চোত সংক্রান্তি – ফিরে দেখা

চোত সংক্রান্তি। নতুন বছর আসছে আগে থেকেই জানিয়ে দিয়েছিল ওয়াটসএ্যাপ। 
অনেক দিন হয়ে গেল প্রবাসে। দেশে যখন চৈত্রের শেষ, এখানে তখনও শীত পুরোপুরি বিদায় নেয় নি। ইংরেজ কবির বিখ্যাত কবিতায় আছে যে এপ্রিল সবচেয়ে নিষ্ঠুর মাস, April is the cruellest month! জার্মান লোককথায় বলে, এপ্রিল মাস যা ইচ্ছে তাই করে, April macht was er will ! এই সুন্দর ঝলমলে দিন তো এই আমার বাঙালি হাড় কাঁপানো ঠাণ্ডা হাওয়া। শীতের পোষাক এখনো আলমারিতে তোলা যাবে না, কখন যে কি প্রয়োজন হয় কে জানে!
মনে পড়ে ভবানীপুরের সেইসব বসন্তের সকালগুলির কথা। তখনও দিনের কাজ পুরোদমে শুরু হয়নি। পড়ার টেবিলে বসে তড়িঘড়ি  কোনো রকমে হোমওয়ার্ক শেষ করার চেষ্টা করছি, হঠাৎই রাস্তা থেকে কানে ভেসে আসে — বাবা তারকনাথের চরণে সেবা লাগি, মহাদেব! মহাদেব কথাটা টেনেটেনে লম্বা করে বলা – মহা-আ-আ-দে-এ-এব।
মনটা আর পড়ার বইয়ে থাকতো না। চড়ক আসছে যে! চড়কের মেলা।
চৈত্রের গোড়া থেকেই একমাস ধরে গাজনের সন্ন্যাসীরা রাস্তায় ভিক্ষা করতে বেরুতেন।অনেক সময় সঙ্গে থাকতো চড়কের সং। ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা রংচং মেখে সাজতো শিব ঠাকুর, দুগ্গা ঠাকুর। দুজনেরই হাতে টিনের ত্রিশূল, শিবের মাথায় জটা। থাকতো, আরো সব ঠাকুর দেবতাদের হেঁটে চলে বেড়ানো মানুষী প্রতিমূর্তি।
পদ্মপুকুরের উত্তর-পশ্চিম ধারে যেখানে বটগাছের গোড়ায় শিবমন্দিরটা আছে, তার গা ঘেঁষে গজাতো বাঁশের উপর তেরপল ঢাকা ছাউনি। তৈরি হতো সন্ন্যাসীদের অস্থায়ী আখড়া।
তাঁরা কেউই সারা জীবনের জন্য সংসার ত্যাগী নন। বেশিরভাগই এ-পাড়া ও-পাড়ার কায়িক শ্রম করা নিম্নবিত্ত গৃহস্থ ঘরের পুরুষেরা, দুয়েক জন মহিলাও। প্রায় সকলেই বস্তিবাসী। অনেকেই ছিলেন যাঁরা বছর বছর কেবল এ সময়টাতেই এক মাসের সন্ন্যাস নিতেন। কেউ কেউ আবার কোনো বিশেষ এক-দু’বছর সাধুর ভেক নিতেন, মানত পালন বা মনোবাসনা পূর্ণ করার আকাঙ্খায়।
আমাদের বাড়ির পাশের বস্তির কেলে ছিল একজন ফি-বছরের গাজনের সাধু। কেলে কিন্তু মোটেও কালো নয়। জন্মের সময় ওর ওপর যাতে যমদূতের নজর না পড়ে, সেই জন্য নাম রাখা হয় কেলে। সাহেব কোম্পানির গাড়ি চালাতো। বস্তিবাসীদের মধ্যে ওর ট্যাঁকের জোর ছিল, সে জন্য ফুটানিটাও একটু বেশি। দিনের বেলা কেলে গাঁজা  টানতো, সন্ধ্যার পরে মাল। পাড়ার কাছেই ছিল গাঁজা পার্কের অনেক দিনের পুরনো দেশি মদের লাইসেন্সড দোকান।
