স্বামী বিবেকানন্দ স্মৃতিধন্য রিজলি

মিস ম্যাক্লাউড এবং মিসেস অ্যান্ড মিঃ লেগেট নামগুলি স্বামী বিবেকানন্দ অনুরাগীদের কাছে সুপরিচিত। নিউ ইয়র্ক সিটি থেকে প্রায় ৯০ মাইল দূরে নিউ ইয়র্ক স্টেটের উত্তরদিকে হ্যামলেট অফ স্টোন রিজ-এ লেগেটদের বাড়ী ও তৎসংলগ্ন জমি সহ বিশাল এস্টেট ছিল। না, একটু ভুল বললাম, ছিল নয়, আজও আছে, রিজলি। যেখানে স্বামী বিবেকানন্দ তিনবার বিশ্রাম ও প্রচারের জন্য এসেছেন, থেকেছেন। আমেরিকায় সব থেকে বেশীদিন থেকেছেন স্বামীজী ১০ সপ্তাহ, সেও এই বাড়িতেই।

১৯৯৩ সালে রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশনের তৎকালীন ভাইস প্রেসিডেন্ট স্বামী গহণানন্দজী মহারাজ তাঁর আমেরিকা ভ্রমণের সময় এই সম্পত্তিটি ক্রয়ের জন্য বেদান্ত সোসাইটিকে উদ্বুদ্ধ করেন। এর কিছুদিন পর তখন নবনির্মিত সারদা সোসাইটি খুব চেষ্টা চালায় এই সম্পত্তিটি কেনার। ১৯৯৭ সালে রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশনের ট্রাস্টিদের আগ্রহে ও অনুমত্যাক্রমে, কাজের সুবিধার্থে স্বামী স্বাহানন্দজী মহারাজ এই সম্পত্তি ক্রয়ের দায়িত্ব পান। ১৯৯৭ এর আগস্ট মাসে এইকথা জানার পর, অ্যামেরিকায় বসবাসকারী ভক্তরা ১৯৯৯ এর মে মাসের মধ্যে প্রায় ১.২ মিলিয়ন ডলার চাঁদা তুলে এবং প্রায় ৪০০,০০০ ডলার বিনা সুদে ধার করে সম্পত্তিটি ক্রয় করতে সাহায্য করেন। ১৯৯৯ সালের মাঝামাঝি সম্পূর্ণ মর্টগেজ এবং ২০০৫ সালে ওই বিনা সুদের ঋণের সম্পূর্ণ টাকা চুকিয়ে প্রায় ৮২ একর জায়গা সম্বলিত সম্পত্তি, রিজলি বিবেকানন্দ রিট্রিট-এর অধীনে আসে। এই কাজটিতে সিস্টার গার্গীর (প্রব্রাজিকা প্রজ্ঞাপ্রাণা) অবদান চিরস্মরণীয়।

১৯৯৭ সালে বাইশে আগস্ট রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশনের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট স্বামী ভূতেশানন্দজী মহারাজ একটি চিঠিতে লেখেন, “Swami Vivekananda loved Ridgely, and on all the three occasions that he visited there, he was deeply impressed by the peaceful atmosphere of the place. The strong spiritual current that Swamiji has left behind will never go in vain. As a result of that the Vivekananda Retreat has come into existence. This is indeed a marvelous gift from Sri Ramakrishna to His admirers and devotees… I hope the Vivekananda Retreat, Ridgely will be a great source of peace and spiritual support to the seekers of God.”
