পেশা শিক্ষকতা। অরণী বিদ্যালয়ে বাংলা সাহিত্য ও সৃজনশীল লেখা বিষয়ের শিক্ষক হিসেবে কর্মরত। প্রকাশিত হয়েছে এই পৃথিবী এই দেশ ও নিভৃত পরবাস নামে দুটি কবিতার বই। টাইমমেশিন ও গুপ্তহত্যা অতঃপর নামে দুটি বড় গল্পের বই। মূলত উপন্যাস লিখছেন। বর্তমানে ‘সম্পর্কটি শুধুই জৈবিক’ নামে একটি ধারাবাহিক উপন্যাস লিখছেন। ঢাকায় বসবাস করেন।

নহন্যিয়া

ছাদের বিকেল। পাঁচতলার ওপর ছ’তলায় ছাদ। বিকেলের আলোটা খানিক নম্র হয়ে এলে যখন শালিখ চড়াইগুলো বসতো দু’জনে গায়ে গা ঘেঁষে, ফিঙেগুলো পোকা খুঁজতে বেরুতো গোধূলি আলোয়, দু’দিক থেকে দু’টি দেয়াল এসে এক জায়গায় লেগে যে কোণটা তৈরির করেছে সেটার একদিকে বসে অন্যদিকে দু’টো পা তুলে দিয়ে আমি বসতাম আলসে নির্ভীক ভঙ্গিতে। মৃদু বাতাস খেলতো আমার চুলে মুখে গায়ে। ছুঁয়ে যেত মন। বাতাস আমাকে ভালোবাসতো। বুঝতাম। কারণ কখনো সে এমন পাগল হতো না যে আমাকে নিয়ে উড়ে যায় পাতাল তলে। যে জায়গাটায় বসতাম অবলম্বনহীন সেটা সত্যি ভীষণ মারাত্মক। গাইতাম গলা ছেড়ে প্রাণ খুলে আমার ঠাকুরের গান। আকাশ এমন একটা সুন্দরতা বিছিয়ে রাখতো বরাবর, যেন বিধাতা আঁকছেন সমস্ত দিনের শেষে তাঁর বেদনা-আরক্ত রঙে আর পূরবীর রাগে গাইছেন গান। নিচে তাকালে, দীর্ঘ রাস্তা চলে গেছে সবুজ ঘাসের মাঠের পাশ দিয়ে। কত যে মানুষ আসে সে পথ ধরে। প্রেমিক আসে প্রেমিকার কাছে বন্ধু বন্ধুর কাছে বাবা মেয়ের কাছে ভাই বোনের কাছে কখনোবা বর তার নতুন বধূর কাছে। কারো হাতে ফুল। কারো হাতে কবিতা। কেউ কেউ ফুলে সেজে হেঁটে চলে হাত ধরে। কেউ বসে সবুজের মাঠে পাশাপাশি কত যে রাগে আর অনুরাগে। তার কেউ ছিল না, আমারও না যে নিচে গিয়ে হাত ধরে বসব পাশে কইব কথা। আমি একা একা গান গাইতে গাইতে দেখতাম ছাদের নিচে ঘাসের মাঠের সেই ছবি। যখন সন্ধ্যার শেষ আলোটুকু এইমাত্র নিভবে তখন সেও উঠে আসতো ছাদে।
-এভাবে বসেছিস? পড়ে যাবি তো।
এইটুকুই কথা তার। এইটুকুই বারণ কিংবা সাবধানতা। আমার জন্য এইটুকু তার যথেষ্ট ভালোবাসা আর উত্তেজনার প্রকাশ। অধীর চোখে তাকিয়ে থাকতো আমি নামি কি না দেখবার জন্য। আমার গান থামতো না। গাইতে গাইতেই চোখে উত্তর দিতাম। বুঝে নিত চোখের ভাষা। বুঝতো এ সুর থামবারও নয় এ মানুষ মরণফাঁদ থেকে নামবারও নয়। সেও তখন হালকা আদরে ঠোঁটের কোনায় ভর্ৎসনার একটা ভাব এনে পটলচেরা চোখে একবার আমার দিকে তাকিয়ে ঝুলে পড়তো নিচে দিঘল ঘাসের মাঠে। ধীরে রাত বাড়তো। হয়তো কোন কোন রাতের শেষে পরীক্ষাও থাকতো। আমরা দু’জনের কেউ পরোয়া করতাম না। নীল আকাশে শাদা মেঘ ভাসতো, আকাশে চাঁদের গায়ে কলঙ্ক স্পষ্ট হতো। আমরা লেগে যেতাম সপ্তর্ষিম-ল কিংবা আদমসুরত দেখতে। আজ সে জীবনেরও পরোয়া করে না। চিরকালের সব নিয়মকানুন ভেঙে আমি আর সে ছিলাম অনাদির মতো হাত ধরে পাশে পাশে সাথে সাথে। রাতের আকাশে তারাগুলো আমাদের প্রিয় বন্ধু ছিল। দু’জনের খুব ইচ্ছে ছিল একদিন নক্ষত্র হবো। যাব আকাশের নীলে।
