জনক


কমলেশদার মত এমন দিলখোলা প্রাণোচ্ছল হাসি আমি আর কাউকে হাসতে দেখি নি। উদাত্ত, তরঙ্গময় হাস্যরোল শ্রোতার মনকে সংসারের আটপৌরে টানাপোড়েন ভুলিয়ে, নিমেষের মধ্যে ভাসিয়ে নিয়ে যেত আনন্দময় এক তুরীয় স্তরে। আসলে কমলেশদার হাসিতে জাদু ছিল, যেমন ছিল তাঁর ভরাট কণ্ঠস্বরে। গম্ভীর, পুরুষালী, অথচ বচনভঙ্গী প্রায় নারীসুলভ মমতা মাখানো।
এত বছর পরেও স্পষ্ট মনে পড়ে তাঁর সঙ্গে প্রথম সাক্ষাৎ। তখন সবে কলেজে ঢুকেছি। নতুন বন্ধুবান্ধব ক’জন মিলে সমবেত ভাবে পড়ার একটা দল শুরু হল। ভবানীপুরে মনোজের বাড়িতে একটা আলাদা পড়ার ঘর ছিল। সেখানেই ক’জন মিলে জোট বেঁধেছি এক রবিবার সকালে। পাঠ্য বিষয় সুভাষবাবুর ‘ফুল ফুটুক না ফুটুক আজ বসন্ত’। অচিরেই সেটা পরিণত হল ‘ফুল ফুটুক আর না ফুটুক, চল আজ আড্ডা মারি’-তে।
সাহিত্য চর্চা ছেড়ে, চিলে আর্জেন্টিনা ঘুরে, বিদেশ বোসের প্রতিভার বিশ্লেষণ করে, বাংলা সংস্কৃতিতে বলিউডের নৃত্যশীল্পের অপপ্রভাবের সপক্ষে এবং বিপথে ঘোরতর তর্ক জুড়ে, আলোচনার বিষয় চলতে থাকল দিকশূন্য খেয়ালে তরতাজা, কলস্রোতা পাহাড়ী নদীর মত।
চারমিনারের ধোঁয়ায় ঘর নীল। থেকে থেকে মনোজের মা ওঁদের পঞ্চদশবর্ষীয় চাকর সুবলের হাত দিয়ে গরম গরম চা ও নিমকি পাঠিয়ে দিচ্ছেন। সকালবেলায় দাদাবাবুদের আড্ডা দেখে সুবলের আনন্দ যেন ধরে না। অতি উৎসাহ ও তৎপরতার সাথে সিগারেট কিনতে ছুটছে। সোমনাথটা আবার পান খায়। সকাল বেলাতেই তার ১২০ জর্দা দরকার।
ঘরের কোণে একটা গীটার পড়ে ছিল। হঠাৎ তুলে নিয়ে মনোজ টুংটাং করতে লাগল। শঙ্কর কিশোর বয়সে বছর খানেক তবলা শিখেছিল। বুককেস থেকে ওয়েবস্টার ডিকশনারি-টা বার করে, তারই উপর তবলার বোল তুলতে লাগল। অভি ভাল গান গাইত। গীটার ও ডিকশনারি-কাম-তবলার সঙ্গতে গান ধরল – ‘পথ হারাব বলেই এবার পথে নেমেছি’।
গান বেশ জমে গেছে, এমন সময় এক চমকপ্রদ কণ্ঠস্বর শোনা গেল — বাঃ, খাসা গলাখানি তো! কে গাইছে রে?
থমকে, কিঞ্চিৎ অপ্রস্তুত হয়ে আমরা দেখি ধোপদুরস্ত পাঞ্জাবী পায়জামা পরণে ছিপছিপে গৌরবর্ণ এক পুরুষ ঘরে প্রবেশ করেছেন। মনোজ পরিচয় করিয়ে দিল, ওর ভগ্নীপতি, কমলেশ চক্রবর্তী।
প্রথম দর্শনেই তাঁর ব্যক্তিত্বের একটা প্রবল আকর্ষণ অনুভব করেছিলাম। এমন তীক্ষ্ণ, বুদ্ধিদীপ্ত অবয়ব সচরাচর বাঙালিদের মধ্যে দেখা যায় না। টিকালো নাকের তলায় দৃঢ় পুরুষালী চোয়াল, ঠোঁটের কোণে কৌতুকের ছোঁয়া লেগে রয়েছে। প্রশস্ত কপালের উপরিভাগে এক মাথা কালো চুল ব্যাকব্রাশ করে আঁচড়ানো। কিন্তু মুখের প্রধান বৈশিষ্ট তাঁর চোখ দুটি। মোটা কালো শেলের চশমার পিছনে নির্মল আনন্দে ভরপুর হয়ে চকমক করছে।
— বৎস সুবলচন্দ্র, আমার জন্যেও কি এক কাপ চা হবে?
বলে নির্বিকার দেওয়ালে ঠেসান দিয়ে মাটিতে আসনপিঁড়ি হয়ে বসে পড়লেন কমলেশদা। একটা সিগারেট ধরিয়ে হাসতে হাসতে বললেন — আরে গান থামালি কেন? চালা, চালা!
বলার ভঙ্গীতে এমন একটা আন্তরিকতার ছোঁয়া ছিল, যে মন হল মানুষটি কতদিনের পরিচিত। কারুরই একটুও লজ্জা বা দ্বিধাবোধ হল না। আবার জোর কদমে গান শুরু হল। এবার আমরা সকলে গলা মেলালাম।
ঘণ্টাখানেক গান চলার পর যখন একটু বিরতি টানা হল, মাটিতে ওল্টানো কবিতার বইটি তুলে নিয়ে কমলেশদা প্রশ্ন করলেন — কি পড়ছিস রে তোরা? সুভাষবাবু?