২০১৩ সালে বিবিসির প্রযোজনায় একটিছোটো ডক্যুমেন্টরি তৈরী হয়। তাতে রিট্রিট এবং স্বামী বিবেকানন্দ সম্পর্কে প্রচার হয় সুন্দর করে।

জীবনে প্রথবার রিজলি যাই এবং রিজলির সম্পর্কে জানতে পারি, ঘনিষ্ঠ বন্ধু পার্থসারথিদা আর সুদীপ্তার সৌজন্যে। ২০০১ সালের মে মাসে যাই রিজলি। সেবারে স্বামী স্বাহানন্দজী মহারাজকেদর্শন করার সুযোগ হয়েছিল। প্রথমবারের অভিজ্ঞতা লিখে আমার বাবাকে দিয়েছিলাম, যাতে তিনি তাঁর পরিচিতদের পড়ে শোনাতে পারেন। বাবার অবর্তমানে এতোগুলো বছর পর সে লেখা কোথায় হারিয়ে গেছে। আমার মেয়েকে বহুবার বলেছি, তাই ২০১৭তে নিয়ে গেলাম। ফোর্থ অফ জুলাই, অ্যামেরিকার স্বাধীনতা দিবস আর স্বামীজীর মৃত্যুদিন। ছুটি থাকা সত্ত্বেও তার আগেই গিয়ে ঘুরে এলাম। যদিও, শুনেছি ওইদিনে বিশেষ কিছু অনুষ্ঠান হয় রিজলিতে।

নিউ জার্সি থেকে সক্কাল সক্কাল রওনা দিয়ে রাস্তায় কিছু যানজট পেরিয়ে মধ্য দুপুরে পৌঁছলাম রিজলি। মূল ভবনে কড়া নাড়তেই দরজা খুললেন প্রব্রাজিকা শুদ্ধাত্মাপ্রাণা। তিনি ঠিক তখনই, সেখানে উপস্থিত, প্রায় সতের জনের একটি গ্রুপকে বিবেকানন্দ রিট্রিট ট্যুর করানো শুরু করবেন জানালেন এবং আমাদেরও সেই গ্রুপের সাথেই নিয়ে নিলেন। লেগেটদের বসার ঘর, খাওয়ার ঘর, দোতলায় বেডরুম, মর্নিং রুম, স্টাডি রুম, মিউজিক রুম (বর্তমানে এটি মন্দির) সব ঘুরিয়ে দেখালেন এবং সেই সব ঘরের সাথে স্বামীজীর কি যোগাযোগ বিশদে বললেন।
আমরা প্রথমেই বসার ঘরে বসে কিছু তথ্য শুনলাম, এবং ঘরে ঢুকেই দেখতে পেয়েছি স্বামীজীর ব্যবহৃত সোফাটি। ১৮৯৯ সালে যে দশ সপ্তাহ স্বামীজী এই বাড়িতে ছিলেন, লেগেটরা তখন স্বামীজীকে পূর্ণ স্বাধীনতা দিয়ে ছিলেন,তাঁর যখন যেমন ইচ্ছা, যা ইচ্ছা করবার। কথাটা স্বামীজী আক্ষরিক অর্থেই গ্রহন করেন। তখনকারদিনে এমন অবস্থাপন্ন পরিবারে নিজস্ব কিছু নিয়ম, কিছু আদবকায়দা মেনে চলা হতো। কিন্তু তাঁরা স্বামীজীকে মুক্তিদেন সেসব থেকে। স্বামীজী যেখানেই যেতেন অবশ্যই ধর্ম প্রচার করতেন, ঘরোয়া আলোচনা বসত তাঁকে ঘিরে। কিন্তু সেবারে সেসব থেকেও মুক্তি দেন লেগেটরা। মানে, স্বামীজী যাতে পরিপূর্ণ বিশ্রাম পান, তাঁর নিজের মতো করে থাকতে পারেন, তারই বন্দোবস্ত। স্বামীজী নাকি বহু রাতেই, নিজের কাজ করতে করতে বসার ঘরের ফায়ার প্লেসের সামনে রাখা সোফাটিতে শুয়ে ঘুমিয়ে পড়তেন। বর্তমানে সেটি ঘরে ঢুকলেই চোখে পড়বে। তবে, পুরোনো ছবিও আছে ফায়ার প্লেসের সামনে ওই সোফার। বসার ঘরের পাশের ঘরটি এখন লাইব্রেরির মতো, তবে যেহেতু সেই ঘরের সঙ্গে স্বামীজীর কোনো স্মৃতি জড়িয়ে নেই, কাজেই এগিয়ে গেলাম আমরা।

এবার গেলাম খাবার ঘরে। খাবার টেবিল চেয়ার সবই সেই সময়ের সাক্ষ্য বহন করছে। যদিও সঠিক জানা যায় না স্বামীজী কোন চেয়ারটিতে বসতেন। তবে, তৎকালীন সমাজের রীতি অনুযায়ী আন্দাজ করা হয় টেবিলের দুই পাশে পরিবারের কর্তা, গিন্নীর স্থান। গিন্নীর ডানদিকের চেয়ার ছিল সবথেকে সম্মানীয় অতিথির বসার জন্য। ধরে নেওয়া যায় মিসেস লেগেট, যেদিক থেকে রান্না ঘর দেখা যাবে বা কাজের মানুষদের পরিচালনা করতে সুবিধে