কালবৈশাখী

সাইকেলের প্যাডেলে পা-রেখে একবার আকাশ দেখল শাহানা l বৈশাখ শেষ হতে চলল, অথচ এবছর তেমন ভাবে কালবৈশাখীই হল না l আকাশ কালো করে গাছেদের  মাথা ধরে ঝুঁটি নাড়িয়ে ধুলো আর শুকনো পাতা বুকে নিয়ে গর্জনে গর্জনে চৌচির হয়ে সে এল না l

ছোটবেলায়  খুব ডাকাবুকো ছিল শাহানা l  ঝড় এলেই মাঠে কিংবা বাগানে গিয়ে দাঁড়াত l তারপর দুরু দুরু বুকে রুদ্র ঝড়ের দাপট দেখত l ওই তাণ্ডবের মধ্যে কেমন যেন একটা মোহ ছিল l  সেই ঘোরলাগা মোহ আজ পঁচিশ বছরের যুবতী শাহানাকে তাড়া করে বেড়াচ্ছে l সে মনেপ্রাণে চাইছে আর একবার কালবৈশাখী আসুক l আর একবার তাণ্ডব এসে তাকে খান খান করে দিক l

আসলে অনেকদিন ধরে সমরেশ তার সাথে যোগাযোগ রাখছে না l না ফেসবুকে, না হোয়াটস্অ্যাপে l ফোন করা তো দূরের কথা, মেসেজ পাঠালে তার উত্তরও দিচ্ছে না l হঠাৎ করে সমরেশের এই অবহেলা, এড়িয়ে যাওয়া শাহানার নারীত্বকে আঘাত করছিল l সে মনে মনে বেশ আহত হচ্ছিল l

সমরেশ তার স্কুলজীবনের বন্ধু l ওরা একসঙ্গে উচ্চমাধ্যমিক পর্যন্ত পড়েছে l  তখন শাহানা কিছু বোঝেনি l কলেজজীবনে সমরেশ চলে গেল শিবপুরে আর ও প্রেসিডেন্সিতে l এক বৃষ্টিস্নাত বিকেলে একহাঁটু জলে দাঁড়িয়ে শাহানার প্রথম মনে হয়েছিল, সে সমরেশকে ভালোবাসে l সেদিনই কফিহাউসে বসে শাহানা সমরেশকে কথাটা বলেছিল l ও তো অবাক হয়ে চোখ বড় বড় করে বিস্ময়ে  চিৎকার করে উঠল,’সত্যি !

আমিও তো সেই কবে থেকে তোকে ভালোবাসি l সাহস করে বলে উঠতে পারিনি l’

‘কেন?’  শাহানা জানতে চেয়েছিল l

‘তুই যা মুডি মেয়ে l যদি না বলে দিস, সেই ভয়ে l’

‘দুর্ বোকা l প্রেমের ব্যাপারে ছেলেদের একটু সাহসী হতে হয় l ঠিক আছে, সে-ব্যাপারে পাঠ নাহয় তোকে আমিই দেব l’

সেই শুরু l তারপর এতগুলো বছর, কত হাজার ঘণ্টা, কত লক্ষ মিনিট তারা পায়ে পা-মিলিয়ে হেঁটেছে l চোখে চোখ রেখে কথা বলেছে l একে অন্যের উপলব্ধির কাছে গেছে l পছন্দ অপছন্দ শেয়ার করেছে l

কিন্তু হঠাৎ এই ছন্দপতন l শাহানা মাস্টার্স করার পর  পি এইচ ডির ফেলোশিপ নিল l সমরেশ কোর্স কমপ্লিট করে ক্যাম্পাস ইন্টারভিউয়ের মাধ্যমে ঢুকে গেল টেলকোতে l

প্রথম প্রথম বলত, ‘নতুন চাকরি, নানারকম ট্রেনিং, খুব ব্যস্ত l’ শাহানার মন তাতে সায় দেয়নি l সে অন্য গল্পের গন্ধ পেয়েছিল l

তার গল্পটা সত্যি করল অনল l ওদের দুজনের কমন বন্ধু l সেই স্কুললাইফ থেকে ছিনে-জোঁকের মত শাহানার পেছনে পড়েছিল l বহুবার বহুভাবে সে উত্যক্ত করেছে l