এলোমেলো পথ ছেড়ে পূর্ণচক্রাকারে আলোচনা ফিরে এল সেই ‘ফুল ফুটুক না ফুটুক’-এ।
তখন অনুমান করি নি কমলেশদার পাণ্ডিত্যের গভীরতা। আলোচনার ছলে আমাদের প্রত্যেকের মতামত নিচ্ছিলেন তিনি। ইংরেজীতে যাকে ফেসিলিটেশন স্কিলস্ বলে, তার প্রথম নিদর্শন পাই কমলেশদার কাছে সেদিন। নিজের মতামতকে আড়ালে রেখে কি অনায়াসে আলোচনার রাশ টেনে ধরলেন তিনি। ছন্নছাড়া গপ্পো-আড্ডার বদলে একটা গম্ভীর চিন্তাকর্ষক পরিবেশ সৃষ্ট হল অল্পকালেই।
সকলের বক্তব্য পেশ হবার পর কমলেশদা তাঁর নিজস্ব জ্ঞানের ভাণ্ডারটি খুললেন। তার জ্যোতিচ্ছটায় আমরা স্তম্ভিত হয়ে গেলাম। অভিনব দৃষ্টিকোণ দিয়ে কবিতার সারমর্ম বিশ্লেষণ করতে লাগলেন। এরই পরিপেক্ষিতে কাব্যের মূল উদ্দেশ্য রূপসৌন্দর্যের ধ্যান না বাস্তব সত্যের স্বীকৃতি, এই নিয়ে উনবিংশ ও বিংশ শতাব্দীর বিশ্বসাহিত্যের বিভিন্ন মনীষীদের বিতর্কের উপরে মিনিট পনেরো-কুড়ি ধরে একটি সারগর্ভ আলোচনা করলেন। সেই আলোচনার সূত্র ওয়ার্ডসওয়ার্থ, কীটস্, রবীন্দ্রনাথ থেকে শুরু করে এলিওট্, পাউণ্ড, ওয়ালকট, জীবনান্দ, শঙ্খ ঘোষ, সুভাষ মুখোপাধ্যায়, শক্তি চট্টাপাধ্যায়ের কাব্য সব ছুঁয়ে গেল। আমাদের চেতনায় একটা নতুন আলোক, মর্মে একটা নতুন বোধ ফুটে উঠল। আমরা স্তব্ধ হয়ে শুনছিলাম।
মধ্যাহ্ন ভোজের সময় আসরের বিরতি পড়ল। বন্ধুরা একে একে উঠে পড়লাম বাড়ি ফেরার জন্য।
যাবার আগে কমলেশদা বললেন — তোরা সব এত গানবাজনা ভালবাসিস, শনিবার সন্ধ্যাবেলা চলে আয় আমার রসা রোডের বাড়িতে। একটা ছোটখাটো  ঘরোয়া মজলিশ হবে। ওখানেই রাতে খেয়ে নিবি তোরা।
প্রথম আলাপেই তাঁর প্রখর ব্যক্তিত্ব ও গভীর আন্তরিকতায় মুগ্ধ হয়ে বাড়ি ফিরেছিলাম।

শনিবার সন্ধ্যাবেলা আমরা কয়জনে পৌঁছে গেলাম কমলেশদার বাড়ি। ইতিমধ্যে মনোজের কাছে তাঁর বিষয় কিছু জেনেছি। যুক্তরাষ্ট্রের রচেস্টর-এ ডক্টরেট করে, কমলেশদা কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতির অধ্যাপক হয়েছেন বছর তিনেক হল। এরই মধ্যে তাঁর বেশ কয়েকটা গবেষণাপত্র আন্তর্জাতিক অর্থনীতিবিদ মহলে স্বীকৃতি পেয়েছে। গণিত শাস্ত্রেও তাঁর অসামান্য ব্যুৎপত্তি।
বিদেশফেরত অর্থনীতি অধ্যাপকের মুখে বাংলা কাব্যের অভিনব সেদিনকার ব্যাখার কথা ভেবে আমার বিস্ময় বেড়ে গিয়েছিল। ছোট বেলা থেকেই গণিত শাস্ত্রের সঙ্গে, বিশেষ করে অঙ্কের মাস্টারের সাথে, কাব্যরসের ছিটেফোঁটাও সংযোগ খুঁজে পাই নি। কমলেশদাকে দেখলাম এই প্রথম ব্যতিক্রম। ক্রমে জেনেছিলাম তাঁর পাণ্ডিত্যের প্রসার আরও কত বিষয় বিস্তীর্ণ। কিন্তু সবচেয়ে আশ্চর্য হয়েছিলাম তাঁর নিরহঙ্কার, অমায়িক ব্যবহারে। তাতে আত্মম্ভরিতার  লেশমাত্র ছিল না। আমেরিকার বেশ কয়েক বছর কাটানো সত্ত্বেও কোনো কৃত্তিম সাহেবিয়ানাও লক্ষ্য করি নি তাঁর পোশাক-আশাকে বা আচার-ব্যবহারে।
রসা রোডের এদিকটা বেশ পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন। রাস্তার দু’ধারে দোতলা তিনতলা সব বাড়ির মধ্যে কমলেশদার গোলাপী রঙের ছিমছাম দ্বিতল বাড়ি। উপরে পূব আর দক্ষিণ ঘিরে টানা বারান্দা। দেখলাম দোতলার সব জানালা ও বারান্দার  ফ্রেঞ্চ উইন্ডোগুলি খোলা, সান্ধ্য হাওয়াকে সাদরে উন্মুক্ত আমন্ত্রণ জানাচ্ছে। সেদিন লোড-শেডিং হয় নি, প্রতিটি ঘরে আলো জ্বালা। ভিতর থেকে যন্ত্রসঙ্গীতের হাল্কা আওয়াজ ভেসে আসছে।
একতলার ভাড়াটের ফ্ল্যাট পেরিয়ে, সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে গেলাম আমরা। ধবধবে সাদা চুনকাম করা দেওয়ালের মাঝে বার্নিশ করা গাঢ় বাদামী দরজাটি চকচক করছে। দরজার বুকে উজ্জ্বল পিতলের ফলকে বাংলা অক্ষরে লেখা, ‘বন্দনা ও কমলেশ চক্রবর্তী’।
আমরা বেল দিতেই, সতেরো-আঠেরো বছর বয়সের এক ফিটফাট যুবক হাসিমুখে দরজা খুলে আমাদের অভ্যর্থনা করে ভিতরে নিয়ে গেল। সাজগোজের পারিপাট্যে, ব্যবহারের সৌকুমার্যে প্রথমে বুঝতে পারিনি, পরে জানলাম তার পরিচয় — কমলেশদা-বন্দনাদির যৌথ সংসারের অপরিহার্য অবলম্বন, পরিচারক শ্রীমান সহদেব।
কলকাতায় বেশ কয়েকটি ধনী, শিক্ষিত পরিবারে অতিথি হয়েছি। বেশীর ভাগ ক্ষেত্রে দেখেছি ঝকঝকে, তকতকে আসবাবপত্রের সঙ্গে কর্মচারীদের পোশাক-আশাক বেমানান ভাবে ছিন্ন-মলিন। কিছু কিছু ধনাঢ্য গৃহে অবশ্য দেখেছি উর্দিপরা ড্রাইভার আর্দালি, কিন্তু সেই বেশ তাদের গোলামীর প্রতীক হয়েই প্রকটিত হয়। কমলেশদার পরিবারেই বোধহয় একমাত্র দেখেছি মনিব-ভৃত্যের সাজগোজ খাওয়াপরার এমন সাম্য।