হবে খাওয়ার সময়ে, টেবিলের সেই পাশের চেয়ারটিতেই বসতেন। তাহলে তার ডানদিকের চেয়ারটিইস্বামীজীর স্পর্শ ধন্য। স্বামীজী, খাওয়ার ঘরের আদবকায়দাও বিশেষ মানতেন না সেই সময়ে। লেগেটরা সব কিছু থেকে ছাড় দেওয়াতে স্বামীজী নিজের জগতে বিচরণ করতেন। খাবার টেবিল ত্যাগ করতেন বাকিদের খাওয়া শেষ হবার আগেই, যেটি শিষ্টাচার বিরুদ্ধ। শোনা যায়, মিসেস লেগেট বুদ্ধি করে স্বামীজীকে আইসক্রিমের লোভ দেখিয়ে বসিয়ে রাখতেন টেবিলে। কাজেই, আরোই তাতে মনেহয় আন্দাজ নির্ভুল স্বামীজী কোন চেয়ারে বসতেন। খাবার ঘরের ওপারে যেসব ঘর, রান্নাঘর ইত্যাদি, সেখানে সাধারণের প্রবেশ নিষিদ্ধ। অতএব চললাম দোতলায়, শোবার ঘর ও মর্নিং রুম দেখতে।
দোতলায় ওঠার সিঁড়ির মুখে লেগেট পরিবারের সদস্যদের বিভিন্ন ছবি, অবিকল একই ভাবে রাখা আজও। দোতলায় টানা করিডোর, যার বাঁদিকে বেডরুম আর ডানদিকে মর্নিংরুম। বাঁদিকের প্রথম ঘরটি মিসেস লেগেটএর, তারপর আছে মিস্টার লেগেটের বেডরুম এবং একদম কোণার ঘরটিতে স্বামীজী থাকতেন। আমরা প্রথম দর্শন করলাম স্বামীজীর ঘরটি। যদিও স্বামীজীর ব্যবহৃত খাটটি বেলুড় মঠে, কিন্তু আজ সেখানে সেই সময়েরই একটি খাট পাতা রয়েছে। ‘খাটটি সাধারণ খাটের তুলনায় অনেকটা উঁচু কেন’ প্রশ্ন করল কেউ একজন; তার ব্যাখ্যা দিলেন প্রব্রাজিকা। তখন তো ঘর গরম করার উপায় ছিল শুধুমাত্র ফায়ার প্লেস। রাতেরদিকে ফায়ার প্লেসের আগুনের তেজ কমে আসলে, ঘর ঠান্ডা হতে শুরু করত। মেঝে থেকে যতোটা উপর পানে থাকবে খাট, ততোটাই উষ্ণতা বেশী সময় থাকবে, এই জন্যই খাট উঁচু। রীতিমতো একটা টুল বেয়ে উঠতে হতো। তবে, গ্রীষ্ম প্রধান দেশে যদিও এমন উঁচু খাটের প্রয়োজন নেই, তবু মিস ম্যাক্লাউড, অজ্ঞাত কারণে, স্বামীজীর ব্যবহৃত খাটটি প্যাক করে বেলুড়ে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন।
মিস্টার লেগেট ছিলেন খৃষ্ট ধর্মাবলম্বী, তৎকালীন সময়ে প্রতিবছর দশ হাজার ডলার করে দান করতেন, চার্চ বা খৃষ্টান কোনো সংস্থাকে। স্বামীজীর সান্নিধ্যে আসার পর তিনি সেই অপচয় বন্ধ করেন। তবে, তাঁর ঘরের ফায়ার প্লেসের ম্যান্টেলের টালিতে খৃষ্টের জন্ম থেকে মৃত্যুর ঘটনা ফোটানো ছিল, তা অবিকৃত রয়েছে।
তৎকালীন সমাজে এমন বিপুল ঐশ্বর্যর মালিকদের বাড়ির মহিলাদের জন্য থাকত একটি মর্নিং রুম। যেখানে মহিলারা সকালের চা পান করত এবং ধীরে সুস্থে রাত পোশাক পাল্টে ভদ্র পোশাকে তৈরী হয়ে নীচে নামত। প্রব্রাজিকার মতে, এই বাড়ির মর্নিংরুমটি অবশ্য সে সময়ের অন্যান্য বাড়ির তুলনায় খুব ছোটো। স্বামীজী এই মর্নিংরুমেও বহু সময় কাটাতেন। এবং ক্যালিফোর্নিয়াতে যাওয়ার আগে একদিন ওই মর্নিংরুমেই বসে আলোচনার সময়ে হঠাৎ ফেটে পড়েন স্বামীজী এবং লিবার্টি সম্পর্কে “What do I care if Mohammed was a good man, or Buddha! Does that alter my own goodness or evil? Let us be good for our own sake on our own responsibility! Not because somebody way back there was good!” এই কথাগুলি বলেন। নীচের তলার মিউজিক রুম ও মিস্টার লেগেটের স্টাডি দেখতে গেলাম