“বিটি রোড, কলকাতা থেকে বারাকপুর, বারাকপুরের চিড়িয়ামোড় থেকে… বিটি রোড জিপি রোড নাম নিয়ে আবার সাঁ সাঁ করে ছুটে গেছে উত্তর দিকে। সেই কাঁচরাপাড়া পর্যন্ত।
এই সুদীর্ঘ রাস্তাজুড়ে ভিড় লেগেছে। কল-কারখানার ছুটির ভিড়। সারাবাংলার বৃহত্তম শিল্পকেন্দ্র এই রাস্তা। গঙ্গার তীরে তীরে, রেল লাইনের ধারে ধারে অসংখ্য কারখানা ইমারৎ, তারই ছত্রছায়ায় ছড়ানো আবর্জনার স্তূপের মত বস্তি। এবড়োখেবড়ো, বাঁকাচোরা, দোমড়ানো সুদীর্ঘ শিল্পশহর।” ( বিটি রোডের ধারে – সমরেশ বসু)

ভারতবর্ষের প্রথম ব্রিটিশ ক্যান্টনমেন্ট গড়ে উঠেছিল ১৭৬৫ সালে, নাম ‘বারাকপুর ক্যান্টনমেন্ট’। ১৭৭৩ সাল নাগাদ ওয়ারেন হেস্টিংস ভারতের গভর্নর জেনারেল হয়ে এলেন। এমন সময়ে কলকাতার সাথে বারাকপুরের যোগাযোগ ব্যবস্থা আরও নিবিড় করে তোলার প্রয়োজন বোধ হল ইংরেজ সরকারের। এজন্যই ১৭৭৫ সালে তৈরি হল বারাকপুর ট্রাঙ্ক রোড।

বি টি রোড সবমিলিয়ে 18.5 কিমি লম্বা এবং বর্তমানে একটি চার লেনের রাজপথ। রাজ্য সড়ক নং ১ এবং ২ এর অংশ। দুটি জেলা অর্থাৎ কলকাতা এবং উত্তর ২৪ পরগনার মধ্যে রাস্তাটি বিস্তৃত। ব্যারাকপুর, টিটাগড়, খড়দহ, পানিহাটি, কামারহাটি, বরানগর প্রভৃতি মিউনিসিপালিটি এবং কলকাতা মিউনিসিপাল কর্পোরেশন এই রাস্তার সাথে যুক্ত।

উত্তর কলকাতা ও শহরতলীর দীর্ঘ পরিবর্তন ও ইতিহাসের সাক্ষী ভারতের প্রাচীনতম পাকা রাস্তাগুলির অন্যতম এই বি টি রোড। একসময় দক্ষিণবঙ্গের বিস্তৃত এলাকা জুড়ে সার্ভের প্রয়োজনে কলকাতার আশেপাশে প্রায় পঞ্চাশটি ত্রিগোনমেট্রিক্যাল সার্ভে টাওয়ার নির্মাণ করা হয়। এর মধ্যে দুটি বি টি রোডের পাশে আজও অবস্থান করছে। এদের গায়ে লেখা তথ্য এবং অন্যান্য সুত্র থেকে জানা যায় ১৮৩১ সালে সার্ভেয়ার জেনারেল জর্জ এভারেস্ট এর নেতৃত্বে এবং রাধানাথ শিকদার এর তত্ত্বাবধানে এদের নির্মাণ হয়েছিল। পাইকপাড়া এবং শুকচরে অবস্থিত এই দুটি টাওয়ারের উচ্চতা ৭৫ ফুট।
বর্তমানে বি টি রোড এর দুপাশে অবস্থিত কয়েকটি উল্লেখযোগ্য দ্রষ্টব্য হল :
★ টালা ট্যাংক (স্থাপিত ১৯০৯)
★ রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয় ( বি টি রোড ক্যাম্পাস স্থাপিত ১৯৭৬)
★ ইন্ডিয়ান স্ট্যাটিসটিক্যাল ইনস্টিটিউট (স্থাপিত ১৯৩১)
★ বেঙ্গল কেমিক্যাল (পানিহাটি শাখা স্থাপিত ১৯২০)
★ গান্ধী ঘাট ( উদ্বোধন ১৯৪৯)

স্বাধীনতার আগে পরে কলকাতার উত্তরে হুগলি নদীর তীর বরাবর শিল্পের বিকাশে বি টি রোড এর ভূমিকা ছিল অপরিসীম। এখানকার পাট, কাগজ, ইঞ্জিনিয়ারিং প্রভৃতি শিল্পে কাঁচামাল আনা ও উৎপন্ন দ্রব্য বাজারে পাঠানোর কাজে এই রাস্তার ব্যবহার আবশ্যিক ছিল। যদিও বর্তমানে এই শিল্পক্ষেত্রটি রুগ্ন হয়ে পড়েছে।
১৮৬৪-১৯৭০ সালের মধ্যে গড়ে ওঠে পলতা ওয়াটার ওয়ার্কস। বর্তমানে গঙ্গা থেকে জল শোধন করে প্রতিদিন প্রায় ২৬০ মিলিয়ন গ্যালন জল বি টি রোড বরাবর বিস্তৃত পাইপের মাধ্যমে টালা ট্যাংকে পৌঁছায়। কলকাতা মহানগরীর চাহিদা মেটাতে এই জল অপরিহার্য।
এইভাবে প্রায় বিগত ২৫০ বছর ধরে বি টি রোড অবিরাম পরিষেবা দিয়ে আসছে। সময়ের সাথে সাথে তার চেহারা বদলেছে। স্থানে স্থানে ব্যাসাল্টের কালো ইঁটের বদলে এসেছে বিটুমেনের মোটা স্তর। দুপাশে শিল্পাঞ্চলের চিমনিগুলি একসময় সময়ের সাথে সাথে অলস ও অকেজো হয়ে পড়েছে। তবু বিশ্বস্ত সৈনিকের মতো বি টি রোড আজও অক্লান্ত, ব্যস্ততায় তার আপাদমস্তক মোড়া।