ফ্ল্যাটে ঢুকে দেখি অভ্যাগত অতিথিদের সব জুতা জোড়া পড়ে আছে। সহদেব বলল যে মজলিশ কিছুক্ষণ আগে শুরু হয়েছে। তাড়াতাড়ি চটিজুতো খুলে, একটা বড় মাপের লম্বাটে ঘরে প্রবেশ করলাম। দেখে বুঝলাম এটা বসবার ঘর, নিখুঁত ভাবে সাজানো। মজলিশের জন্য দেয়ালের গায়ে সোফাসেট, টেবিল সরিয়ে ঘরের মাঝখানে জায়গা করে মেঝেতে ফরাস পাতা হয়েছে। ফরাসের এক প্রান্তে এক সুদর্শন যুবক সেতারে আলাপ করছেন, পাশে তবলচি চোখ বুঝে মাঝে মাঝে মাথা নাড়ছেন। ফরাসের উপর বসে বেশ কয়েকজন বিশিষ্ট চেহারার লোকজন নিবিষ্ট মনে বাজনা শুনছেন।
একগাল হেসে কমলেশদা ইশারা করলেন বসে পড়ার জন্য। আমরাও তাড়াতাড়ি আসন গ্রহণ করলাম। চন্দনের বাটি হাতে এক সুন্দরী ভদ্রমহিলা আমাদের কপালে ফোঁটা দিয়ে গেলেন।
মনোজের মাথায় আলতো করে চাঁটি মেরে ফিসফিস করে বললেন — এই তোরা দেরী করলি কেন?
বুঝলাম ইনিই বন্দনাদি। চেহারার আভিজাত্য, ব্যবহারের মাধুর্যে সত্যিই কমলেশদার সুযোগ্যা। মনোজের কাছে পরে শুনেছিলাম যে কোনো এক বিখ্যাত সিগারেট কোম্পানির প্রতিযোগিতায় কমলেশদা-বন্দনাদি রাজযোটক দম্পতি হিসাবে নির্বাচত হয়ে প্রথম পুরস্কার পেয়েছিলেন।
সেতারবাদকের হাতটি ভারি মিষ্টি। ইমনের আলাপ, জোড় শেষ করে, মধ্যলয়ে তিনতালে গৎ ধরলেন। তখন সঙ্গীতশাস্ত্রের কিছুই জানতাম না, তবে তানগুলি শুনে মোহিত হয়েছিলাম। ঘণ্টা দুয়েক বাজনার পর মজলিশ সমাপ্ত হল। সকলে চমৎকৃত। উচ্চাঙ্গসঙ্গীতের সঙ্গে আমার এই প্রথম পরিচয়, তবুও মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে শুনেছিলাম। আসলে সেই মজলিশে শিল্পী, শ্রোতা, ও পারিপার্শ্বিক বাতাবরণের এমন পূর্ণাঙ্গ সমাগম আজ তো অতিবিরল, সেদিনও সহজলভ্য ছিল না।
বাজনা শেষে কমলেশদা লাফিয়ে উঠে সেতারবাদককে বুকে জড়িয়ে ধরলেন। দৃপ্তকণ্ঠে সভামধ্যে ঘোষণা করলেন — সাধু! সাধু! কি বাজালে ভাই! লেগে থাকো। তুমি শিগগিরই একজন সেরা শিল্পী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে।
এর কয়েক বছরের মধ্যে যখন ঐ তরুণ সুশীলেশ চট্টোপাধ্যায় বিশ্বের প্রথম সারির সেতারবাদকদের তালিকায় স্থান পায়, তখন সেদিনের ঐ ঘরোয়া অনুষ্ঠানে কমলেশদার ভবিষ্যদ্বাণীর কথা মনে পড়েছিল।
মজলিশ শেষ হলে বন্দনাদি আমাদের যত্ন করে পেট ভরিয়ে খাওয়ালেন। চমৎকার হাতের রান্না! ফার্স্ট ইয়ার কলেজ ছাত্রদের বিশ্বব্যাপী ধর্ম অনুযায়ী আমরা রাক্ষসের মত খেয়ে বাড়ি ফিরলাম।
এর পর থেকে প্রায়সই কমলেশদার বাড়ি যাতায়াত শুরু করলাম। প্রত্যেক মাসে কোনো না কোনো অনুষ্ঠান লেগে থাকত সেখানে — কখনও সঙ্গীত, কখনও কবিতাপাঠ বা শ্রুতিনাট্য, কখনও বা আলোচনা। প্রফেসর লাল, সন্তোষবাবু, স্বয়ং সুভাষ মুখোপাধ্যায়, কত না বিশিষ্ট ব্যক্তিদের যোগদান করতে দেখেছি তাঁর আসরে, আবার আমাদের মত কত নবোদ্ভিন্ন শ্মশ্রুমণ্ডিত যুবককে। একটা ব্যাপার বিশেষ ভাবে খেয়াল করেছিলাম — কমলেশদা প্রতিবারই অনুষ্ঠানসূচী আমন্ত্রিতদের আগেভাগে জানিয়ে রাখতেন, এবং সেদিন শুধু সেই বিষয়ই চর্চা হত। আজ বুঝতে পারি কমলেশদা কমলেশদা কত প্রযত্ন নিয়ে আমাদের চেতনাবোধকে গড়ে তুলতে প্রয়াস করেছিলেন। কিন্তু এত সূক্ষ্ম ও অকৃত্তিম ভাবে সেটা করতেন যে তখন আমাদের চোখে পড়ত না।
ক্রমে ক্রমে মানুষটিকে আরও ভাল করে জানতে পারলাম। কমলেশদা সাম্যবাদে বিশ্বাস করতেন। তিনি ছিলেন নিরীশ্বরবাদী, ধর্মের আড়ম্বরকে মানতেন না। সাম্যবাদের সঞ্জীবনী মন্ত্র, চণ্ডীদাসের চিরন্তন সেই তত্ত্ব তাঁর চিদাকাশে অম্লান অক্ষরে লেখা ছিল — ‘সবার উপরে মানুষ সত্য, তাহার উপরে নাই’। এবং এই দর্শন তিনি তাঁর জীবনের প্রতি ক্ষেত্রেই প্রয়োগ করতে সচেষ্ট ছিলেন।
কিন্তু এই দুনিয়ায় তো একটানা সৌভাগ্য ভোগ কাহারও কপালে লেখা থাকে না। এই ছোট্ট সুন্দর পরিবারটিতে অকস্মাৎ নেমে এল নির্মম বজ্রাঘাত! মাত্র তিন দিনের জ্বরে ভুগে, প্রবল মেনিনজাইটিসে প্রাণ হারাল কমলেশদার একমাত্র সন্তান, বন্দনাদির চোখের মণি, তিন বছরের বুবুল।

এত বড় ধাক্কাটা কমলেশদা নীরবে সহ্য করে নিলেন। এক ফোঁটা চোখের জলও কেউ ফেলতে দেখল না। বন্দনাদি কিন্তু পুরোপুরি ভেঙে পড়লেন। সৎকারের সময় মৃত শিশুর মরদেহ বুকে চেপে রইলেন। কিছুতেই কাউকে কাছে আসতে দিচ্ছেন না। পাগলের মত এক নাগাড়ে বলে যাচ্ছেন — বুবুল ঘুমোচ্ছে, ওকে তুলো না!