-তুই নক্ষত্র হবি আর আমি তোর পাশে গ্রহ। তুই জ্বলবি নিভবি।আমি তোর পাশে স্থির। অচঞ্চল।
আহা। এ পৃথিবী বিপুল কালের অন্ত নেই।
আমাদেরও গেছে কতকাল এমনি নিঝুম নিরালা দুপুর, নির্বাক অপলক মেঘরাত, সোনালি রুপালি ভোর।
কোন কোন রাতে তার বুকের ভেতর কী এক গভীর বেদনা ছলছল করে ছলকে উঠতো। আমি দেখতাম রুপালি জোছনার মতো উজ্জ্বল মুখের ওপর কৃষ্ণগহ্বর। বোধকরি ভালোবেসেছিল কাউকে। জিজ্ঞেস করিনি কোনদিন। কিন্তু তার চোখের ভাষা আমার জানা। তার দ্যূতিময় উজ্জ্বল চোখের তারা, সবুজ হীরের অক্ষর, চোখের পাতার চিঠি থাকতো আমার বুকের ভেতর। বলতো না তা নয়। বলতে পারতো না। আমি ঠিক তার উল্টো। খলখল করে হাসতাম। বকবক করে কথা কইতাম আর ছলছল চোখে কাঁদতাম। সে নীরব নির্বাক। এত বিপরীত কী করে যে এক হয় এখনো আমার কাছে তা এক বিস্ময়। এখন সে তারা। আমি নির্বাক স্রোতস্বিনী জীব। সে স্থগিত যৌবনা আমি মধ্যদুপুর। চলছি তারই দিকে। নক্ষত্রলোকই আমার শেষ উদ্দিষ্ট। ভালোবাসতে তার ভুল ছিল কোনো। নিজেকে জানতেও ভুল। জানাতেও ভুল। আজ মনে হয়, তার জন্য আমার জন্য পৃথিবীর সব মানুষের জন্য ‘নো দাইসেল্ফ’ই প্রথম আর শেষ কথা।
স্নিগ্ধ সন্ধ্যায়, যেদিন যেদিন সে ঘর থেকে বের হতোনা সেদিন আমি নিচের ঘাসের মাঠে ফ্ল্যাড লাইটের আলোয় ব্যাডমিন্টন খেলতাম। আশ্বিনের শেষ লগ্ন, শীতবাতাস বয় সরসর করে। পাতাগুলো শুকোতে শুরু করেছে বিরহ বিরাগে, মাথার উপর উজ্জ্বল নিষপ্রভ নীল। অসংখ্য তারাজ্বলা জোছনায় যখন ভেসে যেত রাত। হঠাৎ হঠাৎ মনে হতো দিনটাই বুঝি তার সবটা রুদ্রতা রেখে চলে এসেছে রাতের কিনারে। এমনই পূর্ণ জোছনা রাতে আমি বসতাম ছাদে পাটি বিছিয়ে। একা একা সুবিশাল ছাদে শুয়ে শুয়ে আকাশ দেখা আমার প্রিয় অভ্যাস। রাত গাঢ় হলে সে একটা বড় মগে করে চা নিয়ে চলে আসতো ছাদে। কোনদিন কনকনে হাওয়া দিলে আমার পাঁচতলার রুম থেকে এক দৌড়ে নিয়ে আসতাম ছোট্ট কম্বল। কম্বল মুড়ি দিয়ে শীতের কনকনে হাওয়ায় আমাদের কত কত ঊষ্ণ মধু মধু রাত পার হয়েছে নিঃশব্দে একা কেউ জানে না।