এরপর। মিউজিক রুমটি অবশ্য লেগেট কন্যার ইচ্ছায় কিছুদিন খৃষ্টান উপাসনা গৃহতে পরিণত হয়েছিল, যেখানে প্রতি সকালে প্রতিবেশীরা জড়ো হতেন উপাসনার জন্য। উপাসনা গৃহ তৈরী করার অনুমতি পেতে যেমন প্রচুর কাঠ-খড় পোড়াতে হয়েছিল, তেমনই উপাসনা গৃহ সরিয়ে নিতেও অনেক অনুরোধ করতে হয়েছিল। কিন্তু, ঘরটির ছাদ আজও চ্যাপেলের সাক্ষ্য বহন করছে। এবং ওই উপাসনা গৃহের জিনিস পত্র বোধহয় আজও বাড়ির বেসমেন্ট খুঁজলে বের হবে। এই ঘরটিই বর্তমানে মন্দির। যেটি সকাল থেকে সর্বসাধারণের ধ্যান, উপাসনার জন্য খোলা থাকে; এবং আজও প্রতিবেশী মানুষ আসেন মেডিটেশনের জন্য।

বসার ঘর থেকে একটা ছোট্ট ঘর পার হয়ে আসতে হয় মন্দির ঘরটিতে। সেই ছোট্ট ঘরটি হলো, মিস্টার লেগেটের স্টাডি রুম। এই স্টাডি রুমেই একদিন স্বামীজী ও মিস্টার লেগেট যোগাভ্যাস করা কালীন মিস ম্যাক্লাউড সেই ঘরের দরজা খুলে ফেলেন এবং দেখেন স্বামীজী মেঝেতে শোয়া তাঁর পা দুটি ৯০ডিগ্রীতে তোলা ওপর পানে আর মিস্টার লেগেট স্বামীজীর পায়ের ওপর ব্যালান্স করে উড়ন্ত পোজে রয়েছেন। তখনকার দিনে মহিলা পুরুষদের নানান শিষ্টাচার বিধি ছিল। মিস ম্যাক্লাউড হঠাৎ দরজা খুলে ফেলায় চূড়ান্ত অপ্রস্তুত হন সকলেই, এবং মিস্টার লেগেট পড়ে যান স্বামীজীর পায়ের ওপর থেকে।
স্বামীজী রিজলিতে থাকা কালীন একবার স্বামী তুরীয়ানন্দজী মহারাজ এবং স্বামী অভেদানন্দজী মহারাজও এসেছিলেন সেখানে। বসার ঘরে তিনজনের একত্রে ফটো দেখলাম, বাড়ির পিছন দিক পানে তোলা।  সিস্টার নিবেদিতাও এসেছিলেন। ওই তিন জন মহাপুরুষকে তো আর এই বাড়িতেই চেপেচুপে থাকতে দেওয়া যায় না। তাই ওঁরা তিনজনে একত্রে থাকতেন অন্য একটি বাড়িতে, সেটি লেগেটদের ‘স্মল কটেজ’। দোতলা থেকে নেমে, মূল বাড়িটির থেকে বের হয়ে আমরা চললাম সেই বাড়টির দর্শনে। বাড়িটি যদিও বিবেকানন্দ রিট্রিটের সম্পত্তি ভুক্ত নয়, তবু বাইরে থেকে দেখালেন আমাদের। আন্দাজ করা হয় এই বাড়িটির দোতলার রাস্তার দিকের ঘরে থাকতেন স্বামীজী। কেন? না, ওই বাড়িতে তিনটি বেডরুম দোতলায়। যেগুলির সামনে দিয়ে কোনো করিডোর নেই। অর্থাৎ, একটির মধ্যে দিয়ে আরেকটিতে যেতে হবে, এমনই। তবে, মাস্টার বেডরুমটি হলো ওই রাস্তার ধারের ঘরটি। স্বাভাবিকভাবেই মনেহয় স্বামীজী নিশ্চয়ই মাস্টার বেডরুমেই থাকতেন।
এরপর আমরা হাঁটতে হাঁটতে পৌঁছলাম, এস্টেটের প্রায় শেষ মাথায়, দূর থেকে দেখলাম সিস্টার নিবেদিতা কোন বাড়িতে থেকেছিলেন। দূর থেকে, কারণ সেটিও রিট্রিটের সম্পত্তির মধ্যে নয়। এস্টেটের প্রায় শেষ মাথায় রয়েছে সেই ওক গাছ যার নীচে স্বামীজী ধ্যান করতেন। তার সামনে দাঁড়িয়ে যেন শিহরণ লাগে। হয়ত মূল গাছটি এখন আর নেই, তারই পরের প্রজন্ম একইখানে দাঁড়িয়ে রয়েছে। তবু, সেই গাছটিকেই প্রণাম জানালাম আমরা। এর পাশেই আরেকটি গাছের নীচে আছে লেগেটদের নাতির চিতাভস্ম সম্বলিত স্মৃতি ফলক। এই গাছগুলির ঠিক পাশ থেকে একটি ট্রেল শুরু হচ্ছে যা কিনা পৌঁছে দেবে এমন এক জায়গায় যেখানে থাকবে বিভিন্ন ধর্মের একটি করে সৌধ। সেসব সৌধ এবং ট্রেলটি নির্মানের কাজ চলছিলো তখনও। ট্রেল ধরে হাঁটা পথে প্রায় চল্লিশ মিনিট লাগবে সেখানে পৌঁছতে। কাজেই সেদিকে আর না গিয়ে, ফিরে আসছি মূল ভবনের দিকে। এবার দেখলাম সেই পাইন গাছের শেষাংশ।