সেই সময় কমলেশদার যে সংযত রূপ আমি দেখেছি, তা ভোলবার নয়। অতি শান্ত ভাবে অথচ দৃঢ়তার সঙ্গে পুত্রের শবদেহখানি ক্রন্দরতা স্ত্রীর কবল থেকে মুক্ত করে আনলেন। তাঁর বুকের ভিতর কতটা তোলপাড় হচ্ছে কেউ টের পেল না। বোধহয় বন্দনাদির শোকবিহ্বলা অবস্থা দেখে বুঝেছিলেন যে তাঁকে নিজে শক্ত হতে হবে, ভেঙে পড়লে চলবে না। তাঁর সমস্ত নজর গিয়ে পড়ল বন্দনাদিকে সুস্থ করে তোলার প্রয়াসে।
তাঁর গৃহে বহু বছরের প্রচলিত মাসিক সাংস্কৃতিক আসর বন্ধ হল এবার। আমরা ততদিনে ইউনিভার্সিটি পাস করে গেছি। এক এক করে বন্ধুরা সকলেই কাজে ঢুকে গেছে। কেউ কেউ আবার মনোজের মত উচ্চশিক্ষা লাভ করতে বিদেশে পাড়ি দিয়েছে। আমিও একটা সেলস্ এর চাকরি পেয়ে শিলিগুড়ি চলে গেলাম।বছর পাঁচেক ধরে কমলেশদাদের সঙ্গে যে ঘনিষ্ঠতা গড়ে উঠেছিল, নানান কাজের চাপে তা অনেকটা শিথিল হয়ে গেল। গোড়ায় গোড়ায় পত্র বিনিময় হত। কিন্তু সেলস্এর ঘোরাঘুরির চাপে চিঠি লেখাও ধীরে ধীরে বন্ধ হল।
মাঝে মাঝে সোমনাথের কাছে খবর পেতাম কমলেশদার। ওনার জীবনে আর একটি ঝড় বয়ে গেল। ভগ্নহৃদয় বন্দনাদির মস্তিষ্কের গণ্ডগোল বেড়েই চলেছে। এক দুপুরে, কমলেশদা যখন কাজে গেছেন, বন্দনাদি নিজের গায়ে কেরোসিন ঢেলে কাপড়ে আগুন লাগিয়ে দেন। মরণোন্মুখ মানুষটির আর্তনাদ শুনে প্রতিবেশীরা দরজা ভেঙে ফ্ল্যাটে ঢোকার আগেই, তাঁর ইহলীলা সমাপ্ত হয়ে গেল।
কমলেশদার সুন্দর সংসারখানি এভাবে ছারখার হয়ে গেল শুনে মর্মাহত হয়েছিলাম। তবে শিলিগুড়ি থেকে চিঠি লিখে কীই বা সান্ত্বনা দেব? একবার মনে হয়েছিল ছুটি নিয়ে তাঁর সঙ্গে দেখা করে আসি। কিন্তু একটা আড়ষ্টতার ভাব চেপে ধরল। যাঁর স্নেহময় সান্নিধ্যে এত বছর কত আনন্দ পেয়েছি, তাঁর এই শোকার্ত অবস্থা দেখতে মন সায় দিল না। তায় আবার নিজে সবে বিয়ে-থা করেছি — কমলেশদার সংসারের ধ্বংসাবশেষ দেখার আগ্রহ হল না।
সোমনাথের চিঠি থেকে জানলাম যে বন্দনাদির মৃত্যুতেও বাহ্যিক দৃষ্টিতে কমলেশদা ভেঙে পড়েন নি। কেবল মাস কয়েক অসম্ভব চুপ হয়ে গিয়েছিলেন। তারপর একদিন হঠাৎ বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনার অমন সম্মানার্হ কাজটি ছেড়ে দিয়ে, দক্ষিণ কলকাতার এক প্রাইভেট স্কুলে ক্লাস সিক্সের ছাত্রদের পড়ানোর চাকরি নিলেন।
সোমনাথকে বলেছিলেন — আমার আর সংসার করার ইচ্ছে নেই। বাকি জীবনটা সমাজের জন্য কিছু করতে চাই। বুঝলি সোমনাথ, আমাদের দেশে এখন সর্বাপেক্ষা প্রয়োজন উজ্জ্বল সচ্চরিত্র নাগরিকদের। আর তারা শুধু পরবর্তী প্রজন্ম থেকেই আসবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের চেতনাবোধ তৈরী হয়ে গিয়েছে। তাদের অর্থকরী বিদ্যা শেখানো যায়, কিন্তু কোনো মহৎ আদর্শে গড়ে তোলা যায় না। তাই ঠিক করেছি স্কুলের ছাত্রদেরই পড়াব। যদি একটিও ভাল ছাত্র তৈরী করতে পারি, তবুও জানব সমাজের জন্য কিছু একটু করে গেলাম, জীবনটা সম্পূর্ণ ব্যার্থ হল না।
এই ভাবে দশটি বছর কেটে গেল। এর মধ্যে কমলেশদার সঙ্গে একবার মাত্র দেখা হয়েছিল, তাও প্রায় বছর আষ্টেক আগে সোমনাথের বিয়েতে। ১৯৯২ সালের শেষের দিকে শিলিগুড়ির পাট চুকিয়ে, কলকাতায় আবার ফিরে এসেছি কোম্পানীর কেন্দ্রীয় অফিসে বদলি হয়ে। বহু বছর পর ডোভার লেন মিউজিক কন্ফারেন্স দেখার সুবর্ণ সুযোগটাকে হাতছাড়া হতে না দিয়ে, কিনে ফেললাম একটা সীজন টিকিট। ঢাকুরিয়া লেকের ধারে নতুন নজরুল মঞ্চটিতে অনুষ্ঠানের সুন্দর আয়োজন করা হয়েছে। প্রথম রাতে ছিল পণ্ডিত য়শরাজের গান। বছর পনের আগে যাঁকে প্রাণবন্ত মাঝবয়সী শিল্পীর রূপে দেখেছি, আজ তাঁর মস্তকে রূপালী রেখার প্রাধান্য দেখে হঠাৎ মনে হল নিজের বয়সটাও কত বেড়ে গেছে। এতগুলি বছর কোথা দিয়ে কেটে গেল? কিন্তু পণ্ডিতজীর কণ্ঠের মাধুর্য, শিল্পের দক্ষতা যেন আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। বড় চমৎকার বসন্ত রাগ গাইলেন।
বিরতির সময় বেরিয়ে এক ভাঁড় চা কিনে সবে চুমুক দিয়েছি, এমন সময় শুনতে পেলাম সেই বহু পরিচিত কণ্ঠস্বর — আরে আরে শালাবাবু! কি খবর তোর?