এক মাস ধরে এই সব মৌসুমি সাধুরা আর কি ব্রত পালন করতেন আমার জানা নেই, তবে অনেকেই যে খুব কষে গাঁজার ছিলিমে দম দিতেন তা আসতে যেতে দেখতাম, গন্ধ পেতাম। ভেক ছিল গেরুয়া। আমাদের কেলে কিন্তু সন্ন্যাসকালে মদের গেলাসে হাতও দিত না।
পুকুরের পশ্চিম ধারে, যেখানে শীতকালে পাড়ার ছেলেরা কোর্ট কেটে ব্যাডমিন্টন খেলতো, সেখানে গজিয়ে উঠতো চড়ক গাছ। সংক্রান্তির দিনে সেই চড়ক গাছের মাথায় কোমরে দড়ি বেঁধে বোঁ-বোঁ করে ঘুরপাক খেতেন সাধুরা। ঝাঁপ হতো, কাঁটাঝাপ, আগুনঝাঁপ, আরো কি-কি যেন সব ছিল। ঝাঁপ দেবার আগে সবাই মিলে সুর তুলত- বোলে বাবা শিবো কাঁটা ঝাঁপ দিবো, নয়তো আর কোনো ঝাঁপের নাম। ঐ এক মন্ত্রেই ওদের কাঁটা, আগুন, সব কিছুরই বিপদ কেটে যেত।
চৈত্রের শেষ দিনে শুরু হত এক সপ্তাহের জন্য চড়কের মেলা। কিছু কিছু দোকানপাট খুলে যেতো দুচার দিন আগেই। মেলা শেষের পরেও ভাঙা মেলা টানত আরো ক’টা দিন। হিসেবি বৌ-গিন্নীরা সংসারের প্রয়োজনীয় চাক্কি-বেলুনি, হাতা, খুন্তি, মাদুর, পাটি এসব কিনতেন দরদাম করে ভাঙা মেলায়। দোকানীরা দোকান-পাট গোটানোর তাড়ায় শেষের দিকে সস্তায় মাল ছেড়ে দিতেন।     
রাত ন’টার পরে মহিলারা সাধারণত মেলায় যেতেন  কোনো একজন পুরুষ সঙ্গীকে সাথে নিয়ে — নিজের কর্তা অথবা সদ্য গোঁপের রেখা গজানো কিশোর ছেলেটি বা ভাসুরপো, মোদ্দা কথা সাথে কেউ একজন পরিচিত পুরুষ  থাকতেন। রাত বাড়লে পাড়ার চ্যাংড়াদের ভিড় বাড়তো, মাতালেরা আসত নজরে একটু রং লাগাতে।   
বছরের আরো নানা ফুর্তিফার্তা, দোল দুর্গোৎসবের সাথে আমাদের ছিলো বাৎসরিক এ এক উপরি পাওয়া — পাড়ার চড়কের মেলা।
দেবদেবী, ধর্মীয় আচার, এসবে আমার কোনোদিনই মন নেই। তবে, খুব ভালো লাগে আমাদের দেশে অধিকাংশ ধর্মাচার ঘিরে ভোগ ফুর্তির আয়োজন। যেমন, কালী পূজোর পূজো বাদে আর সবেতেই ছিল আমার আগ্রহ — সে প্যাণ্ডাল বাঁধাই হোক বা মেটাডর করে প্রতিমা নিয়ে আসা, রাত জাগা, বাজি পোড়ানো, সবেতেই। বাড়িতে মা যখন পাঁচালী পড়তেন, —লক্ষীর ভাণ্ডার স্থাপি প্রতি ঘরে ঘরে —   আমার নজর থাকত প্রসাদের থালার বাতাসার দিকে। 

মাঝেমধ্যে লাল-নীল-সবুজ ডোরায় রঙিন করে তোলা লক্ষ্মীর ভাঁড় কিনে প্রায় ধনুর্ভাঙা পণ নিয়ে তাতে সিকি-আধুলি-পাঁচপয়সা-দশপয়সা জমাতাম। নিজের মনেই পণ করতাম যে ভাঁড় ভর্তি না হলে ভাঙবো না। সে প্রতিজ্ঞা কোনোদিনই টেঁকেনি, আগেই ভেঙে ফেলতাম। সংসারে অর্থের যে কেন এতো প্রয়োজন? রবারের বল, ঘুড়ি লাটাই, কাঁচের গুলি এসব-ই কিনতে পয়সা লাগে যে! এইসব অতি জরুরী প্রয়োজনে ভাঙা পড়ত লক্ষ্মীর ভাঁড়। আমার এ জীবনে আর চঞ্চলাকে ধরে রাখতে পারলাম না। মা লক্ষ্মী আমার অধরাই রয়ে গেলেন।