শাহানা ঠাণ্ডা মাথায় ওকে বুঝিয়েছে, ‘দ্যাখ, তোর প্রতি কোন ফিলিংস্  আমার নেই l আমি কী করতে পারি? তাছাড়া আমি এখন সমরেশের সঙ্গে রিলেশানে আছি l’

তবুও অনল থামেনি l শেষমেশ বাধ্য হয়ে শাহানা একদিন অনলের স্কুল-মিস্ট্রেস  মায়ের কাছে গিয়ে হাজির l ব্যাপারটা বাবুর ইগোতে লেগেছিল l সেই থেকে অনল আর শাহানামুখো হয়নি l

কাল উইকএন্ডে বাড়ি ফেরার পথে স্টেশনে অনলের সাথে দেখা l পাশ কাটিয়ে  চলে আসছিল l অনলই ওকে দাঁড় করাল l

‘দাঁড়ান ম্যাডাম, খবর আছে l  আপনার তোতাপাখি তো এবার পাকাপাকি ভাবে অন্য ডালে l’

‘মানে l ‘  শাহানা থমকে যায় l

অনল একটু কাছে সরে আসে l তারপর অনেকটা প্রতিশোধের হিসহিসে গলায় বলে, ‘সমরেশের তো বিয়ে ঠিক হয়েছে l সামনের মাসে l’

পরদিন সকালে সাইকেল নিয়ে সোজা সমরেশের বাড়ি l

অনল যা বলেছিল, তা বর্ণে বর্ণে সত্যি l সমরেশ জানাল, ‘তার মায়ের এক বান্ধবী এই সম্বন্ধটা এনেছেন l দু-বাড়ির সবাইয়ের পছন্দ l ‘

তাহলে আমাদের এতদিনের সম্পর্ক?’ শাহানা ককিয়ে ওঠে l

‘ওসব ভুলে যা, বি প্র্যাক্টিক্যাল l  আমার মা কোনমতে

তোকে মেনে নিচ্ছে না l’

‘তুই মানিস তো?’  শাহানা মরিয়া চেষ্টা করে l  ওর গলায় আকুলতা l

‘না মানে, মাকে কষ্ট দিয়ে, মায়ের অমতে আমি কিচ্ছু করতে পারব না l  ভাল হয়, তুই চলে যা l সবকিছু ভুলে নতুন কাউকে খুঁজে নে l’

‘বাঃ l এই না হলে পুরুষ !’

শাহানা আগুনের ফুলকির মত ছিটকে বেরিয়ে এসেছিল সমরেশের বাড়ি থেকে l

তারপর সারাদুপুর বৈশাখের দাবদাহ  মাথায় নিয়ে শুষ্ক রুক্ষ এই পৃথিবীর বুকে হাঁটছিল l একা একা l

শাহানার সর্বাঙ্গে এখন আগুন l অথচ ওর বুকের গোপন কোটরে কান্নার শীতল স্রোত বইছে l নিজেকে কেমন নিঃস্ব প্রতারিত আর অসহায় লাগছিল তার l  একটা ঝাঁকড়া গাছের নিচে দাঁড়িয়ে ও নিজের মধ্যেকার জেদি অহংকারী মেয়েটাকে জাগিয়ে তুলছিল l

মনেপ্রাণে চাইছিল কালবৈশাখী আসুক l সমরেশের ওই অসভ্যতা, কারণহীন প্রত্যাখ্যানের একটা মোক্ষম জবাব দিতে l  একটা প্রত্যাঘাত ফিরিয়ে দিতে l

আর কি আশ্চর্য, ঠিক তখনই শাহানার চোখের সামনে অনলের মুখটা ভেসে উঠল l যাকে সে একদিন ফিরিয়ে দিয়েছিল l শাহানা সাইকেল নিয়ে অনলের বাড়ির দিকে যাত্রা শুরু করল l

ডোরবেলের আওয়াজ শুনে অনলই দরজা খুলল  আজ ছুটির দিন, ও বাড়িতেই ছিল l শাহানাকে দেখে অবাক

‘কিরে, তুই এসময়?’

‘কেন, আসতে নেই? ভেতরে আসতে বলবি না?’

হতচকিত অনল দরজা থেকে সরে দাঁড়ায় l

‘আয়,  ভেতরে আয় l’

সাইকেল ফেলে একছুটে শাহানা ঘরের মধ্যে l অনল বুঝতে পারল না শাহানা কখন কালবৈশাখী ঝড় হয়ে তার বুকে আছড়ে পড়েছে l