ঐতিহাসিক মার্ক টোয়েন একে বলেছিলেন “Cloud-kissing monument “। কথাটি সত্য বটে। জুন মাসের মাঝামাঝি এই দক্ষিণবঙ্গের আকাশ যখন ভিজে মৌসুমী বাতাসের দখলে চলে যায়, জলীয়বাষ্প শুষে নিয়ে গর্ভিনী হয় বর্ষার মেঘমালা, তখন তার প্রথম আদর ঝরে পড়ে এর উত্তুঙ্গ শরীর জুড়ে। আবার শীতের নীল আকাশে উঁকি মারার অধিকার কোলকাতা মহানগরী যদি কাউকে দিয়ে থাকে তবে সেওতো সেই আমাদের চিরচেনা শহিদ মিনার।

প্রতিটি শহরের একটি চেনা একান্ত নিজস্ব ‘আউটলাইন’ থাকে। শুধুমাত্র কিছু রেখার ওঠানামা সেই শহরের অনন্য বৈশিষ্ট্যগুলিকে মূর্ত করে। এই কোলকাতা মহানগরীর আউটলাইন প্রকাশের উচ্চতম বিন্দুটি নিঃসন্দেহে ছুঁয়ে থাকে শহিদ মিনারের চূড়া, যার ঠিকানা ১১, রানী রাসমণি এভিনিউ, কোলকাতা।

মেজর জেনারেল ডেভিড অক্টারলোনি ছিলেন ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কমান্ডার। তাঁর পরিচালনায় ব্রিটিশ বাহিনী ১৮০৪ সালে সফলভাবে মারাঠা শক্তিকে দমন করে ইংরেজ আধিপত্য অক্ষত রেখেছিল দিল্লির বুকে। আবার ১৮১৪-১৬ সালে নেপালের সাথে যুদ্ধে গোর্খা সৈন্যদলকে পরাস্ত করে অক্টারলোনির নেতৃত্বে ব্রিটিশ সেনাদল ইংরেজ শাসনকে এনে দিয়েছিল দৃঢ়তা। এইসব কৃতিত্বকে সম্মান জানিয়ে স্যার ডেভিড অক্টারলোনির স্মৃতিতে ১৮২৫ সালে কলকাতায় ৪৮ মিটার (১৫৭ ফুট) উঁচু একটি মিনার নির্মাণের কাজ শুরু হয়। মিনারটির নকশা করেছিলেন জে. পি. পার্কার। ১৮২৮ সালে নির্মাণ সমাপ্ত হলে এটি অক্টারলোনি মনুমেন্ট নামে পরিচিত হয়।

স্বাধীনতা পরবর্তীকালে ১৯৬৯ সালের আগস্ট মাসে তৎকালীন সরকার এই মনুমেন্টটিকে ভারতের দীর্ঘ স্বাধীনতা সংগ্রামে শহিদ সকল মানুষের স্মৃতির উদ্দেশ্যে উৎসর্গীকৃত করে। অক্টারলোনি মনুমেন্ট-এর নতুন নামকরণ হয় ‘শহিদ মিনার’ (Martyr’s Monument)।

কুতুবমিনার ছাড়া যেমন দিল্লির কথা ভাবা যায় না, তেমনি শহিদ মিনার কোলকাতার এক অনবদ্য প্রতীক। মিনারটির গঠনশৈলী চমকপ্রদক। এর নিচের অংশে অনুসরণ করা হয়েছে ইজিপশিয়ান স্থাপত্যশৈলী। মধ্যভাগে সিরিয়ান নির্মাণধারা স্পষ্ট। আর উপরের অংশ এবং গম্বুজাকৃতি চূড়ায় রয়েছে তুর্কি গঠন পদ্ধতির অনুসরণ। মিনারটির গায়ে ঢেউখেলানো স্তম্ভাকৃতি কারুকাজ এবং চূড়ার কাছে দু’দুটি ব্যালকনি অসাধারণ মৌলিকতা রচনা করেছে। মিনারের ভিতর সাপের মতো পাকানো সিঁড়ি বেয়ে উঠে পড়া যায় চূড়ার কাছাকাছি। ১৯৮ টি সিঁড়ি অতিক্রম করে পৌঁছানো যায় নিচের ব্যালকনিতে। আরো ২৫ টি সিঁড়ি টপকাতে হয় উপরের ব্যালকনিতে পৌঁছানোর জন্য। আর শহিদ মিনারের চূড়া থেকে পাখির চোখে দেখে নেওয়া আমাদের প্রিয় কোলকাতার অনন্য রূপ — সেতো অবিস্মরণীয় অভিজ্ঞতা।
১৯৯৭ সালে শহিদ মিনারের নিচের ব্যালকনি থেকে একজন পর্যটকের অবাঞ্ছিত আত্মহত্যা সাধারণ মানুষের প্রবেশে এনে দিয়েছে নিয়ন্ত্রণের বেড়াজাল। তবে বর্তমান সরকার ১৯১১ সালে ক্ষমতায় এসে শহিদ মিনারের সৌন্দর্যায়নের বিশেষ পদক্ষেপ নেয়। মিনার থেকে আলোকিত ও রং করার প্রথম পর্যায়ের কাজ শেষ হয়েছে। দ্বিতীয় পর্যায়ে শহিদ মিনার সংলগ্ন এলাকার সৌন্দর্যায়ন ও পরিকল্পনামাফিক উন্নয়নের কাজ সম্পূর্ণ হলে পুনরায় মিনারটির উপরে চড়ে কোলকাতা শহরকে উপভোগ করার সুযোগ হয়তো আবার আসবে আমজনতার কাছে।

শহিদ মিনার প্রাঙ্গণ ও ব্রিগেড ময়দান রাজনৈতিক সম্মেলনের জন্য সকলের কাছেই অতি পরিচিত। এখানে প্রথম রাজনৈতিক সভা হয়েছিল ১৯৩১ সালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নেতৃত্বে। সেই সভায় তৎকালীন ব্রিটিশ অত্যাচারে হিজলীতে নিহত এক ব্যক্তির মৃত্যুর প্রতিবাদে মুখর হয়েছিল বাঙালি। আজও শহিদ মিনার নীরবে সাক্ষী থেকে যায় কেন্দ্রের বঞ্চনা বা রাজ্যের অপকর্ম নিয়ে আয়োজিত সভায় গা গরম করা ভাষণগুলির। তার নিঃশব্দ হাসি, প্রশ্রয়ের আবিলতা ছড়িয়ে পড়ে কোলকাতার আনাচে-কানাচে। যুগ থেকে যুগান্তরে এই শহরের পাহারাদার হয়ে জেগে থাকে শহিদ মিনার।

ছবি সংগৃহীত