চড়ক পূজায় কি পদ্ধতিতে শিব ঠাকুরের কৃপা আদায় করা হতো তা জানার কোনো ইচ্ছা তখনো আমার ছিল না, এখনো নেই। তবে, মেলার সাতদিন, আগেপিছে আরো প্রায় এক হপ্তা, রোজই সকাল-বিকেল সুযোগ পেলেই পুকুরের তিন ধার ঘেঁষা পদ্মপুকুর রোড, রামময় রোডে একটা চক্কর দিয়ে আসতাম। 
চড়ক মেলার আলো অন্ধকার, তার নিজস্ব গন্ধ, সব মিলিয়ে কি যেন এক দুর্বার টান ছিল! বড় হওয়ার পরেও, সারাদিন যেখানেই থাকতাম না কেন, মনের মধ্যে একটা উচাটন লেগেই থাকতো — মেলায় যেতে হবে যে!  নিজের অজান্তেই পাঁপরভাজার গন্ধে পেট্রম্যাক্সের গন্ধ মাখামাখি হ্যাজাক বাতির আলোছায়ায় রাস্তার ল্যাম্পপোস্টের টিমটিমে আলো মিলে তৈরি রূপকথার সেই মোহময় জগৎটায় ঢুকে পড়তাম।

আমার সব চেয়ে ভালো লাগতো ধোপা বস্তির গা ঘেঁষে মেলা যেদিকে রাণাদের বাড়ির দিকে ঘুরে গিয়েছিল, সেদিকটাতে। ওখানে ছিল ঘূর্ণি, নাগরদোলা, কাছাকাছি ভোজবাজির তাঁবু, চার হাতওয়ালা কিশোরী, মাথা-কাটা যুবতী। নিচে, দত্তবাড়ির রক ঘেঁষে বসতো কালো টিনের ট্রাঙ্কে ম্যাজিকের পসরা নিয়ে ম্যাজিকওয়ালা। প্রতি বছর একটা-দুটো জাদুর খেলা কিনতামই। দড়ি কেটে জোড়া দেওয়ার কায়দাটা আজও মনে আছে।

আরো একটা স্বপ্নের জায়গা ছিল পুকুরের দক্ষিণ-পশ্চিম কোণ ঘেঁষে যেখানে পাখিওয়ালা, রঙিন-মাছ ওয়ালারা বসতেন। একবার একটাকা দিয়ে একটা পাঁচদিনের ফুলটুসির বাচ্চা কিনে নিয়ে এলাম। গায়ের রঙ সবুজ, ঠোঁট হলুদ। বড় হলে ছেলে পাখির মাথা হবে লাল, মেয়ে পাখির নীল। আমি চেয়েছিলাম লাল, আমারটা বড় হয়ে হল নীল মাথা। সবুজ পাখি। ওদের আরেক নাম লালমন নীলমন।
পাখির বাচ্চাটাকে প্লাস্টিকের ড্রপারে করে হরিণঘাটার দুধে জল মিশিয়ে ফোঁটা ফোঁটা খাওয়াতাম। যদুবাবুর বাজার থেকে খাঁচা এলো। ওর নাম দেওয়া হ’ল ফুলটুসি। ফুলটুসি বড় হয়ে সারাদিন এদিক ওদিক ঘুরে বেড়াতো, খাঁচায় থাকতো না, তবে ওর বাসায় কেউ হাত দিলে তেড়ে যেত।
আর ছিল চারটে পায়রা। একটা সাদা কাগজি নিয়ে এসেছিলাম ধোপা পাড়ার শম্ভুর কাছ থেকে বারো আনা পয়সা দিয়ে। জোড়টা দিয়েছিল গৌতম। যগুবাজার থেকে একটা ফলের বাক্স কিনে এনে তার ঢাকাটা কব্জা দিয়ে লাগিয়ে বানিয়েছিলাম দরজা। বাড়িতে বেড়াল ইঁদুরের উপদ্রব। পিছনের উঠোনে যেখানে কয়লা রাখার ভাঙা চৌবাচ্চাটা ছিল, তার পাশের দেয়ালে বেশ উঁচুতে পেরেক ঠুকে ঝুলিয়ে দিয়েছিলাম