চমকে উঠে ঘাড় ঘুরিয়ে দেখি সহাস্য কমলেশদা। মনোজ তাঁর শ্যালক বলে, ওর বন্ধুদের তিনি কৌতুক করে ‘শালাবাবু’ বলেই সম্বোধন করতেন।
চেহারায় সামান্য প্রৌঢ়ত্বের ছাপ পড়েছে কমলেশদার। চুলগুলি কাঁচাপাকা, কপালের বলিরেখা আরও গাঢ় হয়েছে। তবে শরীর এখনও মেদহীন ছিপছিপে, ঠোঁটের কোণে এখনও সেই কৌতুকভরা হাসি, চোখদুটি ঠিক সেই আগেকার মতই উজ্জ্বল।
এতদিন পরে তাঁকে এমন আচমকা দেখে, ভারি আনন্দ হল। চায়ের ভাঁড়টি ফেলে দিয়ে, ঢিপ করে একটা প্রণাম করে নিলাম।
— আ হা হা, পাবলিক প্লেসে পা ছুঁয়ে প্রণাম করছিস কি!
বলে কমলেশদা জড়িয়ে ধরলেন।
— চ’ ফিশ্ কাটলেট খাবি চ’!
কে বলবে সুদীর্ঘ দশ বছর তাঁর সঙ্গে দেখাসাক্ষাৎ হয় নি। মনে হল যেন এই গতকাল তাঁর বাড়ি গিয়েছিলাম। কলেজ জীবনের সেই আনন্দময় স্মৃতিগুলি হঠাৎ উড়ে এসে মনটাকে আপ্লুত করে দিল।
— ঐ যে ছোট স্টলটি দেখছিস, ঐখানে অনবদ্য ফিশ কাটলেট ভাজছে। চ’ তোকে খাওয়াই। এই দীপু তাড়াতাড়ি পা চালা, গান আবার শুরু হয়ে যাবে।
এতক্ষণে খেয়াল করলাম যে কমলেশদা বছর দশ-বারো বয়সের এক বালকের হাত ধরে আছেন। ছেলেটির মুখ গোলচে ধরণের, রং বেশ কালো, মাথার চুলগুলি খোঁচা খোঁচা। কপালের বাঁ দিকে ভুরুর পাশে ছোট আঁচিল। ছেলেটির চোখের দৃষ্টি একটু ট্যারা হলেও অসাধারণ তীক্ষ্ণ ও সজাগ। দেখলেই অনুমান করা যায় একটু ডানপিটে, জেদী ধরণের কিন্তু খুব ধীসম্পন্ন। ফিশ কাটলেটের নাম শুনে তার চোখ দুটি আনন্দে চকচক করে উঠল।
কৌতুহল না চাপতে পেরে জিজ্ঞেস করলাম — এটি আবার কে?