কথা বেশি বলতো না বলে বন্ধুরা ওকে বলতো আনসোস্যাল। প্রেমের প্রস্তাবে রাজি না হলে ছেলেরা বলতো অহংকারী। আসলে তার বুকের ভেতর বাস করতো এক অন্ধকার রাত। একিদন খুব গোপনে চুরি করে আলোটুকু নিয়ে গেছিল কেউ ঠকিয়ে। সেই থেকে তার আলোনেভা রাত। বাতিওয়ালা নেই কোনো। যে এনেছিল আলোর দীপালি তাকে সাহস করেনি দেখাতে বুকের নির্জনতা গভীর অরণ্যের নীল কথকতা। অনেকদিন দীপালিওয়ালা অপেক্ষা করে হাত রেখেছিল অন্য আর এক হাতে। সেই থেকে শুরু ক্রুদ্ধ দহন। আমরা সবাই তখন খুব ব্যস্ত। পড়ালেখা-বিশ্বিবদ্যালয় জীবন বাই বাই। সোনালি রুপালি নিঝুম রাত, শীতগ্রীষ্মের ঊষ্ণকাতর রাত, একা একা নির্জনে ভালোবাসার রাত, গানের রাত, অভিমানের রাত, নির্বাক বিষণ্নতার রাত আর নক্ষত্রের সাথে তখন দীর্ঘ দূরত্ব। আমি আরো দূর দ্বীপবাসি। সেও বাস করে অন্য কোথাও। দূরত্বই সম্পর্কের সবচেয়ে বড় আর সর্বশেষ শক্তিশালী সর্বনাশী শত্রু। সে আমার দূর হয়ে গেল আমি তার দূর। বহুদিন পর যখন দেখা হলো অদ্ভুত এক নির্মোহ হাসি দিয়ে বলল:
-জানিস, ১৭ টা ঘুমের ট্যাবলেট খেয়ে দেখি দিবি বেঁচে আছি।
-পদ্মার গভীর স্রোতে লাফিয়ে পড়েও দেখি বেঁচে আছি। বল অদ্ভুত না!!
আমি বিস্মিত অতঃপর ধাতস্থ।
-ছাড় এসব। পৃথিবী তোকে অত সহজে ছাড়বে না। আকাশ তোকে অত সহজে নেবে না।
-সহজে না হোক কঠিনে তো নেবে নিশ্চয়ই।
খুব গম্ভীর হয়ে আমার কাছে ভালোবাসার রূপ জানতে চেয়েছিল। আমিই কি জানি ভালোবাসার আসল রূপ! ভালোবাসার অধরা রূপে আর মুগ্ধতায় পার করেছি কতশত কাল। আমি বললাম:
-এক টুকরো আগুন খড়ের গাঁদায় ঘটায় মুহূর্তে প্রলয়।
-প্রলয়ের নাম তবে ভালোবাসা?
-না রে, ভালোবাসার নাম বুঝি প্রলয়।
-তাহলে মনে হয় আমি ভালোবেসেছি।
বুঝলাম তার বুকে প্রলয় চলছে। প্রলয়ের ব্যাখ্যা এখানে বিশদ, বিপুল তার বিস্তার। রূপে অরূপে বিরহে বেদনায় প্রেমে স্নেহে আত্মশুদ্ধিতে প্রত্যাশার মাত্রাধিক্যে ব্যাপক তার প্রভাব।
ততদিনে দীপালি ওয়ালার ঘরে ফুটেছে নতুন মাধবী। ঘ্রাণে ভরপুর ঘর মন উঠান। অন্যদিকে তার বুকে একটানা বেজে চলেছে রাগ বেহাগ। কত যে বেসেছি ভালো তারে কত যে দিয়েছি প্রাণ। আরো কত মন জ্বেলে দিয়ে দিয়ে গেছে তার পায়ে উজ্জ্বল অধরা আলো। কোনই লাভ হয়নি তাতে। সে চলেছে অসীমের পথে। আমারই ঘরে আমার হার্মোনিয়ামের উপর সারাদিন লিখেছে প্রলয়ের গান। শুনিনি। বারান্দায় ঝুল দোলনাটাতে বসে পুড়িয়েছে রোদের তাপে গায়ের সোনা রং-এর আলো। জানিনি। তারপর গাইছিল বুঝি বিদায়ের গান। সময় কোথা শুনবো সেসব কঠিন গানের স্বরলিপি! সে যে বহুদূর ছিল তখন। তার মগজের কোষে কোষে তখন লালবাতি-রেড সিগনাল। মহাকর্ষ বল ক্রমান্বয়ে অবসন্ন অকার্যকর। অভিকর্ষীয় ত্বরণও বোধকরি নিঃশেষ। ত্রিমাত্রিক বল আর তাকে ধারণ করতে পারছিল না।
-জানিস, হঠাৎ হাঁটতে হাঁটতে সেদিন রাজু ভাস্কর্যের সামনে পড়ে গেলাম।
-হোঁচট খেয়েছিলি?