পায়রার বাসা। দুটোতে বকম-বকম করে কথা বলতো, প্রেম করতো। এ বাড়ির কার্ণিশে, ও বাড়ির ছাতে গিয়ে বসতো। ভালবেসে ডিম দিতো, বেশির ভাগই নষ্ট হয়ে যেতো। দুটো ডিম ফুটে একজোড়া বাচ্চা হ’ল। তারা মায়ের মুখ থেকে ওগরানো খাবার খেয়ে বেড়ে উঠলো। যগুবাজার থেকে আরো একটা ফলের বাক্স কিনে এনে তাতে দরজা লাগিয়ে আর একটা খোপ বানালাম। আমার চিড়িয়াখানা বাড়তে থাকল।
মনে আছে, ভিক্টোরিয়ার পাশের নালাগুলি গঙ্গায় জোয়ার এলে ভরে যেত নদীর জলে, সাথে নিয়ে আসত অনেক ছোট ছোট মাছ। তখন আমি ক্লাস এইট কি নাইনে পড়ি। পাড়ার বন্ধু চাঁদুকে নিয়ে সেই সব উপচে পড়া নালা থেকে গামছা দিয়ে ছেঁকে ধরে একটা লোহার বালতি করে নিয়ে এসেছিলাম কত ছোট ছোট মাছ। কোনোটার রঙ সোনালী, কোনোটা বা রুপোলী, সাদায় কালো ছিটছিট। হরলিকস, জেলির খালি শিশিতে সেইসব মাছ মেলায় বিক্রি করছিলাম, খদ্দের বুঝে টাকায় চারটে, ছ’টা করে। বেশ বিক্কিরি হচ্ছিল। স্কুলের ক্লাস পালিয়ে আমরা দুজনে প্রায় সফল ব্যবসায়ী হয়ে উঠছিলাম। বাদ সাধল নিয়তি। হঠাৎই দেখি চাঁদু পোঁ পাঁ করে দৌড় লাগাল। পিছনে তাকিয়ে দেখি চাঁদুর মেসো। আমিও মাছের বালতি ফেলে রেখে দে দৌড়।
আমার বন্ধু অতি দুরন্ত চাঁদু খুব শৈশবেই বাবাকে হারিয়ে বিধবা মা ও এক বোনের সাথে মাসীর বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছিল। মেসো ছিলেন ও পাড়ার বাংলা স্কুলের সহকারী প্রধান শিক্ষক। সেকেলে মাস্টার মশাই, স্কুলে তাঁর দোর্দণ্ড প্রতাপ। অথচ, কিছুতেই আর বাগে আনতে পারছিলেন না ঘরের ছেলেটিকে। অকস্মাৎ  উদয় হওয়া মেসোর ভয়ে আমাদের স্বপ্নের ব্যবসা পড়ে রইল চরক মেলার পথের মাঝে। এদিক ওদিক ঘুরে ফিরে এসে দেখি বালতি উধাও।        
মেলায় আসতেন সাদা পাজামা সার্ট পড়া ঘোর কৃষ্ণবর্ণ বাঁশিওয়ালা। বছরের অন্য সময় রাস্তায় ঘুরে ঘুরে ফেরি করতেন। একটা সুর বেশি বাজাতেন উনি — সাওন কা মাহিনা পবন করে সোর। নিখুঁত শ্রাবণের সুর বাজতো বাঁশের বাঁশীতে, বৈশাখী মেলায়।
আরো বসতো টিনের তৈরী কেরোসিনের আগুনে চালানো ভুটভুটি জাহাজ। বালতির জলে ঘুরে ঘুরে চলত, যতক্ষণ তেল থাকতো, দম থাকতো। টিনের একটা পতাকাও ছিল তাতে। এছাড়া মাটির খোলে চামড়া দেওয়া তলতা বাঁশের বেহালা, সাদা তুলোর দাড়িওয়ালা মাথানাড়া বুড়ো পুতুল, সাথে তার পান খেয়ে ঠোঁট রাঙানো বুড়ি, সত্যি সত্যি জল বেরুনো প্লাস্টিকের টিউকল, জ্ঞানের আলো, আরো কত কী। মেঠাইএর দোকান, তেলেভাজা, ঘুগনি আলুর দম। দড়ি দিয়ে টানা চাকাওয়ালা কুরকুরে বাদ্যি। ভিড় জমতো এয়ারগান দিয়ে বেলুন ফাটানোর দোকানের সামনে। পাঁচ পয়সায় দেখে নেওয়া যেত কার কত কব্জির জোর। লিখে শেষ করা যাবেনা।          