— আরে দেখ কাণ্ড, ভুলেই গেছি যে! ইনি হলেন আমার প্রাইভেট ছাত্র, মাস্টার দীপেন পাড়ুই। এই দীপু তোকে মান্তুদার কথা বলেছি না? ইনিই সেই মান্তুদা।
বেশ সপ্রতিভ ভাবে ছেলেটি হাত বাড়িয়ে হ্যান্ডশেক করে বলল — হাও ডু ইউ ডু? আপনার কথা স্যারের কাছে শুনেছি।
— খুব ভাল লাগল তোমার সঙ্গে আলাপ হয়ে। তা তোমার বুঝি ধ্রুপদী সঙ্গীত ভাল লাগে? প্রশ্ন করলাম আমি।
— হ্যাঁ। মা বাবার কাছে অনুমতি নিয়ে স্যার সঙ্গে করে এনেছেন, মাথা নেড়ে বলল দীপু।
— শুধু সঙ্গীতানুষ্ঠান কেন, মিউজিয়াম, চিড়িয়াখানা আরও অনেক জায়গায় নিয়ে গেছি আমার সঙ্গে।
জীবনের অনুপম অনুভূতিগুলির মধ্যে শীতকালের রাত একটার সময় মুক্ত আকাশের তলায় দাঁড়িয়ে ধোঁয়া ওঠা গরম গরম ফিশ কাটলেট খাওয়ার অভিজ্ঞতা নিঃসন্দেহে অন্যতম। যিনি খেয়েছেন, তিনিই জানেন। ছোট্ট দীপুর সোৎসাহে কাটলেট খাওয়া দেখে বড়ই তৃপ্তি পাচ্ছিলাম। তার উপরে কমলেশদার সঙ্গে এতদিন পর দেখা। মনটা এক নির্মল আনন্দে ভরপুর হয়ে উঠল। কিন্তু বিরতির সময় শেষ হয়ে এসেছে, সঙ্গীতানুষ্ঠান আবার শুরু হবে। সীটে ফেরার আগে, কমলেশদা অবশ্য করে শীঘ্র যেতে বললেন তাঁর বাড়িতে।

কয়েকদিন পর আবার পা ফেললাম কমলেশদার ফ্ল্যাটে।
— আরে মান্তুদাদাবাবু! আসুন আসুন, সহদেব দরজা খুলে এক মুখ বিস্ময় নিয়ে বসবার ঘরে নিয়ে বসাল।
ফ্ল্যাটটা পরিস্কার পরিচ্ছন্ন রেখেছে। তবে গৃহিণীবিহীন সংসারে কিসের যেন এক সূক্ষ্ম অভাব থেকে যায়, বন্দনাদির সেই নিজস্ব ছোঁয়াটুকু নেই। অথচ তাঁর স্মৃতি তো ওতপ্রোত ভাবে এই ফ্ল্যাটের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। সোফার মুখোমুখি দেওয়ালে একটা বড় ছবি, বুবুল কোলে সহাস্য বন্দনাদি। মনে হচ্ছিল ছবিটা যেন জীবন্ত। হঠাৎ সেই আগেকার সুন্দর দিনগুলির কথা মনে পড়ে গলার কাছটা টনটন করে উঠল।
কমলেশদা স্নান করছিলেন। মিনিট পাঁচেকের মধ্যে সাদা কুর্তা পায়জামা পরে বেরিয়ে এলেন। সহদেব আমাদের চা ও ডিমের ওমলেট দিয়ে গেল।
এতো বছর কোনো খবর নিইনি বলে একটু অপ্রস্তুত লাগছিল। কিন্তু কমলেশদা নিমেষে আমার ইতস্তত ভাব কাটিয়ে দিলেন। কোনো রকম অভাব অভিযোগ না জানিয়ে সোজা গল্প জুড়ে দিলেন।
তাঁর মুখে শুনলাম যে বন্দনাদি ওইভাবে চলে যাওয়ায় সাঙ্ঘাতিক মানসিক ধাক্কা পেয়েছিলেন। কিন্তু কাউকে সেটা প্রকাশ করেননি। শুধু বছরখানেক নিজেকে খুব গুটিয়ে রেখেছিলেন। তারপর একদিন ঠিক করলেন নতুন করে আবার জীবন শুরু করবেন।বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপনার চাকরিটি ছেড়ে দিয়ে স্কুল টিচারের কাজ নিলেন। তার সাথে প্রাইভেট টিউশনও  শুরু করলেন।ছোটো ছেলেমেয়েদের পড়িয়ে তাঁর অন্তরের অশান্তিটা কমতে লাগল।
— দ্বিতীয়বার বিয়ে করার কোনো ইচ্ছে হয় না রে। ছাত্রছাত্রীদের পড়িয়ে বেশ দিন কেটে যায়। ঘরের কাজ সহদেবের দায়িত্বে থাকে। তবে ওর নিজের সংসার হয়েছে বলে, রাত্রে নিজের বাসায় চলে যায়।
নিঝুম নিশীথে একা কমলেশদা কি করে নিছক্কা এই ফ্ল্যাটটিতে তাঁর হারানো সংসারের স্মৃতির ভার নিয়ে কাটান, ভেবে গা ছমছম করে উঠল। কিন্তু কিছু বললাম না।
আশ্চর্য্য হয়ে দেখছিলাম যে কমলেশদার সেই অফুরন্ত প্রাণশক্তি বিন্দুমাত্র হ্রাস পায়নি। বরঞ্চ যখন ছাত্রছাত্রীদের কথা বলছিলেন এক দীপ্ত আনন্দে তাঁর চোখ মুখ উদ্ভাসিত হচ্ছিল। বিশেষ করে যখন দীপুর কথা বলছিলেন।
— এত বছর কত ছেলেমেয়ে পড়ালাম বুঝলি, দীপুর মত এমন মেধা কারুর দেখলাম না। সব ব্যাপারে জানতে চায়, প্রশ্ন করে, তর্ক করে। আবার প্রখর স্মৃতিশক্তি, একবার কোনো কিছু পড়লে ভোলে না। দু:খের বিষয়টা কি জানিস, বেশীর ভাগ লোকে ওর বহুমুখী প্রতিভাটা টের পায়না। তাই জন্য তো ওর বাবা মা আমার কাছে প্রাইভেট টিউশনের জন্য দিলেন। স্কুলের টিচার তো দুরন্ত ছেলে বলে ঘোষণা করে বলেছিল ওর লেখাপড়া হবে না। আমি দেখলাম ওর বুদ্ধি এত চটপটে যে সাধারণ ছেলেদের গতিতে পড়লে ওর কৌতুহল হারিয়ে যায়, ও অন্যমনস্ক হয়ে পড়ে। এ সব ছাত্রদের বিশেষ নজর না দিলে বিগড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। তাই আমি ওকে বাড়িতে অনেক উঁচু স্তরে পড়াই। ওর উপর আমি বেশী করে সময় দি। বিশ্বাস করবি আমার কাছে পড়ার পর সব সাব্জেক্টে ফুল মার্কস পাচ্ছে? ওর বাবা মাও খুব খুশী। ওকে যদি ঠিক মত গাইড করতে পারি, দেখবি ও একদিন দেশের মুখ উজ্জ্বল করবে।
আগে বহুবার দেখেছি যে মানুষের সুপ্ত গুণ আবিষ্কার করতে কমলেশদার কখনো ভুল হয়নি।তাঁর ভবিষ্যদ্বাণী অভ্যর্থ হয়ে ফলত।ছোট্ট দীপুর প্রতিভার কথা শুনে বড়ই আনন্দ হচ্ছিল।
কমলেশদা বললেন — এই মান্তু, কতকাল তোদের খাওয়াইনি। এক কাজ করা যাক, সামনের সপ্তাহে দীপুর জন্মদিন।ওকে বলেছিলাম একদিন রেস্তরাঁয় খাওয়াব। তোর গিন্নীকে নিয়ে তুই চলে আসবি, আলাপটা হয়ে যাবে? সোমনাথদেরও বলি- অনেকদিন পর সবাই মিলে গল্প হবে।
যেমন বলা তেমন কাজ। তৎক্ষণাৎ দীপুর মা ও সোমনাথকে ফোন করে ফেললেন। ঠিক হল পরের রবিবার গ্র্যান্ড হোটেলে লা রোতিসরিতে খাওয়াবেন।
— রোতিসরি! সে তো সাঙ্ঘাতিক দাম! আঁতকে উঠি আমি।
কিন্তু আমার ওজর আপত্তিতে কোনো কান দিলেন না কমলেশদা। বললেন — দেখ, দীপুকে ফরাসি বিপ্লবের বিষয় পড়াতে পড়াতে বলেছিলাম যে ফরাসি কালচারও এটিকেট  জানতে হলে ফরাসি রান্নার সঙ্গে পরিচয় অতি আবশ্যক। ও শিখবেও, আমরাও আনন্দ করব। আর কার জন্যই বা পয়সা জমাবো?
