যশোবন্ত বসু,বাঁকুড়া শহরে বসবাস, সাহিত্যের ছাত্র, পেশা শিক্ষকতা। নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি সময় থেকে জেলা ও রাজ্যের কিছু পত্রপত্রিকায় লেখালিখি শুরু। ভালোবাসার বিষয় কবিতা ও রম্যরচনা। কবিতার পাশাপাশি স্যাটায়ারধর্মী লেখাতেও সমান আগ্রহ। কবিতা ও মননশীল প্রবন্ধের আগ্রহী পাঠক। ভণ্ডামি ও কপটতাহীন জীবনযাপনে বিশ্বাসী।

স্মার্ট বড়, অসামাজিক নয়

ভুরু কুঁচকে চোখ সরু করে পল্কুদা বলল,
আগে ছিল গ্রামের আটচালা, চণ্ডী মণ্ডপ,
বাবুদের বৈঠকখানা,পাড়ার রোয়াক কিংবা
চায়ের দোকান। এখন হয়েছে তোদের এই
ফেসবুক! তোদের যা-কিছু প্রেম,বিপ্লব,
সৃষ্টি ও কৃষ্টি, অম্ল উদ্গার,ফোড়ন-টিপ্পনী,
হুজুগ-হুল্লোড় ইত্যাদি প্রভৃতির ডিজিটাইজড
ডান্ডিয়া নেত্য!
আমি বুঝতে পারলুম,অনেকদিন পর আবার
কোনও কারণে পল্কুদার একটা টেক্‌টনিক
মুড শিফ্‌ট্‌ হয়েছে। এমন হলে কোথাও কোনও
সুনামি হয়না ঠিকই,কিন্তু মনের ভেতর কেমন
যেন একটা ঝাঁকুনি লেগে যায়, ধাতস্থ হতে একটু
সময় লাগে।
পল্কুদা এমনিতে খুবই নির্বিবাদী,নির্বিরোধী চরিত্র।
বিয়ে-থা করেনি। সৎ ,আদর্শবান,পরোপকারী মানুষ।
একাশি বছরের বুড়ি মা’কে নিয়ে তার সাদামাটা
অ্যানালগ সংসার। কুড়ি-বাইশটি ছেলেমেয়েকে
টিউশন পড়ায়। তাদের অর্ধেকের কাছ থেকেই
কোনও টাকাকড়ি নেয়না। কারও বিপদে-আপদে
সবসময় পাশে থাকে। আর অবসরে থাকে কোনও
না কোনও বই নিয়ে।
এহেন পল্কুদা হঠাৎ ফেসবুক নিয়ে কেন এমন
উত্তেজিত হয়ে উঠল বুঝতে পারলুম না। নির্ঘাত
গুরুতর কিছু ঘটেছে। কিন্তু পাছে পল্কুদার মেজাজটা
আরও বিগড়ে যায় তাই খুব সাবধানে খানিক ডিফেন্স
দেবার চেষ্টা করতে লাগলুম,
আহা কারও ক্ষতি না-করে যদি এসব নিয়ে মজে থাকি
তাতে অসুবিধেটা কোথায়? আগে আমরা সামাজিকতা
করতুম, এখন ফেসবুক,হোয়াট্‌স্‌অ্যাপ করি।
আমরা যারা নেতা-মন্ত্রী হতে পারিনি, ললিত,নীরব,
বিজয় হবার ধক্‌ পর্যন্ত নেই, মোটামুটি সুবিধাভোগী
শ্রেণি, অ্যাক্সিডেন্টে বা মারণরোগে উজাড় হয়ে যাবার
আগে এই যে একেক পিস্‌ সবেধন নীলমণি জীবন
নিয়ে কোনরকমে হেঁটেচলে বেড়াচ্ছি, কাজ, আলসেমি,
ফাঁকিবাজি,ঝগড়া,কেচ্ছা,বায়ু,পিত্তের পরেও তো মন
বলে একটা জিনিস থাকে,নাকি?
থাকে বইকি। মন থাকলে মনের আনন্দেরও একটা
ব্যাপার থাকে। অহং বলে একটা অদৃশ্য বায়বীয় অথচ
নাছোড় অচ্ছেদ্য বস্তু থাকে।
অ্যায়, এক্কেরে ঠিক ধরেছ ! মন-মজানোর এমন একটা
খেলা পেলে কি তবে ছেড়ে দেব ? আচ্ছা, এই মুখপোড়া
সিস্টেম আমাদের কী দিয়েছে বল?একটিমাত্র ভোটার-কার্ড
আর পাঁচ বছর ছাড়া ছাড়া রোদে পুড়ে লাইনে দাঁড়িয়ে
একটিমাত্র ভোট। কীটনাশক-মাখা সব্জি,বিষাক্ত ফর্ম্যালিনে
চোবানো মাছ-মাংস। ঘেন্না ধরে যাবার আগে,অবসাদে হেজে
যাবার আগে এই আনন্দ-যজ্ঞে একবার লগ-ইন করব না ?
এই অহং প্লাবনে,শ্লাঘা স্রোতের জোয়ারে গা ভাসাব না
পল্কুদা ?
ভাসাও বাছা,ভাসাও। ভেসে যাও,হেসে নাও, দুদিন
বইতো নয়। হরেক হট্টমেলায় শত শত স্মাইলি বর্ষিত
হোক… দুঃখে থাকুক আনস্মার্ট লোক…
না পল্কুদা, তাই বলে আমাদের স্বার্থপর আত্মমগ্ন ভেবোনা।
চারিদিকে চোখ-কান খোলা রেখেছি। শুধু প্রখর সাহিত্য-
সংস্কৃতিবোধই নয়, প্রতিটি সামাজিক,রাজনৈতিক ক্রিয়া-
কলাপে আমাদের সচেতন ক্লিক্‌-বিক্রিয়া আছে। নিজেরা
পথে না-নেমে ( যারা নামছে তাদেরকে অবশ্য সংগ্রামী
অভিনন্দন,শুভেচ্ছা ইত্যাদি…) সোফা-কাম-বেডের নরম
আয়েসি পরিসরে থেকেও আমরা বিপ্লব ও দিনবদলের
স্বপ্ন দেখি। মেহনতি মানুষের দাবি আদায়ের নৈতিক
সমর্থনে লাইক দিই,মিছিলের ছবি শেয়ার করি।
চারপাশের দুর্নীতি,দুনম্বরি,অত্যাচার,অনাচারের এত এত
প্যানিক-বাটনের চেয়ে আমাদের এই লাইক-বাটনই
সবচেয়ে নিরাপদ ও স্যাটিস্‌ফাইং।
এই ট্যাব,স্মার্টফোনই তো আমাদের এখনকার
চণ্ডী মণ্ডপ, পিএনপিসির ফুড-জয়েন্ট,ভার্চ্যুয়াল
বৈঠকখানা !
পল্কুদার কোঁচকানো ভুরু ক্রমশ সোজা হয়ে গেল।
মুখে একখানা অ্যাকচুয়াল স্মাইল মেলে বলল,
আয়, তোকে একটা হামি খাই !