সারা ফার্মার নামের এক মহিলা, শিকাগো ধর্ম সম্মেলন দেখে অনুপ্রাণিত হন। তিনি চেয়েছিলেন এমন কিছু করতে যাতে ধর্মালোচনা এবং শান্তি চিরস্থায়ী হয়। তাই, অ্যামেরিকার উত্তরপূর্বে নিউ হ্যাম্পশায়ার রাজ্যে কিছু জমি কিনে সেখানে শুরু করেন “গ্রিন একর মুভমেন্ট”। স্বামীজী সেখানে ধর্মালোচনার জন্য গেছিলেন এবং একটি পাইন গাছের নীচে বসে তিনি ভক্তদের সাথে কথা বলতেন। সেই গাছটির বীজ এনে লাগানো হয় রিজলিতে। তবে, কয়েক বছর আগে বাজ পড়ে গাছটি মারা যায়। আমার সৌভাগ্য যে, ২০০১ সালে যখন গেছিলাম, তখন দেখেছিলাম সেই গাছ। গ্রিন একর মুভমেন্ট আজও আছে, এখন বাহাই সম্প্রদায় এটির দায়িত্ব নিয়েছেন। অর্থাৎ চিরস্থায়ী হয়েছে সারা ফার্মারের প্রচেষ্টা।

ট্যুর শেষে ওই দলটি পৌঁছল লেগেটদের ক্যাসিনো নামক বাড়িতে। সেখানে কিন্তু সত্যিকারেরজুয়া খেলা চলত ঠিক তা’ নয়। সেখানে তৎকালীন অবস্থাপন্ন মানুষদের বিনোদন ও সময় কাটানোর একটা উপায় ছিল বিভিন্ন রকম খেলা। তাস, বোলিং এরকম সব খেলা চলত সেই বাড়িতে। বর্তমানে সেখানে কিছু বইপত্র আছে। আর, দর্শকদের খাওয়া দাওয়ার জন্য খুলে দেওয়া হয়।
এখানে একটা নতুন তথ্য জানলাম স্বামীজী সম্পর্কে। স্বামীজী নাকি দারুণ ছবি আঁকতেন। Maud Stumm নামক এক বিখ্যাত আর্টিস্ট যিনি স্বামীজীর একটি স্কেচও করেছিলেন, তাঁর স্বামীজীর স্মৃতিচারণ পড়লে জানা যাবে। “One day he told me that he wanted to undertake some sort of work that would keep his hands busy and prevent him from thinking of things that fretted him at that time — and would I give him drawing lessons? So materials were produced, and at an appointed hour he came, promptly, bringing to me, with a curious little air of submission, a huge red apple, which he laid in my hands, bowing gravely. I asked him the significance of this gift, and he said, “in token that the lessons may be fruitful” — and such a pupil as he proved to be! Once only did I have to tell him anything; his memory and concentration were marvellous, and his drawings strangely perfect and intelligent for a beginner. By the time he had taken his fourth lesson, he felt quite equal to a portrait; so… Turiyanananda posed, like any bronze image, and was drawn capitally — all in the study of Mr. Leggett, with its divan for our seat, and its fine light to aid us. Many great ones may come to that room in its future years, and probably will, but never again that childlike man, toiling over his crayons, with as single a mind and heart as if that were his vocation. How often he thanked me for the pleasure it gave him, and for the joy of learning, even that!”