এরপরে আমার আর আপত্তি টিকল না। পরের রবিবার সস্ত্রীক গ্র্যান্ড হোটেলে উপস্থিত হব কথা দিয়ে উঠে পড়লাম সেদিন।

নির্দিষ্ট তারিখে সন্ধ্যা সাতটা নাগাদ গ্র্যান্ড হোটেলের লবিতে জড়ো হওয়ার কথা। আমার স্ত্রী মুনমুনকে নিয়ে হোটেলে পৌঁছে দেখি কমলেশদা ও দীপু উপস্থিত। সুন্দর একটা স্যুট পরে কমলেশদাকে দুর্দান্ত দেখাচ্ছে। দীপু ও ওর স্কুলের ব্লেজার ও টাই পরে এসেছে, ভারী মজার দেখাচ্ছে তাকে। কমলেশদার সঙ্গে মুনমুনের আলাপ করাতে করাতেই সোমনাথ ও তার স্ত্রী অনুরাধা হাজির। সবাই মিলে রেস্তরাঁর দিকে পা বাড়ালাম।
কমলেশদা আগে থেকেই রিজার্ভেশন করে রেখেছিলেন। আলো আঁধারি রেস্তরাঁটি নিঁখুত এবং সুরুচিপন্ন ভাবে সাজানো। প্রতিটি টেবিলে মৃদু মোমবাতির আলো জ্বলছে। সদ্য ঝরা তুষারপাতের মত টেবিল কভার, ন্যাপকিনগুলি ধবধব করছে। ক্রকারী, কাট্লারী দেখেই বোঝা যাচ্ছে অত্যন্ত মূল্যবান। একে একে সবাই বসে পড়লাম টেবিলে।স্টুয়ার্ড এসে অর্ডার নিয়ে গেল। কোথা থেকে হাল্কা পিয়ানোর আওয়াজ ভেসে আসছে। এমন দামী রেস্তরাঁয় আগে কখনো খাইনি। মুনমুনের সঙ্গে চোখ চাওয়াচাওয়ি হতে বুঝলাম ওরও আমার মত অস্বস্তি হচ্ছে।
কমলেশদা কিন্তু সেই পূর্বেকার মত উৎফুল্ল। চোখ মুখ দিয়ে প্রশান্ত এক দীপ্তি বিচ্ছুরিত হচ্ছে। অতি আন্তরিকতার সঙ্গে সকলের খাওয়া দাওয়ার তদারকি করছেন। ফরাসি রান্নার পদ্ধতি, খাওয়ার আদব-কায়দা, ফরাসি কৃষ্টির সঙ্গে তাদের খাদ্যের সম্বন্ধ, সুন্দরভাবে বিশ্লেষণ করছেন।
ওনার ডান পাশে বসে দীপু আনন্দে খাচ্ছে। লক্ষ্য করলাম যে গল্প আলোচনার মধ্যে কমলেশদা ঠিক নজর রেখেছেন তাঁর ছাত্রের উপর। ছুরি-কাঁটা কি ভাবে ব্যবহার করতে হবে, চামচ দিয়ে কি ভাবে স্যুপ তুলতে হবে, কোন ছুরি দিয়ে পাঁউরুটিতে মাখন মাখাতে হবে, দীপুকে সব দেখিয়ে দিচ্ছেন। যেন এক অভিনব টেবিল ম্যানার্সের ক্লাস! স্বস্তির একটা গোপন নিশ্বাস ফেলে দীপুর দেখাদেখি আমরাও শিখে নিলাম।
তিন দফায় অতিশয় সুস্বাদু ডিনারের পর কমলেশদা একটা সুন্দর চমক দিলেন। আগে থাকতে বোধহয় বলা ছিল। ইশারা পেয়ে ওয়েটার একটি সুন্দর কেক নিয়ে এল। তাতে এগারোটা মোমবাতি জ্বলছে। কেকের উপর লেখা ‘হ্যাপী বার্থডে দীপু’।
আমরা সকলেই অবাক। দীপুর আনন্দ যেন ধরে না। সকলে গান গাওয়ার পর মনের হরষে কেক কেটে দীপু ফুঁ দিয়ে মোমবাতিগুলো নিবিয়ে দিল।
ছাত্রের প্রতি কমলেশদার এই অকৃত্রিম স্নেহ আমরা অভিভূত না হয়ে পারলাম না। বাড়ি ফেরার পথে মুনমুন বলল  — এতদিনে একজন মানুষের মত মানুষ দেখলাম।
এইভাবেই আবার কমলেশদার বাড়ি যাতায়াত শুরু হল। মাঝে মধ্যে যাই, কিছুক্ষণ গল্পসল্প করে চলে আসি।
কমলেশদাও আমাদের বাসায় মাঝে মাঝে আসেন। তাঁর মুখে শুনি দীপুর ক্লাসে ফার্স্ট হওয়ার কথা। তাঁর মত আমরাও ছেলেটির মায়ায় পড়ে গেলাম।
কিন্তু কমলেশদার কপালে বোধহয় নিরবিচ্ছন্ন সুখ লেখা ছিল না। আবার একটি নিদারুণ চোট খেলেন।আমি তখন কলকাতায় ছিলাম না। দিন সাতেকের জন্য দিল্লিতে কাজে গেছি। বাড়ি ফিরে দেখি সোমনাথ গম্ভীর মুখে বসে আছে। খবর দিল যে এর মধ্যে কমলেশদার বড় রকমের সেরিব্রাল অ্যাটাক হয়েছে, একটা দিক পুরো প্যারালিসিস হয়ে গেছে। তখনই সোমনাথকে নিয়ে ছুটলাম কমলেশদার বাড়ি।
