যুধিষ্ঠিরকে বকরূপী ধর্মরাজ জিজ্ঞাসা করলেন “কিসে সুখ?” যুধিষ্ঠির বললেন “স্বজন সঙ্গে”। এখন স্বজন কে? স্বজন মানে আপনার জন যার সঙ্গে ভাব-ভাবনার মিল, কৃস্টি-সংস্কৃতির মিল। আর তাই মাথাপিছু দুখানা সুটকেস নিয়ে যখন বাঙালি পরবাসে পাড়ি জমায়, সঙ্গে থাকে মাথাপিছু আর দুটো করে ঢাউস বস্তা আর বস্তা ভর্তি বাংলা ভাষা ও দেশ, গান ও সিনেমা, গল্প-কবিতা-উপন্যাস, আমাদের শহর-গ্রাম-মফস্বল, থাকে আমাদের বাঙালি স্বকীয়তা। বয়ে নিয়ে আসি গলি ক্রিকেট, বয়ে নিয়ে আসি রসগোল্লা, বয়ে নিয়ে আসি ঠাকুর দালান, তুলসী মঞ্চ, ঢাকের বাদ্যি আর ডাকের সাজে দৈত্যদলনী দুর্গা মাকে। ঘরকুনো বাঙালি অপবাদের মুখে ছাই দিয়ে বাংলার গভীরে প্রোথিত শিকড়কে আমূল উপড়ে ফেলে আমেরিকা, ইউরোপ, অস্ট্রেলিয়ার বিভিন্ন শহরে অভিবাসী জীবন কাটাচ্ছে কত না বাঙালি। তবুও মন স্মৃতিসরণী ধরে ফিরে যায় চিলেকোঠার ঘরে। কোনো এক বিষণ্ণ দুপুরে। মন ফিরে পেতে চায় ছাদে মাদুরে বসে মোমের মত নরম রোদ্দুরে পিঠ এলিয়ে দিয়ে, কমলালেবুর খোসা ছাড়ানো ছোটবেলা। মন ফিরে পেতে চায় বুড়ো শিবমন্দির।
টেকটাচটক আজ থেকে শুরু করল প্রবাসীদের পাতা সাহিত্য মেঘ। রামগিরি পর্বতে নির্বাসিত যক্ষ মেঘকেই কি দূতী করে পাঠায় নি তার প্রেয়সীর কাছে আপন হৃদয়ভার লাঘব করতে? পাঠিয়েছিল পাঠিয়েছিল। সাহিত্য মেঘের সহায়ে তেমনই অভিবাসী বাঙালি নিজের ভাব ও ভাবনা, মনন ও মানসীকে নির্মাণ করবে, উন্নত সাহিত্যরস সৃষ্টি করবে এই আশা রাখি। সেই অর্থে সাহিত্যিকদের কোনো বর্ণ জাতি ভৌগলিক সীমারেখা হয় না। তবে অভিবাসী জীবন নিশ্চয়ই একটি নিজস্ব আঙ্গিক, নিজস্ব মাত্রা সংযোজন করতে পারে বাংলা ভাষার সাহিত্য সৌপায়নে। আন্তর্জালের করাল আক্রমণে পৃথিবীটা বড় নিষ্ঠুরভাবে বড় দ্রুত ছোট হয়ে আসছে। সব জাতি, দেশ স্বাতন্ত্র্য খুইয়ে এক নিরালা সুষমার দিকে এগিয়ে চলেছে। তবু প্রবাসীদের কলমে অভিবাসী জীবনযাত্রার যে মৌলিক দিকগুলি, যে বৈচিত্রগুলি ফুটে বেরোবে তা বাংলা সাহিত্যকে নিশ্চয়ই সমৃদ্ধ করবে।
আমার পরিচয় দেওয়ার মত কিছু না। সাহিত্য সরোজের পাড়ে বসে দিনান্তে দু এক প্রহর কাটাতে চাওয়া ছাড়া কোনো সদ্গুণ আমার নেই। কোনো পত্রিকার সম্পাদকের ভূমিকা পালন করার ক্ষমতা আমার নেই। সে ধৃষ্টতাকে সুধী পাঠক এবং লেখকবৃন্দ নিজগুণে ক্ষমা করে নেবেন।
আমাদের প্রথম সংখ্যায় থাকছে শ্রদ্ধেয় ছোটগল্পকার লেখক বিশ্বদীপ চক্রবর্তীর দরদী কলম থেকে ছোটগল্প। অভিবাসী জীবনের আঁচ পাবেন এ গল্পে। থাকছে কবি উদ্দালক ভরদ্বাজ, আনন্দ সেন, সুদীপ্তা চট্টোপাধ্যায় ও ইব্রাহিম সিকদারের কবিতা এবং বইপাড়া নিয়ে সুষ্মিতা রায়চৌধুরীর একটি দরদী প্রবন্ধ। আশা করি পাঠক উপভোগ করবেন।
পরিশেষে রবি ঠাকুরকে ছুঁয়ে গিয়ে বলি, বিধাতাও “প্রলয় সন্ধায় জপ করবেন কথা কও কথা কও”। কারণ শব্দই তাঁর শ্রেষ্ঠতম সৃষ্টি অথবা শব্দই আদতে তিনি। তাই আমাদের এই শব্দ সম্ভার মন ছুঁয়ে গেলে দু এক শব্দে লেখককে জানাবেন পাঠ প্রতিক্রিয়া।