-আরে নাহ্ (মুখে সেই অদ্ভুত হাসি)
-এমনি এমনি পড়েছি। কতগুলো ছেলে আমার পড়ে যাওয়া দেখে সে কী হাসি।
নিতান্ত তুচ্ছ মজার কিছু বলছে এমনই ছিল তার হাসি। কিছুই বুঝতে পারিনি সেদিন। বুঝবার চেষ্টাও করিনি। আজ মনে হয় অকাট মূর্খ হয়ে যে মানব শিশু জন্ম নেয় পশুর মতো আর দিনে দিনে হয় মানুষ তার কিছুই আমি হতে পারিনি। আমি রয়ে গেছি আমার জন্মের ক্ষণটিতেই, মূর্খতাই এখনো সবচেয়ে বেশি সক্রিয় এই পশু জন্মের মাঝে। সার্বক্ষণিক মৃত্যু চিন্তার কারণে মহাকর্ষ বল ধীরে ধীরে কমতে থাকে। মানুষ ইমব্যালান্সড্ হয়ে পড়ে যখন তখন হোঁচট খায়, জানলাম যখন বার্ন ইউনিটের সামনে পোস্টমোর্টেম থেকে মাত্র ঘুরে আসা তার অচঞ্চল দেহের সামনে দাঁড়িয়ে ছোটবেলার বন্ধু ডাক্তার পারু ঘোষ বলছিল এসব কথা।
জীবনের এত উদাসীনতা, এত ছেলেখেলা আর এত এত অভিমান নিয়েও চেষ্টা যে করেনি তা নয়। আমি নির্বাধ নির্লজ্জ। দূরে এসে পৃথিবীর গতি আর কাজের চাপে ভুলে গেছি তার নিঃসঙ্গতা। ভুলে গেছি সেই একা একা ফুলের কথা যে ফুটতো নিরজনে সন্ধ্যায় আর রাত গভীর হতে হতে যত কথা যত ভালোবাসা হৃদয়ের অনিচ্ছাকৃত যত ক্লেদ যে ঢেলে দিত আমারই কাছে সে কার কাছে আজ বলে কালো মেঘের কথা? কাকে ঢেলে দেয় সুগন্ধ আর হৃদয়ের অমরতা? একটা কাজ ছিল তাও ছেড়ে দিল। রোদ্দুপুরে বসে থাকে বারান্দায়। মেঘে ভিজে বসে থাকে বারান্দায়। ঘুম যেন তার চিরশত্রু। মাঝে মাঝে আসে আমার অফিসে টাকা নিতে। বন্ধুরাও তখন তার ভার বইতে বইতে ক্লান্ত। কিন্তু এই মুহূর্তে প্রয়োজন একজন মনোচিকিৎসক। গেছিল সেখানেও। নিবিড় পরিচর্যার কথা বললেন মনোচিকিৎসক। প্রচুর টাকার দরকার। আমরা ভাবলাম এটা তার এক ধরনের হেঁয়ালি। সেই যে বলছিলাম দূরত্বই সম্পর্কের সর্বাধিক শত্রু। তাই হলো কাল। জানলাম না বুঝলাম না চিরদিনের উদাসিনীর যন্ত্রণা, ব্যথা, বেঁচে থাকবার কাতরতা। দিতে পারলাম না তাকে প্রয়োজনীয় সাহচর্য কিংবা সাহায্য। মা খালা বন্ধু মনোচিকিৎসা কার কাছেই না গেছে আমার সেই নির্বাক কথা কম বলা, নিজেকে প্রকাশ করতে না পারা তারা। অবশেষে সেই দীপালিওয়ালা। তখন তার সানাই বেজেছে। তারও কিছু করবার নেই। স্বল্পভাষী হল মূক। না বলতেই বুঝতে পারা হৃদয় হলো বধির।
তারপর জ্বলল আগুন।
-‘তবু আগুন বেণীমাধব আগুন জ্বলে কই’
দু’দিন আমার বাসায় আমারই ঘরে বসে লিখেছে সব প্ল্যান। জানি না। দিন শেষে এসে দু’একটা কথা। রাতে একসাথে ঘুমুতে যাওয়া, ব্যাস। এইটুকুই। পরদিন আমি অফিস যাবার পথে নামিয়ে দিয়ে গেলাম। সে বাড়ি যাবে। আর আমি যাব শহর ছেড়ে বাইরে। অন্য এক শহরে। বন্ধু কলির বিয়েতে। ফিরবো ছুটি কাটিয়ে দু’দিন পর। আমি কি আর জানি সারা চরাচর ঘুরে এসে সে ঠিক করে নিয়েছে তার আসল ঠিকানা। সে যে পাড়ি জমাচ্ছে তারার দেশে এত তাড়াতাড়ি, এত নীরবে নিশ্চিন্তে, আগেরই মতো! বরাবরেই মতো স্থিত ধীর নিশ্চল বেগে চলেছে সে সকল ছেড়ে আমি কি জানি!