পথে সোমনাথের মুখে শুনলাম মর্মান্তিক কাহিনী। দীপুর ছোটো কাকা বহু বছর আমেরিকায় রিসার্চ করে, মাস খানেক হল দেশে ফিরেছেন।দীপুর প্রতি কমলেশদার প্রবল মনোযোগ তিনি ভালো চোখে দেখলেন না।ভারতবর্ষের পরম্পরাগত গুরুশিষ্যের সম্পর্কের পবিত্র বন্ধনের কথা তাঁর মাথায় খেলল না। বোধহয় আজকের সর্বগ্রাহী পাশ্চাত্য অপসংস্কৃতি কোনো সম্পর্ককেই স্বার্থহীন ভাবে দেখতে পারে না। আমেরিকায় তখন মাইকেল জ্যাকসনের একটি বালকের উপর অনুরাগ নিয়ে প্রচুর কেচ্ছা চলছে। দাদাবৌদির কাছে দীপুর কাকা, কোনো রকম তদন্ত না করেই কমলেশদার বিষয় ঐ ধরনের কুৎসিত ইঙ্গিত করেন। এইসব মন্তব্যে ঘাবড়ে গিয়ে দীপুর বাবা কমলেশদাকে টিউশনির কাজ থেকে ইস্তফা দিলেন।
চুড়ান্ত অপমানে, রাগে কাঁপতে কাঁপতে কমলেশদা বাড়ি ফিরে আসেন। সেই রাত্রেই তাঁর স্ট্রোক হয়। পরের দিন অনেক ডাকাডাকিতে সারা না পেয়ে সহদেব দরজা ভেঙে দেখে কমলেশদার অসার দেহ পড়ে আছে। বুদ্ধি করে সহদেব সোমনাথকে খবর দেয় ও সোমনাথ ভাগ্যক্রমে তাড়াতাড়ি ডাক্তার নিয়ে আসে।
এ যাত্রায় প্রাণে বেঁচে গেলেন কমলেশদা। জ্ঞান, বাকশক্তি ফিরে এসেছে, তবে একটা দিক সম্পূর্ণ অকেজো হয়ে গেছে। পুরোপুরি সুস্থ হবেন বলে ডাক্তারবাবু বিশেষ আশাবাদী নন।তিনি বললেন — এখন কিছুই বলা যাবে না। আবার অ্যাটাক হবার সম্ভবনা আছে। এ অবস্থায় আপাততঃ বাড়িতেই রেখে শুশ্রুষা করুন।
সোমনাথ একটি নার্সের ব্যবস্থা করেছে।
সোমনাথের মুখে এই খবর পেয়ে প্রচণ্ড মুষড়ে পড়লাম। ইতিমধ্যে আমরা কমলেশদার বাড়ি পৌঁছে গেছি। সন্ধ্যে নেমে এসেছে, আকাশ জুড়ে মেঘ। লোডশেডিংয়ের উপদ্রব ইদানীং বড় বেড়েছে, তাই সারা পাড়া নিঝুম। সোমনাথের পকেটে টর্চ ছিল, সাবধানে আমরা দুজনে উপরে উঠে গেলাম।
দরজায় টোকা দিতে সহদেব বিষণ্ণ মুখে দরজা খুলে দিল।চোখের দৃষ্টি উদ্বিগ্ন। বসবার ঘরেই একটা জলচৌকিতে কমলেশদাকে শোওয়ানো হয়েছে।বৃষ্টির দরুণ জানলাগুলি বন্ধ। মাথার কাছে টেবিলের উপর কেরোসিনের একটি ল্যাম্প টিমটিম ম করে জ্বলছে।
এই কদিনে কি সাংঘাতিক পরিবর্তন তাঁর চেহারায়! শরীরটা শুকিয়ে বিছানার সঙ্গে প্রায় মিশে গেছে।মুখময় খোঁচাখোঁচা দাড়ি, চোখদুটি কোটরাগত।কেরোসিনের ঢিমে আলোয় মনে হচ্ছে সারা মুখে কে যেন কালি ঢেলে দিয়েছে।
আমাদের দেখে মৃদু হেসে কমলেশদা ক্ষীণ কন্ঠে বললেন — এসেছিস? আয় বোস্।
কথাগুলি সামান্য জড়ানো, কিন্তু এতো অসুস্থ অবস্থাতেও মমতা ভরা।সন্তর্পণে কমলেশদার পাশে বসে আস্তে আস্তে পায়ে হাত বুলোতে লাগলাম।
মিনিট পাঁচেক নি:শব্দে বসে আছি, এমন সময় কমলেশদা কাতর গলায় বললেন — একটা অনুরোধ, তোরা রাখতে পারবি?
— নিশ্চয় পারব! কি অনুরোধ বল?
— বল ঠিক রাখবি? আবার বললেন কমলেশদা।
— বল-ই না কি করতে হবে? জোর গলায় বললাম।
অদ্ভুত একটা হাসি হেসে কমলেশদা বললেন — আমার তো সময় হয়ে এলো। যেমন করে হোক তোরা দীপুকে দিয়ে মুখাগ্নিটা করাস।
স্তম্ভিত হয়ে বললাম — মাথা খারাপ হল নাকি? কি আবোল তাবোল বকছ? তুমি এক্ষুণি মরছ না। আর দীপুই বা কোন অধিকারে তোমার মুখাগ্নি করবে?
— না রে না, ও যে আমার বুবুল রে! ওকে তোরা চিনতে পারিস নি? বুবুল যেদিন চলে গেল, ঠিক তার এক বছর পরেই তো দীপু জন্মেছে। তোদের মনে নেই বুবুলেরও কপালে ঠিক ঐ জায়গায় একটা আঁচিল ছিল। ওকে আমার কাছে আর আসতে দেবে না। ওকে যে আমি দ্বিতীয়বার হারালাম!
প্রলাপ বকে গেলেন কমলেশদা।
স্তব্ধ হয়ে বসে রইলাম, কোনো উত্তর দিতে পারলাম না। একবারও বলতে পারলাম না, কমলেশদা তুমি তো ঈশ্বর, আত্মা, পুনর্জন্ম এসব বিশ্বাস কর না। শুধু অনুভব করলাম কমলেশদার অন্তরে একটা প্রবল বাৎসল্য রসের ধারা, বারে বারে অবরুদ্ধ হয়ে প্লাবনের মত তাঁর শরীর মনকে ছারখার করে দিয়েছে। কেরোসিনের টিমটিমে আলোয় জীবনে এই প্রথম দেখলাম কমলেশদার চোখে জল।