো আমরা। যেমন রান্নার আইটেম সে তো থাকবেই, সঙ্গে পেঁয়াজের নানান আইটেম। পেঁয়াজ পোস্ত, পেঁয়াজি, পেঁয়াজ দিয়ে ডাল, পেঁয়াজ চচ্চড়ি, পেঁয়াজ আঁচার, মাছ হবে পেঁয়াজের সব পিপারেশন দিয়ে, দোঁ-পিঁয়াজা হবে, পেঁয়াজের চাটনি করা যায় কিনা রান্নার ঠাকুরদের সঙ্গে আলোচনা শুরু করলেন। কেউ একজন বলে উঠলো, “কতকাল মুড়ি মাখা খাইনি পেঁয়াজ দিয়ে।” সেটাও হবে জানিয়ে দিলেন বল্টুদা।

রাস্তায় ক্রমাগত গাড়ির লাইন হয়ে গেছে। ন্যাশানাল হাইওয়ে স্তব্ধ। সবাই গাড়ি থেকে নেমে শুরু করে দিয়েছেন পেঁয়াজ কুড়নো। কিছুটা দূরে সাংঘাতিক লড়াই শুরু হয়ে গেছে মানুষের মধ্যে। রাস্তায় কুড়নো পেঁয়াজের লড়াই নিয়ে। প্রায় রক্তারক্তি হয় আর কী। উত্তেজনা ক্রমশ ছড়াচ্ছে। ওদিকে বল্টুদাদের গাড়ি প্রায় পেঁয়াজে ভরে গেছে। বল্টুদা বুঝলেন পরিস্থিতি সুবিধের নয়। সবাইকে ডেকে গাড়ি ছেড়ে দিতে বললেন ড্রাইভারকে।

গাড়ি এগিয়ে চলেছে রাস্তার একটা ধার ঘেঁষে। বাসে বসে থাকা সবাই দেখতে পেলেন শয়ে শয়ে মানুষ তখন রাস্তায় নেমে পেঁয়াজ কুড়চ্ছেন।

(চলবে)