চড়কমেলা শেষ হয়ে গেলে কি যেন কি একটা বুকের ভিতরে সময়ে অসময়ে রিনরিনিয়ে উঠত। কথায় বলে — কলকাতা এক বড় গাঁ। আমাদের ছোটবেলায় দেখেছি ও শহরের খাঁজেখোঁজে গুঁজে থাকা সব পল্লীগ্রাম। গরিবের বসতগুলিতে ফলন্ত পেয়ারা গাছ, কলা গাছ। কোমরে ঘুন্সি বাঁধা ন্যাংটো শিশু। কুকুর, বেড়াল, ছাগল, গরু। কাপড় শুকোনোর দড়িতে ঝুলতো খাঁচায় টিয়া পাখি। মা শীতলা। সবই ছিল। মনসা পূজা উপলক্ষে পেয়ারাবাগান বস্তিতে জমতো রাতভোর যাত্রাপালা। ছিল রথের মেলা, চড়কের মেলা, ঈদের বাজার, বড়দিনের সাজসজ্জা। গুরু গোবিন্দ সিং-এর জন্মদিনে সর্দারজীরা বিলোতেন বরফ দেওয়া গোলাপি সরবত। দুর্গা পুজো, কালী পুজো। বিশ্বকর্মা পুজোর ঘুড়ি লাটাই। এসবে অংশগ্রাহী সব মানুষ কতটা যে ঈশ্বরপ্রাপ্তির আশায় তা করতেন জানি না, তবে আমার মতন সামাজিক মেলামেশা, ফুর্তিফার্তা হৈচৈ-এর খোঁজে ঘুরঘুর করা লোকজনও তো অনেকেই ছিল। 

বড়দিনের সাজে সজ্জিত নিউ মার্কেটে বেড়াতে যাওয়া বহু জনেরই হয়তো মাথায় থাকতো না মানবাত্মার কারণে সেই মৃত্যুঞ্জয়ী মানুষটার ক্রুশে নিজেকে আত্মবলি দেওয়ার কথা। মনে রাখতাম না যে উনি মরণের ওপার থেকে ফিরে এসে শুনিয়েছিলেন জীবনের বাণী। আমরা সবেতেই, সব উৎসব পার্বণে সবাই মিলে মেতে উঠতাম।

আমাদের সেই পুরনো ঝরঝরে ভাড়া বাড়িটা আর নেই। ওটা ভেঙে গজিয়ে উঠেছে নতুন দশতলা এ্যাপার্টমেন্ট হাউস। পিছনের কয়লা রাখার, ময়লা ফেলার উঠোনটার কোনো ছবি নেই আমার এ্যালবামে। মনে ধরা আছে। সে বয়সে তখনো আমি কোনো ক্যামেরায় হাত দিয়ে দেখিনি। যখন চলে যাব তখন মনের বাক্সে জমা রাখা ওই সব পায়রার খোপের ছবি, ভেঙে যাওয়া নষ্ট ডিমের ছবি, সাথে নিয়ে যাব। আর কেউই তা কোনদিনই দেখতে পাবে না।শুনেছি পুকুরের তিন ধার ঘেঁষে মেলা আর বসে না। গাড়ি যাতায়াতের পথ মসৃণ করার জন্য ওটা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। 
মামুলি ধর্মীয় সংস্কার জড়িয়ে গড়ে ওঠা গাজন গাছ, চরকের মেলা আধুনিক প্রগতিশীলতার সাথে খাপ খায় না। মধ্যবিত্তের বসত ভেঙে তৈরী হয়েছে উচ্চবিত্তের আকাশ ছোঁয়া ফ্ল্যাট বাড়ি। গরীবের বস্তিবাড়ি ধুলোয় মিশিয়ে মাথা তুলেছে শপিং মল।  
গ্রীষ্মে-বসন্তে-শীতে-হেমন্তে শাওনের সুর তোলা বাঁশিওয়ালাও তো তাঁর বাঁশির ঝোলা ফেলে রেখে চলে গেছেন অনেক দূরে।