পরে জেনেছি বাড়ির দারোয়ান জানতে চাইছিল
-আপা হাতে কী?
-কেরোসিন
-এত কেরোসিন দিয়া কী করবেন?
-অনেক পিঁপড়ে। এক সাথে ক্যান ভরে কিনে রাখলাম। বারবার যাতে কিনতে না হয়
এই তার শেষ কথা। অতঃপর আগুন জ্বলে। সে আগুন ছাড়িয়ে যায় মুখ থেকে শরীর শরীর থেকে ঘর ঘর থেকে বাড়ির ছাদ। সব পুড়িয়ে যখন কালো ধোঁয়ার মত্ততা গায়ে মাখছে বাতাস কেবল তখনই জানা যায় সব। তখনো সে মাধবী, স্বল্পবাক কথা বলেনি, চিৎকার করেনি। মধ্যরাতে ফোন বাজে। ঢাকা মেডিক্যালের বার্ণ ইউনিট থেকে ভাইজানের কণ্ঠ শুনি ফোনে;
-৪৫% বার্ন। তাড়াতাড়ি আয়।
সারাটা রাত জ্বলেছিল সে আগেরই মতো বুকের ভেতর। শুধু তার আর আমার রাতগুলো আগে খুব দ্রুত ফুরিয়ে যেত। গল্প করতে করতে কখন যে রাত ফুরিয়ে ভোর হতো আমরা টেরই পেতাম না। কত রাত যে ভোর হতে দেখেছি দু’জনে। সূর্যের প্রথম আলো মেখেছি গায়ে তার কোন হিসেব নেই। আজ রাত বড় দীর্ঘ। শেষ নেই তার। ভোরের আলো ফুটতে না ফুটতেই আমি দৌড়াই বাসস্টপেজে। পথ যেন আরো সুপরিসর। সবই আজ প্রলম্বিত। বিক্ষুব্ধ। ঘড়ির কাঁটাও অনড়। শুধু একটি জীবন প্রদীপ ছাড়া আর আর আরো যা কিছু- সবই আজ বড় বেশি দীর্ঘ। জানালায় চোখে ভাসে পুরানো সব ছবি, সব গান আজ সুর নিয়ে এসে নুয়ে পড়েছে যেন আমারই হৃদয়ের একধারে। কিছুতেই সরে না। চোখের জলও আজ বাঁধ মানবার নয়। মনে পড়ে যায় তার কথা:
-‘সহজে না হোক কঠিনে তো নেবে নিশ্চয়ই’।
-‘জ্বলছে। প্যাথিড্রিন’।
এই ছিল চিরকালের আনসোস্যাল, অহংকারী আর নির্মোহনীয়ার শেষ দু’টি বাক্য। এর পর আর যা যা বলার ছিল বলা যেত না। শোনা যেত না। বুকের কাছে যেন ফুটে আছে একগুচ্ছ রক্ত গোলাপ, শুয়ে থাকলো লাশ কাটা ঘরে তারপর আমাদের চোখের সামনে অতঃপর চেতনার পথ জুড়ে। ভাষাহীন তার কথা এতটা প্রগাঢ় আজো! চোখের তারার শব্দ এতটা নিঃশব্দে এখনো বাজে এত বিধুরতা নিয়ে করুণ সুরে! তারপর আমি কত কত রাত শুয়ে থেকেছি একা অন্য আর এক ছাদে নিঃসঙ্গ। পার করেছি কত কত বেলা আর কালবেলা। সবই জানে সে কথা। এখনো একা আকাশের পানে চেয়ে চেয়ে যখন রাত শেষ হয় শুকতারা চেয়ে থাকে আকাশের কিনারায়। সেই বুঝি নেমে আসে মাটির কাছে আকাশের মাঝখান থেকে একদম পৃথিবী ছুঁতে পারা যায় কি যায় না এমন দূরত্বে। তবু আমি আর পাইনা না তাকে, কোমল হেসে বলে যায় বুঝি চোখের ভাষায় আর হাসির রেখায়
-কী করেছিলি আমার জন্য?!
এইটুকু অভিমান থাকুক। পৃথিবী তো তাকে কঠিণে নিয়ে গেছে। সহজ দহনটুকু আজ আমার থাক।