এবং Maud Stumm-এর স্কেচ করা ছবিটি কেন একটু অন্য রকম হয়ত এটুকু পড়লে বোঝা যাবে। “Then one very warm day, in the morning-room, we asked him to show us how he wound his turban and he did, adding several other methods employed by different castes and tribes. When he arranged it as the desert people do, to keep the neck from the great heat, I asked him to pose, and he did, talking all the time.”
স্বামীজী, প্রখ্যাত বিজনেসম্যান জে.ডি. রকফেলারকে মানুষের কাজে লাগে এমন কাজ করতে উদ্বুদ্ধ করেন। তাঁদের মধ্যে কথোপকথন হয় এই বাড়িতেই। স্বামী গম্ভীরানন্দজী মহারাজের যুগনায়ক বিবেকানন্দ বইটিতে সেই ঘটনার উল্লেখ আমরা পাই।
সাধারণ দর্শনার্থীদের জন্য রিট্রিট থেকে কোনো খাওয়ার ব্যবস্থা করা হয় না। আমরা ইমেলে যোগাযোগ করে ‘যাব’ এটা জানিয়েছিলাম ঠিকই, কিন্তু দুপুরে খাওয়ার কোনো কথা বলিনি। ১৬ বছর পর গেলাম, আগেরবার ঠিক কী ব্যবস্থা হয়েছিল, ভালো করে মনেও নেই।  ওই দলটির কেউ কেউ অতি সম্প্রতি ঘুরেছেন সেখানে ফলে, তাঁদের ধারণা ছিল এবং তাঁরা নিজেদের দুপুরের খাবারের ব্যবস্থা নিয়েই এসেছিলেন। ২০১৭ সালের কথা, বর্তমানে কি নিয়ম সঠিক জানি না।
আমরা আরোও একবার মূল বাড়িতে গেলাম, সেখানে আমার আরোও কিছু ছবি নেওয়ার ছিল। আর আগেরবার একটি খাতা যেখানে স্বামীজী ও সিস্টার নিবেদিতার সই ও লেখা দেখেছিলাম, স্পর্শ না করে। এবার শুনলাম সেই খাতা আর বের করা হয় না। তবে, সেই সই এর ফটোকপি বাঁধানো রয়েছে মূল বাড়ির বসার ঘরে। ছবি নিলাম আরোও একবার, যদিও আমার কাছে মূল খাতাটির ছবিও তোলা আছে।
কানায় কানায় পরিপূর্ণ মন নিয়ে, রিট্রিট ছেড়ে বের হয়ে একটু দূর আসতেই পেলাম স্থানীয় ছোট্ট একটি দোকান, যেখানে টাটকা সব বেকারির খাবার, কাঁচা সব্জি, এবং কিছু তৈরী করা ঠান্ডা খাবার রয়েছে। মেক্সিকান বুরিতো এবং গ্রিক স্যালাড বেছে নিলাম আমরা, ঠান্ডা বার্গার, পাস্তা, র্যাপ, গরম হট ডগ, আরোও রকমারি সব খাবারের থেকে। আবার হয়ত যাব কোনোদিন রিজলি, সেই দিনের অপেক্ষায় রইলাম।
রিজলির ওয়েবসাইট হলো https://ridgely.org। সেখানে প্রয়োজনীয় অনেক তথ্যই পাওয়া যাবে, রিজলিতে কী কী অনুষ্ঠান হয় বা রাত্রিবাস করতে গেলে কী নিয়ম ইত্যাদি সম্পর্কে। তবে, জেনে রাখা ভালো, রিজলিতে ১৭ বছরের কম বয়সীদের রাত্রিবাসের অনুমতি নেই।